দাতা – অরূপ ওঝা

কাল তো সে এসেছিল, নিয়ম করেই আসে রোজ। যখন দীপন অফিসে কাজের ফাঁকে দুপুর দেড়টার সময় টিফিন করতে বসে, ঠিক তখনই সে হানা দেয় “জয় মাতাজী, জয় মাতাজী” স্লোগান দিয়ে। দীপন সবার সামনে লোকদেখানো বিরক্তভাব দেখায় বটে, কিন্তু প্রতিদিনের মত দু-দশ টাকা ধরিয়ে দেয় বা তার টিফিনের কিছু খাবার তাকে দেয়। তারপর দীপন নিজে খেতে বসে। সে জানেইনা পাগলটা তার দেওয়া টাকা বা খাওয়ার নিয়ে সে কি করে, জানার চেষ্টাও করেনি। এই স্বল্পদানের ব্যাপারে তার মধ্যে না কখনো সঙ্কোচ বোধ কাজ  করেছে না কোন কৃপণতা এসেছে। সে দিয়ে খুশি খুশি খেতে পারত।
তাহলে আজ কেন এল না। কাজের চাপে ঘড়িতে কখন যে দুটো  বেজে গেছে তা দীপন খেয়াল করেনি। এত দেরি হওয়ার কথাতো নয়। সাধারণত খুব বেশি হলে একটা চল্লিশের দেরি  হয় না ঐ পাগলটার আসতে।
তবে কি………

      আজ বুধবার, তার চাকরিতে প্রথম দিন। ‘‘মঙ্গলে ঊষা বুধে পা”। শুভদিন বটে। মঙ্গলবার সে অফিসে জয়েন করলেই পারতো  যদি তার বাবা “বেণীমাধবের ফুল পঞ্জিকা” খুলে মঙ্গলবার দিনটির প্রথমার্ধে কোন একটা শুভ সময় খুঁজে পেতেন। পেলেন আজ। তার জয়েনিং লেটার গত পরশু এসে গেছিল। গতকাল জয়েন করলে একদিনের বেতন পেত, কিন্তু বাবার ঐ এক গোঁ। মা আজ সকাল সকাল পুজো দিয়ে এসেছেন।
প্রণাম করে বেরানোর সময় মা দীপনের কপালে সিঁদুরের টীকা লাগিয়ে দিয়ে বললেন, “সাবধানে যা দীপ,মন দিয়ে কাজ করবি।’’
বাবা তাকে বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত এগিয়ে দিলেন। হাঁটতে হাঁটতে দীপন ছিল নিশ্চুপ।  বাবা তার কাঁধে হাত রেখে বললেন, “শোনো দীপ, কাজের জায়গা আমাদের কাছে মন্দিরের মতো। আর কাজ হলো অনেকটা পূজার্চনার মতো, পবিত্রতা , নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করবে। কাজে কখনো অবহেলা কোরোনা। তোমার বেঁচে থাকার এ এক অবলম্বন।”
দীপনের খুব ইচ্ছা করছিল সে সময় তার বাবার দিকে একবার তাকাতে, দুচোখ ভরে দেখে নিতে। তবু মনের কোথাও যেন একটা জড়তা, একটা লজ্জাবোধ কাজ করছিল। তাই সে সামনের দিকে তাকিয়ে হাঁটছিল, চুপচাপ।
বাস এল। “আসছি বাবা’’। উঠে বাসের পেছনের কাচ দিয়ে দীপন তাকালো, বাবা তেমনি তার দিকে চেয়ে আছেন, একইরকম দাঁড়িয়ে। বাস যখন স্ট্যান্ড ছাড়িয়ে অনেকটা চলে এল,  দূরে দাঁড়িয়ে থাকা বাবাকে দেখতে পেল না আর, কেমন যেন ঝাপসা আর ঘোলাটে হয়ে এল, জলের আস্তরণ কখন অলক্ষ্যে চোখ ঢাকা দিয়েছে বুঝতে পারেনি দীপন।   পেছনের সিটে জানালার ধারে বসল ।

“নন্দকিশোর দাসবাবুর অফিসঘরটি কোথায়?’’ অফিসের বারান্দায় টেবিল পেতে বসা ভদ্রলোককে দীপন জিজ্ঞাসা করল।  উনি খবরকাগজ পড়ছিলেন, প্রথমে যেন শুনতে পাননি, তারপর ধীরে ধীরে মুখ তুলে চশমাটা একটু নামিয়ে উপরের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “আপনি?’’
