পরশপাথর

pexels-photo-1024972

 

       মৌতমা হাতের গোলাপটার দিকে তাকিয়ে ভাবল গোপাল কি সত্যিই তাকে ভালোবাসে? আজ যেভাবে জয় আর তার বন্ধুদের থেকে মার খেল….আজকের ভ্যালেন্টাইন্স ডের সন্ধেটা পুরো মাটি…ধুর। হাতের গোলাপটা সোজা ডাস্টবিনে ফেলে দিয়ে জয় কে কল করল,

– হ্যালো?
– এখনো আপসেট হয়ে আছিস?
এই ছেলেটা না বলতেই কেমন বুঝে যায়।
– হ্যাঁ, ভালো লাগছে না কিছু। আমাদের দিনটাই তো খারাপ হয়ে গেল জয়।
– এতো বেশি ভাবিস না। আমাদের সবদিনই তো ভ্যালেন্টাইনস্ ডে। কাল দেখা করি? দীর্ঘ ১০ বছর সাথে আছি। জীবনের কত ওঠাপড়া, ঝগড়া-ঝামেলা গেছে। শুধু একটা কথা সবসময় মনে রাখিস, তুই শুধুই আমার। কেউ তোর দিকে হাত বাড়াতে এলে আমি কিছুতেই সহ্য করব না। ওই গোপালের থোবড়া বিগড়ে দিয়েছি। আর সাহস হবে না। কি সাহস ভাব…আমার গার্লফ্রেন্ড কে..সরি হবু বউকে প্রোপোজ করছে। বাস্টার্ড একটা…
উফ্!…ছেলেটা একদম পাগল। মৌতমা হেসে ফেলল। এইরকম ভালোবাসা কজন পায়? ভাগ্য ভাল যে জয়কে পেয়েছে।

