দূর্গামায়ের সিন্দুরকৌটো – স্বরূপ রায়

আজ চতুর্থী।
টুনু আর ফজিল বসে ঠাকুর গড়া দেখছিল।
টুনুদের বাড়িতে প্রতি বছর দুর্গাপূজা হয়। টুনুর প্রপিতামহ সৌরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী এই অঞ্চলের জমিদার। যেমন গোঁড়া তেমন দৌর্দণ্ডপ্রতাপ। বাঘে-গরুতে এক ঘাটে জল খায় তাঁর নামে। এখনও পাঁচ গ্রামের মানুষ টুনুদের জমিদারমশায় বলে ডাকে।
এইতো সেদিন ঠাণ্ডা লেগে টুনুর একটু সর্দি-জ্বর মতো হয়েছিল। বাবা তাকে নিয়ে গেলেন গোপাল ডাক্তারের কাছে। গোপাল ডাক্তারকে টুনু ভালোই চেনে। প্রতিবছর শীতলা পুজোর সময় বাবার সঙ্গে গিয়ে অ্যান্টিপক্সের ওষুধ নিয়ে আসে। কি সুন্দর সাদা সাদা চিনির গুলি, তাতে আবার কিরকম একটা ঝাঁঝালো জল দেওয়া! গোপাল ডাক্তারের ওষুধ খেতে খুব ভাল লাগে টুনুর।
এইবার যখন সে ডাক্তারের কাছে গেল, গোপাল ডাক্তার তাকে মোড়ায় বসতে দিয়ে বলল, ‘বাব্বা! ছোটকত্তা যে অন্নেক বড় হয়ে গেল!’
তারপর বাবার বসার জন্য ডাক্তারখানার হাতলভাঙা চেয়ারটা গামছা দিয়ে মুছে দিল। সেটা যে অনেক পুরনো, তা তার বাদামি-কালচে রঙ, আর পালিশ দেখলেই বোঝা যায়।
টুনুর খুব হাসি পাচ্ছিল। তার বাবাকে অনেকই কত্তামশাই বলে ডাকে বটে, কিন্তু তাকে কেউ কোনোদিন ছোটকত্তা বলেনি। এই বছর দুর্গা পুজোয় সে ছ’বছরে পড়ল। তার জন্মদিন গেল এই তো কয়েকদিন আগেই। খুব মজা হয়েছিল। কিন্তু তার থেকে এই দুর্গাপুজোয় ঢেরগুন বেশি মজা হয় নিশ্চয়ই।
দুর্গা টুনুদের ইষ্টদেবী। সারাবছর সবাই অপেক্ষা করে থাকে এই চারটা দিনের জন্য। অনেক লোকজন আসে ঘরে।
পিসিরা সবাই চলে এসেছে। ছোটপিসিতো সেই যেদিন ঠাকুরের দু’মেটে হল, সেদিন সকালেই এসে গেছে।  সারাঘর জুড়ে হইরই-চইচই ব্যাপার!
নীলকান্ত কুমোর ঠাকুর গড়ে। অনেক দিনের লোক। দিঘি থেকে মাটি এনে তাকে জল দিয়ে চটকে পাঁচ ছ’দিন ফেলে রাখতে হয়। মাটি পচাতে হয়। তারপর শুরু হয় মাটি মাখা আর কাঠামো তৈরি।
নীলকান্ত খড় দিয়ে চমৎকার ম্যাড় বাঁধতে পারে। টুনুর দিকে তাকিয়ে বলে, ‘এই হল দুগ্‌গা মায়ের হাড়গোড় টুনুবাবু! হাড়গোড় মজবুত না হলে মা দুগ্‌গা, অসুরকে বধ করবেন কীভাবে!’
