দরজাটা খুলুন না – শাশ্বতী সেনগুপ্ত

নেক কষ্টে শহরে বাড়িটা ম্যানেজ করতে পেরেছিল মানস। ভাড়া বাড়ি তাও ভাড়া পেতে প্রচুর ঝামেলা পোহাতে হয়েছে। শেষ পর্যন্ত বোকোদা বলে একজন পরিচিতর মাধ্যমে ভাড়াটা পায়। ২০হাজার টাকা অ্যাডভ্যান্স নিয়েছিল তখন। আর এই টাকাটা জোগাড় করতে গিয়ে তাকে আর তার স্ত্রীকে হিমসিম খেতে হয়েছিল। কারণ দুজনেই তখন সামান্য বেতনের চাকরি করত। অবশ্য ভাড়াটা খুবই কম ছিল মূলত তাই নেওয়া।

বিশাল বাড়িটায় ওরাই একমাত্র ভাড়াটে হয়ে এল। তার আগে কয়েকজন ছিলেন। বাড়িটার নাকি পয় সাংঘাতিক। তারা সকলে বাড়ি কিনে অথবা ফ্ল্যাট কিনে উঠে গেছেন। বাড়িটা ফাঁকা পড়েছিল। দেখাশোনা করতেন বোকোদা। আসল মালিক থাকেন উত্তর কলকাতায়। বাড়িটা দেখভাল হয়ে আর ভাড়াও মিলবে বলে তারা ভাড়া দিতেন। তবে শর্ত ছিল ভাড়াটিয়া ভালো হতে হবে।
বাড়িটা মানসের আর তার স্ত্রীর খুব ভালো লেগেছিল। বড় দোতলা বাড়ি। একতলাটায় তারা ভাড়া পেয়েছিল। বাড়ির দোতলা ফাঁকা থাকত। বাড়ির মালিক এলে তিনি ক’দিন থেকে চলে যেতেন। পিছন দিকটায় ঘন জঙ্গল ছিল। তবে বেশ উঁচু পাঁচিল দিয়ে পুরো  বাড়িটা ঘেরা ছিল। প্রথম রাতে এত বড় জনমানবশূন্য জঙ্গলঘেরা বাড়িতে খুব ভয় পেয়েছিল দুজনেই। তাই সারারাত বাইরের উঠানে আলো জ্বালিয়ে রেখেছিল। এমন ভাবে বেশ ক’দিন কাটার পর ভয় চলে যেতে আলো নিভিয়ে দিত তারা।

যখন প্রাকৃতিক দুর্যোগ হত। প্রবল ঝড় বা বৃষ্টি তখন সারা বাড়িটায় ওরা একা ভয়ে থাকত। ফাঁকা দোতলাটা কেমন যেন কেঁপে উঠত। পিছন দিকের জঙ্গলে শনশন আওয়াজ উঠত। পুরানো বাড়ির দোতলার জানলার শার্সি গুলোর ঝনঝন আওয়াজ উঠতো। কোনও খোপে লুকিয়ে থাকা পাখি ডানা ঝটফট করে উঠতো। ভয় জেঁকে বসত মনে কিন্তু কোনও অঘটন ঘটেনি। রাত ঠিকি কেটে যেত ঘুমিয়ে। এভাবেই ওই বিশাল বাড়িটায় থাকতে তাকতে দুজনে সাহস বাড়িয়ে তুলেছিল। এমন কি বাড়ির টয়লেট ছিল একেবারে উঠানের শেষ প্রান্তে। কখনও কখনও গভীর রাতে যখন প্রয়োজন হত। একটু দূরে আলো জ্বালিয়ে দাঁড়িয়ে থাকত একজন একজনের জন্য। এভাবেই কটা বছর ওরা কাটাচ্ছিল বাড়িটাতে।
এই ভাবেই একদিন ওই পাড়ায় একটা ফ্ল্যাট তৈরি হবার তোড়জোড় হল। যে তৈরি করছিল সে মানসের পরিচিত। তার সঙ্গে যোগাযোগ করে কথা বলল। কিন্তু কিছুতেই আশা পাচ্ছিল না দুজনে কি করে ফ্ল্যাটটা কিনবে। এত কম ইনকামে ব্যাঙ্ক কি লোন দেবে? এমন যখন চিন্তা ভাবনা চলছে তখন এক রাতে একটা ঘটনা ঘটে গেল।