“আমি দীপন পাত্র।’’
“কি চাই?”
“আমি এই অফিসে জয়েন করতে এসেছি।’’ দীপন জয়েনিং লেটার বের করে দেখাল।
তখন উনি দাঁড়িয়ে নমস্কার ঠুকে বললেন, “স্যার তো এখন আসেননি, আপনি বরং ভেতরে চলুন, স্যার এক্ষুণি এসে পড়বেন।’’
ভেতরে যেতে যেতে দীপন উনার পরিচয় জানতে চাইল। “আমি অলোক শাসমল। এখানে
দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছি। নাড়ী-নক্ষত্র সব চেনা  বুঝলেন তো।
“হুম বুঝলাম।“
“এখানে বসুন”
দীপন উৎসুখ চোখে চারিদিক দেখছিল। বারান্দা থেকে  ঢুকে ভেতরে হলঘরের মতো, সারি দিয়ে কর্মচারীদের বসার জায়গা, সেখানে পাঁচটা কম্পিউটার দেখতে পেল। বারান্দা থেকে ভেতরে ঢুকে হলঘরের মতো, সারি দিয়ে কর্মচারীদের বসার জায়গা, সেখানে পাঁচটা কম্পিউটার দেখতে পেল। দুজন  ইতিমধ্যে এসে পড়েছেন। যে যার চেয়ারে বসে কাজ শুরু করার তোড়জোড় করছেন।
একদম বামদিকে “ACCOUNT SECTION” , আর ডানদিকে একটা অফিসঘর, নাম-ফলকে লেখা “Nandakishor Das”, নীচে উনার পদের নাম।
একজন বেঁটে নাদুসনুদুস অফিসার গোছের ঐ ঘরে ঢুকলেন, পেছনে অলোক মহাপাত্র সাইড-ব্যাগ হাতে গেলেন। কিছুক্ষণ পরে অলোকবাবু বেরিয়ে দীপনকে বললেন, “স্যার ডাকছেন।”
হৃদকম্পন টের পেল সে, দুরু দুরু বুকে সাইডব্যাগটা বুকে জড়িয়ে উঠল। “আসবো ?”
“ ও আসুন।’’ চেয়ারে বসা নন্দকিশোর দাস হাত নাড়লেন, “বসুন।” বেল টিপলেন। দীপন সামনে বসল।
অলোকবাবু এলেন।
“অলোক চায়ের ব্যবস্থা কর।’’
অলোকবাবু মাথা নেড়ে চলে গেলেন।
“জয়েনিং লেটারটা দিন।”
দ্রুত দীপন জয়েনিং লেটার দিল।
“প্রথম চাকরি?”
ঢোক গিলে দীপন বলল, “আজ্ঞে… হ্যাঁ”
“গুড, ভেরি গুড। এত কম বয়সে চাকরি পেয়েছেন এ তো চরম সৌভাগ্যের।”
দীপন একটু ইতস্ততঃ করতে লাগল, কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমা হচ্ছে।
“এত সঙ্কোচবোধ করার কোন প্রয়োজন নেই। আমি বাঘ ভাল্লুক নই। … । জেরক্স আছে?”
“আজ্ঞে হ্যাঁ স্যার”
“দিন। বাই দ্য ওয়ে ডোন্ট কল মি স্যার। ওনলি নন্দকিশোরদা। ওকে?”
