পরিশোধ স্পৃহা -তুষার চক্রবর্তী

   সুমনা সোফায় বসে ফোনের অপেক্ষা করছে। বেশ অধৈর্য্য লাগছে। সময় যেন কাটছে না। চিন্তাও হচ্ছে। পল্লবের ছেলেরা কি ঠিকঠাক কাজটা করে উঠতে পারলো না! এতো দেরি হওয়ার তো কথা নয়! পুরো প্ল্যানটা তো সুমনার সামনেই পল্লব তার ছেলেদের ছকে দিয়েছে। ভাবতে ভাবতেই, সোফায় রাখা সুমনার সেল ফোনটা বেজে উঠলো। সুমনা ফোনটা কানে নিতেই ওপাশ থেকে পল্লবের আওয়াজ ভেসে এলো, ‘সুমনা! কাজ হয়ে গেছে। তুমি এবার শুয়ে পড়।’

সুমনা স্বস্তির একটা নিশ্বাস নিল। মনে মনে ভাবলো একটা আপদ বিদায় হলো। সুমনা সোফা থেকে উঠে ডাইনিং হলে এসে, ডাইনিং টেবিলের চেয়ার টেনে বসলো। টেবিলে খাবার ঢেকে রেখে মনুর মা চলে গেছে সেই সাড়ে আটটায়। সুমনা ঘড়ির দিকে তাকালো। রাত দশটা। সুমনা বুঝলো যে খাবার গুলো সব ঠান্ডা হয়ে গেছে। কিন্তু কিছু করার নেই। সেই দুপুরের পর আর কিছু খাওয়া হয়নি। খুব খিদে পেয়েছে। কোনোক্রমে ওই ঠান্ডা খাওয়ার গুলো খেয়ে নিয়ে, থালা, বাটি, গ্লাসগুলো রান্নাঘরের বেসিনে রেখে দিয়ে স্নান করতে ঢুকলো। স্নান সেরে নাইট গাউনটা পরে শোয়ার ঘরে এসে, বিছানায় গাটা এলিয়ে দিল। কিন্তু ঘুম কিছুতেই এলো না। মাথায় ঘুরতে থাকলো সব পুরোনো দিনের ঘটনা।

সুমনা তখন ক্লাস নাইনে পড়ে। একদিন রাত্রে হটাৎ করে চেঁচামেচিতে ঘুম ভেঙ্গে গেল। বিছানা ছেড়ে রাস্তার দিকের বারান্দায় এসে দেখলো, বাড়ির সামনের রাস্তায় অসংখ্য পুলিশ দাঁড়িয়ে আছে। তিন চারটে পুলিশের জিপ, একটা পুলিশের ভ্যান দাঁড়িয়ে আছে। সুমনা অবাক হয়ে দেখলো, পুলিশ তার বাবাকে হাতকড়ি পরিয়ে পুলিশের ভ্যানে তুলে নিয়ে গেল। নীচে বাইরের গেটে সুমনার মা স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।
সুমনা এক দৌড়ে নীচে নেমে মাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ওঠে বলেছিল,’ মা, বাবাকে পুলিশ কেন ধরে নিয়ে গেল?’ সুমনার মা সুমনাকে টেনে দরজার ভেতরে ঢুকিয়ে দরজাটা বন্ধ করে ভেতরে এসে বললো,’ধরে নিয়ে গেছে, আবার ছেড়েও দেবে। এই নিয়ে তোকে মাথা ঘামাতে হবে না। যা নিজের ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়।’ সুমনা আর কথা বাড়ায়নি। সে কিছুই বুঝলো না। সে ভাবতে থাকলো, তার বাবা কি কোনো খারাপ কাজ করেছে! পুলিশ কেন তার বাবাকে ধরে নিয়ে গেল! সারা রাত সুমনা ঘুমোতে পারেনি।
মা না বললেও, সুমনা ধীরে ধীরে সবই জেনে গিয়েছিল। এতদিন খেয়াল করেনি, কিন্তু বাবাকে পুলিশে ধরে নিয়ে যাওয়ার পর সুমনার খেয়াল পড়লো যে সে না জানলেও, পাড়ার লোকেরা, এমনকি তার স্কুলের বন্ধুরাও জানে যে তার বাবা, অসীম বসু, একজন কুখ্যাত মাফিয়া ডন। তার বাবাকে সবাই ভয় পায়।