——-

টলতে টলতে এসে বাড়ির দরজার তালা খুলল গোপাল। স্নানের ঘরে গিয়ে গায়ে দু-তিন বালতি জল ঢাললো। কিছু খেতে ইচ্ছে করল না তাই বিছানায় গা এলিয়ে দিল।
কী দোষ ছিল তার? কী দোষ? কাউকে মন থেকে ভালোবাসা কি দোষের?
মৌতমা কে গোপাল চেনে স্কুলে পড়ার সময় থেকে। জন্ম-অনাথ গোপালের সাথে সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মানো মৌ ছিল বড়ই বেমানান। হরিদাস বয়েস হাইস্কুলের সাথে যে সেন্ট জেভিয়ার্স কোনোদিন যে মেল খায়না সেটা সবাই জানে। তাও… গোপালের ভাগ্য যে তার বস্তিতে মাথা গোঁজার মত ঝুপড়ি ছিল। বাবা মিলের শ্রমিক, অ্যাক্সিডেন্টে মারা গেল। তখন গোপাল হবে, গোপালের মা শোকে পাগলপাড়া। মায়ের বোধ হয় খুব তাড়া ছিল, তাই গোপাল কে জন্ম দিয়েই পরপারে পাড়ি দেয়। বস্তির কাকী,মাসী,পিসিদের হাতেই বড় হয়েছে গোপাল। গোপালের মায়ের যা গয়না ছিল তা বেচেই গোপাল কে খাবারের যোগান দিয়েছে। বস্তির লোকেরাই গোপালের পরিবার। একটু বড় হলে গোপাল কে বস্তিরই এক কাকা সামনের এক নামী রেঁস্তোরায় কাজে লাগিয়ে দেয়। ছোটোবেলায় রেঁস্তোরার ভিতরে বাসন-টাসন মাজার কাজ করত। কেউ জেনে ফেললে সমস্যা ছিল, কী সব চাইল্ড লেবার টেবারের ব্যাপার, তাই কাজ যাওয়ার ভয়ে নিজেই আসতো না গোপাল কারোর সামনে। সকালে স্কুল, স্কুল শেষে রেঁস্তোরা, আর ছুটির দিনগুলোয় বস্তির এক স্যারের কাছে বিনামূল্যে টিউশানী, এই ছিল গোপালের জীবন। বস্তির স্যারই স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছিল, বেশ ভাল ছাত্র গোপাল। কিন্তু তাতে কী? ছেলে তো সে বস্তিরই।
তখন গোপাল ইলেভেন। গোপালের প্রোমোশান হল। মালিক বলল এবার থেকে তাকে ওয়েটারের কাজ করতে হবে। বেশ খুশি গোপাল। হাসিমুখে সবাইকে সার্ভ করছে, প্লেট তুলছে। প্লেট তুলে রাখতে যাবে এমন সময় সজোরে ধাক্কা। প্লেট মাটিতে পড়ে টুকরো টুকরো হয়ে গেল। নীচু হয়ে তড়িঘড়ি টুকরোগুলো কুড়োতে গিয়ে হাত কেটে ফেলল গোপাল। ধ্যাত!…আজ কপালে বেশ দুঃখ আছে।
– হে ইউ। তখন থেকে ডাকছি। কথা কানে যাচ্ছে না?
গোপাল মুখ তুলে তাকালো তারই বয়সি একটি সুন্দর দেখতে মেয়ে সামনে দাঁড়িয়ে বড় বড় চোখ করে তাকে ধমকাচ্ছে।
– হ্যালো। কথা বলছো না কেন?
– সরি ম্যাম।
– তুমি সরি বলছো কেন? আই অ্যাম সরি। তোমাকে ধাক্কা মারলাম,না দেখে। Don’t worry…ড্যাড কে বলে দিচ্ছি ম্যানেজারকে বলে দেবে যে তোমার কোনো দোষ ছিল না। তোমার তো হাতটাও কেটেছে দেখছি। ডাক্তার দেখিয়ে নিও। মেডিসিন খেয়ে নিও। ওকে?
এত যত্ন? গোপালের মনে পড়ল না এর আগে ওর জীবনে এইরকম কেউ বলেছে কি না।
– ইয়েস ম্যাম। থ্যাঙ্ক ইউ।
গোপাল কে পাশ কাটিয়ে এক্সিট ডোরের দিকে এগিয়ে গেল মৌ, সাথে বন্ধুরা।
সেদিন পুরো রাতটা ঘুমোতে পারল না গোপাল। ওই একটা কথাই কতবার যে ভেবেছে। আরও কয়েকদিন পর এলো মৌ, বন্ধুদের সাথে। গোপালের আনন্দ আর দেখে কে? তড়িঘড়ি ছুটল অ্যাটেন্ড করতে। ফুড সার্ভ করার সময় একটা একস্ট্রা চকলেট পেস্ট্রী সার্ভ করল। মৌ জিজ্ঞাসা করলে বলল, “কম্পলিমেন্টরী ম্যাম”। গোপাল ফিরে এসে সযত্নে নিজের নামে বিল করল পেস্ট্রীর,এর থেকে বেশী আর সামর্থ্য কোথায় গোপালের?
এইভাবে দিন গেল, মাস গেল, বছর গেল। মৌ রেঁস্তোরায় আসত, আর গোপাল বাকী খাবারের সাথে সার্ভ করত নিজস্ব কম্পলিমেন্টরী। মৌ কোনোদিন খেত, কোনোদিন খেত না। এরপর একদিন এলো ভ্যালেন্টাইন্স ডে। রেঁস্তোরাতেই জয় মৌকে প্রোপোজ করল, মৌ ও হ্যাঁ বলল। সেদিন প্রথমবার গোপাল জোর ধাক্কা খেল, বুঝল মৌকে ও ভালোবাসে। এতদিন ভেবেছিল মৌয়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা থেকে করছে এইসব, এত বড়লোকের মেয়ে, গোপাল কৃতজ্ঞতা জানালে যদি অপমানিত বোধ করে?
বেশ ভাগ্যবান গোপাল ছোট থেকেই, সেটা সে নিজেও জানে। যেদিন নিজের ভালোবাসার কথা বুঝলো, সেদিন এটাও বুঝলো যে তার ভালোবাসাকে কোনোদিন পাওয়া সম্ভব নয়। তবুও গোপাল সরে আসেনি নিজের জায়গা থেকে। মৌকে ভালোবেসে গেছে, নিঃস্বার্থভাবে, গোপনে, সবার চোখের আড়ালে, মৌকে জয়ের সাথে খুশি দেখে খুশি হয়েছে। শুধু চোখে দেখেই ভালবেসেছে মৌকে, বছরের পর বছর। কম্পলিমেন্টরী বাদ যায়নি একবারও, জয় আসার পর সেটা একটা থেকে দুটো হয়েছে। মৌকে খুশি রাখার জন্য জয়ের প্রাপ্য।
কিন্তু এই ১১ বছর পর কী যে হল? হঠাৎ মনে হল যে মৌকে একবার জানাই ভালবাসার কথা। কিন্তু কিছু পেতে চেয়ে নয়। ফুড সার্ভ করার একটু পর আবার গোপাল ফিরে এল মৌয়ের টেবিলে। জয় আর বাকী বন্ধুরা তখন খেতে ব্যস্ত। মৌ বলল,
– কিছু বলবে?
– হ্যাঁ ম্যাম। যদি একটু এইদিকে সাইডে আসেন, যদি আপনার শুনতে আপত্তি না থাকে, তাহলে…
– OK.
বন্ধুদের বসতে বলে মৌ এক সাইডে উঠে এল গোপালের সাথে।
– বলো, কী বলবে।
– ম্যাম, দয়া করে ভুল ভাববেন না আমাকে। আমি তাই কোনোদিন বলিনি। আপনি যদি ভুল বোঝেন। আমার খারাপ কোনো মতলব নেই। শুধু জানানোর দরকার মনে হলো তাই…
একটা কাঁটাহীন লাল গোলাপ আর একটা চিঠি ধরিয়ে হনহন করে গোপাল রেঁস্তোরার ভিতর দিকে হাঁটা দিল। মৌ অবাক হয়ে চিঠির ভাঁজ খুলে ফেলল।

ম্যাম,
আমি ঠিক গুছিয়ে কথা বলতে পারি না। তাই কী লিখব এখনো বুঝে উঠতে পারছি না। শুধু আপনাকে এটাই বলতে চাই যে আমি আপনাকে ভালবাসি, খুব ভালবাসি। আজ থেকে নয়, সেই যেদিন আপনার সাথে ধাক্কা লেগেছিল, সেদিন বা তারপর থেকেই। ঠিক জানি না। আপনার জীবনের ব্যাপারে সবটাই জানি আমি। জয়দার সাথে আপনি খুব ভালো আছেন, এতেই আমি খুব খুশি। আমার সত্যি কিছুই চাইনা আপনার থেকে। কিন্তু এটা জানবেন ম্যাম আপনার জীবনে সবসময়ে আমাকে পাশে পাবেন। ছোট-বড় যে কোনো দুর্দিনে যদি দরকার হয়, নিশ্চই পাবেন। এইটুকুই বলার ছিল শুধু। ধন্যবাদ।
                                                                    – গোপাল

