পুরুষ – তুষার চক্রবর্তী

 দুপুর তিনটে বাজে। কাকলির আজ আর ঘুম আসছে না। বার বার ঘড়ির দিকে দেখছে। সাড়ে পাঁচটা বাজলে, কাকলিকে যেতে হবে অয়নদের বাড়িতে। অয়নের বাবার সাথে তাকে দেখা করতে হবে।
কাকলি স্কুলে পড়ায়। ফার্স্ট স্ট্যান্ডার্ডের ক্লাস টিচার। ওই ক্লাসের একটা ফুটফুটে সুন্দর ছেলের নাম অয়ন। স্কুল ছুটির পর কাকলি টিচার্স রুমের দরজা দিয়ে বেরোতেই পেছন থেকে কেউ যেন কাকলিকে ডাকলো,’মিস! মিস!’ কাকলি পেছন ঘুরে দেখে বারান্দার এক কোনে অয়ন দাঁড়িয়ে আছে। ওকে বোধহয় নিতে এখনো ওর বাড়ি থেকে কেউ আসেনি। কাকলি অয়নের দিকে এগিয়ে গেল। অয়ন কাকলির হাত দুটো ধরে বলল,’মিস! তুমি আমার মা হবে? জান আমার মা নেই।’

শুনে কাকলির চোখে জল এসে গিয়েছিল। অয়নকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলেছিল। অয়নকে বলেছিল,’হ্যাঁ, আজ থেকে আমি তোমার মা।’ তারপর অয়নের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে জিজ্ঞেস করেছিল,’কেন তোমার মা নেই কেন?’অয়ন বলল,’আমি তো আমার মাকে কোনো দিন দেখিনি। তবে বাবা বলে, মা নাকি আকাশের তারা হয়ে গেছে। মা তো খুব ভালো ছিলো। তাই আকাশের তারারা মাকে নিজেদের দলে নিয়ে নিয়েছে।’ কাকলি বলল,’ও তাই! তা তুমি এখন কার সাথে বাড়ি যাবে?’ অয়ন বলল,’আন্টি আসবে। বাবা সকালে স্কুলে দিয়ে যায়। এখন আন্টি আসবে, আমাকে নিতে। আন্টি আমার সাথেই বাড়িতে থাকবে। সন্ধ্যে বেলা, বাবা অফিস থেকে ফিরলে, তবেই আন্টি নিজের বাড়িতে চলে যাবে। আন্টিকে আমার একটুও ভালো লাগে না। কোন গল্পই জানে না। শুধু টিভি চালিয়ে বসে থাকে। আমার সাথে খেলেও না। তুমিও বলতো মিস, একা একা কি খেলা যায়?’ কাকলি জিজ্ঞেস করলো,’সন্ধ্যের পর, বাবা অফিস থেকে ফিরলে, তার সাথে খেল না কেন?’ অয়ন বলল,’বাবা খেলবে কি করে! বাবা তো অফিস থেকে ফিরে আমার আর বাবার জন্য রান্না করে। তারপর আমাকে হোমওয়ার্ক করায়। অবশ্য রবিবার রবিবার বিকেলে বাবা, আমাকে পার্কে নিয়ে যায়। তখন আমার সাথে খেলে। রবিবার দুপুরেও আমাকে শুয়োরানী দুয়োরানীর গল্প শোনায়।’

     অয়নের কথা শেষ হতে না হতেই, এক মধ্য ত্রিশের ভদ্রমহিলা এসে অয়নের পাশে দাঁড়ায়। তাকে দেখে অয়ন বলে উঠলো,’এই তো আন্টি এসে গেছে। মিস! আজ থেকে কিন্তু তুমি আমার মা হয়ে গেলে। চলো আন্টি!’ অয়ন তার আন্টির হাত ধরে স্কুলের বারান্দা থেকে উঠোনে নেমে, গেটের দিকে এগোতে লাগলো। কাকলি এক দৃষ্টে ওদের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে ছিল। দূর থেকেই অয়নের ঘাড়ের ওপর, জামার কলারের ঠিক ওপরটায় কাকলির চোখ পড়তেই, কাকলি চমকে উঠেছিল। ঘাড়ের ওপর একটা কালো জরুল। কাকলি দৌড়ে গেল। ততক্ষণে, অয়ন তার আন্টির হাত ধরে গেটের কাছে পৌঁছে গেছে। কাকলি অয়নকে জাপটে ধরলো। তারপর অয়নের ঘাড়ের ওপর কালো জরুলটা ভালো করে দেখল। অয়ন আর অয়নের আন্টি বেশ ঘাবড়ে গিয়েছিল। কাকলি নিজেকে সামলে নিয়ে, অয়নের আন্টিকে জিজ্ঞেস করলো,’অয়নের বাড়ি কোথায়? আমি ওর বাবার সাথে দেখা করতে চাই।’ অয়নের আন্টি, কাকলিকে অয়নদের বাড়িটা ঠিক কোথায়, তা বুঝিয়ে দিলো। কাকলি, অয়নকে আরও একবার জড়িয়ে ধরে আদর করে বলল,’বাবাকে বলবে যে মিস আজ বিকেল সাড়ে পাঁচটায় তোমাদের বাড়িতে আসবে।’ অয়ন বলল,’আজ থেকে তুমি আমাদের বাড়িতে থাকবে?’
কাকলির চোখে আবার জল এসে গেল। কাকলি নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,’তোমার বাবার সাথে বিকেলে আগে কথা তো বলতে দাও।’ এই কথায় অয়নের আন্টি কি ভাবলো, কে জানে! সে অয়নের হাতটা ধরে বলল,’চলো, তাড়াতাড়ি বাড়ি চলো। আমার অনেক কাজ আছে।’ এই কথা বলে, সে অয়নকে নিয়ে রাস্তায় হাঁটতে শুরু করে দিল। যতক্ষণ না ওরা দুজন রাস্তার বাঁকে ঘুরে গেল, ততক্ষণ কাকলি এক দৃষ্টে ওদের দিকে তাকিয়ে ছিল। তারপর, শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখের জল মুছে, নিজের লেডিস হোস্টেলের দিকে রওনা দিয়েছিল।