তারপর হয় ঠাকুরের একমেটে। খড় দিয়ে তৈরি কাঠামোর উপর প্রথম বারের জন্য মাটি ধরানো হয়। তখন মা দুর্গার হাত-পা, অবয়ব বোঝা গেলেও হাতের আঙ্গুল, চোখ-নাক-মুখ কিছুই থাকে না। সেসব করা হয় দুমেটের পর।
দুমেটের পর দুর্গা, অসুর, সিংহ, ইঁদুর, লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্ত্তিক, গণেশ সকলকে চেনা যায়।
তারপর শুরু হয় রঙ করা। টানা টানা, ক্রোধান্বিতা মা দুর্গার চোখ, সিংহের বিকট হাঁ করা মুখের ভিতর লাল টকটকে জিব, কার্ত্তিকের ধনুকের মতো বাঁকানো সুন্দর গোঁফ, সব তুলির টানে জীবন্ত হয়ে উঠতে থাকে।
তারপর সবার শেষে দেওয়া হয় ঘামতেল। তখন সবার চেহারা চকচক করতে থাকে। অসুরের বুকের লাল রঙ আসল তাজা রক্ত বলে মনে হয়।
ঠাকুর গড়া দেখতে খুব ভাল লাগে টুনুর। বাবা বলে, আগে নাকি নীলকান্তর বাবা ঠাকুর গড়তেন। তখন নীলকান্ত ছিল ছোট। বাবার সঙ্গে আসতো, বাবাকে হাতে হাতে সাহায্য করত।
টুনু জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘তখন তো কাত্তিক-গণেশ-লক্ষ্মী-সরস্বতী ওরাও খুব ছোট ছিল, তাই না বাবা?’
তার কথা শুনে খুব হেসেছিলেন বাবা।
তখন নীলকান্ত টুনুকে দুর্গা মায়ের গল্প শুনিয়েছিল, ‘ঠাকুরের কি আর বয়স হয় টুনুবাবু! তেনারা যে অমর!’
টুনু অবাক হয়ে শুনেছিল সে গল্প।
ফজিল কখনও ঠাকুর গড়া দেখেনি। সে হতবাক হয়ে দেখছিল, মহিষের পেট চিরে বেরিয়ে আসা দৈত্য, বিকট হাঁ করা সিংহ, গণেশের ইঁদুর, কার্তিকের ময়ুর!
ফজিল টুনুর বন্ধু, এক ক্লাসে পড়ে। প্রায়ই আসে টুনুর সাথে খেলতে। তবে পুজোর ক’টাদিন আসেনা। টুনু আগের বার অনেক বলেছিল পুজোতে আসতে, কিন্তু ফজিল আসেনি। আজ হঠাৎ এসে পড়েছে তার আঁকার খাতাটা নিতে। সেটা বেশ কিছুদিন টুনুর কাছে পড়ে রয়েছে। ফজিল খুব সুন্দর ছবি আঁকতে পারে। শোলা কেটে ঘর, পুতুল সব বানাতে পারে।
টুনুরা বসে মন দিয়ে নীলকান্তর কাজ দেখছিল। দূরেই বসেছিল। কাছে গেলে সে আবার বকাবকি করে! তখন পিছন থেকে মা ডাকলেন। ‘টুনু…’।
টুনু দেখে, মায়ের হাতে ফজিলের আঁকার খাতা, আর গোটা কতেক নাড়ু। সেগুলো তিনি ফজিলের হাতে দিয়ে বললেন, ‘টুনুকে বাবা একটু ভিতরের ঘরে ডাকছেন ফজিল, আজ তো আমাদের ঘরে অনেক কাজ, তুমি বরং পরে একসময় এসো টুনুর সাথে খেলতে! কেমন! আর নাড়ুগুলো খেও।’
ফজিল চলে গেল। মাও টুনুকে নিয়ে ভিতর ঘরে চলে গেলেন। তাঁর এখন অনেক কাজ। এখন তিনি স্নান করে ঠাকুরের বাসন মাজতে বসবেন। টুনুকে বললেন, ‘লক্ষ্মী হয়ে বসে বড়পিসির কাছে দুধ-চিঁড়ে খেয়ে নাওগে! বিকালে নতুন জামাকাপড় বার করে দেব খন।’

ঠাকুরের বাসনকোসন অনেক। পুজোর চারদিন অন্নভোগ রান্না করা হয়। তার সমস্ত হাঁড়ি, কড়াই, হাতা, খুন্তি সব স্নান  করে একবস্ত্রে মাজতে হয়। তার সঙ্গে পিতলের প্রদীপ-পিলসুজ, সেসব আবার তেঁতুল দিয়ে ঘসতেও হয়। তবে সেগুলো হবে কাল। আজ শুধু মেজে রাখা।
এইসমস্ত জিনিস সবই হাল ফ্যসানের। বড়জোর টুনুর দাদুর আমলেই কেনা! পুরনো জিনিস আগে যা ছিল সেসব নাকি ছিল রুপোর। এখন সাবেকী জিনিস বলতে আছে শুধু দুর্গা মায়ের একখানি সিন্দুরকৌটো। রূপোর তৈরি, নানারকম পাথর বসানো। অদ্ভুত সুন্দর জিনিসটা! আগেকার দিনে তো রীতিমতো সিন্দুকে রাখার মতো সম্পদ। এখন অবশ্য রূপোর কদর অত নেই, তবে কৌটোটা সাবেকী বলে টুনুদের বাড়িতে খুব যত্ন করে রাখা হয়। তাছাড়া মা বলেন, জিনিসটা নাকি পয়মন্ত।
লাল-পাড়-সাদা-শাড়ি পরে, খোলা চুলে, টুনুর মা নাটমন্দিরে বসে সেইসব বাসনপত্রের পরিচর্যা করছিলেন। তখন দরজার দিক থেকে একটা ডাক শোনা গেল।
-‘মা, গরিবকে দুটি খেতে দেন মা!’