এরপর সাত বছর কেটে গেছে। সুমনার বাবা তখনও জেলে। সুমনা এও শুনেছে যে তার বাবা সহজে জেল থেকে ছাড়া পাবে না। তার বাবা নাকি টাডা আইনে এরেস্ট হয়েছিল। আজ সাত বছর হয়ে গেল, সুমনা কারো সাথেই কথা বলে না। প্রথম দিকে স্কুলে, তাও দু একজন বন্ধুর সাথে কথা বলতো। কিন্তু কলেজে সুমনা কারো সাথেই কথা বলতো না। উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে, সুমনা কলকাতা ছেড়ে চলে গিয়েছিল দেরাদুনে। সেখানকার কলেজে হোস্টেল থেকে পড়তো। সেখানে সুমনার বাবার কথা কেউ জানতো না। তবুও সুমনা কোনও বন্ধু বান্ধবদের সাথে মেলামেশা করতো না। শুধু পড়াশোনা নিয়ে থাকতো। সে এটাও বুঝে গিয়েছিল যে বাবা জেলে থাকলেও তাদের পয়সা করির কোনো অভাব ছিল না। কলকাতার বুকে তার বাবা যে চার পাঁচটা হাউসিং কমপ্লেক্স বানিয়ে ছিল, তাতে প্রায় বাবার নিজের আর মার নামে ছ সাতটা ফ্ল্যাট ছিল। তার ভাড়ার টাকায় তাদের বেশ চলে যেত। এছাড়াও সুমনা দেখতো মাসের দু তিন তারিখে বাবার এক বন্ধু এসে মার হাতে কিছু টাকা দিয়ে যেত।
দেরাদুন থেকে পড়াশোনার পাঠ চুকিয়ে সুমনা আবার কলকাতায় ফিরে এলো। তার প্রথম উদ্দেশ্য ছিল একবার জেলে গিয়ে বাবার সাথে দেখা করা। সুমনা একবারই বাবার সাথে দেখা করতে গিয়েছিল। তখন তার বাবা সবে জেলে গেছে। সুমনার বাবার করুণ মুখটা আজও চোখের সামনে ভাসে। গরাদের ভেতর থেকে হাত বাড়িয়ে, সুমনার দুটো হাত ধরে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েছিল। বলেছিল,’ আমাকে ওরা ফাঁসিয়ে দিলো। আমার অফিসে ওরা স্টেনগান, রাইফেল, রিভলবার রেখে দিয়ে পুলিশকে ফোন করে দিয়েছিল। আসলে ওরা উগ্রপন্থী কার্যকলাপে মদত দিত। প্রতি মাসে আমাকে ভয় দেখিয়ে অনেক টাকা নিয়ে যেত। আমাকে জেলে পাঠিয়ে, ওরা আমার ব্যবসাটার দখল নিতে চাইছে। ছোট্টু আর টুকাই সব জানে। ওরা বাধা দিয়েছিল। কিন্তু ওরা দুজন একা পড়ে গেছে। ওরা ভয়ে কেউ মুখ খুলছে না। এমন আইনে আমাকে ফাঁসিয়েছে যে আমি সহজে ছাড়া পাবো না।’ সুমনা বাবাকে বলেছিল,’ওরা না পারলেও, এর প্রতিশোধ আমি নেব।’

