পিতৃত্ব – শ্বেতা মল্লিক

মি অনীক সাহা, বয়স ৪০। পেশায় শিক্ষক। ১৫বছর ধরে এই পেশার সাথে যুক্ত আছি। অবিবাহিত থাকার অঙ্গীকার করেছিলাম। কিন্তু সন্তান সুখ যে কখনো পাব, তেমনটা ভাবিনি কোন দিন। গত ১টা বছরে আমার জীবনে আসা এক অপ্রত্যাশিত মোড়ের গল্প আজ ভাগ করে নিতে চলেছি আপনাদের সাথে। গল্পের দুই মুখ্য চরিত্র- আমি আর আমার মেয়ে গিনি।
 
ঘটনার সূত্রপাত দুই বছর আগে। শহরের স্কুলের একঘেয়েমি শিক্ষকতা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য প্রাণটা ছটফট করছিল। অনেক টানাপোড়েনের পর অবশেষে সিদ্ধান্তটা নিয়েই নিলাম। কিছুদিন আগে পেপারে একটা গ্রামের কথা পড়েছিলাম। রূপকথা নগরী নাম লেখা ছিল, সাথে ছবিগুলো দেখে এটুকু নিশ্চিত হয়ে গেছিলাম যে এই জায়গা রূপকথার গল্পের গ্রামের থেকে কম কিছু নয়। খুব দেখতে ইচ্ছা করছিল, শেষমেশ একমাসের জন্য ছুটির আবেদন জানিয়ে বেরিয়ে পড়লাম স্বপ্নপূরণের উদ্দেশ্যে। পেপারে ভদ্রলোকের ফোন নম্বর টা ছিল, যিনি গ্রাম টি ঘুরে এসে আর্টিকেল টি লিখেছেন। ওনার দেওয়া অনেক তথ্যের মধ্যে সবথেকে মনে ধরার মত যেটি ছিল সেটি হল, ঐ গ্রামের ছেলে মেয়েদের মধ্যে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়া খুব প্রয়োজন। দ্বিতীয় বার আর ভাবিনি, সবকিছু পিছনে ফেলে রওনা দিলাম রূপকথার গল্পের সন্ধানে।
 
গ্রামে এখনো ট্রেন চলাচল শুরু হয়নি। বাস এবং ভ্যান রিক্সাই একমাত্র অবলম্বন। কাঁচা পাকা রাস্তা আর রাস্তার দুই পাশে ফসল ও সব্জির খেত। বেশ কিছুটা অন্তর কিছু লোকের বাস। কেন এই গ্রাম টি কে রূপকথা নগরী নাম দেওয়া হয়েছে তা এখনো অবধি বুঝে উঠতে পারছিলাম না। ভ্যানওয়ালা কে জিজ্ঞেস করে বসলাম,
‘আচ্ছা দাদা, গ্রাম টার আসল নাম কি?’
‘আসল মানে?’, ঘাড়  ঘুরিয়ে প্রশ্ন করল লোকটা।
‘খবরের কাগজে পড়েছিলাম এই গ্রামের নাম রূপকথা নগরী, কিন্তু এরকম নামকরণের পিছনে ঠিক কি কারণ থাকতে পারে সেটা এখনো পরিষ্কার হলো না, তাই ভাবলাম এটা নিছকই নামকরণ কিনা।’
‘একটু ধৈর্য রাখেন বাবু, আপনার সব প্রশ্নের উত্তর আপনি পেয়ে যাবেন।’
বুঝলাম লোক টা আর কিছু বলবে না, তাই চুপ থাকা টাই শ্রেয় মনে হল। 
 