পার্থ যদি ভীরু কাপুরুষের মতো গায়েব না হয়ে যেত, পার্থ যদি সাহস করে কাকলিকে সেই সময় বিয়ে করে নিত, তাহলে কাকলির জীবনটা অন্যরকম হতো।
কাকলি আর পার্থ শিলিগুড়িতে পাশাপাশি পাড়ায় থাকতো। পার্থ, কাকলির দাদা চিন্ময়ের বন্ধু। কাকলি যখন মাধ্যমিক পাস করে উচ্চমাধ্যমিকে সায়েন্স নিয়ে নতুন স্কুলে ভর্তি হয়, তখন পার্থ আর চিন্ময় ফিসিক্সে অনার্স নিয়ে সেকেন্ড ইয়ারে পড়ছিল। চিন্ময়ের কথায়, কাকলির বাবা, পার্থকে বাড়িতে এসে কাকলিকে পড়ানোর জন্য অনুরোধ করেছিল। পার্থদের আর্থিক অবস্থা তখন বেশ ভালো। পার্থর বাবা চা বাগানের ম্যানেজার। তাই পার্থর প্রাইভেট টিউশনি করার কোনো দরকার ছিল না। পার্থর বাড়ি থেকে আপত্তিও করেছিল। কিন্তু চিন্ময়, পার্থর বাবা, মাকে বলে রাজি করিয়েছিল।

সোম থেকে শুক্র, পার্থ সন্ধ্যে সাড়ে ছটা নাগাদ পড়াতে আসতো। সাড়ে আটটা নাগাদ পড়ার ঘর থেকে বেরিয়ে, বারান্দায় বসে সে চিন্ময়ের সাথে পনের বিশ মিনিট আড্ডা দিয়ে বাড়ি ফিরে যেত। কাকলির সাথে পার্থর পরিচয় চিন্ময়ের বন্ধু সূত্রে আগে থেকেই ছিল। তখন তো কাকলি, পার্থদা বলেই ডাকতো। এমনকি উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা পর্যন্ত পার্থ, কাকলির কাছে পার্থদাই ছিল। পার্থদা থেকে পার্থ হয়ে গেল উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার পর। সেটা হয়েছিল, পার্থর দিদির বিয়ের সময়। পার্থর দিদির বিয়ে হয়েছিল কলকাতার শোভাবাজারে। বিয়ে উপলক্ষে, পার্থর বাবা, তার জানা শোনা এক গুজরাতি বন্ধু মারফত কোলকাতায় ভাড়া নিয়ে ছিল একটা গুজরাতি সমাজ বাড়ি। সেখান থেকেই পার্থর দিদির বিয়ে হয়েছিল।

বিয়ের চারদিন আগে থেকেই পার্থদের বাড়ির লোকেরা, ওই সমাজ বাড়িতেই থাকতে চলে গিয়েছিল। চিন্ময়ের জন্ডিস হওয়ায়, কাকলির বাড়ি থেকে, বিয়েতে কেউ না গেলেও, পার্থর দিদি বীণাদির অনুরোধে কাকলির বাবা, মা পার্থদের পরিবারের সাথে কাকলিকে কলকাতায় যেতে দিয়েছিল। তখন উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা হয়ে গেছে, পড়াশোনা নেই। তাই কাকলির বাবা, মা আপত্তি করেনি। বিয়ের আগে পরে মিলিয়ে, প্রায় সপ্তাহ খানেক, কাকলি পার্থদের পরিবারের সাথেই ওই সমাজ বাড়িতে কাটিয়েছিল। এই সময় কাকলি আর পার্থর প্রেম হয়ে যায়।
বিয়ের আগের দিন বীণাদি, কিছু কেনাকাটার জন্য নিউ মার্কেটে পাঠায়। সঙ্গে বীণাদি পার্থকে যেতে বলে। পার্থ ছেলে। তাই ওর পক্ষে মেয়েলি জিনিসপত্র চিনে কেনা সম্ভব নয়। পার্থর মা, বিয়ের আগের দিন, বীনাদিকে বাড়ির বাইরে যেতে দিতে রাজি নয়। সেই কারণেই বীণাদি তার বিয়ের সাজের কিছু টুকিটাকি জিনিস কিনতে কাকলিকে দায়িত্ব দেয়।
পার্থর বাবা, সপ্তাহ খানেকের জন্য, দু দুটো গাড়ি সারাদিনের জন্য ভাড়া করে রেখেছিলেন। ওই দুটোর একটা গাড়ি নিয়ে পার্থ আর কাকলি বেরিয়েছিল খাওয়া দাওয়ার পর দুপুর দুটো নাগাদ।