“ওকে স্যার” জেরক্স বের করে দিল।
দীপনের সন্ত্রস্তভাব দেখে নন্দকিশোরবাবুর ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি। উনি মুখ কুঁচকে হতাশ হয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
ততক্ষণে অফিসে পুরোদমে কাজ শুরু হয়ে গেছে। পাঁচটা চেয়ারের একটাই খালি, নন্দকিশোরবাবুর সামনের চেয়ারটা। সেই চেয়ারের দিকে দেখিয়ে অলোকবাবু বললেন, “আপনার।”
দীপন স্তম্ভিত, কিছুক্ষণ চেয়ারটির দিকে চেয়ে রইল। বসার আগে সবার অগোচরে চেয়ারের হাতলে মৃদুভাবে স্পর্শ করতে করতে বিগতদিনের পরিশ্রম তার মনে একঝলক দিয়ে গেল।
‘প্রথম?”
অকস্মাৎ এই প্রশ্নে সম্বিৎ ফিরে পেল সে। তার পাশে বসা কাঁচাপাকা চুলের ভদ্রলোকের প্রশ্নে ঈষৎ হেসে মাথা নেড়ে দীপন নীরব উত্তর দিল।
“গ্রাজুয়েট না মাস্টার্স?”
প্রশ্নটা হজম করতে খানিকটা সময় লাগল। “গ্রাজুয়েট, আপনি?”
বুকটা যেন ফুলে উঠল ভদ্রলোকের। “মাস্টার্স”। দীপনের চোখে পড়ল উনার নেমপ্লেটে লেখা ‘AMARESH LAHA’ । তারপর যেন অমরেশবাবুর বুকটা সঙ্কুচিত হয়ে গেল। “কিন্তু জানোতো ভায়া একেই বলে ভাগ্য। আমি এখনো তোমার চেয়ারে যেতে পারলাম না। পনেরো বছর বুঝলে পনেরোটা বছর।”
এবার স্বভাবত দীপনের আপমানবোধ হতে লাগল। কিন্তু কিছু বললো না। নিজের চেয়ারে বসল।
“ভায়া তোমার নামটা?”
এতক্ষণে নাম জানতে চাওয়ায় মনে মনে ক্ষুব্ধ দীপন বলল “দীপন পাত্র।”
“পাত্রী জুটেছে?”
“না”।

অফিস ফর্মালিটি পূরণ করে টুকটাক কাজ করল দীপন। মাঝে একবার নন্দকিশোরবাবু তাকে ডেকে একটা-দুটো কাজ বুঝিয়ে দিয়েছেন। উনি খুব ব্যস্ত মানুষ, তাঁর পক্ষে দীপনের পেছনে পড়ে থেকে সমস্তটা বোঝানো সম্ভব নয়।
সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে , প্রথম অফিসের হাল-হকিকৎ আত্মস্থ করতে করতে মধ্যান্তর হয়ে গেল। ঘড়িতে  দেড়টা বাজে তখন। ব্যাগ থেকে টিফিন বের করল। রুটি, আলুভাজা, ডিমভাজা । একটুকরো রুটি ছিঁড়ে তাতে আলুভাজা ভরে মুখে দিতে যাবে এমন সময়
“জয় মাতাজী, জয় মাতাজী”
পাশের একজন সহকর্মীর কাছ থেকে বিরক্ত স্বর শুনতে পেল “ওই এল আবার।”
দীপন কিছু বুঝে ওঠার আগে সে এসে দাঁড়ালো তার টেবিলের সামনে। পরনে ছেঁড়া, অতিশয় ময়লা  জামাকাপড়। লম্বা উসকো-খুশকো চুল অজস্র জটে ভর্তি, নোংরা। বিশ্রী গন্ধ আসছে শরীর থেকে। তবে তার দিকে তাকিয়ে দীপন বুঝল এরকম শান্ত,স্থির চোখ, নির্মল নিষ্পাপ হাসি আজ পর্যন্ত কোনো বড়মানুষের মুখে দেখেনি।
