দেখ কেমন লাগে – দেবাশিস ভট্টাচার্য

সাল–2218

কটু আগেই ঘুম টা ভাঙলো সায়ন এর সানাই এর আওয়াজে।মাথা টা এমনিতেই ভারী হয়ে রয়েছে।সেই ভোর রাত্তিরে মা,দিদি
আরো সবাই এসে দই,চিঁড়ে দিয়ে মাখা একটা মণ্ড খাইয়ে দিয়ে গেছে।আজ নাকি দধিমঙ্গল।

সারাদিনে আর কোনো কিছু খাওয়া বারুন।
একটা সিগারেট ধরালো সায়ন।দু টান দেয়ার পরে খুব কান্না পাচ্ছিল। এত দিনকার সম্পর্ক বাবা,মা ,বোন সবাই কে ছেড়ে কাল সকাল বেলায় চলে যেতে হবে।

নিজের ঘর,নিজের আলমারি নিজের সবকিছু ছেড়ে যেতে হবে নিজের চেনা পরিবেশ সব কিছু।কেন যে প্রেম করলো,কেনই বা বিয়েতে সম্মতি দিলো?

একটু বাদে দরজা টা খুলে মা এলো ঘরের মধ্যে।হাতের একটা প্লেটে অনেকগুলো সন্দেশ।প্লেট টা সামনের দিকে বাড়িয়ে বললো বাপি আমি জানি তুই ক্ষিদে সহ্য করতে পারিস না।এই সন্দেশ গুলো তুই খেয়ে নে।

সায়ন এর চোখ দিয়ে জল বেরিয়ে এলো।
মায়ের হাত দুটো ধরে বললো।কেন যে বিয়ে করতে গেলাম। মা আমি পারবো না এই যন্ত্রনা সহ্য করতে।তোমাদের ছেড়ে আমি থাকতে পারবো না বরং তোমরা বিয়েটা বন্ধ করো মা।

মা মাথায় হাত দিয়ে চুলে বিলি কাটতে কাটতে বললো এরকম করতে নেই বাপি।
আমরা তো রইলাম যখনই মন খারাপ করবে চলে আসবি।

বাবা সেই সময় ঘরে ঢুকলেন। কথাগুলো বোধহয় কানে গিয়েছিল।বললেন “তোর মা ঠিক বলছিল পুরুষ হয়ে যখন জন্মেছিস শ্বশুর বাড়ি যেতেই হবে বাবা।আমাকেও আসতে হয়েছে এখানে অনেক কষ্ট বুকে নিয়ে”।

“জানিস আজ থেকে দুশো বছর আগে এরকম নাকি ছিল না। তখন মেয়েরা যেত ছেলেদের বাড়িতে”।

‘কিন্তু সেই সময় এক মহিলা রাষ্ট্রপ্রধান এই নিয়ম পরিবর্তন করেন।তিনি নিয়ম করেন এখন থেকে ছেলেরা বিয়ের পর মেয়ের বাড়িতে যাবে”।

সেই থেকে আমাদের সর্বনাশের শুরু।সন্তানের পরিচয় মায়ের পরিচয়ে।সন্তানের উপাধি মায়ের উপাধি।কোনো পিতৃতান্ত্রিক ব্যাপার থাকবে না সবটাই মাতৃতান্ত্রিক।

কিছু পুরুষ বাধা দেয়ার চেষ্টা করেছিল ঘরজামাই এর প্রসঙ্গ টেনে। তাতে উনি বলেছিলেন মেয়েরা যদি বিয়ের পর অন্যের ঘরকে নিজের ঘর অন্যের বাবা ,মাকে নিজের বাবা, মা মনে করতে পারে।
ঘরের মেয়ে না হয়ে তাদের বৌমা হতে হয়। স্ত্রী হতে হয়।দিদি হতে হয়।আরো কত কিছু।এবং নিজের বাবা,মা নিজের পরিবারে অতিথি হতে হয়।

তাহলে পুরুষদের ঘর জামাই নয়। ঘরের ছেলে হতে হবে।নিজের পরিবারের প্রতি কোনো দায়বদ্ধতা নয় সবটাই তোমার শ্বশুরবাড়ি ও তোমার বউ এর জন্যে।

হ্যাঁ মন খারাপ হলে নিজের পরিবারের কাছে যেতে পারো।কিন্তু থাকতে হবে শ্বশুর বাড়িতেই।

মনে মনে হাজার এক শাপ শাপান্ত করতে লাগলো সায়ন।সেই সময় মেয়ের বাড়ি থেকে গায়ে হলুদ এসে গেল।