প্রায় পাঁচ কিলোমিটার আসার পর চোখের সামনে যে দৃশ্য দেখতে পেলাম, তারপর একনিমেষে নিজের সিদ্ধান্তের জন্য নিজেকে বাহবা দিতে ইচ্ছা করল। ছবির মত সাজানো সুন্দর একটি গ্রাম। যেদিকে চোখ যায় শুধু সবুজ রঙের ছড়াছড়ি। ঘন নীল আকাশ, ঠিক ফ্রেমে বন্দী ছবির মত। ভ্যান থেকে নেমে হাঁটতে শুরু করলাম। এরকম মোহময় পরিবেশ আগে কখনো পেয়েছি বলে মনে পড়ছে না। একটু আগে অবধি ও রোদের তেজ গায়ে লাগছিল, কিন্তু এখন সেই রোদের মিঠে তাপ সারা শরীরে মেখে নিতে ইচ্ছে করছে। বেশ অনেক টা হেঁটে চলে এসেছি, থামতে হল, কারণ সামনে আর এগোনোর পথ নেই। আছে শুধু একটা বেড়ার গেট, আর তার ওপারে একটা ছোট্ট বাড়ি। হঠাৎ সাহস পেয়ে গেলাম যেন, গেট টা সরিয়ে ভিতরে প্রবেশ করলাম। এত সুন্দর সাজানো জায়গা আমি কখনো দেখিনি। টালির চাল দেওয়া একতলা বাড়ি, নক্সা করা দেওয়াল। বারান্দার ধার বরাবর রঙিন ফুলের গাছ সাজানো, বাঁশের বেড়া দিয়ে ঘেরা। উঠোনের একপাশে একটা মাঝারি সাইজের শিউলি গাছ, গাছের নিচে নজর পড়তেই আমার চোখ দুটো আটকে গেল। একরাশ শিউলি ফুলের মাঝে বসে আছে ফুটফুটে একটি মেয়ে, ঠিক যেন মা দূর্গা। ফুল কুড়ানো বন্ধ করে আমার দিকে একবার তাকাল। কি অপূর্ব সুন্দর মুখখানি, মনটা জুড়িয়ে গেল। কাছে এসে বসলাম,
 
‘এগুলো কি ফুল জানো?’, ওর মাথায় হাত রেখে প্রশ্নটা করলাম।
‘হ্যাঁ, এটা তো শিউলি ফুল। দিদি আমাদের শিখিয়েছে তো।’, মুচকি হেসে ঘাড় নেড়ে উত্তর দিল।
কে দিদি জিঞ্জেস করার আগেই পাশে একটা পায়ের শব্দ অনুভব করলাম। একজন মাঝবয়সী মহিলা পাশে এসে দাঁড়ালেন। আগ্রহী দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন দেখে আমিই কথা শুরু করলাম।
‘নমস্কার, আমার নাম অনীক সাহা। আমি কলকাতা থেকে আসছি। আমি একজন শিক্ষক, সেই পেশা থেকে একমাসের জন্য বিরতি নিয়ে আপনাদের এই রূপকথা নগরীতে এসে পৌঁছেছি। একটু কথা বলা যাবে এখানকার যিনি মালিক তার সাথে?’
‘আমাদের এখানে কোন মালিক নেই। এটা একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, আমরা কয়েকজন মহিলা মিলে চালাচ্ছি। আপনি কি কোন আর্থিক সাহায্যের জন্য এসেছেন?’, ভদ্রমহিলা একটু উৎসাহ নিয়ে শেষ কথাটি বললেন।
‘ না ঠিক তা নয়, আমি একটু অন্য ভাবে সাহায্যের হাত টা বাড়িয়ে দিতে চাই। আপনাদের এখানে কতজন ছেলে মেয়ে আছে?’
‘ সব মিলিয়ে ১৫জন। কেন বলুন তো?’, ভদ্রমহিলা এবার একটু কৌতূহল দৃষ্টি নিয়ে তাকালেন।
‘ আমি এই কচিকাঁচা গুলো কে একটু পড়ালেখা শেখাতে চাই, অনুমতি পাওয়া যাবে কি?’
এতক্ষণে ভদ্রমহিলার মুখে হাসি দেখতে পেলাম। বুঝলাম আমাকে এখানে ঠাঁই পেতে আর কোনো কসরত করতে হবে না।
 
 
দেখতে দেখতে দশদিন কেটে গেল। বাচ্চা গুলোর সাথে খুব সুন্দর একটা সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। আমার কাছেই ওদের যত আব্দার। আমিও ওদের ইচ্ছা গুলো পূরণ করার চেষ্টা করি, ওদের রোজ সকালে আর বিকালে নিয়ম করে পড়াতে বসাই। খেলাও করি ওদের সাথে, আবার গল্পও শোনাই। কিন্তু এসবের মধ্যে একটি বাচ্চার সাথে এখনো অবধি ভাব জমিয়ে উঠতে পারিনি, প্রথম দিন এসে যাকে শিউলি কুড়োতে দেখেছিলাম। শুধু নাম টাই জানতে পেরেছি, গিনি। ভারী মিষ্টি নাম, কিন্তু কপাল টা গিনির মতো চকচকে না। বাকি বাচ্চা গুলো শুধু এখানে পড়তে আসে, সবার নিজের বাড়ি আছে, মা বাবা ভাই বোন আছে। কিন্তু গিনির কেউ নেই। কিংবা থাকলেও ওরা কখনো গিনি কে নিজের বলে দাবি করেনি। 
 