দীপন হকচকিয়ে গেল, কি করবে সে ভেবে পেল না। রুটি আলুভাজা তেমনি ধরা আছে।  হঠাৎ কি মনে করে একটা রুটি ঐ পাগলটাকে দিয়ে দিল। অবাক কাণ্ড! ঐ রুটিটা নিয়ে চওড়া হাসিটুকু বজায় রেখে অনুরূপ স্লোগান দিয়ে নমস্কার ঠুকে চলে গেল।
“লোকে তাকে পাগল বলে।” পেছন থেকে  সহকর্মী সুরেশ বলল, “ মাঝে মাঝে আসে, বিভিন্ন স্লোগান দিয়ে চলে যায়।”
দীপন প্রথমদিন অফিসের কাজ সাঙ্গ করে ঘরে ফিরল।
পরেরদিন যথাসময় অফিস এল। কাজ সেরকম না থাকায় অলসতার ক্লান্তি ভর করছিল। আজও অমরেশবাবুর বাঁকা কথা হজম করতে হল। সে তবু নিশ্চুপ থাকল। অযথা কারোর সাথে ঝামেলা তার বরাবরই না-পসন্দ। উপরন্তু সে এখানে সম্পূর্ণ নতুন, কাউকে কিছু জবাব দেওয়ার আগে পরিবেশটা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থাকাটা দরকার।
হাফটাইমে খেতে বসল দীপন।
“জয় মাতাজী—-জয় মাতাজী” কর্কশ গলায় স্লোগান দিতে দিতে কালকের সেই পাগলটা আজ উপস্থিত। দীপন চুপচাপ একটা রুটি দিতে   সে নমস্কার ঠুকে চলে গেল। সুরেশ বলল “এরকম দিতে থাকলে সে পেয়ে বসবে দীপনবাবু। প্রতিদিন আসতে থাকবে। আর দিয়েই বা কি লাভ। কোথাকার এক পাগল। এ জন্য তো অতিরিক্ত খাওয়ার নিয়ে আসতে হবে।”
“সে নিক না, কি আর ক্ষতি হচ্ছে আমার।” দীপন খাওয়া শুরু করল।
এরকম করে কয়েকদিন কেটে গেল। নিজের কাজকর্ম নিজে করে যাওয়ার চেষ্টা করে যায় দীপন। পাগলটাও রোজ আসে; কোনোদিন খাওয়ার কোনোদিন টিফিন দেওয়ার মতো না হলে টাকা ধরিয়ে দেয়। পাগলটা শুধু যে “জয় মাতাজী জয় মাতাজী” স্লোগান দেয় তা নয়, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের স্লোগান ও বাদ যায় না। দীপনের ক্রমে ক্রমে এটা অভ্যাস হয়ে গেল। পাগলটাকে খাওয়ার বা টাকা দেওয়া তার নিত্যদিনের অফিসের কাজের মধ্যেই যেন থাকে। সে তাকে কিছু না দিয়ে মুখে খাওয়ার তুলতে পারত না।

     দীপন বেশ বুঝতে পারে সে সে যখন কোনো ঝামেলার মধ্যে পড়ে অমরেশবাবু সেটা তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করেন। আত্মগ্লানিতে ভোগা এই মানুষটার জন্য দীপন অনেকবার বিস্তর অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয়েছে। নন্দকিশোরবাবু যিনি অফিস হয়েও মজাঠাট্টার মাধ্যমে আনন্দের পরিবেশে কাজকে এগিয়ে নিয়ে যেতে  পছন্দ করেন, তাঁর মুখ থেকেও কয়েকবার কথা শুনতে হয়েছে। কলকাঠি নাড়তে যে অমরেশবাবু ওস্তাদ তা বুঝতে বেশ সময় লেগে গেছে। তবু নন্দকিশোরবাবু দীপনের কাজ, ব্যবহারে সন্তুষ্ট থাকায় তাকে স্নেহ করেন। এটা অবশ্য অমরেশবাবুর নজর এড়ায়নি। আনকোরা দীপনের কাজের ফাঁক ফোকরের সুযোগ নিয়ে তাকে অপদস্থ করার কোনো কসুর তিনি ছাড়েননি। তাই দীপন মাঝে মাঝে নন্দকিশোরবাবুর বিরাগভাজন হয়।
