ঠাকুরের কলিকাতা যাত্রা -কাশ্মীরা মৈত্র

বাসাংসি জীর্ণানি যথা বিহায়
নবানি গৃহ্ণাতি নরোহপরাণি।
তথা শরীরাণি বিহায় জীর্ণান্য-
ন্যানি সংযাতি নবানি দেহী।।”
( মানুষ যেমন জীর্ণ বস্ত্র পরিত্যাগ করে নতুন বস্ত্র পরিধান করে, দেহীও তেমনই জীর্ণ শরীর ত্যাগ করে নতুন দেহ ধারণ করেন)

কেশব চন্দ্র সেন ১৮৮২ সালের ২৭শে অক্টোবর জাহাজ নিয়ে উপস্থিত হলেন দক্ষিণেশ্বরের ঘাটে।তাঁর সঙ্গে অন্যান্য ব্রাহ্মভক্তরাও ছিলেন।কেশবের ইচ্ছা, ঠাকুরকে জাহাজে করে কলকাতায় নিয়ে যাবেন।এদিকে দক্ষিণেশ্বরে ঠাকুরের ঘরে তখন উপস্থিত ছিলেন বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী। বিজয় আগে কেশবের ব্রাহ্মসমাজে ছিলেন।কিন্তু পরে কেশবের সঙ্গে মতবিরোধ হওয়ায় তিনি নতুন দল গড়েছেন।
শ্রীরামকৃষ্ণকে জাহাজে তোলবার জন্য ঘাটে নৌকা এসে উপস্থিত হল।বেলা ৪ টে নাগাদ তিনি নৌকায় উঠলেন।সঙ্গে রইলেন বিজয়।এ তো তাঁরই ইচ্ছা। দূরে চলে যাওয়া দুটি মানুষকে তিনি মিলিয়ে দেবেন।

অন্যদিকে জাহাজে দাঁড়িয়ে তখন সকলে শ্রীরামকৃষ্ণের আসার অপেক্ষা করছেন।অপেক্ষারত মানুষদের মধ্যে মা ও ছিলেন।তিনি কলকাতা থেকে কেশবের সঙ্গে জাহাজে করে এসেছেন, কেশব ও শ্রীরামকৃষ্ণের এই অপূর্ব সম্মিলন দেখার জন্য।
নৌকায় উঠেই শ্রীরামকৃষ্ণ সমাধিস্থ হলেন।তাঁকে অত্যন্ত সাবধানে নৌকা থেকে জাহাজে তোলা হল।সেই ভাবস্থ দিব্য সন্ন্যাসীকে অতি কষ্টে খানিকটা হুঁস করিয়ে জাহাজের কেবিনে নিয়ে আসা হল।বদ্ধ কেবিনে ঠাকুরের কষ্ট হবে বলে কেশব উঠে গিয়ে জানালা খুলে দিলেন।তিনি বিজয়কে দেখে একটু অপ্রস্তুত হয়েছেন।
একটু পরে শ্রীরামকৃষ্ণের সমাধি ভঙ্গ হল, আর তিনি তাঁর ‘মা’-র উদ্দেশে বলে উঠলেন,—- ” মা, আমায় এখানে আনলি কেন? আমি কি এদের বেড়ার ভিতর থেকে রক্ষা করতে পারব?”
মায়াজালে বদ্ধ জীবেরা তো বেড়াতেই আবদ্ধ, মিথ্যা অহং এর বেড়া।এ বেড়া একবার ভেদ করতে পারলে যে কত আলোক, তা কি তারা দেখেছে? তারা তো সব ভুলে বসে আছে।তারা যে নিত্য আনন্দময় সত্তা— এ খবর তো তারা রাখেনা।পঞ্চ ইন্দ্রিয় তাদের যা দেখাচ্ছে, সেটুকুকেই তারা বিশ্বাস করে।এর বাইরের খবর শ্রীরামকৃষ্ণ তাদের বোঝাবেন কি করে? তাই তিনি তাঁর ‘মা’ র কাছে প্রশ্ন করছেন।তাঁর কাছে তো তাঁর ‘মা’-ই সব।’মা’ যা বলে দেবেন, তিনি তাই করবেন।এভাবে তিনি জগতকে বোঝাবেন, মানুষের কর্তব্য কি।কিভাবে ঈশ্বরে প্রশ্নহীন বিশ্বাস স্থাপন করতে হয়।তিনি যে জগতের শিক্ষক!
গাজীপুরে অবস্থানকারী সাধক পওহারী বাবার কথা তুললেন একজন ব্রাহ্মভক্ত।ভক্তটি জানালেন, —” মহাশয়, পওহারী বাবা নিজের ঘরে আপনার ফটোগ্রাফ রেখে দিয়েছেন।”
ভাবমগ্ন শ্রীরামকৃষ্ণ এখনো ভালো করে কথা বলতে পারছেন না।তিনি মৃদু হেসে নিজের দেহের দিকে আঙুল দেখিয়ে বললেন, “খোলটা”!