দেরাদুন থেকে ফিরেই সুমনা ছোট্টু আর টুকাই কাকুর সাথে যোগাযোগ করে। ছোট্টু আর টুকাই কাকু ইতিমধ্যেই তাদের সামান্য পুঁজি নিয়ে বিল্ডিং মেটেরিয়ালস এর ব্যবসা খুলে নিয়েছে। ছোট্টু কাকু, রড আর হার্ডওয়ারের ব্যবসা করে। টুকাই কাকু সিমেন্টের ডিলার।
সুমনা বাবার অফিস খুলে নিজেই বাবার ব্যবসাটা আবার নতুন করে শুরু করে। তবে ব্যবসায়ে টুকাইকাকু আর ছোট্টু কাকুকে পার্টনার হিসাবে নেয়। ইতিমধ্যে সুমনা টুকাই কাকু আর ছোট্টু কাকুর কাছ থেকে জেনে নেয় তার বাবাকে যারা ফাঁসিয়ে ছিল, তাদের নাম, ঠিকানা, তারা কি করছেন, তার সমস্ত খবরা খবর।

সুমনা বসে আছে এডভোকেট শীলভদ্র মিত্রের চেম্বারে। পাশে বসে আছে ছোট্টু কাকু আর টুকাই কাকু। শীলভদ্র মিত্র হাইকোর্টের জাঁদরেল উকিল। একদিনের ফিস তার বিশ হাজার টাকা। টুকাই কাকু কি ভাবে সুমনার বাবাকে ফাঁসানো হয়েছিল, সেই ঘটনা বিস্তারিত ভাবে শীলভদ্র মিত্রকে বললেন। সব শুনে শীলভদ্র মিত্র বললেন,’ আমাকে কেস রিওপনেনিং জন্য আপিল করতে হবে। সেক্ষেত্রে যথেষ্ট প্রমাণ দিয়ে আপিল করতে হবে। আপনাদের দুজনের বক্তব্য জানিয়ে একটা করে এফিডেভিট ফাইল করতে হবে। ইতিমধ্যে আমি তোমার বাবার সাথে দেখা করে তার কথা বার্তাও শুনে নিচ্ছি।
তিন বছর আরও কেটে গেল। শীলভদ্র মিত্র সুমনার বাবাকে জেল থেকে ছাড়িয়ে আনতে সক্ষম হলেন। চক্রান্তে সামিল পাঁচজনের মধ্যে তিন জনের জেল হলেও, মূল ষড়যন্ত্রকারী পল্টু বিশ্বাস আর বীরেন দাস উপযুক্ত প্রমাণের অভাবে নির্দোষ সাব্যস্ত হয়। বাবা নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে ঘরে ফিরলে সুমনা খুশি হলেও, শান্তি পেল না। সুমনা ইতিমধ্যেই জেনে গেছে যে মূল ষড়যন্ত্রকারী পল্টু বিশ্বাস আর বীরেন দাস। সুমনা মনে মনে সিদ্ধান্ত নিল, আইন শাস্তি দিতে না পারলেও, সে শাস্তি দেবে। প্রয়োজনে নিজের হাতে সে আইন তুলে নেবে।

গত তিন বছর ধরে সুমনা তার বাবার ব্যবসা চালাচ্ছে। চালাচ্ছে বললে ভুল হবে, বাবার ব্যবসার পরিধিও অনেক বাড়িয়ে ফেলেছে। জেল থেকে বাবা ছাড়া পেলেও, বাবাকে আর ব্যবসায়ে জড়াতে দেয়নি। দশ বছর জেলে থেকে তার শরীর অনেকটাই ভেঙ্গে পড়েছিল। বড় ডাক্তারের পরামর্শ মতো, বাবা, মাকে ঋষিকেশে পাঠিয়ে দেয় পাঁকাপাকিভাবে। সেখানে সুমনা একটা ছোট্ট বাড়ি কিনে, সর্বক্ষণের একটা লোক রেখে দেয় বাবা, মাকে দেখাশোনা করার জন্য। প্রতি মাসের শেষ সপ্তাহে, সুমনা গিয়ে তিন চার দিন মা, বাবার সাথে কাটিয়ে আসতো। সুমনা পুরোনো বাড়ি বিক্রি করে পিকনিক গার্ডেন এলাকায়, তার বাবার তৈরি ফ্লাট বাড়ির একটা ফ্ল্যাটে নিজে থাকতে শুরু করলো। নিজেদের পুরোনো বাড়িটাকে একটা কোম্পানিকে ভাড়া দিয়ে দিল গেস্ট হাউস হিসাবে।

