নরক থেকে স্বর্গ – বিভূতি ভূষন বিশ্বাস

চায়ের দোকানে গল্পগুজব করতে করতে হঠাৎ অমল বাবু কথা প্রসঙ্গে বলেই ফেললেন “আরে বিশ্বাস বাবু আপনি তো এ যুগের কর্ন ।”কথাটা শুনেই আমার মনে কেমন বিদ্যুৎ খেলে গেলো কিন্তু হাঁসি ঠাট্টা করে কথাটা উড়িয়ে দিলাম । অমল বাবু বয়সে প্রায় আমার বাবার সমবয়সী হবে । কিন্তু কথাটার গুরূত্ব আছে বলে আমার মনে হলো । তাই বাড়িতে এসে মনে মনে অনেক খোঁজা খুঁজি করলাম কিন্তু কিছু্ই পেলাম না । এই ভাবে বেশ কিছু দিন কেটে গেলো । একদিন সকালে দূর থেকে লক্ষ্য করছি বাবা নিমের দাঁতন নিয়ে দাঁত মাজতে মাজতে মাটিতে কি যেন লিখছে, কিছুক্ষণ পরে বাবা চলে গেলো । আর আমি ওখানে গিয়ে দেখি বাবা লিখেছে । “কাল ‘ভোরের আলো’ বৃদ্ধাশ্রমে গিয়ে ছিলাম, কল্পনার শরীরটা ভালো নেই ।”
           এই ভোরের আলোর কথা বাবর মুখে কোনদিন শুনিনি কিছু একটা ব্যপার তো আছে । আমি সময় নষ্ট না করে ভোরের আলো বৃদ্ধাশ্রমের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম । ওখানে পৌঁছে কল্পনা নামক মহিলার কথা জিজ্ঞাসা করতেই এক বৃদ্ধা দেখিয়ে দিলেন । উনি শান বাঁধানো নিম গাছের গোড়ায় বসে আছেন । হাতে একটি পেন ও খাতা নিয়ে কি যেন লিখছেন । আমি নমস্কার করে বললাম আপনার সঙ্গে দেখা করতে এসেছি । উনি কৌতুহল ভরা অবাক দৃষ্টিতে আমার দিকে চেয়ে রইলেন, পাশ থেকে এক বৃদ্ধা বললেন “উনি কথা বলতে পারেন না । ” কি করি খাতাটা দেখতে চাইলাম । উনি বুঝতে পেরে উঠে চলে গেলেন । অগত্যা ফিরে এলাম তবে হাল ছাড়িনি মাঝে মধ্যেই যাই আর উনার সঙ্গে দেখা করি ।
         এবছর প্রচুর কাশ ফুল ফুটেছে মাঠ ঘাট সব সাদা হয়ে গেছে । বাতাসে মিষ্টি একটা গন্ধ বইছে । আগমনীর পদধ্বনিতে চারিদিক মুখরিত হয়ে গেছে । দেখতে দেখতে কটা দিন কেটে গেলো, আজ এসে হাজির হলাম বৃদ্ধাশ্রমে কারণ আজ যে বিজয় দশমী  । হ্যা, আজ ও উনি ওই নিম গাছের তলায় বসে আছেন । আমি দূর থেকে দেখছি । কিন্তু একি দূপুর থেকে বিকাল গড়াতে গেলো, একটি বৃদ্ধ মহিলা ঠাঁই এক ভাবে বসে থাকতে পারে । ব্যপারটা সন্দেহ হওয়াতে কাছে গিয়ে দেখি উনি এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন । পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করতেই চমকে উঠলাম উনি যে আর নেই । সঙ্গে সঙ্গে অনেক লোকজন জড়ো হয়ে গেলো ।  ওনাকে সকলে মিলে ধরে ঘরে নিয়ে গেলো । কিন্তু ওনার খাতার দিকে কারোরই নজর পড়ল না । আমি খাতাটা নিয়ে বাড়ি চলে এলাম । নির্জন ঘরে খাতাটা খুলে পড়তে শুরু করলাম ।
প্রথম পৃষ্ঠায় লেখা ——– আমি একটি হতভাগ্য মেয়ে ।
দ্বিতীয় পৃষ্ঠায় লেখা —– ভালোলাগা ভালোবাসা ।
তার পরের পৃষ্ঠায় —- শুধুই ব্যর্থ প্রেম ।
এই ভাবে প্রীতি পৃষ্ঠায় লেখা আছে প্রেম ভালোবাসার কথা । বড় নেতার একমাত্র ছেলে অমরজিত তার আশা ভালোবাসা । কুমারী জীবনের ছোট্ট ভুল । অমরজিতের বেইমাণীতে গণ ধর্ষিতা হয়ে সমাজ পরিত্যক্ত নারী । এক মাত্র পিতা লজ্জায় লোকচক্ষুর আড়ালে আত্মহত্যা করল । সহ্য করতে না পেরে আমি উন্মাদের মতো হয়ে রেল লাইনে আত্মহত্যার চেষ্টা করতে গিয়ে শান্তি বাবুর হাতে ধরা পরে গেলাম । ওনার সহায়তায় পুত্র সন্তানের জন্ম দিলাম । শেষে বৃদ্ধাশ্রমে আমাকে রেখে গেলেন । উনি বলে ছিলেন বোবার শত্রু হয়না তাই বোবা হয়ে আছি । আমার সন্তানকে আনার সন্তান বলে মানুষ করতে বলেছি । উনি ছেলের ছবি সবসময় আমাকে দেখাতেন । কিন্তু এত দিন পরে ছেলেকে সচক্ষে দেখে আমি স্থির থাকতে পারিনি । হ্যা আমার ছেলে কিছু একটা আঁচ করেছে তাইতো প্রায়ই আমাকে ও দেখতে আসে । তবে আমি বলবো বাবা তোকে নরক থেকে স্বর্গে পাঠিয়েছি । তুই নরকে আসিস না, স্বর্গে থাক । যদি নতুন কনো জন্ম থাকে তাহলে শান্তি বাবুর মতো মানুষকে চাইবো ।
হঠাৎ বাবা আমার ঘরে এসে বলল বাবা তোমাকে আমার সঙ্গে যেতে হবে আর এক অভাগিনী মায়ের সৎকার করতে হবে । বাবার দুই চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়তে লাগলো ।
===