সেদিন অফিসে কাজের ভীষণ চাপ, দীপনের পক্ষে সামলানো কঠিন হয়ে পড়ছিল। পাশে থেকেও অমরেশবাবুর কাজ থেকে বিন্দুমাত্র কোনো সাহায্য সে পাচ্ছিল না । যদিও উনার হাত একপ্রকার ফাঁকাই ছিল। তবে দীপন এখন আর সে আশাও করে না। প্রথমদিকে সে অসহায় বোধ করলেও মানুষ ঠেকে শেখে। অমরেশবাবুকে দেখল নন্দকিশোরবাবুর ঘরে যেতে। সে নিজের কাজে মন দিল। কিছুক্ষণ পর তিনি বেরিয়ে দীপনকে বললেন, “স্যার তোমাকে একটা রিপোর্ট পাঠাতে বললেন বিশ্বাস স্যারের মেলে।”
ঘর্মাক্ত দীপন জিজ্ঞাসা করল, “কি বিষয়ে?”
তখন তিনি তাকে সার-সংক্ষেপ বুঝিয়ে দিলেন। দীপন সেই মতো রিপোর্ট পাঠিয়ে দিল। ব্যস্ততায় মেল পাঠানোর আগে নন্দকিশোরবাবু্কে একবার দেখিয়ে নেওয়ার কথা বেমালুম ভুলে গেল।
মিনিট পাঁচেক বাদে স্যারের ঘর থেকে ঘনঘন বেল পড়তে লাগল। অলোকদা দ্রুত ছুটে গেল। তড়িঘড়ি করে বেরিয়ে এসে দীপনকে বলল, “স্যার আপনাকে ডাকছেন।”
দীপনের বুক ঢিবঢিব করতে লাগল। টেনশানে মুখ পানশে হয়ে গেল তার।
“আসব?”
‘‘কি ভেবেছোটা কি? এটা অফিস না প্লে-গ্রাউন্ড?”
“কেন স্যার কি হয়েছে?”
“কি হয়েছে?” ব্যঙ্গস্বরে ক্রুব্ধ নন্দকিশোরবাবু বলে চললেন, ‘‘ এটা কি কেত্তন করার জায়গা? কি মেল পাঠিয়েছ তুমি? মেলটা পাঠানোর আগে আমাকে একবার চেক করিয়ে নিতে পারলে না? কি সাবজেক্ট নিয়ে পাঠাতে বললাম আর কি পাঠিয়ে রেখেছো? এত ইম্পোর্টান্ট একটা বিষয়ে।”
“ কিন্তু আমাকে অমরেশবাবু… “
নন্দকিশোরবাবু দীপনকে শেষ করতে দিলেন না, তাঁর এই রূপ আগে কখনো কেউ দেখেনি। দীপন তো নয়ই।
“ ‘আমাকে আমাকে’ কি? কাজের সময় মন কোথায় থাকে, ফের যদি ভুল হয় তবে শো-কজ ……” উনার ফোন বেজে উঠল। বিশ্বাস স্যারের ফন।
“হ্যাঁ স্যার……. ছোট্ট একটা ভুল হয়ে গেছে…আজ্ঞে নতুন ছেলে তো…… হ্যাঁ হ্যাঁ আমি আর একবার পাঠিয়ে দিচ্ছি।”
“কিরকম লিখতে হবে বলে দিন, আমি পাঠিয়ে দিচ্ছি।’’ দীপন ভাঙা গলায় বলল, অধোবদনে দাঁড়িয়ে।
“ অনেক করেছো, আর কিছু করতে হবে না, যাও তো।”
দীপন আর দাঁড়াতে পারল না। চোখে জল এসে গেল। এরকম অপমান আগে কখনো হয়নি। রুম থেকে বেরিয়ে একটা দৃশ্য দেখে আর মাথার ঠিক রাখতে পারল না, কপালের শিরা ফুলে উঠল, চোয়াল শক্ত হল। অমরেশবাবু  তাঁর চেয়ারে বসে ঈষৎ বাঁকা হাসিতে যেন কিছুই জানেন না এরকম ভান করে টেবিলের সামনের দিকে চেয়ে রয়েছেন। অমরেশবাবুর কাছে একপ্রকার তেড়ে গিয়ে ক্রোধে দীপন বলল, ‘‘অমরেশবাবু, আপনি যদি ভেবে থাকেন…..”