চুলদাড়িওয়ালা এক সাধু। ভিখারি। ফাটক পেরিয়ে এরা যে কেন ঘরের ভিতর ঢোকে জানিনা! অন্যদিন হলে হয়তো বকাবকি করতেন মা! কিন্তু আজ পুজোর দিন, দরজা বন্ধ মানা। তাই কিছু বললেন না।
বললেন, ‘ওইখানে দাওয়ায় গিয়ে বস একটু। আমার হাতের কাজ শেষ হয়ে এসেছে। দিচ্ছি।’
সাধু আড়াল হল।
টুনুর মা সমস্ত বাসন উঠানের মাঝখানে সাজিয়ে রাখলেন। সিন্দুরকৌটোটা রাখলেন একদম মাঝখানে, একটা বাটির আড়ালে। জল ঝরে গেলে, কাল আবার স্নান করে, সব মুছে তুলে রাখতে হবে। তেঁতুল দিয়ে পিতলের বাসনগুলো মাজতে হবে। কিন্তু তার আগেই যাতে কারুর পা না ঠেকে, কিম্বা ছোঁয়া না লাগে, তাই সব জিনিস উঠানের ঠিক মাঝখানে রাখা হয়। সেখানে আগেই বড় করে আলপনা এঁকে রাখা হয়। কেউ ভুল করেও সেদিকে পা রাখে না।
হাতের সব কাজ গুছিয়ে, ঠাকুরের শাড়ি ছেড়ে, সাধুকে চালমুড়ি বিদায় করলেন টুনুর মা। আজকের মত সব কাজ সারা রইল তাঁর।
দুপুর গড়িয়ে প্রায় বিকেল হয়ে এসেছে। একটু শীত-শীত ভাব লাগছে। টুনুর মা অবেলায় একটু গড়িয়ে নিচ্ছিলেন। টুনু বায়না ধরল, সে যাবে ফজিলের বাড়ি। একখানা অতি দরকারি জিনিস নাকি দেখানোর আছে।
মা বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘সে তো পরেও দেখানো যায়।’
কিন্তু টুনু নাছোড়। ওদিকে মাও খুব বকাবকি করছেন।
কিন্তু অবশেষে বাবা এসে পড়ায় সে অপ্রত্যাশিতভাবে অনুমতি পেয়েই গেল।
শেষে মা বললেন, ‘ঠিক আছে, যাচ্ছ যাও, কিন্তু সন্ধ্যের আগেই ফিরে এসো। আর আলোয়ানটা নিয়ে যাও।’
টুনু চরকির মতো বেরিয়ে গেল।
ভিতর থেকে শোনা গেল মায়ের চিৎকার, ‘ওরে আসতে যা! উঠানময় এলো জিনিস সব ছড়িয়ে রেখে এসেছি। ছুঁয়ে দিস নে!’
কিন্তু ততক্ষণে সে, ফাটক পেরিয়ে গেছে।
ফজিলের বাড়ি পৌঁছেই টুনু তাকে নিয়ে চলে গেল তাদের প্রিয় পুকুরতলায়। সে জায়গাটা বেশ নির্জন; ওদের দুজনেরই খুব পছন্দের।
পেয়ারা গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে, টুনু তার আলোয়ানের তলা থেকে বার করল সেই জিনিস। ওদের পরম্পরার সেই  দুর্গামায়ের সিন্দুরকৌটো। অনেক দিন থেকে কথা দিয়েছিল ফজিলকে দেখাবে। কিন্তু দেখাবে কি করে! সারাবছর তো সেটা থাকে বাক্সবন্দি। তাই আজ সকাল থেকেই সে তক্কে তক্কে ছিল। যেই মায়ের চোখটা একটু লেগেছে, ওমনি সে টুক করে পকেটস্ত করেছে কৌটোটা।
ফজিল তো দেখে খুব খুশি। টুনু যতটা বলেছিল তার থেকেও অনেক বেশি সুন্দর জিনিসটা।  দুপুরের শেষ রোদে পাথরগুলো চকচক করছে। আহঃ দারুন! সে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখতে লাগল কৌটোটা।
টুনুর মুখে তৃপ্তির হাসি। বন্ধুর কাছে অনেক গর্ব করেছিল সে। এখন তার মনে না ধরলে খুব অপ্রস্তুত হতে হত।
ফজিল বলল, ‘ভাই, আমাকে কৌটোটা কিছুক্ষণের জন্য দিবি? আমি শোলা দিয়ে এর একটা নকল বানাব।’
টুনু ভয়ানক আপত্তি করল, ‘না না ভাই। মা যদি জানতে পারে একদম কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে!’
