নির্ভুল – শ্বেতা মল্লিক

‘উফফ! সকাল সকাল এতবার ফোন করে ঘুম ভাঙ্গাচ্ছিস কেন সুমি? জানিস তো কাল কত রাতে ফিরেছি।’ , ঘুম ও বিরক্তি মেশানো গলায় বলে উঠলো রণিত।

‘ তাড়াতাড়ি হোয়াটসঅ্যাপ টা দেখ। সর্বনাশ হয়ে গেছে। উই আর ফিনিস্ড।’ , বলেই কেঁদে উঠলো সুমি।

‘ বাট হোয়াট হ্যাপেন্ড? কিছু তো বল।’

ততক্ষণে ফোন টা কেটে দিয়েছে সুমি।

কি ঘটেছে কিছুই বুঝতে পারছিল না রণিত। হোয়াটসঅ্যাপ টা খুলতেই টুং টুং করে গাদাখানেক নোটিফিকেশন ঢুকল। এ কি, এ তো সব ভিডিও। কাল রাত আর আজ সকাল মিলিয়ে পাঠানো। একদম উপরে দেখল ওর বেস্ট ফ্রেন্ড অর্ণবের ম্যাসেজ। ওপেন করতে একটা ভিডিও আর সাথে কয়েকটা ম্যাসেজ।

‘আর তো কয়েকটা দিনের অপেক্ষা ছিল মাত্র। একটু ধৈর্য ধরতে পারলি না?’

আর একটা,

‘সবাই জানলে কি হবে বুঝতে পারছিস?’

‘সকালে প্লিজ একটা কল করিস, টেনশনে থাকব।’

ব্যাপারটা আসলে কি? আর না ভেবেই ভিডিও টা ডাউনলোড করা শুরু করল রণিত। একটা অজানা ভয় কাজ করছিল। ডাউনলোড কমপ্লিট হতেই রণিত একলাফে উঠে বসলো। একটা ছেলে আর একটা মেয়ে, একটা রুমের মধ্যে। ছেলেটার শার্ট টা রণিতের খুব চেনা, মেয়ে টার ব্যাগ টাও ও অনেকবার দেখেছে, পুরো পরিবেশ টাই রণিতের চেনা। চিনবে নাই বা কেন? ভিডিও তে ক্যারেক্টার দুটো আর কেউ না, স্বয়ং রণিত আর ওর ফিয়ন্সে সুমিতা।

অদ্ভুত একটা উত্তেজনা কাজ করছে রণিতের মধ্যে। কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না কি হচ্ছে এসব। মনটাকে জোর করে টেনে আনল মোবাইলের স্ক্রিনের দিকে। রণিত আর সুমিতা দুজনে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে, সুমিতাকে কাছে টেনে এনে ডিপ কিস করছে রণিত। সুমিতার হাত দুটো রণিত কে আটকানোর বৃথা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। রণিত এবার ব্যস্ত হয়ে পড়েছে সুমিতার টি শার্টের বোতাম গুলো খুলতে। সুমিতা আটকাতে চেয়েও পারছে না। একটানে ওর টি শার্ট টা খুলে ওকে বিছানায় ঠেলে শুইয়ে দিলো রণিত। তারপর যা যা দেখল তার সবটাই ঠিক এক সপ্তাহ আগে হোটেলের ডবল বেডরুমে রণিত আর সুমিতার মধ্যে ঘটে গেছে।

আর দেখতে পারল না রণিত। উঠে পড়লো বিছানা থেকে। হোয়াটসঅ্যাপে ভর্তি ম্যাসেজ, সবার একই প্রশ্ন, কিভাবে হল এসব? যেন ওরাই প্রথম কাপল যারা এমনটা করেছে। অবশ্য এর আগে আর কারো এম এম এস ওরা দেখেছে কিনা তা রণিতের জানা নেই। এই মুহূর্তে ঠিক কি করা উচিত কিছুই বুঝে উঠতে পারছিল না, সুমি কে একটা কল করবে কি? কোন মুখে কথা বলবে ওর সাথে? সুমি ওকে অনেক বার বারণ করেছিল, এখনো মনে আছে সেদিনের চ্যাটটা।

‘আর তো একটা মাস। এতগুলো বছর ওয়েট করতে পারলি আর এই কয়েক টা দিনের জন্য কেন রিস্ক নিতে চাইছিস রণিত?’