সেদিন সারাটাদিন বেশ মেঘলা ছিল। তবে বৃষ্টি হয়নি। কেমন যেন মন খারাপ করা আবহাওয়া। গভীর রাতে দমকা বাতাস এল তাদের ঘরে। বাতাস কেমন ভিজে ভিজে। ওরা বুঝতে পারল কোথাও হয়ত বৃষ্টি হয়েছে। জানলা বন্ধ করল না। যদিও কেমন একটু শীত শীত করছিল। ঘড়ির দিকে তাকাল। রাত দেড়টা কাঁটায় কাঁটায়। হঠাৎ দুজনেই চমকে উঠলো। কে যেন বাইরের দরজায় টোকা মেরে বলছে, দরজাটা একটু খুলুন না? মহিলা কন্ঠ। এত রাতে কে? মানস বিছানায় উঠে বসতেই তার হাত জাপটে ধরল স্ত্রী মানু। ফিসফিস করে বলল, আলো জ্বালবে না। বাইরে বের হবে না। গভীর রাত এখন। কেউ চুরি-ডাকাতিও করতে আসতে পারে। তারপর আর কোনও কন্ঠ পেল না আর। ওরা অপেক্ষা করে শুয়ে পড়ল।

সবে বিছানায় পিঠ ঠেকিয়েছে ওমনি আবার সেই কন্ঠ পেল, দরজাটা একটু খুলুন না? বাইরে থেকে তখনও ভিজে বাতাস বয়ে আসছে। পিছনের জঙ্গল থেকে পাশের বাড়ির বিড়ালটা কেমন বেসুরে কাঁদছে। দোতলার ঘরের শার্সি দেওয়া জানলায় আবার ঝনঝন আওয়াজ উঠলো। এত বছরে আজই এমন ঘটছে। মানস আর মানু হাতে হাত রেখে বিছানায় কাঠ হয়ে বসে রইল ভোরের অপেক্ষায়। নিমেষ কাটছে আর ভাবছে আজি ওদের মৃত্যু বোধহয়। ভয়কে কতক্ষণ চেপে রাখবে! হঠাৎ করে আর একবারও কোন কন্ঠ ভেসে এল না। দুজনে ঘুমিয়ে পড়েছিল। ঘুম ভাঙল সকালে। অফিসের তাড়া। দ্রুত কাজ সারল ওরা। বের হবার আগে একটু পাশে থাকা প্রতিবেশীকে জিজ্ঞ্যেস করল, কোনও মহিলার কন্ঠ ওরা পেয়েছে কিনা। প্রতিবেশী জানাল না, তেমন কোনও কন্ঠ ওরা শোনেনি।

সন্ধ্যের পর অফিস থেকে বাড়ি ফিরে এল ওরা বুকে ভয় নিয়ে। সময় কাটতে লাগল। রাত এগিয়ে চলল। দশটার পর খাওয়া দাওয়া করে শুয়ে পড়ল। তারপর টি ভি দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে পড়ল দুজনেই। কালকের চেয়ে আজ আকাশ অনেকটা পরিস্কার। হঠাৎ মাঝরাতে আবার সেই মহিলা কন্ঠ, দরজাটা একটু খুলুন না? তড়াক করে বিছানায় উঠে বসল দুজনেই। মানস বলল, আজ তোমার কথা শুনব না। এভাবে ভয় নিয়ে বাস করা যায় না। এপার ওপার হবে তবু দরজা আমি খুলবই। মানু প্রায় কেঁদে বলল, আমার খুব ভয় করছে, দরজা খুলো না তুমি প্লিজ। থমকে গেল মানস। ঠিক সেই সময়ই আবার কন্ঠস্বরটা এল। একি কথা নিয়ে। রাত কেটে গেল ওদের প্রায় জেগে। সকালেই মানস বেকোদার কাছে গিয়ে সব ঘটনা জানল।