মৌ কীভাবে রিয়্যাক্ট করবে বুঝতে পারল না। একটু রেগেও গেল। জয়কে চিঠিটা দেখালো। তারপর…

—–

গোপাল মাঝ রাস্তায় পড়ে আছে রক্তাক্ত অবস্থায়। জয়ের সাথে তার বন্ধুরা তাকে লাথির পর লাথি মারছে। গোপালের কোনো কথা কানে ঢুকছে না।
-জয় কুল ডাউন বেবি, ছাড় ওকে এবার। দিলি তো শিক্ষা। তোর হাতে লেগেছে অলরেডি। আমার জন্য অন্তত ছাড় এবার ওকে।
কথাগুলো চেঁচিয়ে বলল মৌ।
– শালা, সাহস কী…আমার হবু বৌকে প্রোপোজ করছে। আবার আমার সামনে…দুঃখের দিনে পাশে থাকবে আবার…নিজের স্ট্যান্ডার্ডে থাক বুঝলি? কী ক্ষমতা আছে রে তোর? দেবেশ রায়ের মেয়ের কোনোকিছুর অভাব নেই, আর জয় বোসের বৌয়ের কোনোদিন কিছুর অভাব হবেও না। হ্যাঁ, তোর অভাব হলে বলিস….আমাদের বাড়ির উচ্ছিষ্টগুলো পাঠিয়ে দেব। চল তোরা সব…দিনটাই খারাপ করে দিল। বাস্টার্ড একটা।

ওরা চলে যাওয়ার পর শরীরটা কে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে বাড়ি ফিরেছিল গোপাল। নাহ!..চাকরীটা আর থাকেনি। এবার একটা ক্যাটারার সার্ভিসে যোগ দিল গোপাল। টেনেটুনে যোগ্যতা উচ্চমাধ্যমিক, এতে আর কী হয় এর বেশি? গোপালের তো সোনায় মোড়ানো কপাল। মাস দুই পর এক বিয়েবাড়িতে কাজ করতে গিয়ে দেখল জয় আর মৌয়ের বিয়ে। নিজের ওপর খুব হাসল গোপাল সেদিন। মন দিয়ে সব কাজ সামলে দিল, কিছুটা বেশিই কাজ করল বোধ হয়। হাজার হোক মৌয়ের বিয়ে। গোপাল করবে না তো কে করবে? রাতে বিয়ে সহ সব কাজ সুষ্ঠুভাবে মিটে গেলে মৌয়ের বাবা সব কাজের লোক কে খুশি হয়ে বকশিস দিল। বিয়েবাড়ির গেট দিয়ে বেরোবার সময় গোপাল দেখল এক ভিখারী সামনের ফুটে ভিক্ষা করছে। বকশিস সহ গোটা দিনের উপার্জিত অর্থটাই ধরে দিয়ে দিল। মৌয়ের বিয়ে, গোপাল কখনও টাকা নিতে পারে? বিয়েবাড়ির গেটের দিকে ফিরে গোপাল বলল মনে মনে, “ভালো থেকো, সুখে থেকো। জানি আমার ভালোবাসার দরকার হবে না তোমার, কিন্তু তাও…কোনোদিন দরকার হলে জানিও, ঠিক পাশে পাবে আমাকে।” একফোঁটা জল বোধ হয় চোখের কোনে চিকচিক করছিল। সেটা মুছে গোপাল বাড়ির দিকে পা বাড়ালো।

১০ বছর পর –

উফ!…বাচ্ছাগুলো এত্ত দুরন্ত। পেরে ওঠে না আর মৌ। খলবলে দুরন্ত এনার্জীর ভান্ডার কতগুলো। এত্ত কিউট…বছর চল্লিশ হতে চললো। কত দৌড়বে আর মৌ?…সকাল থেকে তেমন কিছু খায়নি। ইচ্ছেও করছিল না কিছু। মেন বিল্ডিং এর দিকে পা বাড়ালো মৌ। কিন্তু বেশি দূরে যাওয়ার আগেই পড়ে গেল ঘাসের উপর।