সুমনার বাবা যে ব্যবসা করতো, সেটা ছিল ডেভালপারের ব্যবসা। জমি কিনে বড় মাপের ফ্ল্যাট বাড়ি বানানো। এই ধরণের ব্যবসা করতে গিয়ে সুমনাও সমাজের অন্ধকার জগতের সাথে পরিচিত হলো। এই অন্ধকার জগতের একজন পল্লব ঘোষাল। মাত্র ত্রিশ বত্রিশ বছর বয়সেই সে শুধু এলাকারই ডন নয়, তার অন্ধকার জগতের পরিধি বাংলার বাইরে ঝাড়খন্ড, বিহার, উত্তর প্রদেশ পর্যন্ত ছড়ানো। এই পল্লব ঘোষালের সাথে সুমনার পরিচয় ব্যবসার শুরুতেই।

ব্যবসার শুরুতেই সুমনা জয়নগরে একটা ফ্ল্যাট তৈরির কাজ হাতে নেয়। জমিটা তার বাবা বহুদিন আগেই কিনে রেখেছিল। কাজ শুরু করতেই কিছু ছেলের বাধা এলো। সুমনা নিজে খোঁজ নিয়ে জানতে পারলো যে ছেলেগুলো একটা মাফিয়া গ্রূপের সাথে যুক্ত। সুমনা নিজেই যোগাযোগ করে সেই মাফিয়া গ্রূপের লিডার পল্লব ঘোষালের সাথে।

রাত আটটা বাজে। পার্কস্ট্রিটের একটা রেস্তোরাঁ। মুখোমুখি বসে আছে সুমনা আর পল্লব ঘোষাল। সুমনা নিজের বিস্তারিত পরিচয় দেওয়ার পর, পল্লব ঘোষাল জিজ্ঞেস করলো,’আমার মতো একটা ছেলের সাথে এরকম রাত্রে একটা রেস্তোরাঁয় দেখা করতে এলেন। আপনার ভয় করলো না?’ সুমনা মৃদু হেসে বললো, ‘ কেন, ভয় করবে কেন? আপনি বাঘ না ভাল্লুক? তাছাড়া যে ধরণের ব্যবসা আমি করছি, তাতে আপনার মত ছেলেদের ভয় পেলে আমার ব্যবসাতো চলবে না।’ সুমনার কথা শুনে পল্লব ঘোষাল হাসলেও, তার চোখে ফুটে উঠেছিল বিস্ময়। সেটা সুমনার চোখ এড়িয়ে যায়নি। পল্লব ঘোষাল এবার কাজের কথায় এলো। বললো,’ বলুন, আপনি আমার সাথে দেখা করতে চেয়েছেন কেন?’ ইতিমধ্যে ওয়েটার চা রেখে গিয়েছিল। সুমনা চা খায়না। তাও পল্লব ঘোষালের অনুরোধে চা খেতে রাজি হয়েছে। সুমনা চায়ে একটা চুমুক দিয়ে সরাসরি বললো,’ আমি আমার ব্যবসায়ে আপনাকে পার্টনার হিসাবে পেতে চাই। আমি সব কিছু করবো। কিন্তু জমি কেনা এবং তার দখল নেওয়া সংক্রান্ত যে সমস্ত ঝামেলা হয়, সেগুলো আপনি দেখবেন। এক একটা প্রজেক্টে যা লাভ হবে, তার চল্লিশ ভাগ আপনি পাবেন। প্রত্যেক প্রজেক্টের আগে আমরা দুজনে এই বিষয়ে একটা এগ্রিমেন্ট করে নেব।’ সুমনার কথা শুনে, পল্লব ঘোষাল অবাক চোখে সুমনার দিকে তাকিয়ে রইলো। তারপর বেশ সময় নিয়ে রেস্তোরাঁর সিলিংয়ের তাকিয়ে রইলো। শেষে হাতটা সুমনার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো,’ডান!’