‘শোন, এই ওয়েট করাটাই ভুল হয়েছিল। ইউ হার্ড অ্যাবাউট সৌরভ এ্যান্ড লিনা না?’

‘নো।’

‘দে বোথ ওয়্যার ডেটিং সিন্স টুং ইয়ার্স বাট নেভার গেট ইনটিমেটেড আন্টিল ম্যারেজ। বাট সামথিং হরিবল হ্যাপেন্ড অন দ্যা ফার্স্ট নাইট।’

‘কি হয়েছিল?’

‘আরে দ্যা গাই হ্যাড সামনে সেক্সচুয়াল ডিফরমিটিস। ইট রুইন্ড দেয়ার ফার্স্ট নাইট অ্যাজ ওয়েল হোল লাইফ।’

‘বাট উই নো ইচ আদার সিন্স আওয়ার কলেজ ডেজ, মোর দ্যান সেভেন ইয়ার্স। আই বিলিভ ইউ ডিয়ার।’

‘বাট আমি আর রিস্ক নিতে চাইনা। দ্যাখ, ফোন বা চ্যাটিং এগুলো তে যা হয়েছে, নট এনাফ ফর মি। আমি চাইনা আমাদের লাইফ টাও রুইন্ড হোক। ট্রাই টু আন্ডারস্ট্যান্ড ইয়ার।’

‘ বড্ড জেদি রে তুই। আর এই জেদের কাছেই বারবার হেরে যাই আমি। ওকে।’

‘দ্যাট্স লাইক মাই গার্ল। লাভ ইউ সুমি।’

‘লাভ ইউ টুউ-উ রণিত।‘

‘সো বল, কবে মিট করছি আমরা?’

‘তুই বল। বাট শোন, আমার বাড়ি কিন্তু এখন ফাঁকা নেই। সো নট হেয়ার।’

‘সে তো আমার বাড়ির ও সেম কন্ডিশন।’

‘দেন?’

‘হোটেল!’

‘আর ইউ ম্যাড? প্রচুর রিস্ক ওসব জায়গায়। নো ওয়ে।’

‘বাট উই হ্যাভ নো অপশন ইয়ার। অ্যান্ড আই নিড ইট ব্যাডলি।’

‘তাই বলে হোটেলে সেটা কোন ভাবেই পসিবল না।’

এরপর প্রায় পাঁচ দিনের দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর সুমিতাকে রাজি করাতে পেরেছিল রণিত। কিন্তু সেদিন সুমিতার বারণটা শুনলে আজকের সকালটা হয়তো দেখতে হত না। আর ভাবতে পারছে না রণিত, সুমির নম্বর টা ডায়াল করল। ফুল রিং হয়ে কেটে গেল। কি জানি মেয়েটার উপর দিয়ে কি যাচ্ছে, কেন যে সেদিন ওর কথা টা শুনলাম না। নানা রকম চিন্তা মাথায় আসতে শুরু করেছে রণিতের। আবার কল করতে যাবে এমন সময় বাইরে থেকে কিছু কথা কাটাকাটির আওয়াজ কানে এলো। ব্যাপারটা বোঝার জন্য রুমের দরজা টা অল্প একটু খুলে শোনার চেষ্টা করল।

‘ আপনি তার মানে বলতে চাইছেন সবটা আমার ছেলের দোষ? আপনার মেয়ে কিছুই জানত না?’, ফোন টা কানে ধরে উত্তেজনায় ফুটছে রণিতের বাবা।

রণিত বুঝতে পারল উল্টো দিকে সুমিতার বাবা অথবা মা কেউ একজন আছে। মানে ঘটনাটা কারোর জানতে বা দেখতে বাকি নেই। দরজা টা বন্ধ করে বিছানায় এসে বসলো রণিত। লজ্জায় দুহাতের মধ্যে মাথাটা গুঁজে দিল। দরজা খুলে রণিতের মা ঘরে ঢুকল।

‘ ছেলের মা বলে গর্ব করতাম, আর আজ লজ্জায় মাটিতে মিশে যেতে ইচ্ছা করছে। একটা মাস পর বিয়ের কথা ছিল আর……’

‘ছিল মানে?’, অবাক চোখে মায়ের দিকে তাকালো রণিত।

‘ তুই কি ভাবছিস? এসবের পরও সুমিকে বাবা মানবে? এমনি তেও তোর বাবা লাভ ম্যারেজের পক্ষে কোন দিন ছিল না। শুধু তোর মন রাখতে আর আমার জোরাজুরিতে রাজি হয়েছিল। কিন্তু যে ঘটনা ঘটেছে তাতে তোর বাবা কিছুতেই মানবে না।’, মাথায় হাত দিয়ে চেয়ারে বসে পড়ল রণিতের মা।

‘ হোয়াট রাবিস! যা হয়েছে আমাদের দুজনের মর্জিতে। আর আমরা অ্যাডাল্ট, সো এটা অন্যায় তো নয়। তাছাড়া…..’