সুশীলা অনাথ আশ্রমালয়ের গেট দিয়ে ঢুকছিল গোপাল। হঠাৎ দেখল এক মহিলা মেন বিল্ডিং এর সামনের জমিটার উপর পড়ে আছেন উপুড় হয়ে। দৌড়ে এসে মহিলাকে সোজা করে গোপাল দেখল আরে এ তো মৌ। সেই বিয়ের রাতে শেষ দেখেছিল। প্রায় ১০ বছর… এ কী অবস্থা হয়েছে ওর? চেনা যাচ্ছে না। যাই হোক, আশ্রমের অন্যান্যদের ডেকে ধরাধরি করে টেনে তুলে নিয়ে গেল অফিস রুমে। মৌয়ের হাউস ফিজিশিয়ান কে ফোন করলেন অধ্যক্ষ। গোপাল হালকা হালকা জলের ছিটে দিতে থাকল মৌয়ের মুখে।
– ম্যাডাম, ম্যাডাম…ঠিক আছেন তো আপনি?
হালকা চোখ মেলে তাকালো মৌতমা। চোখ খুলেই প্রথমে দেখলো গোপালের উৎসুক মুখ। বাকীরাও বেশ ঘাবড়ে গিয়ে তাকিয়ে আছে মৌয়ের দিকে। একদম আগের মতোই আছে গোপাল। আস্তে আস্তে উঠে বসল মৌ।
– কী হয়েছিল আপনার ম্যাম? সকালে কিছু খেয়েছেন?
– জানি না কী হয়েছিল। বাচ্ছাগুলোর সাথে দৌড়চ্ছিলাম, খেলছিলাম। হঠাৎ মাথাটা…
এর মধ্যেই এসে গেলেন হাউস ফিজিশিয়ান। চেক করেই কয়েকটা টেস্ট লিখে দিল। কিছু মেডিসিনও দিলেন। গোপাল ডাক্তারের সাথে কথা বলে এসে বলল,
– চলুন ম্যাম। আপনার টেস্টগুলো করিয়ে আনি। ডাক্তারবাবু বললেন আপনাকে একা না ছাড়তে। এখানে সবাই ব্যস্ত বাচ্ছাদের নিয়ে। কোথায় থাকেন বলুন, আমি আপনাকে দিয়ে আসছি।
– আমার গাড়ি আছে, একাই চালিয়ে এসেছি।
– শরীরের এই অবস্হায় একা কি যেতে পারবেন? আমারও গাড়ি আছে। ওরা নয় পরে আপনার গাড়ি বাড়িতে পৌঁছে দেবে। চলুন।
মৌ আর না করল না। মৌকে ধরে ধরে গাড়ির পিছনের সিটে বসালো গোপাল। তারপর ড্যাশবোর্ড থেকে একটা বিস্কুটের প্যাকেট বের করে মৌকে দিয়ে বলল,
– ম্যাম, এটা খেয়ে নিন। জলের বোতল আপনার পিছনদিকে আছে। ডাক্তারবাবু বললেন কিছু না খেয়ে আছেন। টেস্টের আগে কিছু খাওয়া জরুরী।এখন প্রায় সকাল ১০টা। খেয়ে নিন।
মৌ বিনা বাক্যব্যায়ে বিস্কুট খেতে থাকল। গোপাল নিয়ে গেল কাছাকাছি একটা ভালো ডায়াগনোসিস সেন্টারে। মৌয়ের টেস্ট হয়ে গেলে গোপাল মৌকে বাড়িতে পৌঁছে দিল, মেডিসিন সহ। মৌ ভাবল গোপাল বোধ হয় চিনতে পারেনি তাকে। মৌ সাথে আজ বেশি টাকা নিয়ে যায়নি। গোপালই সব করেছে। মৌ বলেছে যে আজ ই এসে যাতে টাকাগুলো নিয়ে যায়, গোপাল শুধু হেসেছে। বোধ হয় এখন ড্রাইভারের চাকরী করে। বারবার ফোন আসছিল রাস্তায়। সেগুলো কেটে দিচ্ছিল গোপাল। আর যাই হোক গাড়িটা একটু দামিই, গোপালের পক্ষে কেনা…এছাড়া মৌকে পিছনে বসালো। ড্রাইভারই হবে।

পরদিন সকালে আবার আশ্রমে গেল মৌ। অধ্যক্ষ কে জিজ্ঞাসা করল,
– স্যার, কাল যে ভদ্রলোক এসেছিলেন ওনার ব্যাপারে একটু বলবেন?
– অফকোর্স ম্যাম। এই অনাথালয়টা আপনার ঠাকুমার নামে হতে পারে কিন্তু তাতে যে বছরের সবচেয়ে বড় ডোনেশান টা আসে সেটা উনিই দেন। সরকার ইন্ডাস্ট্রীর মালিক গোপাল সরকার। নিজে অনাথ বলে অনাথ বাচ্ছাদের প্রতি আলাদাই টান। প্রত্যেক সপ্তাহে একবার আসেন বাচ্ছাদের সাথে দেখা খরতে। দেখে কে বলবে যে উনি এত বড় একজন লোক। ওনার জার্নিটা জাস্ট স্বপ্নের মতো। অনেক কষ্ট করে আজ এই জায়গায় পৌঁছেছেন। অথচ খুব সাধারণ জীবনযাপন করেন। দেখলেনই তো। বাড়িঘর মধ্যবিত্তদের মতো। ইন্ডাস্ট্রীর বেশিরভাগ লভ্যাংশ কর্মচারীদের মধ্য বিলিয়ে দেন। আর এই অনাথ আশ্রমে। বিয়েও করেছেন এই আশ্রমেরই একজন কে। মেয়েটা বিধবা ছিল।

মৌয়ের মনে পড়ল ১০ বছর আগের সেই দিনটা। যেদিন জয় গোপালকে…গোপালের ঠিকানা আশ্রম থেকেই নিয়ে এসেছিল। ঠিক করল কাল সকাল সকালই দেখা করতে যাবে গোপালের সাথে।
——