কিন্তু শেষপর্যন্ত বন্ধুর জোরাজুরিতে তার আপত্তি টিকল না। আর তাছাড়া মা তো সেই সকালে কাল স্নান করে বাসনগুলোতে হাত দেবেন। তার আগে কৌটোটা নিয়ে গিয়ে ঠিক জায়গায় রেখে দিলে, কেউ কিছু টের পাবে না।
-‘ঠিক আছে। তাহলে তুই আজ রাতটা ওটা রাখ। কাল ভোরেই কিন্তু ফেরত নিয়ে যাব। নইলে মা কিন্তু খুব বকবেন।’
-‘তুই কোনও চিন্তা করিস না। আমি কালই তোকে ফেরত দিয়ে দেব।’ ফজিল বলল।
সন্ধ্যের আগেই বাড়ি ফিরল টুনু। বাড়িতে তখন দারুন হাঁকডাক। পিসিরা সব পাড়াবেড়িয়ে বাড়ি ফিরে এসেছে। ঘরে বসেছে চায়ের আসর, তার সঙ্গে চলছে অন্তাক্ষরী। বড়পিসি গাইল, ‘বাজলো তোমার আলোর বেনু’। বাবা গাইলেন, ‘ছুটি ছুটি আজ নেব লুটি ওই আনন্দঝর্না…’। টুনুও গলা মেলাল সবার সঙ্গে।
হইহুল্লোড়ের মধ্যে যে কখন সন্ধে গড়িয়ে রাত নেমে গেল কারুর খেয়ালই হল না। টুনু মাঝখানে একবার চুপিচুপি উঠে গিয়ে, নাটমন্দির থেকে ঘুরে দেখে এসেছে। সব ঠিক আছে, কেউ কিছু টের পায়নি। তবে কাল ভোরেই কৌটোটা যথাস্থানে রেখে দিতে হবে।

আজ পঞ্চমী।
টুনুর ঘুম ভাঙল ছোটপিসির চিৎকারে। কী হল! বিছানা ছেড়ে দৌড়ে বাইরে বেরল সে।
দেখে সর্বনাশ কাণ্ড! নাটমন্দিরের মাঝখানে আলপনা আঁকা জায়গাটা খালি! একটাও বাসন নেই! প্রদীপ-পিলসুজ কিচ্ছু নেই!
সব চুরি! সর্বনাশ! আর কিছুক্ষণ পরই পুজো শুরু হবে। টুনুর কান্না পেতে লাগল।
বাবা, মাকে বকাবকি করতে লাগলেন। কিন্তু মা আর বুঝবেন কীকরে! পুজোর চারদিন ফাটক বন্ধ হয় না ঠিকই, কিন্তু প্রতিবছর তো সব জিনিস এইভাবেই পড়ে থাকে। কখনও তো কিছু এদিকওদিক হয়নি।
বাসনকোসন, প্রদীপ-পিলসুজ নিয়ে কারুর মাথাব্যাথা নেই। সেসব তো বাজারে গেলেই এখুনি কিনে আনা যায়। আসল কথা হল সেই সাতপুরুষের সিন্দুরকৌটো। সেটা তো পয়মন্ত।
বাবা উত্তেজনায় উঠানময় পায়চারি করছেন। মা বসে বিলাপ করেছেন, ‘কী অপরাধ করেছিলাম মা! এমন কেন হল মা!…’
বাবা হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে মাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কাল যখন বাসনগুলো বার করেছিলে, তখন বাইরের লোক কেউ দেখেছিল?’