খানিকটা গুম হয়ে থেকে বোকোদা বললেন, ভয় পেও না। আগেও এমন ঘটেছে। তারা ভয় পেয়েছিল প্রথম দিকে তারপর আর পায়নি। ক্ষতি কিছু হবে না। শুধু বের হবে না ঘর থেকে। বোকোদার কথায় দুজনেই ভরসা পেল। কিন্তু কার কন্ঠস্বর? উনি কে? এই প্রশ্নে বোকোদা বললেন, কাল তো রবিবার? সন্ধ্যায় তোমাদের বাড়ি গিয়ে বলব। আর কাউকে এসব ঘটনা বলতে যেও না। নিশ্চিন্তে থাকো তোমরা। অফিস বের হবার সময় ফ্ল্যাট যে তৈরি করছে সেই মুন্নাদার সঙ্গে দেখা ওদের। মুন্নাদাই উপযাচক হয়ে বললেন, শুনুন। আপনাদের লোনের ব্যাপারে ব্যবস্থা হয়ে যাবে। আপনারা কি ফ্ল্যাট নেবেন? মানস আর মানুর বুকের কোথায় যেন আনন্দ নেচে উঠল। বলল, তাহলে তো নিতেই পারি মুন্নাদা? মুন্না বললেন, সোমবার আপনাদের ব্যাঙ্কে নিয়ে যাব। ম্যানেজারের সঙ্গে দেখা করিয়ে দেব আর এজেন্ট সব ব্যবস্থা করে দেবে। ওকে সামান্য একটা টাকা দিলেই হবে। বাসে যেতে যেতে সারাক্ষণ এই চিন্তায়, নানা কথায় দুজনের সময় কেটে গেল। ভয়টা যেন উবে গেল।

গভীর রাতে আজও তেমনই ঘটল। দরজায় কে যেন নক করে বলল, দরজাটা খুলুন না? অঘোরে ঘুমাচ্ছে মানু। এই সুযোগ, বাইরে বেরিয়ে দরজাটা খুলে ফেললো মানস। কোথায়? কেউ নেই। সহসা একটা বাতাস বয়ে গেল। তার পরমুহূর্তেই একটা আবছা অবয়ব যেন দেখতে পেল মানস। নাহ, তার ভয় করছে না। কিন্তু ওই আবছা অবয়ব কার! আরো কিছুক্ষণ দরজা খুলে দাঁড়িয়ে থেকে দরজা বন্ধ করে ভিতরে চলে এল মানস। মানু ঘুমাচ্ছে। তাকে ডাকল না।
পরদিন অফিস বের হবার সময় মুন্না এসে হাজির। ওকে দেখে ওরা দুজনেই অবাক হল। মুন্না বলল, যাবার মুকে ব্যাঙ্ক ঘুরে চলুন। আপনাদের লোনটা হয়ে যাবে। মানস আর মানু একসঙ্গে বলে উঠল, সেকি!
আজ ক’বছর হল ওরা নতুন ফ্ল্যাটটিতে বসবাস করছে শান্তিতে। সেই ব্যাপারটা মানুকে বলেছিল মানস। দরজা খুলে অবয়ব দেখাটা। মানু হঠাৎ বলে
উঠলো ,ইশ , আমায় একবার ডাকলে না? হয়ত তার জন্যেই  আমাদের এসব হয়েছে।