গোপালের বাড়ির দরজায় নক করতেই একটা ছোটখাটো চেহারার সাধারণ বউ দরজা খুলল।
– আমি গোপালের সাথে দেখা করতে চাই। ওকে একটু ডেকে দেবেন? বলবেন মৌতমা এসেছে।
– আসুন ম্যাম। কী সৌভাগ্য। আপনিই দেবেশ রায়ের মেয়ে না? বসুন ম্যাম।
মৌতমা হলঘরে ঢুকে সোফায় বসে বেশ অবাক হল,
– আপনি আমার নাম কী করে জানলেন? বাবার নামই বা…
– সে অনেক কথা। নমস্কার। আমি শবনম, গোপালের বউ। গোপাল মর্নিং ওয়াকে গেছে,এক্ষুণি এসে পড়বে।
এবার বেশ চমকালো মৌ। নমস্কার প্রতি-নমস্কারের পালা শেষ করে মৌ জিজ্ঞাসা করল,
– তুমি আমাদের আশ্রমেই? তাই বোধ হয়। যাই হোক, ম্যাম নয়, দিদি বোলো কেমন?
– আচ্ছা দিদি। শুধু সেই জন্যেই না। গোপালও আপনার ব্যাপারে সব বলেছে আমাকে।
মৌয়ের মুখে অন্ধকার ঘনালো।
– নিশ্চই ভালো কিছু বলেনি।
– ও বলেছে যে ও আপনাকে ভালোবাসে।
এবার বেশ অবাক হলো মৌ। গোপাল এইসব নিজের বউকে বলতে পারল?চুপ করে থাকল মৌ।
– ও আপনাকে অনেক ছোটোবেলা থেকেই ভালোবাসত। কোনোদিন বলতে পারেনি। আপনি বড়লোকের মেয়ে। ও অনাথ। তাই আপনাকে শুধু দুর থেকে দেখেই ভালোবাসত। কোনোদিন কিছু চায়নি আপনার থেকে। কারণ জানত কিছু সম্ভব নয় আপনাদের মধ্যে। তারপর একদিন ভাবল যে বলবে। ও নিজেও তো একটা মানুষ। সেদিন আপনাদের সম্পর্ক ভাঙতে আপনাকে কিছু বলেনি। বিশ্বাস করুন। ও শুধু চেয়েছিল যে আপনি শুধু জানুন যে ও আপনাকে শুধু ভালোবাসে,পাশে থাকতে চায় সবসময়। কিন্তু আপনার বর, আর বন্ধুরা…
– জয়ের সাথে আমার আর সম্পর্ক নেই। বছর তিন আগে ডিভোর্স হয়ে গেছে।
– আমি খুব দুঃখিত দিদি।
– না না। ঠিক আছে। তারপর বলো যে গোপালের কী হলো?
– ওর আর কী হবে? চাকরীটা চলে গেল। একটা ক্যাটারিং এ কাজ জোটালো। একদিন একটা বিয়েবাড়ির কাজ করতে গিয়ে দেখল আপনাদের বিয়ে। সারারাত কাজ করেছিল ও। তারপর জমানো সব টাকাকড়ি নিয়ে ভোরের ট্রেন ধরে চলে গিয়েছিল ওড়িশায়। ওখানেই প্রথম ব্যবসা শুরু করে। তারপর আবার ফিরে আসে কয়েকবছর পর। আমি তখন বিবাহিত। গোপাল আমার বর রফিকের বন্ধু ছিল। তারপর একদিন রফিক মারা গেল। আমার শ্বশুরবাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিল। চলে এলাম আবার সেই আশ্রমে।আমি সন্তানসম্ভবা ছিলাম তখন। একদিন মরতে গিয়েছিলাম। গোপাল বাঁচিয়েছিল। তারপর আমাকে বাঁচাবার জন্য বিয়ের কথা বলে, দায়িত্ব নিতে চায় আমার, সাথে আপনার কথাও সব বলে। ও চায়নি যে আমার বাচ্ছা অনাথ হয়ে বড় হোক। আমি রফিক কে ভুলতে পারিনি সেইসময় আর না ও আপনাকে। তাই আমাদের মধ্যে শর্ত হয় যে আমরা সারাজীবন বন্ধু হিসেবেই কাটাবো। তারপর আমার বাচ্ছাটা আর… আমি খুবই ভেঙে পড়ি। ও আমাকে সামলায়। সেইদিনই বলে যে ও আমাকে ভালোবাসে। মন রাখতেই বলেছিল কথাটা। আজ বেঁচেও আছি শুধু ওর জন্য। কিন্তু এইরকম একটা মানুষের সাথে কী শুধু বন্ধু হয়ে বাঁচা যায় বলুন? ওকে দেখে ভালোবেসে ফেলি আস্তে আস্তে। ওকে ভালোবাসার পর মনে হয়, রফিক কে আমি ভালোবাসতাম ভাবতাম এটা কতটা ভুল ধারণা ছিল। বেশিরভাগ মানুষই প্রচুর ভুল ধারণা নিয়ে গোটা জীবন টা কাটিয়ে দেয়। অথচ বুঝতেও পারে না। গোপালের ভালোবাসা নিঃস্বার্থ, বড়ই পবিত্র। কোনোদিন আমাকে ধর্ম পাল্টাতে বলেনি। বিয়ের সাত বছর পরও আমাদের কোনোদিন শারীরিক সম্পর্ক হয়নি। ও রোজ রফিকের জন্য ফুলের মালা কিনে আনে নিজের হাতে। আমি যে রফিক কে ভালবাসি বলতাম তাতে কোনোদিন ওর কোনোভাবে অসুবিধা হয়নি। বিয়ের পর থেকে ও কখনও কিছু চায়নি আমার থেকে। অনাথ ছিল, তাই যে ওর একটু যত্ন নিত, ও তাকেই খুব ভালোবাসতো। যেমন আপনাকে। আজও বাসে। ও আমার জীবনের পরশপাথর, যাকে ছুঁলে লোহাও খাঁটি সোনা হয়ে যায়। কিন্তু আফশোস যে ওকে পেয়েও পেলাম না এই জন্মে। ও আপনাকে ভালোবাসে। কিন্তু যারা দুজন দুজন কে ভালোবাসে তাদের তো সাথে থাকা উচিত বলুন? আপনারা কি সাথে থাকতে পারেন না?