“জয় মাতাজী জয় মাতাজী”
আচম্বিতে দীপন নিজের টেবিলের সামনে ঘুরে দেখে পাগলটা হাসিমুখে দাঁড়িয়ে রয়েছে। দুপুর দেড়টা বেজে গেছে। আর অমনি অমরেশবাবুর উপর পুঞ্জীভূত ক্রোধের আগুন গিয়ে পড়ল ঐ নিরীহ পাগলটার উপর।
‘‘কি? আবার চাইতে চলে এসেছিস” শালীনতা হারিয়ে ফেলে একপ্রকার মারার অভিপ্রায়ে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল। তীব্র সুউচ্চ গলায় বলে গেল, “ আমাকে কি দাতা হরিশ্চন্দ্র পেয়েছিস? দানছত্র খুলে বসেছি তোর জন্য? আজ কিচ্ছু পাবি না। যা দূর হ এখান থেকে”
পাগলটার চওড়া হাসি অন্তর্লীন হল নিমেষে, মাথা নিচু করে ধীরে ধীরে সে বেরিয়ে গেল।
সেখানে তখন আকস্মিক নীরবতা ছেয়ে গেছে, পিন পড়লেও শব্দ পাওয়া যাবে। সবাই কাজ ছেড়ে দীপনের দিকে তাকিয়ে। দীপন চেয়ারে ধপ্‌ করে বসে হাতে মুখ ঢাকা দিল। নিজের এ হেন আচরণে সে নিজেই স্তম্ভিত। তার ক্রোধের বহিঃপ্রকাশ যে এরকম নির্মম হতে পারে, এতদিনকার শিক্ষাদীক্ষা ভুলে যে ধৈর্য্যচ্যুতি ঘটিয়ে এরকম আচরণ করে বসবে, এসব ভেবে তীব্র অনুশোচনায় তার চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ল।
সেদিন আর টিফিন করার কথা মাথায় থাকল না। অফিস থেকে বাড়ি ফিরেও ধাতস্থ হতে পারেনি।  তার বাবা মা কিছু সমস্যা হয়েছে কিনা জিজ্ঞাসা করেও উত্তর না পাওয়ায় জোর করে আর বিরক্ত করতে চাইলেন না।
তার পরদিন অফিসটাইমে ঢুকল সে। আজ ঠিক করেই এসেছে তার সমস্ত টিফিন সেই পাগলটার হাতে তুলে দেবে। এরকম করে ধীরে ধীরে তার পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে পারবে। আজও কাজে মন দিতে পারল না। ঘড়িতে বারবার দেখছিল কখন দেড়টা বাজবে। দেড়টা যখন বাজল সে টিফিন বের করে বসল, দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করার পরও পাগলটা এল না।
তিন-চারদিন কেটে গেল। যতই ব্যস্ততা থাকুক না কেন সে অপেক্ষা করে টিফিন হাতে। কিন্তু যার জন্য এই অপেক্ষা তার দেখা নেই। প্রতিদিন এ  ব্যাপারটা লক্ষ্য করত একজন- নবীন। দীপন এক আধবার মনস্থির করে নিয়েছিল অন্তত নবীনের কাছে ঐ পাগলটার খোঁজ করবে কিন্তু সে পারেনি, একটা কুন্ঠাবোধ কাজ করত।
নবীন একদিন দীপনের কাছে এসে জিজ্ঞাসা করল, ‘ স্যার, ঐ পাগলটার জন্য অপেক্ষা করছেন?”