সকাল সাড়ে দশটা বাজে। সুমনার অফিসে সুমনার সামনে টুকাই কাকু আর ছোট্টু কাকু বসে আছে। কিছু ব্যবসার প্রয়োজনীয় কথা বার্তার শেষে, ছোট্টু কাকু সুমনাকে বললো,’ তুই বড় হয়েছিস। আমাদের থেকে অনেক বেশি লেখাপড়া করেছিস। তুই সব কিছুই আমাদের থেকে বেশি বুঝিস। তাও বলছি। অসীমদা যে ভুল করেছিল, পল্লবকে ব্যবসায়ে নিয়ে, তুই সেই ভুলই করলি না তো? একটা কথা তোকে বলছি, পল্লবের বাবার নাম বিপ্লব ঘোষাল। সেই বিপ্লব ঘোষালও, ছিল মাফিয়া। তোর বাবার কাজে বাধা দিয়ে ভয় দেখিয়ে কত লক্ষ লক্ষ টাকা নিয়ে যেত।’ সুমনা শুনে নিজের আসল উদ্দেশ্যের কথা না বলে শুধু বললো,’ তোমরা ভয় পেওনা। শুধু জেনে রেখো, বাবা, ওদের বিশ্বাস করত, কিন্তু আমি এই সব লোককে বিশ্বাস করি না। এদের আমি শুধুমাত্র কাজের স্বার্থে নিয়েছি।’ সুমনার কথা শুনে টুকাই কাকু বললেন,’ হ্যাঁ, তুই ঠিক বলেছিস। এই সব ছেলেদের সাবধানে হ্যান্ডেল করিস। একটু দূরে দূরে রাখিস। তাহলেই হবে।’

সুমনা কিন্তু পল্লব ঘোষালকে দূরে দূরে রাখেনি। বরঞ্চ যত দিন গেছে, ততই সুমনা আর পল্লব ঘোষালের ঘনিষ্টতা বেড়েছে। সুমনার কাছে পল্লব বাবু, পল্লব হয়ে গেছে। পল্লব ঘোষালের কাছে, সুমনা ম্যাডাম, সুমনা হয়ে গেছে। একে অপরকে আর আপনি বলে না, বলে তুমি।
যেদিন কোর্টের রায় বেরিয়েছিল, সেদিন সুমনার একটুও আনন্দ হয়নি। বাবাকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে, সন্ধ্যের পর পার্কস্ট্রিটের রেঁস্তোরাতে এসে বসলো।কিছুক্ষণের মধ্যেই পল্লব এলো। কাজ শেষে সন্ধ্যের পর রোজই সুমনা আর পল্লব এই রেস্টুরেন্টে এসে চা খেত। ঘন্টাখানেক গল্প করে রাত নটা নাগাদ যে যার বাড়ি চলে যেত। পল্লব এসে সুমনার মুখের দিকে তাকিয়ে বললো,’ কি ব্যাপার! আজ এত খুশির দিন! আর তুমি এরকম গোমড়া মুখে বসে আছো।’ সুমনা উত্তর দেয় না। উদাস চোখে রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকে। পল্লব অধৈর্য্য হয়ে পড়ে। বলে ওঠে,’ কি হলো, বলবে তো?’ সুমনা শেষে হতাশ গলায় বললো,’ আসল কালপ্রিটতো ছাড়া পেয়ে গেল।’ পল্লব হাসতে হাসতে বললো,’ ও আচ্ছা! এই ব্যাপার! ঠিক আছে, মাস চারেক আমাকে সময় দাও। পল্টু বিশ্বাস আর বীরেন দাসকে আমি ঠিকানায় লাগিয়ে দিচ্ছি।’ সুমনা, পল্লবের হাত দুটো ধরে বললো,’ পারবে? তুমি পারবে? ওই দুটো মানুষ যত দিন বেঁচে থাকবে, ততদিন আমার শান্তি নেই।’ পল্লব সুমনার হাত ধরা অবস্থায় বললো,’ নিশ্চিন্ত থাকো। কাজ হয়ে যাবে।’
পল্লব চারমাস সময় নেয়নি। আজ ঠিক তিন মাস তিন দিন। আজ পল্লব, বীরেন দাস আর পল্টু বিশ্বাসকে পৃথিবী থেকে মুছে দিল। এবার পল্লবের কি ব্যবস্থা করা যায়! ভাবতে ভাবতে সুমনা ঘুমিয়ে পড়লো।