মৌয়ের মাথা আর কাজ করল না। তড়িঘড়ি করে বেরিয়ে গেল বাড়ি থেকে। কী বলল এইসব শবনম? কেন এত নার্ভাস লাগছে? বরাবর এইরকম ভালোবাসাই তো জীবনে চেয়ে এসেছিল সে। ভেবেছিল জয়ই সেই মানুষ। কিন্তু আফশোস। বিয়ের প্রথমদিকে সব ঠিকই ছিল। তারপর শুরু হল সমস্যা। বিবাহিত জীবনে আস্তে আস্তে জয়ের অন্যদিকগুলো আবিস্কার করতে থাকল মৌ। যে এত্ত কেয়ার করত তার একদিন, শারীরিকভাবে তৃপ্ত না হলে সেই কথা শোনাতে ছাড়ত না। কথায় কথায় সন্দেহ। মৌ কারোর সাথে ভয়ে কথা বলতে পারত না, জয়ের খারাপ লাগবে ভেবে। তারপর আস্তে আস্তে সন্দেহের মাত্রা বাড়ল। সন্দেহের সাথে বাড়ল ফোর্সফুলী সেক্স, সাথে একটাই কথা। তুমি শুধু আমার, আর কারোর নয়।যে কথাটা মৌয়ের প্রিয় ছিল, একসময় অসহ্য লাগত। আগে ভাবত যে ভালোবেসে করছে, পরে লাগত না। মৌয়ের যে শরীর আগে জয়ের কাছে আকর্ষণীয় ছিল সেটা আস্তে আস্তে ছিবড়েতে পরিণত হল। মৌ প্যাডি ব্রা পরত সেটা আবিস্কারের পর জয়ের অশ্রাব্য গালিগালাজ আজও মৌয়ের কানে বাজে। কি না করেছে মৌ, ব্রেস্ট ম্যাসাজ অয়েলের ব্যবহার থেকে শুরু করে সব কিছু করেছে নিজেকে আকর্ষণীয় করতে, তাতেও মন পায়নি জয়ের। চাকরী করত মৌ, বিয়ের আগে কোনো আপত্তি ছিল না জয়ের। বিয়ের পর বলল, কী দরকার? এত টাকা আছে…মৌ চাকরী ছাড়ল না। তাতে অশান্তি বাড়ল। মৌয়ের নিজের মাইনে অনাথ আশ্রমে দান করতে গেলে জয় বাঁধা দিত। বাড়ি থেকে চাপ এল বাচ্ছার জন্য। প্রবলেম ধরা পড়ল দুজনেরই। কিন্তু মূল্যহীন হয়ে গেল শুধু মৌ। কথা বলা তো দুর, আস্তে আস্তে জয় অন্য নারীসঙ্গে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। ধরা পড়লে সেদিন ক্ষমা চাইত জয়, সাথে ভালোবাসার প্রচুর কথা, আবার অনেক আদর। আবার সব ভুলে যেত মৌ। পরেরদিন আবার ধরা পড়ত জয়। অনেক মানিয়ে নিতে চেয়েছিল মৌ, পারেনি। এটাই ভাবত বারবার যে জয় কে ও ভালবাসে। জয় শুধু ওর। তারপর একদিন শুরু হল মারধর। মৌ সব সহ্য করত, বাইরে হাসিমুখে চালাতো নিখুঁত অভিনয়। সহ্যের সীমা সেইদিন ছাড়ালো যেদিন জয় কে নিজের বিছানায় অন্য মেয়ের সাথে দেখল। আর পারেনি। সেদিনই বাড়ি ফিরে এসেছিল। এখন তো জয় দিব্যি আছে আরেকটা বিয়ে করে। এই কয়েকবছরে মৌয়ের কী খোঁজ নিয়েছে একবারও? মৌও কী খোঁজ নিয়েছে? না। বোধ হয় দুইজনই দুজন কে পেতে চেয়েছিল। ভালোবাসা ছিল না। দুজন দুজন কে ছেড়ে বেশ ভালোই আছে। অথচ একটা সময় মনে হতো যে কেউ কাউকে ছাড়া বাঁচবে না। গোপাল সত্যিই বোধ হয় ভালোবেসেছিল। কিন্তু দেখবে কী করে? মৌয়ের চোখে যে তখন মিথ্যে ভালবাসার পর্দা। আফশোস… আচ্ছা, এখনো কী গোপাল ওকেই ভালোবাসে? গোপালের কথা শুনে তো…বুকের গভীরে এক চিনচিনে ব্যাথা অনুভূত হল মৌয়ের।
আস্তে আস্তে মৌ পার্কের দিকটায় এসে পার্কিং করল গাড়ি। একটু বসলে বোধ হয় উত্তেজনা টা একটু কমবে।