মুখের কথা শেষ হওয়ার আগেই রণিতের বাবা ঘরে এসে ঢুকলেন। বাবার সামনে সব কথা রণিত বলতে পারে না। চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।

‘ পরিবারের নিয়ম ভেঙে লাভ ম্যারেজে মত দিয়েছিলাম। শুধু মাত্র তোমার মা আর তোমার জেদের জন্য। আর কোন কিছুর সামনে মাথা নত করতে পারব না।’

দরজা টা বন্ধ করে বাবা বেরিয়ে গেল।

ইকো পার্কের একটা বেঞ্চে বসে আছে রণিত ও সুমিতা। ঐ ঘটনার প্রায় দেড় মাস পর অনেক টা সাহস জোগাড় করে সুমিতার মুখোমুখি হতে পেরেছে। মাঝে অনেক ঝড় ঝাপটা গেছে, তবে তার বেশি টা গেছে সুমিতার উপর দিয়ে। রণিত কে ওর মা-বাবা পাঠিয়ে দিয়েছিল হায়দ্রাবাদে,ওর পিসির কাছে। যোগাযোগের সব পথ বন্ধ ছিল। থানা পুলিশ করতে দেয়নি রণিতের বাবা, বলেছিল কিছুদিন পর সবাই ভুলে যাবে। কিন্তু শেষ রক্ষাটা রণিত করতে পারেনি। সুমির সাথে বিয়েটা ভেঙ্গে গেছিল।

‘ হঠাৎ ডেকে পাঠালি আমাকে? মা বাবা পারমিশন দিল তাহলে?’, বেঞ্চের এক পাশে বসে প্রথম কথাটা বলল সুমিতা।

‘ মা বাবা বাড়িতে নেই তাই ভাবলাম……’

‘ ও আচ্ছা! আমি তাই ভাবছি, যে ছেলেটা একটা মেয়েকে মাঝ রাস্তায় দাঁড় করিয়ে স্ক্রাউন্ডেলের মত পালিয়ে যেতে পারে, তার আজ হঠাৎ আমায় কি দরকার পড়লো?’

‘ বিশ্বাস কর সুমি, আমি পালাতে চাইনি। বিয়ে টা আমি ভাঙতে চাইনি। মা বাবা এমন করল। আমার যদি পালানোর ই হত তাহলে কি আমাদের রিলেশনশিপটা বিয়ে অবধি এগিয়ে নিয়ে যেতাম?’

‘ তাই আজ বিয়েটা ভেঙ্গে ভুল টা শুধরে নিলি।’

‘ ট্রাস্ট মি প্লিজ। আমার উপর দিয়ে কি কি যাচ্ছে তার তুই ভাবতে পারবি না সুমি।’

এক ঝটকায় রণিতের হাতটা কাঁধ থেকে সরিয়ে উঠে পড়লো সুমি।

‘ ইউ নো রণিত। তোর আর আমার ডিফারেন্স টা কোথায়? তোর মা বাবা তোকে আটকিয়ে ছিল আমায় বিয়ে করতে। আর আমার পেরেন্টস আমাকে আটকিয়েছে তোদের এগেইনস্টে থানায় কেস করতে। তবে আমাদের সিমিল্যারিটি ও আছে। উই বোথ স্টুড উইথ আওয়ার পেরেন্টস।’

সূর্যাস্তের লাল রং টা রণিতের মুখের উপর পড়েছিল নাকি ওর ভিতরের সত্ত্বার ছাপ মুখে ফুটে উঠেছিল,সেটা সুমিতা সেদিন বুঝতে পারেনি।

চার বছর কেটে গেছে। রণিত এখন ব্যাঙ্গালোরে সেটেল্ড। তিন বছর হতে চলল বিয়ে করেছে, মেয়েটিও আইটি এমপ্লয়ি। প্রথম দুটো বছর ভালোই কেটেছিল কিন্তু তার পর থেকেই সমস্যার শুরু হয়। অনেক চেষ্টার পরও রণিতের ওয়াইফ কনসিভ করতে পারছে না। ডক্টর বলেছেন সি হ্যাজ সাম ইন্টারনাল ইস্যুজ। ট্রিটমেন্ট চলছে, কিন্তু বিষয় টা ক্রিটিক্যাল। দুজনের সম্পর্কের মধ্যে টানাপোড়েন চলছে। খুব ডিস্টার্বড থাকে আজকাল রণিত।