ডায়মন্ড হাড়বারে গঙ্গার পাড়ে একটা শতরঞ্চি বিছিয়ে বসে আছে পল্লব আর সুমনা। পাশেই দাঁড় করানো সুমনার সাদা ইনোভা। আজ আর সুমনা পল্লবের গাড়িতে আসেনি। নিজের গাড়িতে পল্লবকে নিয়ে এসেছে। সুমনা নিজেই গাড়ি ড্রাইভ করে পল্লবকে নিয়ে এসেছে। প্রায়ই পল্লব আর সুমনা বিকেলের দিকে এখানে আসে। ওরা দুজন ছাড়া এই ডায়মন্ড হাড়বার আসার ব্যাপারটা কেউ জানে না। যখনই আসে, সুমনা বাড়ি থেকে চা বানিয়ে আনে।
তখন প্রায় সন্ধ্যে হয় হয়। দুজনে চা খাচ্ছে। পল্লবের রিভলবারটা দুজনের মাঝখানে পড়ে আছে। পল্লব যখনই মাটিতে পা ছড়িয়ে বসে, কোমর থেকে রিভলবারটা বার করে পাশে রাখে। ওটা কোমরে থাকলে, পল্লবের পা ছড়িয়ে বসতে বোধহয় অসুবিধা হয়। এর আগেও সুমনা দেখেছে পল্লবকে এরকম রিভলবারটা কোমর থেকে বার করে পাশে রাখতে। সুমনা রিভলবারটা হাতে নিয়ে। নাড়াচারা করতে লাগলো। এর আগেও সুমনা এরকম ওটা হাতে নিয়ে নাড়াচারা করেছে। পল্লব চায়ে চুমুক দিয়ে সুমনাকে বললো,’এবার চলো একদিন ঋষিকেশ যাওয়া যাক। তোমার বাবা, মায়ের কাছ থেকে বিয়ের অনুমতি…..’ পল্লবের কথা শেষ হলো না। সুমনার হাতের রিভলবারটা দু দু বার গর্জে উঠলো। দুটো বুলেট সোজা বিধে গেল পল্লবের বুকে। পল্লব আওয়াজ করার সুযোগও পেলো না। সুমনা উঠে দাঁড়িয়ে পড়লো। এগিয়ে গেলো গঙ্গার আরও কাছে। রিভলবারটা ছুড়ে দিল গঙ্গার জলে। সুমনা ইনোভা স্টার্ট করলো।

….. শেষ…..