——-

পার্কে বন্ধুদের সাথে জগিং করতে করতে গোপালের নজর গেল পার্কের বেঞ্চের উপর। আরে ওটা মৌতমা ম্যাম না? গোপাল কাছে এসে জিজ্ঞাসা করল,
– এখন কেমন আছেন ম্যাম? রিপোর্ট তো সব ঠিক আসার কথা। আমি আগেই ডায়াগনোসিস সেন্টারে জিজ্ঞাসা করে নিয়েছিলাম।
– ঠিক আছি। আচ্ছা তুমি সবসময় ম্যাম কেন বলো? নাম ধরে ডাকতে পারো না? আর সেদিন কেন আমাকে ড্রাইভারের পাশের সিটে বসালে না?
গোপাল মৌয়ের পাশে বসল দূরত্ব রেখে।
– সারাজীবন ম্যাম বলেই ডেকে এসেছি। কোনোদিন তো নাম ধরে ডাকতে বলেন নি আপনি। বললে হয়তো ডাকতাম। আর সারাজীবন আর কোনো সম্পর্ক থাকুক না থাকুক আমরা মালিক-ভৃত্যের সম্পর্কে থেকেছি। আপনাকে পাশে কী করে বসাবো বলুন?
– আজ থেকে আমরা বন্ধু। নাম ধরেই ডেকো, আর আপনি বলবে না। আমার মতো তুমি বলবে। কেমন?
গোপাল হাসল।
– আচ্ছা ঠিক আছে। তাই হবে।
– আমরা বন্ধু হলাম। কিছু জানতে চাইলে বলবে?
– বলো কী জানতে চাও?
– তোমার বাড়িতে গিয়েছিলাম। তোমার বউয়ের থেকে সব শুনলাম। তোমাদের জীবন, তোমাদের শর্ত, সবকিছু। তোমার বউ চায় আমরা একসাথে থাকি। তুমি কি আজও আমাকে ভালোবাসো?
– হ্যাঁ মৌতমা। আমি তোমাকে ভালবাসি এটা একদম সত্যি। শবনম কে যা বলেছি তার সবকটা কথা সত্যি। কিন্তু এটাও সত্যি যে আমি শবনম কে খুব বেশি ভালোবাসি। তুমি আমার প্রথম ভালোবাসা। অস্বীকার করার উপায় নেই। যেদিন তোমার বিয়ে হল কষ্ট পাইনি বললে ভুল হবে। কিন্তু এটাও বুঝেছিলাম যে আমার সেই ভালোবাসার আর তোমার কোনোদিন দরকার হবে না। অন্যের স্ত্রীকে সেই নজরে দেখাটাও অন্যায় হত। কিন্তু তোমাকে ভালোবাসতে ছাড়িনি। ভালবাসি তো আজও, কিন্তু বন্ধু হিসেবে। তোমাকে তো বলেছিলাম প্রথমেই কোনোদিন বিপদে পড়লে আর কাউকে না পাও আমাকে পাবে। আজও সেটা ভাবি, ভবিষ্যতে সেটা প্রমাণ করার সুযোগ পেলে আমি খুশিই হব। শবনম কে বিয়ে করি, তারপর কবে যে ভালোবেসে ফেলেছি নিজেও জানিনা। ও রফিক কে ভালোবেসে খুশি, আর আমি ওকে।
মৌয়ের মনে হল বুকের ভিতরটা কেউ ছুরি দিয়ে কেটে ফালা ফালা করছে। চোখের জল সামলে নিয়ে হেসে বলল।
– শবনম ও তোমাকেই ভালোবাসে। আর ভাবে যে তুমি আমাকে ভালবাসো। কী বলতো তোমরা? একসাথে থেকে কথা বলে নিতে পারো না কেন? এক ছাদের তলায় থাকো অথচ….তুমি একবার সম্ভবত ওকে বলেছিলে কিন্তু ও ভেবেছিল যে তুমি ওর মন রাখতে বলেছো।
– সত্যি বলছো? হ্যাঁ বলেছিলাম একবার। তারপর ও কিছু বলেনি দেখে ভেবেছি যে ও রফিককেই ভালোবাসে।
– তোমরা সত্যিই পাগল, ভালোবাসায়। ভগবান করুক তোমরা খুব সুখী থাকো। যাও তাড়াতাড়ি বাড়ি। সব কথা বলে মিটিয়ে নাও।
গোপাল হাসিমুখে মৌয়ের হাত দুটো টেনে নিয়ে বলল অসংখ্য ধন্যবাদ।
– ধন্যবাদ দিতে নেই বন্ধুদের। একদিন আমার বাড়িতে এসো দুজনে।
গোপাল বাড়ির দিকে হাঁটতে হাঁটতে বলল, অবশ্যই।
গোপাল যাওয়ার পর মৌতমার চোখের জল আর বাঁধ মানল না। আজ নিজেকে খুব বেশিই হালকা লাগছে। ভালবাসার মানুষকে মন থেকে খুশি দেখলে যে কতটা ভালো লাগে আজ বুঝতে পারছে। নাই বা হল সে নিজের একান্ত আপন। গোপালও তো একদিন তাকে ছেড়েছিল এইভাবে। কিন্তু আফশোষ এটাই যে যেদিন ভালোবাসার মানে বুঝল সেদিনই নিজের ভালোবাসাকে ছেড়ে দিতে হল। সত্যি, শবনম ঠিকই বলেছিল। মানুষ অনেকসময় অনেক জিনিসকে ভালোবাসা ভেবে ভুল করে ফেলে, যেমন জয়ের ক্ষেত্রে হয়েছিল। আজ যেটা মৌ অনুভব করছে গোপালের জন্য সেটা এ জীবনে আর কারোর জন্য হয়নি কখনও। এটাকে সে আমৃত্যু লালন করতে চায়,স্ব-ইচ্ছায়।নাই বা জানল কেউ। কী আসে যায়? এর থেকে সঠিক বোধ হয় আর কিছুই নেই। নিজের কষ্টের থেকে আজ মৌ বেশি খুশি গোপালের জন্য। ভগবান দিয়েও দেখেন, আবার নিয়েও নেন। আজ এত সম্পদ থেকেও শবনমের কাছে সে গরীব। হ্যাঁ, দেবেশ রায়ের মেয়ে আজ সত্যিই গরীব। গোপাল সত্যিই পরশপাথর। গোপাল এতকিছুর পরেও যে তার বন্ধুত্ব স্বীকার করেছে এটাই জীবনের পরম পাওয়া।