দীপন চুপচাপ মাথা তুলল। “কয়েকদিন ধরে তো দেখছি না।’’
“ সে আর আসবে না স্যার। ঐ যে সেদিন অমন করে বকলেন, তারপর থেকেই এদিকে আসা বন্ধ। তবে একটা ব্যাপার হয়তো  আপনার জানা নেই,ঐ পাগলটাকে যা খাওয়ার দিন, যেটুকুই দিন না কেন সে নিজে না খেয়ে রাস্তার দু-একজন ভিখারী, ঐ বটগাছের তলায় আর এক পাগল বসে থাকে তাদের দিয়ে সে নিজে খায়। আর আপনি যা টাকা দিতেন  তা দিয়ে তাদের দোকানে এনে খাওয়াত, নিজে আগে কখনো খেয়ে নিত না। পাগলামিটা তার মাথায় এলেও হয়তো রক্তের ধর্ম পরিবর্তন হয়নি।”
স্তম্ভিত দীপন বুঝতে পারলনা শেষ কথাটা, “মানে?”
“ওর বাড়ি ছিল ঐ যে মোড়টায় আপনি অটো ধরে অফিসে আসেন সেখানে। সে স্বাভাবিক সংসারী মানুষ ছিল। নিপাট ভাল মানুষ। খুব দয়ালু ছিল। যখন যেরকম পারত দান-ধ্যান করত। বিপদে কেউ পড়লে নির্দ্বিধায় সে ছুটে যেত, সাহায্য করত।
ঘরে স্ত্রী মেয়েকে নিয়ে সুখে সংসার কাটত। একমাত্র ভাই বাহিরে থাকত। প্রাণোচ্ছল সংসার চিরকালের মতো ধ্বংস হয়ে গেল যেদিন তার স্ত্রী আর মেয়ে দুজনেই গাড়ি অ্যাক্সিডেন্টে মারা যায়। এই বিষম শকটা নেওয়া কষ্টকর ছিল। উপরন্তু তার ঐ ভাই মানসিক অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে সমস্ত সম্পত্তি হাতিয়ে নেয়। তারপর মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলতে থাকে, ঠিকানা হয় এই পথঘাট। অথচ পৃথিবীর নিষ্ঠুরতা দেখুন, যাদের দু-হাত ভরে দান করেছিল, সাহায্য করেছিল, তাদের কেউ একদিনের জন্য তার পাশে দাঁড়াল না। রাস্তার পচাগলা খাবার খেয়ে বেঁচে আছে স্যার। আমরা একটু আধটু খাবার দিলেও আশেপাশের হতভাগ্যদের বিতরণ করে খায়। কিন্তু এখনো হয়ত সেই আত্মসম্মান বোধ কাজ করে, যদি কেউ একবার না বলে বা বকে দেয় তার ত্রিসীমানায় আর মাড়ায়না, যেরকম আপনি বকে দেওয়ার পর এদিকে আসেনা আর। আসছি স্যার।”

দীপন বাকরুদ্ধ। ভেতরে তার তীব্র আলোড়ন হতে লাগল। ঐ অতিশয় সামান্য দানে নিজেকে ‘দাতা হরিশচন্দ্র ভাবার দম্ভ রাস্তার এক দুর্গন্ধমাখা ছেঁড়া ময়লা পোশাকধারী এক লহমায় চূর্ণ করে দিয়ে গেল।

 

-সমাপ্ত


FavoriteLoading Add to library

Up next

বসুধার কান্না – গার্গী লাহিড়ী... ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত অবনি নিতে চায় অবসর, উত্তরে বলে বিশ্ব বিধাতা আরো পর আরো পর | কাতর কণ্ঠে ধরা বলে যায় আমার সবুজ সকলই শুকায়, এত অন্যায় এত অবিচ...