গিনি অন্যদের থেকে একটু আলাদা। বেশিরভাগ সময় ঐ শিউলি গাছের নিচে বসে আপন মনে খেলা করে। সেদিন ও সকালে একা বসেছিল, সুযোগ বুঝে আমিও ওর পাশে গিয়ে বসলাম।
‘ তোমার নাম টা ভারী সুন্দর, গি-নি। এর মানে কি জানো?’
‘না!’, এখনো একমনে খেলা করে যাচ্ছে।
‘আচ্ছা, এখানে সব বাচ্চারা আমার কাছে পড়তে আসে, গল্প শোনে, খেলা করে, কিন্তু তুমি আসো না কেন?’
‘কারণ আমি আর সবার মতো নই তাই।’, খুব দৃঢ় স্বরে উত্তর দেয় সে।
‘একথা কে বলেছে তোমাকে?’
‘কেউ না, কিন্তু আমি বুঝতে পারি।’
‘কি বুঝতে পারো তুমি?’, আমার উৎসাহ টা বেড়ে গেল।
‘ ওদের সবার মা বাবা আছে, আমার নেই।’
বুকের মধ্যে কোথাও যেন একটা মোচড় দিয়ে উঠলো আমার। এইটুকু বয়সে এতটা পরিণত মন মেয়েটির। দুই হাতের মধ্যে টেনে নিলাম ওকে।
‘আমরা সবাই সমান গিনি। কারণ আমাদের সবাইকে যিনি বানিয়েছেন তিনি এক ও অভিন্ন। তিনি কে জানো?’
‘হুম! ঠাকুর।’, এই প্রথম গিনির চোখে জল দেখতে পেলাম।
 
এরপর থেকে গিনি কে রোজই আমার আসরে আসতে দেখতে পেলাম। খুব বেশি কথা না বললেও ওর চোখ বলে দিচ্ছিল যে গিনি এখন নিজেকে আর আলাদা ভাবে না। এভাবে ভালোই চলছিল, কিন্তু হঠাৎই একটা খবর এসে পৌঁছাল যাকে সুখবর ও দুঃখের খবর দুটোই বলা যায়। সুখবর এটাই যে পঞ্চায়েত সমিতির আর্জি মঞ্জুর করে সরকার থেকে গ্রামে একটি স্কুল তৈরী করা হবে, আর দুঃখের খবর এটাই যে স্কুল টা এই সংগঠনের জমির ওপর বানানো হবে। বাচ্চা গুলো এবার ভালো করে লেখাপড়া শিখতে পারবে, মানুষ হয়ে উঠতে পারবে। সংগঠনের মহিলাদের স্থায়ী রোজগারের ব্যবস্থা হবে। সবার কিছু না কিছু ব্যবস্থা হয়ে যাবে, কিন্তু গিনির কি হবে? ও কোথায় যাবে? কে দেখবে ওকে? মেয়ে টার যে কেউ নেই।
 
আমারও একমাসের ছুটির মেয়াদ শেষের পথে। ভেবেছিলাম ফিরব না আর, বাকি জীবন টা এখানেই কাটিয়ে দেব। কিন্তু যে একঘেয়ে পুঁথিবিদ্যার বেড়াজাল থেকে রেহাই পেতে এখানে ছুটে আসা, আবার সেই জালে জড়াতে মন চাইল না। ব্যাগপত্র সব গুছিয়ে নিলাম, বাচ্চা গুলো আগের দিন এসে দেখা করে গেছে। কিন্তু গিনি আসেনি। খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম শিউলি গাছের নিচে বসে আছে। আমি কাছে গিয়ে দাঁড়াতে আমার দিকে চোখ তুলে তাকালো একবার, আমার বুঝতে বাকী রইল না।
‘ কি রে? আমার সাথে দেখা করতে এলি না যে?’
‘ আমাকে তোমার সাথে নিয়ে যাবে বাবা?’, এক পশলা বৃষ্টি গিনির চোখে।
‘ কি বলে ডাকলি আমাকে?’, এটাই তো শুনতে চেয়েছিলাম এতদিন।
‘ ঠাকুর তো তোমাকেও তৈরী করেছে, তুমি ও তো আমারই মতো। তাহলে আমায় কি তোমার সাথে নিয়ে যেতে পারবে না?’
এরকম আব্দার আজ অবধি কোন শিশু আমার কাছে করেনি। এই অনুভূতি মুখে প্রকাশ করা যায় না। বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরলাম আমার গিনি কে। আর মুখ দিয়ে বেরিয়ে এলো,
‘ আমার এই গিনি, সোনার চেয়েও দামি।’
 