——-

প্রায় দৌড়তে দৌড়তে ঘরে ঢুকল গোপাল। শবনম ঘরের টুকিটাকি কাজ করছিল। দেখে তাড়াতাড়ি কাছে এসে বলল,
– এভাবে দৌড়াচ্ছো কেন? দাঁড়াও জল আনি।
শবনম জল আনার জন্য পিছন ঘুরলে গোপাল শবনমের হাত ধরল।
– দাঁড়াও। তুমি মৌতমাকে কেন বলেছো যে আমাদের একসাথে থাকা উচিত?
ঘুরে দাঁড়িয়ে শবনম হেসে বলল,
– তুমি ওকে ভালোবাসো। ওর ডিভোর্সও হয়ে গেছে। একটা মেয়ে সারাজীবন ভালোবাসা খোঁজে। তুমি যেমন ভালোবাসো ওকে, সেইরকম ভালোবাসা। তোমরা ভাল থাকবে তাই বলেছি।
– আর তোমার কী হবে?
– আমার আর কী হবে? এমন এখন আছি তেমন পরেও থাকব।
– আমি তোমাকে সত্যিই ভালোবাসি। বলেছিলাম একবার, কিন্তু আমার কপালের দোষ যে তুমি সেটাকে করুণা ভাবলে। আমার প্রথম ভালোবাসা মৌ, এটা সত্যি। এটা কে আমি সম্মান করি। তাই তোমাকে বিয়ের আগেই বলেছিলাম। আর তুমি রফিককেও তো ভালোবাসতে, স্বামীকে ভালোবাসা খুবই স্বাভাবিক। অন্তত বিয়ের আগে সেই মুহূর্তে কথাগুলো তো সত্যি ছিল। আমি সেগুলোকে, সেই মুহূর্তগুলোকে সম্মান করি। তাই বলে একবারও বলবে না যে এখন আমাকে তুমি ভালোবাসো?
– বলতে সাহস হয়নি যদি ভুল বোঝো আমাকে। আর আমি সত্যিই ভাবতাম যে ম্যাম কে ভালোবাসো। তোমরা ভাল থাকবে ভেবে সবটা বলেছিলাম। আমি তো অনাথ। ছোটো থেকে কেউ বেশি ভালোবাসে নি। বিয়ের পর রফিক অল্প যত্ন করত, সেটাকেই ভালোবাসা ভাবতাম। তুমি জীবনে না এলে বুঝতামই না যে ভালোবাসা কী?
– আর যদি আমি মৌতমার সাথে চলে যেতাম? কী হত তাহলে?
– তাহলে আমি তোমাদের জন্য খুশি হতাম। আল্লার কাছে প্রার্থনা করতাম যাতে তোমরা সুখী হও।
গোপাল শবনমের চিবুক হাত দিয়ে তুলে ধরল নিজের দিকে। দেখল শবনমের চোখের কোনে একফোঁটা জল চিকচিক করছে। এই জল গোপালের বড্ড চেনা। শবনম গোপাল কে জড়িয়ে ধরল প্রথমবার।
গোপাল শবনমের কপালে চুমু এঁকে দিয়ে বলল, “আমি শুধু তোমার, তোমারই।”

(সমাপ্ত)

[কেমন লাগল কমেন্ট করে অবশ্যই জানাবেন]


    Tamali Chakraborty

    Author: Tamali Chakraborty

    Moody, foody, creative, traveller, adventurous, passionate about writing....etc etc

    2
    Comments

    Please Login to comment
    2 Comment authors
    Tamali ChakrabortyAnkur Krishna Chowdhury Recent comment authors
    newest oldest most voted
    Ankur Krishna Chowdhury
    Member

    খুব সুন্দর