নিউ মার্কেট পৌঁছে, যা কিছু কেনা কাটার ছিল, তা কাকলি দেখে শুনে কিনলো। পার্থর কোন কাজ ছিল না। কেনাকাটা হতে, সে শুধু পার্স থেকে টাকা বার করে দোকানদারকে দিল। কেনা কাটা হয়ে যেতেই পার্থ, কাকলিকে বলল,’চলো, কোন রেস্ট্রুরেন্টে গিয়ে বসা  যাক।’ কাকলি অবাক হয়ে বলল,’ তার মানে! এই তো খেয়ে বেরোলাম। এখন আবার কি খাবো?’ পার্থ হেসে বললো,’ না খাবো না সেরকম কিছুই। আসলে, তোমার সাথে আমার কিছু কথা আছে। তবে রেস্ট্রুরেন্টে ঢুকে, টেবিল দখল করে বসলে, কিছু একটা অর্ডার অবশ্যই দিতে হবে। নিদেন পক্ষে চায়ের অর্ডার তো দিতেই হয়। আর কথা বলার জন্য গড়ের মাঠ, গঙ্গার ধার বা ইডেন, আমার একদম পছন্দ নয়।’ পার্থর চোখের দিকে তাকিয়ে, কাকলির কেমন যেন মনে হয়েছিল! কাকলি সেই মুহূর্তে ভেবেছিল যে সে এতদিন যা ভেবে এসেছে, সেটা কি তাহলে, ঠিকই ভেবে এসেছে!

বারো ক্লাসে পড়ানোর শেষের দিকটায়, পার্থদা যেন একটু অন্যরকম হয়ে গিয়েছিল। পড়ানোর সাথে সাথে অনেক বেশি গল্প করতো, যেগুলো প্রথম দিকে একেবারেই ছিল না। শুধু তাই নয়, যখনই পড়াতে আসতো, হাতে থাকতো কোনো না কোনো ইংরেজি রোমান্টিক নভেল বা বুদ্ধদেব গুহর কোনো উপন্যাস। অঙ্ক কষতে কষতে, কাকলি খেয়াল করতো, পার্থদা তার দিকে একদৃষ্টে উদাস চোখে তাকিয়ে থাকতো। কাকলির চিন্তায় বাধা পড়লো, পার্থদার কথায়,’এত ভাবছো কি? ওঠো, গাড়িতে উঠে বসো।’ গাড়িতে বসেই, গাড়ির ড্রাইভারকে পার্থদা পার্কস্ট্রিটের একটা ঠিকানা বলে, বলল সেখানে নিয়ে যাওয়ার জন্য। পার্থদা তখন রাজাবাজার সায়েন্স কলেজে পড়ে। থাকতো ওর বাবার পরিচিত এক ব্যবসায়ীর বাড়িতে। ফলে, কলকাতার রাস্তাঘাট ততদিনে পার্থদার নখদর্পনে এসে গেছে। মিনিট তিন চারের মধ্যেই গাড়িটা থামলো, পার্ক স্ট্রিটের একটা রেস্ট্রুরেন্টের সামনে।
পার্থ, কাকলির হাত ধরে ভেতরে নিয়ে গিয়ে বসালো একটা চেয়ারে। কাকলির অস্বস্তি হচ্ছিল। সেই প্রথম পার্থ, কাকলির হাত ধরেছিল। ছোট একটা গোল টেবিলের দুপাশে দুটো মুখোমুখি চেয়ার। কাকলি আর পার্থ, চেয়ারে বসতেই, ওয়েটার এসে সামনে দাঁড়ালো। পার্থ কাকলির দিকে তাকিয়ে বলল,’তুমি, চা না কফি?’কাকলি বলল,’কোনটারই ইচ্ছে নেই। তবে দাও, চায়ের অর্ডারই দাও।’ পার্থ, ওয়েটারকে দুটো চায়ের অর্ডার দিয়ে, কাকলির দিকে তাকিয়ে একটু হাসলো। কাকলির বুকের ভেতরটা তখন ধড়াস ধড়াস করছিল। মনের ভেতরে ভীষণ উত্তেজনা। পার্থদা কি বলতে চায়! শেষে থাকতে না পেরে, কাকলি বলেই ফেলল,’কি এমন কথা, যে এই রেস্ট্রুরেন্টে বসে বলতে হবে?’পার্থ আবার একটু কাকলির দিকে তাকিয়ে হাসলো। তারপর কাকলির দিকে তাকিয়ে বলল,’সত্যিই কি তুমি কিছুই বুঝতে পারছো না যে আমি কি বলার জন্য তোমাকে নিয়ে এখানে এসেছি?’ কাকলি বলল,’কি করে বুঝবো! কোনোদিন তো তুমি এভাবে কথাই বলোনি।’

       এবার পার্থ তার মাথাটা নিচের দিকে নামিয়ে বলতে শুরু করল,’দ্যাখো! তোমাকে যখন প্রথম পড়াতে শুরু করেছিলাম, তখন থেকেই এই ব্যাপারটা আমার মাথায় ঘুরতো। তুমি যখন ক্লাস টুইলভে উঠলে, ততদিনে এই ব্যাপারটাতে যথেষ্ট সিরিয়াস হয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু, তোমার পরীক্ষার কথা চিন্তা করে, তোমাকে আমি, আমার মনের কথা বলিনি। ভাবতাম, বললে যদি তোমার পড়াশোনার মনোসংযোগে ব্যাঘাত ঘটে। তাই আমি ভেবেই রেখেছিলাম যে তোমার উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা হয়ে গেলে, আমি আমার মনের কথা তোমাকে বলবো।’ পার্থ এবার নিজের মুখটা ওপর দিকে তুলে, কাকলির চোখেচোখ রেখে জিজ্ঞেস করল,’তুমি কি, এখনো আমার কোনো কথা বুঝতে পারছো না?’ কাকলি, ততক্ষণে সবই বুঝে গিয়েছিল। কিন্তু ঠিক কি বলা যায়, তা ভেবে উঠতে পারছিলো না।