FavoriteLoading Add to library
Up next
একটি বিয়ের গপ্প – অভিনব বসু... নায়িকার গল্প দিয়ে শুরু করি। কোলকাতারই মেয়ে, এলাহাবাদের এক ছেলের সাথে বিয়ে ঠিক হয়েছে, ছেলে না বলে লোক বলাই ভালো; বছর ৩৭-৩৮ বয়স, তায় দোজবর। যদিও মেয়ের স...
বৃষ্টিভেজার গান   - সৌম্যদীপ সৎপতি, চায়ের কাপের কুণ্ডলি ধোঁয়া, আকাশ ঝরায় অভিমান কাকভেজা মন আত্মমগন, পাগলা হাওয়ায় অভিযান মেঘেদের ভীড়ে নস্টালজিয়া, বজ্রে আকাশও দেয় ...
বেইমান- তমালী চক্রবর্ত্তী... সব্জিভর্তি থলে নিয়ে অনেক কষ্ট করে বাড়ির দরজার তালা খুলল ফাতিমা বেগম। আজকাল আর আগের মতো দৌড়ঝাঁপ পোষায় না। ৬০ তম বসন্ত কিছুদিন আগেই পেরিয়েছে, হাঁপ ধরা স...
একটা খুন – বৈশাখী চক্কোত্তি... কি ভেবেছিলে, তুমিই করবে ঠিক আমার মনের খুন? ধারালো বিভিন্ন যন্ত্র দিয়ে খুঁচিয়ে রক্তক্ষরণ ঘটাবে বহুক্ষণ?? ভুলে গেছো, যন্ত্রনা পাবার নতুন করে আর নেই...
অপ্রত্যাশিত প্রত্যাখ্যান – তুষার চক্রবর্তী...  রাত একটা বাজে। আজ রাজীব কিছুতেই ঘুমোতে পারছে না। ঘুরে ফিরে তার চোখের সামনে ভেসে উঠছে ঋতুপর্ণা বসুর মুখটা আর কানে বাজছে তার কথা গুলো। রাজীব বুঝতে পারছ...
ঝিলের ধারে বাড়ি – গার্গী লাহিড়ী... আমার ঝিলের ধারে বাড়ি কোনো এক অতীতে ছাদের কোন ঘেঁষে রঙিন সুতোর দড়িতে আলতো একটু হেসে হওয়ার সাথে সই পাতাতো তোমার জংলা ডুরে শাড়ী এখন সময় শুধুই বয়ে ...
লাইটহাউস – সৈকত মন্ডল... আরও একটা বছর, আরও কয়েকটা মাইলস্টোন, তাতে লেখা স্বপ্নপূরনের দ্বুরত্ব, আরও কিছুটা রাস্তা, অন্ধকার, তবে কেন জানিনা ঠিক নিসঙ্গ নয়, অচেনা, অজানা কেও...
ভূ-স্বর্গ ঘুরে আসুন... - বিভূতি ভূষন বিশ্বাস               ভ্রমন করতে কে না ভালোবাসে কিন্তু ভ্রমন করাই মানে যেমন আনন্দ করা তেমনই এটাও খেয়াল রাখা উচিত সেটি কোনমতেই যেন নিরান...
দূর্গামায়ের সিন্দুরকৌটো – স্বরূপ রায়... ১ আজ চতুর্থী। টুনু আর ফজিল বসে ঠাকুর গড়া দেখছিল। টুনুদের বাড়িতে প্রতি বছর দুর্গাপূজা হয়। টুনুর প্রপিতামহ সৌরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী এই অঞ্চলের জমিদার। ...
বিজলী বাতি – গার্গী লাহিড়ী... আশির পঁচাশি রামবাবু গুপ্তা লেনে ভাড়া করা ছোট ঘরে মায়ের সাথে থাকে দুই বোনে , নামের বাহার লিলি ও রূপালী মায়ের নাম কুমারী বিজলী | অবাক হচ্ছো  ? মা ...
ADMIN

Author: ADMIN

Comments

Please Login to comment