গিনি আর আমি এখন শান্তিনিকেতনে বাসা বেঁধেছি। এখানে কিছু গ্রামের বাচ্চাদের নিয়ে একটা স্কুল করেছি। গিনি আমার ছাত্রী আবার দিদিমণি ও বটে। সন্তান সুখ পাবো বলে কখনো ভাবিনি, কিন্তু আজ নিজের অস্তিত্ব সুখের সন্ধান পেয়ে গেলাম। একেই বুঝি বলে পূর্ণতা, একেই বুঝি বলে পিতৃত্ব।
_____


FavoriteLoading Add to library
Up next
ভূ-স্বর্গ ঘুরে আসুন... - বিভূতি ভূষন বিশ্বাস               ভ্রমন করতে কে না ভালোবাসে কিন্তু ভ্রমন করাই মানে যেমন আনন্দ করা তেমনই এটাও খেয়াল রাখা উচিত সেটি কোনমতেই যেন নিরান...
ফেসবুক এনভি ফেসবুকে লগ ইন করতেই হোম পেজ জুড়ে মীরা চৌধুরী আর তার পরিবারের এক ঝাঁক ছবি দেখে স্ক্রল বারটা একটু থামায় পৃথা। ফেসবুকের নীল সাদা পেজটি যেন আজ পুরোটাই মীর...
বলিউডে ফের নরেন্দ্র মোদীর স্বচ্ছ ভারত অভিযান... - সায়নী দাস বলিউডে ফের নরেন্দ্র মোদীর স্বচ্ছ ভারত অভিযান। এই অভিযানকে সমাজের প্রত্যেকটি স্তরে পৌছে দিতে বলিউডে ফের আসতে চলেছে নতুন এক সিনেমা। অক্ষয় ...
সুদূরের পিয়াসী – বৈশাখী চক্রবর্তী... কথা হচ্ছিলো সেদিন বিকেলে তোমার সাথে, মুঠো ফোন ও আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে, শত সহস্র মাইলের ব্যবধান,  তোমার ওই মাটি আর আমার এই প্রাঙ্গনে।।    দেশ ভ...
নিজের মতো বাঁচি -ডঃ মৌসুমী খাঁ  চলো আজ নিজের মতো বাঁচি- খাঁচা খুলে নীল আকাশে উড়িয়ে মন-পাখি- ঝরা পাতা মাড়িয়ে চলি সবুজ পাতার খোঁজে- মনের যত ব্যথা বেদনা ভাসিয়ে দি...
তোমাকে দিলাম -সৌম্য ভৌমিক... তোমাকে দিলাম হরফ আর শিলালিপি, আমার হৃদয় নিংড়ানো স্বরলিপি । তোমাকে দিলাম ঝুলন সাজানো বাড়ী, তোমার জন্য কাঙাল হতেই পারি। তোমাকে দিলাম সর্ষে ক্ষেতের হ...
মুক্তিপণ -শুভদী্প পাপলু (সেন)  তোমার হাসি ভাল লাগে না,কাকু মায়ের সাথে কি এত কথা ছিলো? ভালো সাজার ভাব করো যে'টুকু- বুঝে নিতে হয়।গভীর রাতের আলো! বাবা ...
মিথ আর প্রশ্ন - মৌমিতা মারিক (রাই)   আমি কোনোদিন ফরসা হতে চাইনি ফেয়ার অ্যান্ড লাভলীর অ্যাড মেখে ঘুরতে চাইনি যতবার আমায় কালো বলেছো জিজ্ঞেস করেছি " বিদেশী...
গল্পকার ভোলা- প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়...   কি মুশকিল, ভোলা পড়েছে সমস্যায়। জীবনে কোনওদিন তার মা-বাবা তাকে পায়ে বেড়ি দিতে পারেনি। যখন যেখানে মন চেয়েছে সে চলে গেছে। ভবঘুরে মানুষ ভোলা। সংসা...
এক মৃত গাছ – বৈশাখী চক্কোত্তি... না, আমি যাব না। দেব না সাড়া ---- আজ তোমার আহ্বানে আর। নদীতেও নয়, ভরা জলের সরোবরেও নয়, আজ থেকে এক নতুন অঙ্গীকার । তোমার কাছে যা বাঁচার লড়াই, প্রে...
ADMIN

Author: ADMIN

Comments

Please Login to comment