পার্থ হয়তো ততক্ষণে কাকলির চোখের ভাষা পড়ে নিয়েছিল। তাই সে আগ্রহের সাথে, কাকলির দুটো হাত ধরে বলেই ফেলল,’আমি তোমাকে, প্রথম পড়ানোর দিন থেকেই ভালোবেসে ফেলেছি। কিন্তু কোনো দিন মুখে প্রকাশ করিনি। আজ তোমাকে নিয়ে এখানে এসেছি, তোমার মতামত জানবো বলে।’ কাকলি খুব বেশি অবাক হয়নি। হওয়ার কথাও নয়। সে অনেকদিন আগে থেকেই পার্থদার চোখের ভাষা পড়তো। কিন্তু কাকলি, মুখে কিছু না বলে, পার্থর চোখের দিকে তাকিয়ে রইলো। উদ্দেশ্য, পার্থ, তার চোখের ভাষাটা পড়ে নিক। কিন্তু ওই ভাবে হাত ধরে কিছুক্ষণ বসে থাকার পর, পার্থ আবার বলে উঠল,’আমি তোমার উত্তর শুনতে চাইছি।’ কাকলি আর বেশিক্ষণ থাকতে পারেনি। সে তার হাতে ধরা পার্থদার দুটো হাতে দুবার চুমু খেয়ে, নিজের হাত দুটো ছাড়িয়ে নিয়ে, নিজের মুখটা ঢেকে টেবিলের ওপর ঝুকে পড়ল। ওয়েটার এসে প্লেট সমেত দুটো চা টেবিলে রাখলো। পার্থর সাথে কাকলির প্রেমের সেই শুরু। পার্থদা সেই দিন থেকে হয়ে গেল পার্থ।

কাকলির উচ্চ মাধ্যমিকে রেজাল্ট খুব ভালো হয়েছিল। পার্থর ইচ্ছা আর উৎসাহে সে কলকাতায় চলে আসে। আশুতোষ কলেজে ভর্তি হয়। থাকতে শুরু করে পার্থর বান্ধবীর চেনাশোনা এক গার্লস হোস্টেলে। কাকলির বাবা, প্রথম দিকে একটু আপত্তি করেছিলেন। কিন্তু পার্থর কথা, আর চিন্ময়ের সায় থাকায়, কাকলির বাবা মেনে নিয়ে ছিলেন। কাকলির দাদা, চিন্ময়ের অবশ্য এম এস সি পড়া হয়ে ওঠেনি। চিন্ময় বি এস সি পাস করার পর থেকেই, বিভিন্ন চাকরির পরীক্ষায় বসতে শুরু করেছিল। সঙ্গে সঙ্গে ডব্লু বি সি এস পরীক্ষারও প্রস্তুতি নিচ্ছিল। কিন্তু মাস পাঁচেকের মধ্যেই, চিন্ময় রাজ্য সরকারের অধীনে একটা সংস্থায় চাকরি নিয়ে হলদিয়াতে চলে গিয়েছিল।
কাকলির আশুতোষ কলেজে ক্লাস শুরু হতেই, পার্থর সাথে তার দেখা সাক্ষাৎ, আড্ডা মারা, সবই অনেক বেড়ে গেল। তিন চার বছরে তাদের প্রেম গাঢ় থেকে গাঢ়তর হয়ে গেল। কাকলি বি এস সি পাস করলেও, তার এম এস সি পড়া হলো না। বি এস সি তে যা মার্ক্স পেয়েছিল, তাতে কলকাতা বা যাদবপুরে এম এস সি তে সুযোগ হলো না। অবশ্য সুযোগ পেয়েছিল বিশ্বভারতীতে এম এস সি পড়ার। কিন্তু কাকলি বিশ্বভারতীতে না গিয়ে, কলকাতায় বি এড পড়া শুরু করে দিল। ততদিনে পার্থ এম এস সি শেষ করে পি এইচ ডি করছে।
ঘটনাটা ঘটল, কাকলি যখন বি এড ফাইনাল দিয়ে, বাড়ি ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছে। পার্থর সেই সময় পি এইচ ডি শেষ করে অধ্যাপনার সুযোগ খুঁজছে। বেশ কয়েকটা বিদেশের সুযোগ তখন তার হাতে।

বিকেলের দিকে কাকলি আর পার্থ আড্ডা মারছিল গড়িয়া হাটের মোড়ের কাছে একটা রেস্ট্রুরেন্টে। কথায় কথায় পার্থ বলল,’দু এক দিনের মধ্যে, তুমি তো বাড়ি চলে যাবে। আমার নিজের যতক্ষণ না একটা পাঁকাপাকি ব্যবস্থা করতে পারছি, ততক্ষণ বাড়ি যাওয়ার প্ল্যান নেই। বাড়ি গেলেই বাবা, মাকে জানাতে হবে আমাদের দুজনের এই ব্যাপারটা। বাবা, মাকে বলতে হবে তোমার বাবা, মার সাথে কথা বলতে। বেশ কিছুদিন ধরে আমি খুব বোর ফিল করছি। চলো না, দু এক দিনের জন্য কোথাও ঘুরে আসা যাক। ফেরার পর তুমি বাড়ি চলে যেও।’ কাকলির আপত্তির কোনো কারণ ছিল না। কাকলির সাথে পার্থর সম্পর্ক তখন এতটাই ঘনিষ্ট যে এই ধরণের প্রস্তাবে হ্যাঁ, বলাটাই স্বাভাবিক। কলকাতার বন্ধুমহলে, তখন সবাই জানে কাকলি আর পার্থর প্রেম কাহিনী। অনেকেই তখন বিয়ের কথা বলতে শুরু করে দিয়েছে। কস্তুরীদি, কয়েকদিন আগেই কাকলির সামনেই পার্থকে বলেছিল,’তোরা কিন্তু শিলিগুড়িতে গিয়ে বিয়ে করলে চলবে না। বিয়ে কিন্তু কলকাতায় করতে হবে। আর যদি বা শিলিগুড়িতে বিয়ে করিস, কলকাতায় আলাদা করে পার্টি কিন্তু চাই।’ এইসব কথা তখন কাকলির মাথায় ঘুরতে থাকে। কাকলি পার্থকে বলল,’চলো, কোথায় যাবে?’ পার্থ বলল,’চলো না, চাঁদিপুর ঘুরে আসি।’
কাকলি আর পার্থ, প্রায় সাত বছর ধরে ঘনিষ্ট ভাবে মেলামেশা করলেও, তাদের মধ্যে কোনো শারীরিক সম্পর্ক ছিল না। যা ছিল, তা সামান্য একটু আধটু ছোঁয়া ছুঁয়ি আর চুমুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু চাঁদিপুরে সেই সীমাটা ভেঙ্গে গেল। চাঁদিপুর, ওরা সার্কিট বাংলোতে তিনদিন ছিল। ওই তিনদিনে কাকলি আর পার্থ, বেশ কয়েকবার শারীরিক ভাবে মিলিত হয়েছিল। কিন্তু তার জন্য কাকলি অপরাধ বোধের গ্লানিতে ভোগেনি।