একদিন অফিস থেকে বাড়ি না ফিরে একটা পার্কে ঢুকে পড়ল রণিত। রোজই আসা যাওয়ার পথে এখানে বেশ কিছু বাচ্চাকে খেলা করতে দেখে। এতগুলো কচি কচি মুখ দেখলে কেমন জানি একটা সুখ খুঁজে পায় রণিত। সন্তানের উপস্থিতি যে কতটা প্রয়োজন তা বেশ বুঝতে পারছে ওরা দুজনে।

হঠাৎ রণিতের চোখ গেল উল্টো দিকের বেঞ্চের উপর। ফুটফুটে একটা মেয়ে বসে আছে। একটা অদ্ভুত আকর্ষণ অনুভব করল রণিত। উঠে গিয়ে বসল মেয়েটির পাশে। আশপাশে কাউকে নজরে পড়ল না। কোলে তুলে নিল মেয়েটিকে। কেন জানি না মেয়েটিও ওর কোলে ঝাঁপিয়ে চলে এলো। ভীষন মিষ্টি মেয়েটির মুখটা। বছর তিনেক হয়ত বয়স হবে। কতই না সুখী সেই মা বাবা, যাদের জীবন আলো করতে এরকম ফুটফুটে একজন আছে। হঠাৎ যেন মেয়েটির মুখের সাথে নিজের মুখের মিল খুঁজে পেল। এটা কি মনের ভুল নাকি অতিরিক্ত ভাবনা, সেটা সবেমাত্র বোঝার চেষ্টা করতে যাচ্ছিল এমন সময় একটা আওয়াজ পেল পাশ থেকে,

‘এক্সকিউজ মি!’

পিছন ঘুরতে যাকে দেখল, তার মুখ টা এতগুলো বছরে একটা দিনের জন্যেও ভুলতে পারেনি রণিত।

‘সু-মি-তা !’

চার বছর আগে ইকো পার্কের বেঞ্চে যার সাথে শেষ বারের মত দেখা হয়েছিল, তাকে প্রায় ১৮০০কিমি দূরে এক পার্কে আবার দেখতে পাবে এমনটা আশা করেনি রণিত।

‘ তুই এখানে?’, প্রথম মৌনতা ভাঙলো সুমিতা।

সেই চেনা স্বর।

‘ আমি তো এখানে সেটেল্ড।’, বাস্তবে ফিরে এলো রণিত। ‘বাট তুই…..’

‘ আমি সেটেল্ড ছিলাম।’

কথা টা বলতে বলতে বাচ্চাটাকে নিজের কোলে তুলে নিল।

‘ হাসবেন্ড এখানে সেটেল্ড তোর তারমানে?’

‘ আমি বিয়ে করিনি রণিত।’

‘ তাহলে এই বেবি?’

‘ আই অ্যাম এ সিঙ্গেল মাদার।’

নিজের কান কে বিশ্বাস করতে পারল না রণিত। পরের প্রশ্ন টা করার আগেই উত্তর টা দিয়ে দিল সুমি।

‘ তুই চলে যাওয়ার পর ভাবিনি উঠে দাঁড়াতে পারব। কিন্তু যাওয়ার আগে আমার লাইফের বেস্ট গিফট টা আমায় দিয়ে গেছিস। আমার মেয়ে, এনা। কালই আমরা গ্লাসগো সিফ্ট করছি। ওখানেই পারমানেন্টলি সেটেল করব। এনিওয়ে টেক কেয়ার এ্যান্ড হ্যাভ এ গ্রেট লাইফ এহেড।’, গেটের দিকে এগিয়ে গেল সুমিতা।

রণিত কি বলবে বুঝে উঠতে পারল না। শুধু বুঝল সেদিনের সেই ভুল টা আসলে ভুল ছিল না। কাউকে বাঁচানোর একটা উপায় ছিল।

চোখের কোনে বিন্দু বিন্দু জল অনুভব করল রণিত। তাতে কষ্ট ও আনন্দ দুইই মিশে ছিল।

_____


ADMIN

Author: ADMIN

Comments

Please Login to comment