____


FavoriteLoading Add to library
Up next
ভৌতিক সন্ধ্যা – প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়... কত কি না ঘটে। যার ব্যাখ্যা আমরা পাই না। যতই তর্ক বিতর্কে জড়াইয়া না কেন, কেন ঘটে বা ঘটল তার হদিস কে দেবে? এই ঘটনাটাই পড়ুন। আশ্চর্য হবারই কথা। আমিও হয়...
।।ঠোঁটের ভালোবাসা।।... ফেসবুক থেকে বেডরুমের জার্নিটা তোর মনে আছে?কি যে বলিস? ভোলার জো আছে?তোর এক ডাকেতেই কিভাবে ছুটে গেছিলাম নর্থ টু সাউথ?দরজায় তোর ফার্স্ট অ্যাপিয়ারেন্সেই...
বাজার অভিযান – সমর্পণ মজুমদার...  আজকের মেসের বাজারের পালা পড়েছে আমার ওপর। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে  সবার ওপরেই একেকদিন পড়ে। যার যেদিন বাজার করার থাকে, সে চলতি মাসের ম‍্যানেজারের কাছ থেকে প্...
কনফেশন – তমালী চক্রবর্ত্তী...  থানায় ঝড়ের বেগে ঢুকল এক অল্প বয়সী ছেলে। অফিসার কে বলল স্যার আমি কিছু বলতে চাই। অফিসার তার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে জলের গ্লাস টা এগিয়ে দিল। একবারে জল শেষ...
কিপটে ভূতের গল্প – শাশ্বতী সেনগুপ্ত...       নাদেশ্বর বাঁড়ুজ্যে মরে গেলেন। ভূত হয়ে ভূত জগতে পর্দাপণ মাত্রই শুনতে পেলেন তাকে নিয়ে ফিসফিসানি আরম্ভ হয়েছে। তিনি হাওয়ায় কান পাততেই কথা স্পষ্ট হল,...
জাতিভেদ প্রথা ও স্বামী বিবেকানন্দ – অঙ্কুর ... ভারতীয় হিন্দু সমাজে জাতিভেদ প্রথা বহু প্রাচীন কাল থেকেই প্রচলিত রয়েছে। এই প্রথার উদ্ভব বেশ জটিল ও নানা বিবর্তনের মধ্য দিয়ে প্রথাটি তার বর্তমান রূপ পে...
কাল বৈশাখী দারুন এক ঝঞ্ঝা এসে উড়িয়ে দিল এক নিমেষে, সব কিছু কি? ছিন্ন হল সব সংস্কার, সব পুরানো চিন্তার বাঁধন, সেকি কাল বৈশাখী? নতুন এক অংকুরের সৃষ্টি করে, যখন বিন...
নিয়মিত জীবন-যাপন - সমর্পণ মজুমদার   জীবনে অনেক কিছুই করতে ইচ্ছে হয় আমাদের। যা দেখেই আমরা অনুপ্রাণিত হই, সেটাই করতে ইচ্ছে করে। সেটা যে কোনো নির্দিষ্ট একটা বিষ...
১৬-১-১৯-১৯-২৩-১৫-১৮-৪ - মনীষা বসু     ।। ১।। এয়ার পকেটে পড়ে প্লেনে জোর ঝাঁকুনি লাগতেই ল্যাপটপ থেকে চোখ ওঠালেন সূর্য। মানুষ যেমন ঘুম থেকে উঠে চারিদিকে তাকিয়ে বুঝতে চায়, সে...
শ্রীকৃষ্ণ বিচ্ছেদে – রুমাশ্রী সাহা চৌধুরী... শ্রীকৃষ্ণ বিচ্ছেদ অনলে মোর অঙ্গ যায় জ্বলিয়া..কানে হেডফোন মনে বিরহযন্ত্রণা,চোখটা আজ বড় ছলছল করছে শ্রীরাধার। ট্রেনের জানলা দিয়ে মুখটা বাড়ায় বাইরে, সবাইক...
ADMIN

Author: ADMIN

Comments

Please Login to comment