– ‘বাইরের লোক তো সেরকম কেউ আসেনি। এসেছিল এক সন্ন্যাসী। সে তো চালমুড়ি নিয়েই চলে গেল।’
বাবা রেগে বাম হাতের তালুতে মুষ্টিঘাত করলেন। বললেন, ‘এ আর কেউ নয়। এ হল রসু চোর। নইলে ঠাকুরের বাসনপত্রে কেউ হাত দেবে না। এক্ষুনি যাচ্ছি বড়বাবুর কাছে। মালসমেত চোর ধরা পরবে আজই।’
টুনুর হাত পা ভয়ে ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছিল। চোর ধরা পড়লে হয়তো সব মাল ফেরত পাওয়া যাবে, কিন্তু সেই সিন্দুরকৌটো তো আর পাওয়া যাবে না! মা আসল কথা জানতে পারলে খুব বকবেন।
বাবা থানা রওনা হবার আগেই তাঁকে সব খুলে বলতে হবে। বাবাই এখন একমাত্র ভরসা টুনুর।
মিনমিন করে সে বাবাকে বলেই ফেলল। সব কথা শুনে বাবা তৎক্ষণাৎ তাকে নিয়ে ছুটলেন ফজিলদের বাড়ি।
ফজিলের বাবা উঠানে বসে গরুর বিচালি কাটছিলেন। টুনুদের আসতে দেখে রীতিমতো ঘাবড়ে গিয়ে বললেন, ‘কত্তামশাই এদিকে?’
বাবা বললেন, ‘মুরশিদ মিয়াঁ, ফজিলকে একবার ডেকে দিন তো। আমার একখানি অতি দরকারি জিনিস সে বাঁচিয়ে দিয়েছে।’
মুরশিদ মিয়াঁ বিশ বাঁও জলে! ডেকে দিলেন ফজিলকে।
ফজিল তো টুনুর সঙ্গে তার বাবাকে দেখে হতভম্ব। কিছু কথা হবার আগেই সে বন্ধুর দিকে বাড়িয়ে দিল মুঠোবন্ধ হাত। হাতে তার সেই সিন্দুরকৌটো।
টুনুর বাবা টুনুর হাতে থেকে কৌটোটা নিয়ে একবার মাথায় ঠেকালেন। উত্তেজনায় তাঁর চোখ দুটো চকচক করছে।
মুরশিদ মিয়াঁ হতবাক! সসংকোচে বললেন, ‘ফজিল কি কিছু অপরাধ করে ফেলেছে কত্তামশাই? আমি তো কিছুই জানি নে!’
টুনুর বাবা মুরশিদ মিয়াঁকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। ঠিক যেমন করে ইদের সময় ফজিল কোলাকুলি শিখিয়ে দিয়েছিল ঠিক তেমন করে। তারপর তাকে খুলে বললেন সব ঘটনা। শুনে তো মুরশিদ মিয়াঁর মুখ হাঁ! শেষে ফজিল আর তাকে বার বার করে নিমন্ত্রন করলেন বিসর্জনে টুনুদের বাড়ি যেতে। মুরশিদ মিয়াঁ বললেন, ‘যাবো কত্তামশাই, নিশ্চয়ই যাবো।’

পুজোর চারটা দিন হুল্লোড় করে কেটে গেল। আজ দশমীর দিন সকাল থেকেই বিদায়ের বেলা। বাতাসে বিষাদের সুর। সকলের মন ভারি।
সেই সিন্দুরকৌটে সিন্দুর ভরে মায়ের মূর্তির পায়ের কাছে নামিয়ে রাখা হয়েছে। বিদায়ের সময় সেই কৌটো থেকে সবাই মাকে সিন্দুর দেবে। আবার সেই সিন্দুর যাত্রা বেঁধে শাড়ির আঁচলে বেঁধে বাড়িতে নিয়ে যাবে। সে হল শুভ। এইসব কথা টুনু মায়ের মুখে শুনেছে।
সব কিছুর তোড়জোড় হচ্ছিল, তখন টুনু দেখে, ফজিল, তার সঙ্গে মুরশিদ মিয়াঁ। ফজিলের একহাতে মিষ্টির প্যাকেট, অন্যহাতে একখানি ভাঁজকরা কাগজ। টুনুর জন্য উপহার।
টুনু সেই কাগজখানি খুলে দেখে তাতে একটি ছবি। জলরঙে আঁকা। একজন ঠাকুর গড়ছে, আর দুটি ছেলে হাত ধরে দাঁড়িয়ে দেখছে সেই শিল্পকর্ম। অনবদ্য সেই ছবির আবেদন! দেখলেই মন ভাল হয়ে যায়!