         কাকলি চাঁদিপুর থেকে কলকাতার হোস্টেল হয়ে শিলিগুড়ি ফিরে গিয়েছিল। পার্থ কলকাতায় থেকে গেল। কাকলি খুব ঘাবড়ে গেল, যখন সে বুঝলো যে সে অন্তঃসত্ত্বা। যদিও তখনও কাকলি ডাক্তার দেখায়নি। বেশ কয়েকবার সে পার্থ কলকাতার যে বাড়িতে থাকতো, সেই বাড়িতে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করলো। কিন্তু কেউ ফোন তুলতো না। কাকলি মনে মনে ভাবল যে ফোনটা খারাপও হতে পারে!
উপায় না খুঁজে পেয়ে, কাকলি বন্ধুর বাড়িতে কাজ আছে বলে ফিরে এল কলকাতার হোস্টেলে।
পার্থর সাথে দেখা হলো রাজাবাজার সায়েন্স কলেজেই। পার্থ তখন বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিচ্ছিল। পার্থ সব শুনে বলল,’এত ভয় পাওয়ার কিছু নেই। তুমি বাড়ি যাও। আমি রবিবার সকালে বাড়ি আসছি। কারণ দিন পনেরোর মধ্যেই আমি ইউ এস যাবো। পাসপোর্ট আর ভিসার কাজ গুলো সেরেই আমি বাড়ি আসছি। বাবা, মার সাথে কথা বলে সব কিছু আমি ঠিক করে নেব। তুমি এত দুশ্চিন্তা করোনা।’ পার্থর সাথে কথা বলে কাকলি যেন একটু স্বস্তি পেল।

পরের রবিবার, পার্থ তার বাড়িতে এলেও, কাকলির সাথে দেখা করতে এলো না। কাকলি, পার্থর বাড়িতে দু তিন বার ফোনও করেছিল। পার্থর বাড়ির কেউ ফোনটা তুলে, কাকলির গলার আওয়াজ শুনেই রিসিভারটা রেখে দিচ্ছিল। বাধ্য হয়ে মঙ্গলবার, বেলার দিকে কাকলি নিজেই পার্থদের বাড়িতে গেল। পার্থর বাড়িতে তখন, পার্থর মা একা। কাকলি বাইরের গেট খুলে ভেতরে গিয়ে, বারান্দায় উঠতেই, পার্থর মা বলে উঠলেন,’পার্থ তো কাল রাত্রেই কলকাতা ফিরে গেছে।’ পার্থর মায়ের কথায় যে রুক্ষতা ছিল, তাতেই কাকলি বুঝে গিয়েছিল যে পার্থর বাবা, মা সব শুনে রাজি হয়নি। তাই কাকলি আর বেশি কিছু কথা না বলে বলল,’ঠিক আছে, আমি তাহলে যাচ্ছি।’ কাকলি ফিরতে উদ্যত হতেই, পার্থর মা, কাকলিকে ডেকে ভেতরের ঘরে বসতে বললেন। কাকলি ভেতরের ঘরে গিয়ে বসল না, দাঁড়িয়েই রইলো। পার্থর মা, কাকলিকে তিরস্কারের সুরেই বললেন,’তুমি, এটা ঠিক করোনি কাকলি! পার্থর বাবা, পার্থর জন্য পাত্রী অনেক আগেই দেখে রেখেছেন। মেয়ের বাবাকে কথা দেওয়া আছে। এখন যদি অন্যথা হয়, তাহলে তোমার কাকুকে নিজের সন্মান বাঁচাতে হয়তো আত্মহত্যা করতে হবে। যাই হোক ভুল একটা হয়ে গেছে। তুমিও, তোমার সমস্যাটা আর বেশি না বাড়িয়ে কলকাতার ডাক্তারের সাথে কথা বলে ব্যবস্থা করে নাও। এখনো অনেক সময় আছে।’ কাকলি, পার্থর মাকে আর কোনো উত্তর দেয়নি। নিজের বাড়িতে ফিরে এসে নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে খুব কেঁদেছিল।