শ্রীরামকৃষ্ণ বুঝিয়ে দিলেন, ফটোগ্রাফে কেবল খোল অর্থাৎ দেহের ছবি আছে।দেহ নশ্বর।কিন্তু দেহের ভেতরে যে আছে, সে অবিনশ্বর।সেই দেহ-খোল আবৃত দেহীর খোঁজ পাওয়াটাই তো এ জীবন লাভের আসল উদ্দেশ্য।
এরপর আর একটু প্রকৃতিস্থ হয়ে শ্রীরামকৃষ্ণ বলছেন, —-” তবে একটি কথা আছে।ভক্তের হৃদয় তাঁর আবাসস্থান।তিনি সর্বভূতে আছেন বটে,কিন্তু ভক্তহৃদয়ে বিশেষরূপে আছেন।যেমন কোনো জমিদার তার জমিদারির সকল স্থানেই থাকিতে পারে।কিন্তু তিনি তাঁর অমুক বৈঠকখানায় প্রায়ই থাকেন, এই লোকে বলে।ভক্তের হৃদয় ভগবানের বৈঠকখানা।”
সকলে আনন্দ লাভ করল একথা শুনে।শ্রীরামকৃষ্ণের সঙ্গলাভে সকলেই আনন্দ লাভ করে।তাঁর কথা, অপূর্ব পবিত্রতা, শিশুসুলভ হাবভাব সকলকে আনন্দে ভরিয়ে দেয়। তিনি আনন্দস্বরূপ! তাঁর জগতের আনন্দযজ্ঞে তিনি সকলকে এনেছেন।আমরা তাঁকে ভুলে ইন্দ্রিয়ের বিষয় নিয়ে মগ্ন থাকলে, আনন্দের এ অবিরাম প্রবাহ আমাদের অধরাই থেকে যাবে।তাই না?

(‘শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃত’ অনুসরণে লিখিত)

(চলবে)

____


FavoriteLoading Add to library

Up next

নস্যি -সৌম্য ভৌমিক গা ঘিনঘিন করে উঠলো সুমনার, বিয়ের রাত্রে বাসরঘরে একবার দেখেছিল বটে, তখন ভেবেছিল হয়ত বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে নেয়া, তাই বলে ফুলশয্যার রাত্রে ন...
বিলম্বিত মানিক প্রাপ্তি – অস্থির কবি... নবরত্ন পত্রিকার জন্মলগ্ন থেকেই চলচ্চিত্র সংক্রান্ত লেখা এই পত্রিকাটিতে আমি লিখে আসছি। পত্রিকা কর্তৃপক্ষের আগ্রহ এবং তাদের শ্রদ্ধা সম্মানে ভীষণই অভিভূত...
Vinci Da Movie Review ভিঞ্চিদা পরিচালক - সৃজিৎ মুখোপাধ্যায়       সৃজিৎ মুখোপাধ্যায় যে থ্রিলার ছবি তৈরী করতে সিদ্ধহস্ত তা তিনি আবার প্রমাণ করলেন `ভিঞ্চিদা' বানিয়ে। এর আগে...
মুখোশ – মৌসুমী খাঁ... এই পৃথিবীতে দেখি অনেকেই মুখোশ পরে আছে, ওই যে এক দম্পত্তি বেশ সুখীসুখী যাচ্ছে অনুষ্ঠান বাড়ি , তারাই আবার বাড়ি ফিরে মুখোশ খুলে করছে চুলোচুলি l আর ...
অন্ত্যমিল – মধুপর্ণা ঘোষ... অধিকাংশ সময় ছন্দহীন বাক্যগুলো ভীষণরকম ছন্নছাড়া; অন্ত্যমিলের খোঁজ যেটুকু বা ছিল সেটুকুও আজ আতিশয্য! তবুও হঠাৎই মিলে যায় শেষ শব্দগুলো - যেমন হঠা...
সত্যজিতের চিড়িয়াখানা-প্রচুর আলোচনা ও সামান্য সমালো... একটা সিনেমা তৈরির পেছনে যে ইন্টারেস্টিং গল্পগুলো থাকে তা দিয়েই হয়তো আরেকটা সিনেমা বানানো হয়ে যেতে পারে। এরকম বহু ছবি আছে যা তৈরি হতে হাজারো বাধা এসেছি...
উপহার – বিভূতি ভূষন বিশ্বাস... মায়ের হাত ধরে কাঁচা রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে আছি । একেবারে অজপাড়াগাঁ ফাঁকা রাস্তা,লোকজন নেই বললেই চলে । দুটি ছোট্ট ছেলে কাঁধে হাত দিয়ে হেঁটে আসছে । আমার থ...
রূপকথার বালিকার কল্পনায় – সৌমিক মান্না... একদিন আমি খেলার ছলে হারিয়ে গেলাম মেঘের দলে, হঠাৎ এক মেঘের ছায়া পড়লো আমার চোখের জলে তাকে দেখে মুগ্ধ হয়ে প্রশ্ন করলাম কৌতূহলে "বলো তো মেঘবালক,সোনার ...
নিয়মিত জীবন-যাপন - সমর্পণ মজুমদার   জীবনে অনেক কিছুই করতে ইচ্ছে হয় আমাদের। যা দেখেই আমরা অনুপ্রাণিত হই, সেটাই করতে ইচ্ছে করে। সেটা যে কোনো নির্দিষ্ট একটা বিষ...
ভৌতিক সন্ধ্যা – প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়... কত কি না ঘটে। যার ব্যাখ্যা আমরা পাই না। যতই তর্ক বিতর্কে জড়াইয়া না কেন, কেন ঘটে বা ঘটল তার হদিস কে দেবে? এই ঘটনাটাই পড়ুন। আশ্চর্য হবারই কথা। আমিও হয়...
ADMIN

Author: ADMIN

Comments

Please Login to comment