FavoriteLoading Add to library

Up next

জন্ম শতবর্ষে সত্য চৌধুরী – শ্রদ্ধাঞ্জলি R... "তখনো ভাঙেনি তখনো ভাঙেনি প্রেমেরও স্বপনখানি। আমারও এ বুকে ছিল প্রিয়া, ছিল রাণী। আজ যত দূরে চায় আসে শুধু এক ক্ষুধিত জনতা প্রেম নাই, প্রিয়া নাই...
ওরা বেঁচে আছে – বিক্রম মন্ডল... সাড়ে তিন হাতের চেয়ে কম কিছুটা জায়গা, মস্তিষ্কের সঙ্গে সংযুক্ত দুটো চোখ, আপোষহীন কিছু মন্তব্য - আজ ঐ নদীর চড়ায় বিপ্লব আর রক্তের সম্পর্ক খুঁজতে গিয...
আবর্ত – সৈকত মন্ডল... যারা ভাঙাচোরা অতীত থেকে উঠে আসে, হটাৎ পেয়ে যাওয়া উষ্ণতার স্রোতে ভেসে, বোধ হয় তারাই জানে স্বপ্নভাঙ্গার আঘাত টা, বোঝে, মুহূর্তে নিঃস্ব হাওয়ার আকস...
পাখি পাঁচালী – সৌম্য ভৌমিক... পাতি কাকটা তক্কে আছে কখন বেরোবে চড়াই, দোয়েল রানী শিস দিয়ে যায় না করে বড়াই। টেলিগ্রাফের তারে বসে ফিঙেটা লেজ নাড়ে, শুনতে পেলাম ঝগড়া করে তিনটে ছ...
Google এর উৎপত্তি - দিব্যেন্দু গাঙ্গুলী   বর্তমানে সর্বাধিক ব্যবহৃত ও সবচেয়ে জনপ্রিয় আন্তর্জাতিক ও‍‌‌‍য়েবসাইটটি হল ‘www.google.com’। এটি তৈরি হয়েছিল ১৯৯৬ সাল...
সামলে রাখো জোছনাকে …..... "---সামলে রাখো জোছনাকে" "ও চাঁদ, সামলে রাখো জোছনাকে ", ওই জোছনা তোমার কেন আবার, আমায় পিছন থেকে ডাকে।। জোছনার ফাঁদে পা দিলেই যাবো সর্বনাশের ফাঁকে, ঝ...
বদনামের ফাঁদে – তুষার চক্রবর্তী... সুচিত্রার আজ পনের দিন হয়ে গেল চোখে ঘুম নেই। সারা রাত একা নিজের ঘরের বিছানায় এপাশ ওপাশ করেছে। রোজই দু তিনবার উঠে জল খেয়েছে, একবার বাথরুমে গেছে। এখন আয়ন...
মেট্রো ঘটনার কয়েক মিনিট পরে... - অর্পণ দাস(অন্তিম)   উজ্জ্বল বাবু মুখে কীসব বিড় বিড় করতে করতে মেট্রো স্টেশন দিয়ে বেরোলেন। সিঁথিরমোড়গামী অটোর লাইনে দাঁড়িয়েও নিজের বাহাদুরি ন...
ফেসবুক এনভি ফেসবুকে লগ ইন করতেই হোম পেজ জুড়ে মীরা চৌধুরী আর তার পরিবারের এক ঝাঁক ছবি দেখে স্ক্রল বারটা একটু থামায় পৃথা। ফেসবুকের নীল সাদা পেজটি যেন আজ পুরোটাই মীর...
আঁধার পেরিয়ে - অদিতি ঘোষ বাতের ব‍্যথায় রীতিমতো কাবু  মিত্তিরগিন্নী কোনরকমে পা টেনে টেনে এসে দাঁড়ালেন মিশ্রভিলার গেটে। কলিংবেলে বার দুয়েক চাপ দিয়েই অধৈর্য্য গলায় ড...
ADMIN

Author: ADMIN

Comments

Please Login to comment