না মিটিতে সাধ এ জীবনে মোর মধুরাতি গেল ফুরায়ে ( বিস্মৃত শিল্পী C.H. Atma কে নিয়ে কিছু কথা ) – দিব্যেন্দু দে

 
   ১৯৪৫ সালের কোনো একদিন, একটি ২০, ২১ বছরের ছেলে অধীর আগ্রহ নিয়ে সায়গল সাহেবের বাড়ি তে এসেছে…নিজের সত্যিকারের পরিচয় দেওয়ার সাহস হয়নি, ক্যামেরা নিয়ে গিয়েছিলেন ফটোগ্রাফার হিসাবে। সায়গল সাহেবের সাথে কথা চলছে, উনি ছেলে টিকে জিজ্ঞাসা করলেন, “বেটা, আচ্ছা ইয়ে বাতাও, তুম গাতে হো ??” ছেলেটি অম্লান বদনে বলেছিল, “না”…কথা চলছে এইভাবেই… হঠাত এক ভদ্রলোক প্রবেশ করলেন সেই ঘরে, একজন প্রফেশনাল Astrologer… সায়গল সাহেব জিজ্ঞাসা করলেন , তোমার কি চাই, সার্টিফিকেট?? কিন্তু আগে বলো তুমি কি দেখতে পারো?” ভদ্রলোক বললেন, সায়গল সাহাব, আপনার হাত দেখব … সায়গল বললেন, আমার হাত ?!, আমার এক পা কবরে দিয়েই বসে আছি আমার হাত দেখে কি করবে , আমার সামনে এই যে বাচ্চা ছেলে টি বসে আছে, ওর হাত দেখো আর বলো কি দেখলে,”… সেই জ্যোতিষী ভদ্রলোক ছেলেটির হাত দেখলেন এবং সায়গল সাহেব কে বললেন, “স্যার, এ তো শিল্পী,” সায়গল অবাক হয়ে বললেন, “কি বলছ, অর গলায় ক্যামেরা আছে বলেই কি ও শিল্পী হয়ে গেল…?” সেই ভদ্রলোক উত্তর দিলেন , আপনি যা ই বলুন এ শিল্পী , অনেক বড় শিল্পী… আপনাকে মিথ্যে বলছে। সায়গল সাহাব তখন সেই ছেলেটির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন , বেটা আমি যখন থাকব না তখন তুমি ঐ গান টি গাইবে তো? ছেলে টি জিজ্ঞাসা করল , কোন গান ??
সায়গল সাহাব বললেন, “কোঁই মানুষ কিতনা ভি বুরা হো, কুছ হোতি হ্যায় ভালা ই ভি, ঈশ্বর কে এক গুন হে ইয়ে ভি কাঁটো মে ফুল খিলা দেনা…তুমি গাইবে তো” ছেলেটি উত্তর দিয়েছিল, “জরুর গায়েঙ্গে”।। সায়গল সাহেব হেসে বলেছিলেন, “এই যে তুমি ধরা পড়ে গেলে আর তুমি যে গায়ক সেটাও বুঝলাম…”। সেদিন থেকে ছেলেটি তাঁর জীবনে যত অনুষ্ঠান করেছেন, এই গান দিয়েই শুরু করতেন… কারণ ছোট বেলা থেকেই তিনি সায়গল কে তাঁর ঈশ্বর মানতেন…গলা নকল করে বোন কে শোনাতেন…,হ্যাঁ এই ছেলেটির পুরো নাম চন্দন (চান্দ্রু) হাসমত রাই আত্মা যাকে আমরা
সি এইচ আত্মা নামে জানি।
জন্ম হয়েছিল ১৯২৩ সালে অধুনা পাকিস্থানের হায়দ্রাবাদ Sind এ। পড়াশোনা করেছিলেন করাচী শহরে। কর্মজীবন ও শুরু করেছিলেন একজন রেডিও অফিসার হিসাবে কিন্তু কদিনের মধ্যেই উপলব্ধি করেছিলেন এই জীবন তাঁর জন্য নয়। প্রথম রেকর্ড করেন ১৯৪৫ এ। যে গান এখনো তাঁর গাওয়া অন্যতম শ্রেষ্ঠ গানের মধ্যে পড়ে … প্রীতম আনমিলো…।অন্যদিকে ছিল “কোঁন নগর তেরা”…গান তিনি অনেক ভাষায় গেয়েছিলেন।, গুজরাতি, সিন্ধ্রি, হিন্দী, উর্দু এমনি কি বাংলাতেও। ১৯৫২ সালে একটি ৭৮ rpm রেকর্ড বার হয়েছিল তাঁর, সুর দিয়েছিলেন দুর্গা সেন, গান দুটি ছিল যথাক্রমে “ আমি আজো আগের ই মতো স্মৃতি নিয়ে যাই নিরালায়” লিখেছিলেন শ্যামল গুপ্ত।। অন্যদিকে ছিল “না মিটিতে সাধ এ জীবনে মোর মধুরাতি গেল ফুরায়ে…” লিখেছিলেন প্রনব রায়।
ভুল বললাম একটু , গান উনি গাইতেন না … উনি গানের পুজা করতেন … স্তব করতেন আর সেটাই হয়ত গান হয়ে বেরোত তাঁর কণ্ঠ দিয়ে এতটাই দরদ ভরা ছিল ওনার কণ্ঠ।
অনেক কিছু পাওয়ার কথা ছিল, কিছুই পান নি …ব্যক্তিগত জীবনেও সুখী ছিলেন না।। সেই আর্তি ফুটে বেরোত তাঁর গানের গানের মধ্যে দিয়ে। যেমন …
“তুঝ বিণ শুনি প্রেম ডগরিয়া
আজা রে আজা রে ও সনম…”
দুটি ছবি তে উনি নায়ক গায়কের ভূমিকায় অভিনয় ও করেছিলেন। বিল্বমঙ্গল এবং ভাইসাহাব। শান্তরাম জির বিখ্যাত ছবি ” গীত গায়া পত্থর নে ” তে তাঁকে আমরা নিজের লিপে গান গাইতেও দেখেছি।দুঃখের এই জীবনের অবসান ঘটে ১৯৭৫  সালের ডিসেম্বর মাসে…(1974 সালে তাঁর মৃত্যু হয়েছিল, এই তথ্য সম্পূর্ণ ভুল যা আমি প্রথমে একটি রেডিও ইন্টারভিউ থেকে পেয়েছিলাম। পরে তাঁর ভাই প্রয়াত চান্দ্রু আত্মা র একটি লেখা থেকে এই তথ্য জানতে পারলাম।)  তাঁর গুরুর মতোই তিনি ও আমাদের ছেড়ে অকালেই চলে যান,তখন তাঁর বয়স মাত্র 52…আর আজ তিনি প্রায় বিস্মৃত শিল্পী…।
আমার শ্রদ্ধা ও প্রণাম জানাই তাঁকে… আর আমার এই লেখাই তাঁর জীবন ও কর্ম কে যদি একটু ও আলোকপাত করতে পারি আপনাদের কাছে , তাহলে আমার এই প্রচেষ্টা সার্থক বলে মনে করব।