পরদিনই কাকলি আবার ফিরে আসে কলকাতার হোস্টেলে। পার্থর ঘনিষ্ঠ বান্ধবী, কস্তুরীদির সাথে যোগাযোগ করে। কস্তুরীদি, কাকলিকে তাদের বাড়িতে আসতে বলে। কস্তুরীদি ওদের বাড়ির ছাদে বসে কাকলিকে যা বলল, তাতে কাকলি একেবারেই দিশেহারা হয়ে গেল। কস্তুরীদির কথা অনুযায়ী, পার্থ তার বাবা, মাকে সবই খুলে বলেছিল। কিন্তু তা শুনে, পার্থর বাবা খাওয়া দাওয়া না করে সারা রাত কান্নাকাটি করেছে। পার্থর বাবা আত্মহত্যার কথাও বলেছে। তবে পার্থও, ওর বাবা, মাকে কোন কথা দেয়নি। পার্থ নাকি কস্তুরীদিকে বলেছে যে এই বিদেশ যাওয়ার তাড়াহুড়োয় তার পক্ষে রেজিস্ট্রি ম্যারেজ করা সম্ভব নয়। পার্থ চেষ্টা করবে, বছর খানেকের মধ্যেই বিদেশ থেকে ফিরে আসতে। তখন সে না হয় কাকলিকে বিয়ে করবে। তবে পার্থ এটাও বলেছে, কাকলির উচিত যে এই পৃথিবীতে যে আসছে, তাকে আসতে না দেওয়া। সব শুনে কাকলি কস্তুরীদিকে জিজ্ঞেস করল,’পার্থ এখন কোথায়? আমি একবার ওর সাথে দেখা করতে চাই।’ কস্তুরীদি বলল,’জানিনা, তবে আগে পার্থ যে বাড়িতে থাকতো, এখন সেই বাড়িতে নেই।’ কাকলি, কস্তুরীদির কোলের উপর মাথা রেখে কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো। ঠিক এই সময় কস্তুরীদির মায়ের গলা নিচ থেকে শোনা গেল,’কস্তুরী! রমা এসেছে। ওকে ছাদে পাঠিয়ে দিয়েছি।’ কস্তুরীদির মায়ের কথা শেষ হতে না হতেই পার্থর আর এক ঘনিষ্ট বান্ধবী, রমাদি ছাদে এল।

রমাদিকে, কস্তুরীদিই খবর দিয়ে ডেকে পাঠিয়েছিল। রমাদিও সব ব্যাপারটা জানতো। কথায় কথায় কস্তুরীদি, কাকলিকে জিজ্ঞেস করল,’কাকলি! তুই কি ভাবছিস? এখন তুই কি করতে চাস?’ কাকলি অনেকক্ষণ চুপ করে থাকার পর বলল,’লেখাপড়া শিখে আমি এরকম জঘন্য কাজ করতে পারবো না। আমার যদি কোনো থাকার ব্যবস্থা করতে পারি, তাহলে আমি আমার সন্তানের জন্ম অবশ্যই দেব। পার্থ ফিরে এসে যদি আমাকে সন্তানসহ গ্রহণ করে তো ভালো, আর তা না হলে, আমি তাকে কোন অনাথ আশ্রমে রেখে আসবো’ কাকলির কথা শুনে প্রথমে কস্তুরীদি আর রমাদি দুজনেই চমকে উঠেছিল। কিছুক্ষণ তিন জনের চুপ করে থাকার পর, রমাদি বলল,’আমি কাকলির সাথে এক মত। আমি তোর থাকার ব্যবস্থা আপাতত কামারপুকুরের কাছে একটা মহিলা আশ্রমে করে দিচ্ছি। ওখানে আমার মাসির জানাশোনা আছে। কিন্তু কাকলি! তুই বাড়িতে কি বলবি?’ কাকলি বলল,’সে তোমরা ভেব না।’

                 এর পরের এক বছরের ঘটনা গুলো মনে পড়লে, কাকলি এখনো কেঁপে ওঠে।কলকাতা থেকে কাকলি শিলিগুড়ি ফিরে এলো। একদিন মায়ের উদ্দেশ্যে একটা কাগজে সবকিছু লিখে, নিজের বিছানার ওপর রেখে দিয়ে কাকলি বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েছিল। গন্তব্য কলকাতা। কলকাতায় পৌঁছনোর পর, কস্তুরীদি আর রমাদি, কাকলিকে সেই কামারপুকুরের কাছে মহিলা আশ্রমে রেখে এসেছিল।
কস্তুরিদি চিঠি দিয়ে পার্থকে সবই জানিয়েছিল। কিন্তু পার্থ কোনো চিঠির উত্তর দেয়নি। সময়মতো কাকলির কোলে একটা সুন্দর ফুটফুটে ছেলে আসে। সে কথা জানিয়ে আবার কস্তুরীদি, পার্থকে চিঠি পাঠায়। সেই চিঠির উত্তর পার্থ দিয়েছিল। উত্তর মানে দু লাইনের উত্তর। “আমি আর কোনোদিন বাড়ি ফিরছি না। আমাকে ক্ষমা করে দিও।” কাকলি এই উত্তরের কথা শুনে একদম ভেঙ্গে পড়েছিল।
রমাদির কথায়, মহিলা আশ্রমের কর্মকর্তারা কাকলির ছেলেকে এক অনাথ আশ্রমে রাখার ব্যবস্থা করে দিল। তখন কাকলির ছেলের বয়েস এক বছর পূর্ণ হয়নি।