স্নান করে উঠতে উঠতে প্রায় দুটো বেজে গেল।এর পর বাবা পুজোর কাজে বসলেন।
সেই সময় মোবাইল টা বেজে উঠলো।
অর্যিকার নামটা দেখে ফোনটা ধরলো।

প্রথম প্রশ্ন “কিছু খাওনি তো”? ‘কেমন আছো”?’আমরা মোটামুটি ছটার মধ্যে পৌঁছে যাবো।আর একটা কথা তোমার জামা কাপড় সব প্যাক করে নিয়েছো তো।না হলে প্রথম প্রথম তোমারই অসুবিধে হবে’।

ফোনটা নামিয়ে রেখে চুপ করে বসে রইল সায়ন।ছোট বোনটা ঘরের মধ্যে ঢুকলো এগিয়ে এসে হাতটা ধরে ছলছল চোখে বললো “দাদাভাই তুই আবার কবে আসবি”? মুখটা অন্য দিকে ফিরিয়ে সায়ন বললো “জানি না রে।মনে হয় অষ্টমঙ্গলার দিন।প্রায় সাত দিন বাদে’।ছোট বোনটা হাতটা ধরে কাঁদতে কাঁদতে বললো ‘আমার দরকার আমার আবদার কে মেটাবে রে দাদাভাই’?

সায়ন ও কাঁদতে কাঁদতে বললো “আমি তো আসবো রে মাঝে মাঝে।পাগলী কোথাকার”।

বিকেলের মধ্যে রেডি হতে হলো অর্যিকার বাড়ি থেকে পাঠানো ধুতি পাঞ্জাবি পরে। এর কিছুক্ষণ এর মধ্যে কোনে যাত্রীরা এসে হাজির। মা আর বাড়ির সবাই দৌড়ে গেল অর্যিকাকে বরণ করার জন্যে। এর পর একে একে শুভ দৃষ্টি মালা বদল হয়ে শেষ অবধি অর্যিকার সিন্দুর দান করার পর সায়ন তার জন্মগত উপাধি দত্ত রায় থেকে বসু হয়ে গেল।

রাতে বাসরে সবাই যখন হৈ হৈ করছে সায়ন তখন মন খারাপ করে বসে আছে। আর শুধু আজকের রাতটুকু।কাল সকালেই চলে যেতে হবে এই বাড়ি ছেড়ে।কখন যে রাতটা কেটে গেছে সে খেয়াল টাও আর নেই। সকাল হতে না হতেই অর্যিকার দিদি,জামাইবাবুরা সবাই এসে হাজির।বর নিয়ে ফিরে যেতে হবে।

আশীর্বাদ,কান্নাকাটির পর অর্যিকা হাসি হাসি মুখে তাকালো সায়ন এর দিকে পুরো ভিলেন এর মত হাসি হেসে বললো’ চলো এবার যাওয়া যাক”।

মা,বাবা দুজনেই বুক চাপড়ে কাঁদছে।ছোট বোনটা কেঁদে গড়াগড়ি খাচ্ছে।তার মধ্যে দিয়ে অর্যিকা এগিয়ে চললো সায়ন কে নিয়ে কোনের গাড়ির দিকে।

ওদের বাড়ি পৌঁছনোর পর হাজার এক নিয়ম।ল্যাঠা মাছ,এক হাতে আর এক হাতে কলসী নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা কি হরিবল কান্ড।তারপর আবার দোর ধরুনীর টাকা সেটা অবশ্য সায়ক কেই মেটাতে হলো। সব কিছু মেটাবে সায়ক নাম হবে অর্যিকার।কেননা সায়ক এখন এ বাড়ির জামাই কাম ছেলে।

কালরাত্রি পর্ব মেটার পর বৌভাতের দুপুরে অর্যিকার ভাত কাপড়ের দায়িত্ব সেটাও নিতে হলো।সবকিছু এক শুধু পাল্টে গেছে আগের বরিস পুরোনো নিয়ম। বড়ভাতের দিন সন্ধ্যে থেকে অধীর অপেক্ষা কখন বাবা,মা,বোনরা আসবে।রাত আটটার মধ্যে সবাই এসে গেল। মা এসেই আলাদা করে প্রশ্ন কেমন আছিস বাবা ? সকলের সঙ্গে মানিয়ে চলবি। তোর মুখটা খুব শুকনো দেখাচ্ছে।খাওয়া ঠিক ঠাক ভাবে করবি।

বর ভাতের অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর ঘরে এলো সায়ক।অর্যিকা কে পুরো রানীর মতো দেখাচ্ছে।এত দুঃখের পরেও একটা স্বস্তি অর্যিকা এখনো কিছু বলে নি।একটা হীরের আংটি বের করে দিলো অর্যিকাকে।”বললো এটা তোমার”।

“আমিও তোমার জন্যে একটা জিনিস এনেছি” একটা বাজারের থলে দিলো সায়ক কে ।”বাজারের থলে কেন”?