মঞ্চ – হ য ব র ল স্কুলে নতুন টিচার এসেছেন সাংস্কৃতিক বিভাগের। প্রতি বছরের মত এবছরও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করবে একাদশ শ্রেণীর ছাত্র-ছাত্রীরা। তার জন্যই আজ এই মিট...
হারানো সুর – সুস্মিতা দত্তরায়... চোখের জল বাঁধ ভাঙলো ইরার। চোখ ছাপিয়ে দুই গাল বেয়ে নেমে এলো অশ্রুধারা। দুই হাতে তা মুছে আবার ফিরে তাকাল ওই দোতলা বাড়ীটার দিকে। তারপর ধীর পায়ে উঠোনটা পে...
উইন্ডোজ কম্পিউটারের ইতিকথা- অভিষেক চৌধুরী...   কম্পিউটারের সঙ্গে ব্যবহারকারীর মেলবন্ধন ঘটাতে প্রয়োজন OS - এর | এই OS - বানানোর উদ্দেশ্য নিয়েই কাজ শুরু করেন বিল গেটস | ফলস্বরূপ ১৯৮১ তে আবির্...
তোমাকে দিলাম – সৌম্য ভৌমিক... তোমাকে দিলাম ভোরের লালচে আকাশ শরৎ মাখা নদীর ধারের কাশ , তোমাকে দিলাম ড্রইং খাতার রং মেঘ চিরে যাওয়া শঙ্খচিলের ঢং | তোমাকে দিলাম আমার ভাবনাগুলো ছ...
বাঙালীর দূর্গাপুজো – দীপ্তি মৈত্র... দুগ্গা পূজা ভারী মজা পড়াশুনা নাই ঘুরে ঘুরে ঠাকুর দেখা দিন-রাত্তির ভাই। সংগে চলে “খানা-পিনা” বাহারে বাহার, মাতিয়ে রাখে কটা দিন কি মজাদার।    ছোট্ট ...
একটি ছেলে - দীপ চক্রবর্তী ছোট্ট একটি ছেলে ক্রিকেট খেলবে বলে হাতে ব্যাট নিয়ে অনেকক্ষন দাঁড়িয়ে, কোনও একটি দূরের মাঠে... শচীন হ‌ওয়ার স্বপ্ন তার যে চোখে মুখে,...
দৃষ্টিভেদ – শুভেন্দু সামন্ত... হিমের ভোর-জানালার রোদ শিখার মতো তোমার মায়াভরা দৃষ্টি , বুক ভেদ করে যায় চোলে । এ-প্রান্ত থেকে ও- প্রান্ত ।এ বড় মধুর দহন , যেন স্বপ্নের দেশে স্ব...
প্রতিশ্রুতি – শ্বেতা আইচ... 'আচ্ছা মা,চাঁদটাও আমাদের সাথে কাল যাবে তো?”, পুঁচকে অরি প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয় কুমুদিনীকে। “চাঁদ আমাদের সকলের সোনা, চাইলেও শুধু তুমি আর আমি ওকে নিয়ে যেত...
অপেক্ষার অন্তরালে – গার্গী লাহিড়ী... ৫০০ স্কয়ার ফিটের ছোট্ট সংসার চারিদিকে ঘরকন্নার খুঁটিনাটি ছোট্ট খোকা দামাল বড় করবে কোথায় হুটোপুটি ? এরই মাঝে তিনজনের সুখের ঘর সকাল ৮.২০ এর লোকাল ...
ADMIN

Author: ADMIN

Comments

Please Login to comment