কাকলি কয়েক দিনের মধ্যেই জানতে পারে, তার ছেলেকে অনাথ আশ্রম থেকে নিয়ে গেছেন এক নিঃসন্তান দম্পতি। তারা দত্তক নিয়েছেন। কাকলি গিয়েছিল সেই অনাথ আশ্রমে। জানতে চেয়েছিল সেই নিঃসন্তান দম্পতির বাড়ির ঠিকানা। কিন্তু অনাথ আশ্রমের সম্পাদক কাকলিকে জানিয়ে দেয় যে, সে দত্তক নেওয়া দম্পতির ঠিকানা দিতে পারবেন না। সেটা নাকি তাদের নিয়মের বিরুদ্ধে। কাকলি কলকাতা ফিরে আসে। কিছুদিন সে কস্তুরীদির বাড়িতেই ছিল। শেষে এই স্কুলের চাকরিটা পায়। চলে আসে দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার এই ছোট্ট শহরটাতে।
কাকলি আজ সেই পুরোনো ঘটনা গুলো ভাবতে ভাবতে বিকেল পাঁচটা বাজিয়ে ফেলল। তাড়াতাড়ি বিছানা ছেড়ে উঠে মুখ ধুয়ে , শাড়িটা চেঞ্জ করে অয়নের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হলো। অয়নের বাড়িতে পৌঁছতে পৌঁছতে প্রায় পৌনে ছটা বেজে গেল। কাকলি যখন অয়নদের বাড়িতে পৌঁছলো, ততক্ষণে অয়নের বাবা অফিস থেকে ফিরে গেছে আর অয়নের আন্টি বাড়ি চলে গেছে। কাকলি অয়নদের বাড়ির গেটের সামনে দাঁড়াতেই, অয়ন ছুটে এলো গেটের কাছে। অয়ন বোধহয় তার বাবাকে কিছু বলেছিল। সেই কারণেই হয়তো অয়ন ওর বাবার সাথে গেটের দিকে তাকিয়ে বারান্দায় বসেছিল।

অয়নের বাবা, কাকলিকে ভেতরে নিয়ে গিয়ে বসার ঘরে বসতে বললেন। তারপর বললেন,’আপনি একটু অয়নের সাথে কথা বলুন, আমি পাঁচ মিনিটেই আসছি।’ বাবা চলে যেতেই, অয়ন কাকলির কোলে বসে পড়লো। বলল,’মিস! সত্যি তাহলে আজ থেকে তুমি আমার মা তো?’ কাকলির চোখে জল। কাকলি নিজেকে সামলে নিয়ে শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখ মুছে বলল,’হ্যাঁ, বলেছি তো!’ এই কথা বলে কাকলি অয়নকে জড়িয়ে ধরে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে থাকে। অয়ন চুপ করে চোখ বন্ধ করে কাকলির কোলেই বসে থাকে।

অয়নের বাবা একটা ট্রেতে করে প্লেট সমেত দু কাপ চা আর কিছু বিস্কিট নিয়ে ঢুকলো। ট্রে টি টেবিলের ওপর রাখতে রাখতে বলল,’অয়ন বোধহয় আপনাকে খুব ভালোবাসে? আসলে মায়ের আদর তো কোনো দিন পায়নি।’ এই কথা বলতে বলতে তিনি, কাকলির মুখোমুখি একটা চেয়ারে বসলেন। বসেই কাকলিকে বললেন,’নিন, চা নিন।’ কাকলি বলল,’আপনি অফিস থেকে ক্লান্ত হয়ে ফিরে, আবার এসব কষ্ট করে করতে গেলেন কেন?’ অয়নের বাবা বললেন,’আপনি না এলেও, আমি তো আমার জন্য চা বানাতাম। যাই হোক, বলুন তো কি ব্যাপার? অয়ন কি খুব দুষ্টুমি করছে স্কুলে?’ কাকলি হেসে বলল,’না, না, সেরকম কিছু নয়। আমি এসেছি আপনার সাথে দেখা করতে। কিছু অন্য কথা জিজ্ঞেস করতে। আসলে অয়ন বলে ওর মা নেই। যদি কিছু মনে না করেন, তাহলে একটু বলবেন, অয়নের মায়ের কি হয়েছিল?’

অয়নের বাবা কাকলির কথায় যেন বেশ একটু অবাক হলো। বেশ কিছুক্ষণ মাথাটা নিচের দিকে করে ভাবলো। তারপর অয়নকে বলল,’অয়ন! তুমি বলটা নিয়ে বাগানে গিয়ে একটু খেল। আমি ততক্ষণ তোমার মিসের সাথে একটু জরুরি কথা বলি।’ অয়ন সঙ্গে সঙ্গে কাকলির কোল থেকে নেমে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। অয়নের বাবা, অয়ন বেরিয়ে যাওয়ার পরও, আরো কিছুক্ষন কি যেন ভেবে নিল। তারপর বলতে শুরু করল,’অয়নের আসল মা কে, তা আমিও জানি না। আমরা নিঃসন্তান ছিলাম। তাই আমার এক বন্ধুর পরামর্শে আমরা কামারপুকুরের কাছে, এক অনাথ আশ্রম থেকে অয়নকে নিয়ে এসেছিলাম। তখন অয়নের বয়েস সবে এক বছর। কিন্তু যার জন্য অয়নকে নিয়ে এসেছিলাম, সেই চলে গেল। অয়নের আমাদের বাড়িতে আসার মাস তিনেকের মধ্যেই আমার স্ত্রী মারা গেলেন। সেই থেকে আমিই অয়নের বাবা, আমিই অয়নের মা।’