_____


FavoriteLoading Add to library
Up next
পুজো – ডঃ মৌসুমী খাঁ... পুজো আমার শিউলি ফোঁটা ভোর নীলাকাশ জুড়ে পেঁজা তুলোর মেঘ, বাতাসে ঢেউ তোলা কাশের বন আকাশ ভরা সোনা রোদের আলো , ক্ষেত জোড়া সবুজ ধানের শিষ কুমারটুলির স...
ওই লোকটা – গার্গী লাহিড়ী... আবার এসেছে ওই লোকটা দু হাত মুষ্টিবদ্ধ , কাঁধে বিশাল এক ঝোলা মুঠোর মাঝে কি আছে বোঝা যায় না দুর্বোধ্য ভাষায় হেঁকে যায় গলি থেকে গলি লোকটা কি ফেরি ক...
পাতা ঝরার দিনগুলি – গার্গী লাহিড়ী... কোনো এক তুমুল ঝড়ের রাতে পাখির বাসার মতো ভেঙে যাচ্ছ তুমি ঝমঝম একলা রাজপথে আঁচল পেতে দিয়েছিলাম অতি ক্ষিপ্রতায়  , ধুলোয় মেশার আগেই সন্তর্পনে কোঁচড়ে ...
যন্ত্রণা – অনিন্দিতা দাস... দু-বছরের ছোট্ট শিশু ব্যাগের বোঝা কাঁধে যাচ্ছে সে ইসকুলেতে বাবা মায়ের সাথে। গল্প শোনায়, খেলতে যাওয়ায় আছে মায়ের বারণ টেলিভিশনে চোখ রাখতে বাবার করা ...
বলিউডের দুই দেশি বয়েজের টক্কর- রাজদীপ ভট্টাচার্য্...      ১৫ই আগস্ট গোটা বলিউড দেখবে দুই দেশি বয়েসের টক্কর কারণ অক্ষয় কুমারের গোল্ড এবং জন আব্রাহামের সত্যমেব জয়তে স্বাধীনতা দিবসের দিন একই সাথে মু...
নেতাজী-একটি আগুন – প্রসেনজিৎ মূখার্জী... ছোটবেলায় ছোট্ট মনে আসতো ভেসে শুধুই স্বাধীনতার￰￰ মানেটা কি? সকলকে কেবলই তা শুধোই একটু বড়ো হলে পরে মায়ের কোলে শুয়ে একটি ছবিই আসতো ভেসে বইয়ের পাতায় চ...
ভাবি আনমনে -সৌম্য ভৌমিক শিশির ধোয়া জানালার কাচে জেগে থাকে মুখোশের সারি ছোট টবে বনসাই বাঁচে বিবর্ণ হওয়া ফ্ল্যাট বাড়ী । ঘামে ভেজা শরীরের ভীড়ে খুঁজে পাওয়া...
উইন্ডোজ কম্পিউটারের ইতিকথা- অভিষেক চৌধুরী...   কম্পিউটারের সঙ্গে ব্যবহারকারীর মেলবন্ধন ঘটাতে প্রয়োজন OS - এর | এই OS - বানানোর উদ্দেশ্য নিয়েই কাজ শুরু করেন বিল গেটস | ফলস্বরূপ ১৯৮১ তে আবির্...
বেগুনের বিরিয়ানী - অনামিকা দাস   আপনাকে যদি প্রশ্ন করা হয় যে আপনার "ক্রাশ" এর নামগুলি উল্ল্যেখ করতে,নিঃসন্দেহেই আপনি সেই তালিকার মধ্যে বিরিয়ানীর নামটাই সর্বপ্...
বদনামের ফাঁদে – তুষার চক্রবর্তী... সুচিত্রার আজ পনের দিন হয়ে গেল চোখে ঘুম নেই। সারা রাত একা নিজের ঘরের বিছানায় এপাশ ওপাশ করেছে। রোজই দু তিনবার উঠে জল খেয়েছে, একবার বাথরুমে গেছে। এখন আয়ন...
ADMIN

Author: ADMIN

Comments

Please Login to comment