টুনুর বাবা মুরশিদ মিয়াঁকে দেখে এগিয়ে এলেন। মিষ্টির প্যাকেটটি হাতে নিয়ে তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে কোলাকুলি করলেন।
মনটা খুশীতে ভরে গেল টুনুর। সেও গুটি গুটি এগিয়ে গেল ফজিলের দিকে। টেনে নিল তাকে বুকে, ঠিক যেমন করে ইদের সময় শিখিয়ে দিয়েছিল ফজিল। শুভ বিজয়া!
সমাপ্ত


FavoriteLoading Add to library

Up next

করিডোর - বর্ষা বেরা   ব্ল্যাক করিডোর,কানে হেডফোন,কফিতে চুমুক        হাতে ব্যোমকেশ। মুখে সাদা ধোঁয়া,গুনছে প্রহর,এক ঝড়েতেই    সবশেষ ।। হঠাৎ বসন্ত,...
বিশেষ ধরণের অপ্রচলিত শক্তির ব্যবহার – বর্তমা... ভারতবর্ষে জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে শক্তির চাহিদা ক্রমশ বেড়ে চলেছে | আর এই শক্তির বেশিরভাগই আসে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে | যা পরিবেশ বান্ধব নয় | বর্তমানে কিছ...
তবু ভালোবাসি – সায়ন্তনি ধর... ।। ১।। -“হ্যালো মা, আমি সুমি বলছি। আমরা পৌঁছে গেছি, তুমি চিন্তা কর না, রনি সবসময় আমার সাথেই আছে” মা কে কথা গুলও বলে ফোনটা রেখে আবার রনজয় কে ফোন করল স...
বলিউডের দুই দেশি বয়েজের টক্কর- রাজদীপ ভট্টাচার্য্...      ১৫ই আগস্ট গোটা বলিউড দেখবে দুই দেশি বয়েসের টক্কর কারণ অক্ষয় কুমারের গোল্ড এবং জন আব্রাহামের সত্যমেব জয়তে স্বাধীনতা দিবসের দিন একই সাথে মু...
পত্র – সমর্পণ মজুমদার... হে প্রিয় পরমাপন অভিন্নপ্রাণ মিত্র, বহুদিন তব সংবাদ বিনা চঞ্চল মোর চিত্ত। হেথা মোর দেহ স্বাস্থ্যযুক্ত, গৃহেতে বিরাজে শান্তি, তবু হে বন্ধু, দিবসে-রা...
বর্তমান – সমর্পণ মজুমদার...         মানুষ স্বপ্ন দেখতে খুব ভালোবাসে। অতীতের স্মৃতিরোমন্থন করে সুখ লাভ করে। ভবিষ্যতের ইচ্ছেগুলো কল্পনা করেও রোমাঞ্চিত হয়। আমরা বেশিরভাগই চিন্তা ...
দেখ কেমন লাগে – দেবাশিস ভট্টাচার্য... সাল--2218 একটু আগেই ঘুম টা ভাঙলো সায়ন এর সানাই এর আওয়াজে।মাথা টা এমনিতেই ভারী হয়ে রয়েছে।সেই ভোর রাত্তিরে মা,দিদি আরো সবাই এসে দই,চিঁড়ে দিয়ে মাখা একট...
বিজ্ঞান ও ঈশ্বর - ইন্দ্রজিৎ ঘোষ   বিজ্ঞান শব্দের অর্থ বিশেষ জ্ঞান অর্থাৎ ধারাবাহিক পরীক্ষা,পর্যবেক্ষণ,গণনা ও সিদ্ধান্তের মাধ্যমে অর্জিত জ্ঞানই হলো বিজ্ঞান । ...
বসন্তমেদুর এমনও বসন্ত দিনেখোঁজ করো আলাদিনেখুনসুটি জমে আছে কতএমনও বসন্ত রাতেআজও ছুটি ন্যাড়া ছাতেক্ষয়ে যাওয়া প্রেম অবিরতএমনও বসন্ত দিনেসোফাসেটে নীল সিনেকোল্ড ড্রিং...
জঠর – পদ্মাবতী মন্ডল... কী গো! তোমার সকাল হল? বড় লোকের বেটি তিন পো বেলা কেটে গেল পেলাম না তো চা'টি । ঠাকুর দ্যেবতা ডর নেই মা এমন অলক্ষুণে , পাঁচ বছরেও ,জ্বলল নাকো বংশ ...
ADMIN

Author: ADMIN

Comments

Please Login to comment