কামার পুকুরের কাছের অনাথ আশ্রম শুনে কাকলি চমকে ওঠেনি। সে সকালেই বুঝে গিয়েছিল যে অয়ন তারই ছেলে। কিন্তু কাকলির শরীরের ভেতরে যেন কি একটা হচ্ছিল। সে ঘেমে উঠেছিল। কাকলি অয়নের বাবাকে একটু জল দিতে বলল। অয়নের বাবা জল এনে দিল। কাকলি জলটা খেয়ে, গ্লাসটা টেবিলে রাখতে রাখতে বলল,’এবার শুনুন, আমার, আপনার কাছে আসার কারণ।’ কাকলি ধীরে ধীরে তার জীবনের সব ঘটনা অয়নের বাবাকে বলল। কাকলির কথা শেষ হতে দুজনেই একে অপরের মুখের দিকে তাকিয়ে বেশ কিছুক্ষণ বসে রইল। শেষে অয়নের বাবাই আবার কথা শুরু করল,’দেখুন, অয়ন যে আপনারই ছেলে, তার প্রমাণ, আমি আপনার কাছে চাইবো না। আপনি যদি অয়নকে আপনার নিজের কাছে রাখতে চান, তাতেও আমি আপত্তি করবো না। শুধু একটাই অনুরোধ, মাঝেমধ্যে অয়নকে নিয়ে আপনি আমার বাড়িতে আসবেন। আমার স্ত্রী চলে যাওয়ার পর, অয়নই আমার বাঁচার একমাত্র সম্বল।’ কাকলি বলে উঠল,’না, না, আমি অয়নকে নিয়ে যেতে আসিনি। সে অধিকারও আমার নেই। আমিও ঠিক আপনার কথাটাই বলছি। মাঝেমধ্যে আমি আপনার বাড়িতে এলে, আপনার অসুবিধা হবে না তো?’ অয়নের বাবা বললেন,’এ আপনি কি বলছেন! আপনি ওর মা। আমি তো ওর কেউ নয়। আপনি যদি চান, আপনি হোস্টেল ছেড়ে আমার এই বাড়িতেও থাকতে পারেন। অয়ন তো ওর মাকে সব সময় কাছে পাবে।’

……….. শেষ………


FavoriteLoading Add to library
Up next
বাজারে বিপত্তি -গার্গী লাহিড়ী রবিবারের সকাল বেলা চায়ের কাপ নিয়ে সবেমাত্র আয়েশ করে বসেছি । ভাবছি মুখপুস্তিকায় চোখ রাখবো নাকি খবরের কাগজে ? এমন সময় বিনা মেঘে বজ্রপা...
Poem…ফাগুনের ডাক   ফাগুনের ডাক চারিদিকে শুধু জ্বলছে আগুন জ্বলুক না, আজ আগুনকে বইছে ফাগুন বউক না।।   বনভূমিতে আজ আবির রঙ লাগুক না, পলাশ শিমুলে যেন খুশির ঢঙ জাগুক না।।...
পত্র – সমর্পণ মজুমদার... হে প্রিয় পরমাপন অভিন্নপ্রাণ মিত্র, বহুদিন তব সংবাদ বিনা চঞ্চল মোর চিত্ত। হেথা মোর দেহ স্বাস্থ্যযুক্ত, গৃহেতে বিরাজে শান্তি, তবু হে বন্ধু, দিবসে-রা...
অন্তরালে – স্বরূপ রায়... -স্যার, টিকিট প্লিজ! -স্যার, টিকিট! ‘অ্যাঁ’ করে একটা শব্দ করে চোখ খুললেন অনিমেষবাবু। মিটমিট করে তাকিয়েই চোখের সামনে টিটি-কে দেখে একটু অপ্রস্তুত হয়ে ...
মাসতুতো -  সৌম্যদীপ সৎপতি (১)    অন্ধকার গলির ভেতরের নীল রং এর বাড়িটা থেকে বেরিয়ে এল রমেশ।তার মনের মাঝে আজ এক অদ্ভূত অনুভূতি, আর সেই অনুভূতিটা সুখ এবং অস্ব...
ইলিশ মাছ ভাপা - মালা নাথ    "একে তো ফাগুন মাস দারুণ এ সময় লেগেছে ভীষণ চোট কী জানি কী হয়, অঙ্গে চোট পেলে সে ব্যথা সারাবার হাজার রকমের ঔষধি আছে তার, মরমে...
ভুলেও থাকবেন না স্যার – শাশ্বতী সেনগুপ্ত... বাসটা গিয়ে যখন গুমটিতে থামলো, তখন বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে। শীতের সন্ধ্যে তাই লোকজন ও তেমন নেই,  বিমল বাস থেকে নেমে বুঝতে পারছে না কোন দিকে যাবে। ড্রাইভ...
প্রতিশ্রুতি – শ্বেতা আইচ... 'আচ্ছা মা,চাঁদটাও আমাদের সাথে কাল যাবে তো?”, পুঁচকে অরি প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয় কুমুদিনীকে। “চাঁদ আমাদের সকলের সোনা, চাইলেও শুধু তুমি আর আমি ওকে নিয়ে যেত...
স্বপ্ন রাত্রে বিছানায় একরাশ হতাশানিয়ে যখন চোখ বুজলাম,স্বপ্ন দেখলাম একটা স্বপ্ন দেখার।স্বপ্নের মধ্যে স্বপ্ন জাগানোর !সেই স্বপ্নটা ছিল একরাশ স্বপ্ন নিয়ে,স্বপ্ন...
অলৌকিক – প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়... নিঃঝুম গ্রাম, গরমের ঘন দুপুর। বেলা গড়িয়ে যাচ্ছে তবু তাপ কমার নাম নেই। কমবেই বা কি করে? সারা দিনের প্রখর রোদের তাপ খেয়ে প্রকৃতি আগুন হয়ে আছে। এ...
ADMIN

Author: ADMIN

Comments

Please Login to comment