বাঃ রে কাল থেকে বাজার করার দায়িত্ব তোমার বাবার বয়েস হয়েছে শরীর খারাপ
বাড়ির ছেলেকেই এসব করতে হবে।
সায়ক অজ্ঞান…………..

 

____


FavoriteLoading Add to library
Up next
স্বাধীনতা - কৌশিক চক্রবর্ত্তী   আমাদের দৈনন্দিন জীবনে অসংখ্য কাঙ্খিত নৈমিত্তিক চাহিদার মধ্যে স্বাধীনতা অগ্রগণ্য বলেই আমার ধারণা। কিন্তু স্বাধীনতার সংজ্ঞাটি মনে...
ঠিক আসে না – প্রিয়তোষ ব্যানার্জী... আমার কবিতা লেখা টা ঠিকমত আসে না ছন্দ,অমিত্রাক্ষর,গদ্য-ছন্দ.কিছুই জমাট বাধেনা। বিপ্লব,বিরহ.প্রেম,প্রতিবাদের কাব্য হয় না লেখা বুদ্ধিজীবী মহলে আমায় ...
আম বাগানে কে? – শ্রাবণী সরকার... আমার মামারবাড়ি ওদলাবাড়ি। ডুয়ার্সের এক ছোট্ট চা বাগান ঘেরা মফস্বল টাউন। এখনও ভারী শান্ত। আমার মায়ের ছোটবেলায় সেটি ছিল আরো জনবিরল চুপচাপ একটি গ্রাম। মায়...
নষ্ট প্রেম – প্রিয়তোষ ব্যানার্জী... দু হাত দিয়ে মেখেছি তোমার লজ্জার আবীর গোপনে, নির্জনে,অন্দ্ধকারে ছুঁয়েছি শরীর - তোমার ঠোঁটের মধ্যে খুঁজেছি উত্তেজনা রক্তিম গালে পেতে চেয়েছি সুখ কামনা...
বেকার – সরোজ কুমার চক্রবর্তী... আমরা কজন পড়াশোনা শিখলাম পায়ে পায়ে একসাথে কত পথ চললাম, দেখতে দেখতে কবে বড় যে হলাম স্কুল,কলেজ পরে মাস্টার ডিগ্রী একসাথে শেষ করলাম l একদিন হটাৎ সবাই...
পরশপাথর         মৌতমা হাতের গোলাপটার দিকে তাকিয়ে ভাবল গোপাল কি সত্যিই তাকে ভালোবাসে? আজ যেভাবে জয় আর তার বন্ধুদের থেকে মার খেল....আজকের ভ্যালেন্টাইন্স ডের সন্...
মায়ের আঁচল- বিভূতি ভূষণ বিশ্বাস ...   আরে বাপরে ১০ টা বেজে গেছে,সর্বনাশ করেছে ১০ টা থেকেই তো ডিউটি । তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে পড়লাম । কি আর করবো সব কাজই তো আমাকে করতে হয় । যাবার সময় মা ...
বিষয় অনিল – অভিনব বসু...   বাংলা ছবির স্বর্ণ যুগে খুব কমই অভিনেতা আছেন যারা তিন মহারথী পরিচালকের ছবিতেই অভিনয় করেছেন, ঋত্বিক, মৃণাল এবং সত্যজিত এবং এঁদের সাথে অবশ্যই জ...
মাসতুতো -  সৌম্যদীপ সৎপতি (১)    অন্ধকার গলির ভেতরের নীল রং এর বাড়িটা থেকে বেরিয়ে এল রমেশ।তার মনের মাঝে আজ এক অদ্ভূত অনুভূতি, আর সেই অনুভূতিটা সুখ এবং অস্ব...
স্ফুলিঙ্গ –  কৌশিক প্রামাণিক...   আজ যেন সব হারিয়ে যেতে চাইছে ক্ষণিকের মিথ্যাগুলোর জন্যে, তবু তো আমি আঁকড়ে ধরতে চেয়েছিলাম সেই পুরোনো তোমাকে | এই সেদিনকারই তো কথা যেদিন আমায...
ADMIN

Author: ADMIN

Comments

Please Login to comment