প্রতিশ্রুতি – শ্বেতা আইচ

চ্ছা মা,চাঁদটাও আমাদের সাথে কাল যাবে তো?”, পুঁচকে অরি প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয় কুমুদিনীকে।

“চাঁদ আমাদের সকলের সোনা, চাইলেও শুধু তুমি আর আমি ওকে নিয়ে যেতে পারব না।“, চোখ দুটো পূর্ণিমার আলোয় চিকচিক করে ওঠে কুমুদিনীর।

চার বছরের ছেলে আর স্বামী সমীরকে নিয়ে ছোট্ট সংসার কুমুদিনীর। ছয় বছর আগে অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ হয়েছিল দুজনের। কুমুদিনীর শ্যামলা রং ও সেই সাথে গালভরা সাবেকি নামের জন্য অনেকগুলো সম্বন্ধ ফিরে গেছে। ঠাকুমার দেওয়া বড় সাধের নাম এটি। ছোট থেকেই একটু শান্ত স্বভাবের মেয়ে কুমুদিনী, স্বল্পভাষী। বাইরের জগতটা কলেজের পর আর দেখা হয়ে ওঠেনি। প্রায় এক বছরের কঠোর চেষ্টার পর সমীরের সাথে বিয়েটা পাকা হয়ে যায়। ইঞ্জিনিয়ার পাত্র,বেশ হ্যান্ডসামও। সম্বন্ধটা বেশ অবাক করার মতোই ছিল। যাইহোক বিয়েটা হল শেষমেশ, কিন্তু তার পরের ঘটনাগুলো খুব একটা সুখকর ছিল না কুমুদিনীর জন্য। প্রথম রাতেই সে বুঝে যায়, সমীরের পছন্দের পাত্রী সে কখনোই ছিল না। সমীর তার রাগী বাবার মন রাখতে সাত পাকে বাঁধা পড়েছে।

মনটা সেদিনই ভেঙেছিল কুমুদিনীর। তারপর থেকে একটার পর একটা দিন কেটেছে, সমীর না পেরেছে ওকে ফেলতে না পেরেছে মেনে নিতে। জৈবিক নিয়মে শরীর দুটো এক হয়েছে ঠিকই কিন্তু মনের দূরত্বটা একই ভাবে বজায় থেকেছে । বেডরুমে সম্পর্কটা যেমনই থাকুক, বাইরের জগতের কাছে নিজেদের সবসময় মানিয়ে চলেছে দুজনে। কুমুদিনী অনেকভাবে সমীরকে ভালো রাখতে চেয়েছে, নানা কৌশলে ওর মন পড়ার চেষ্টা করে গেছে। তবু মনের শেষ সীমানা অতিক্রম করতে পারেনি। দেখতে দেখতে এক বছর কেটে গেল সংসার জীবনের। সমীরের অফিস ফ্রেন্ডরা এখনো পর্যন্ত কুমুদিনীকে দেখেনি। বারবার সমীরকে বিরক্ত করায় বাধ্য হয়ে বিবাহ বার্ষিকী উপলক্ষে সকলকে বাড়িতে ডেকে আনল। অফিসের মোস্ট ডিজায়েরেবেলের মিসেস কে দেখার ইচ্ছা কার না থাকে! কিন্তু সবার ইচ্ছাটা এভাবে ধাক্কা খাবে সেটার আভাস সমীর হয়ত পেয়েছিল। সবার ঠোঁটে যেন তাচ্ছিল্যের হাসি ধরছিল না। এই পছন্দ সমীরের? নিজেকে অসহায় লাগছিল সমীরের, কিন্তু তার থেকেও বেশি কষ্ট পাচ্ছিল কুমুদিনী। ওর রূপের জন্য সমীর কে আর কত ছোট হতে হবে? সেই রাতে সমীর ঘরে আসেনি। কুমুদিনী গেছিল ওর কাছে, কিন্তু…….

‘তোমার জন্য আমাকে আর কত ছোট হতে হবে বলতে পারো?’, সমীরের ভিতরের সব রাগ ফুটে উঠেছিল ওর চোখ মুখে।

‘তুমি বলো আমি কি করবো?’

‘চলে যাও আমার জীবন থেকে, মুক্তি দাও আমায়।’

‘এতেই তোমার শান্তি হবে তাই তো? বেশ! তবে কয়েকটা দিন সময় দাও। বাবার শরীরটা ভালো নেই, উনি আমাকে চলে যেতে দেখলে সহ্য করতে পারবেন না। একটু সুস্হ হলে নাহয়…….’

‘তার মানে এটাই তোমার ফাইনাল ডিসিশান,তাই তো? ঠিক আছে, তবে আমিও আজ বলে দিচ্ছি, আমাদের মধ্যে আর কোন সম্পর্ক থাকবে না। আমার কাছে আসার চেষ্টাও করবে না, বুঝতে পেরেছ?’

‘আমি কি আসতে চেয়েছিলাম? সেই রাতে তুমি ওভাবে কাছে টেনে…….’

‘আহ্! আমি ঐ দিন বা রাত কিছুই মনে রাখতে চাইনা। এরপর থেকে তুমি আর আমি আলাদা ব্যস!’

‘অন্তত বাবাকে কিছু বুঝতে দিও না। খুব কষ্ট  কথা দিলাম, উনি যেদিন থাকবেন না সেদিন আমিও থাকব না।’

সেই রাতে আর কোন কথা হয়নি দুজনের। লোকচক্ষুর আড়ালে ওদের সম্পর্কটা সাজিয়ে রাখা শো পিস হয়ে গেছিল। একটু একটু করে কুমুদিনীর ভিতরটা পুড়ছিল। কোথাও কোন আশার আলো ছিল না। এরই মধ্যে এল এক অপ্রত্যাশিত খবর,যার আশা কুমুদিনী বা সমীর কেউই করেনি। কুমুদিনী কনসিভ করেছে, বাড়ির সবথেকে বয়স্ক মানুষটির আনন্দের সীমা রইল না। খুব খুশি মনে খবরটা সমীরকে দিয়েছিল কুমুদিনী, কিন্তু সমীরের মধ্যে কোন পরিবর্তন ওর চোখে পড়েনি। শুধু একটি পরিবর্তন ছাড়া। সবসময় ফোনে এনগেজড থাকে এখন, চ্যাটিং যাকে বলে। আপন জগতে থাকে, ভালো আছে সেটা দেখেই বোঝা যায়। কিন্তু কুমুদিনীর যে এখন ওকে খুব দরকার, বাচ্চাটা যে ওদের দুজনের। সেটা সমীর মানে তো? আচ্ছা ও যদি কোন দিন বাচ্চাটাকে অস্বীকার করে? সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে ৮মাস কেটে যায়। কুমুদিনীর শূন্য জীবন পূর্ণতার মুখ দেখে। ছেলে হয় ওদের, নাম রাখে অরি।

অন্ধকারে যেন আলোর দিশা খুঁজে পেল কুমুদিনী। সারাদিন ছেলে কে নিয়ে কেটে যায়।ওকে খাওয়ানো, ঘুম পাড়ানো, স্নান করানো, সাজানো আরও কত কি। সময়ের সাথে সাথে ছেলে বড় হয়ে গেছে, কিন্তু সমীরের মধ্যে কোন পরিবর্তন আসেনি। সারাদিন শেষে এসে একটিবার হয়ত ছেলের কাছে বসে। ছেলেকে মানুষ করার জন্য টাকা পয়সা, জিনিসপত্র সবই দিচ্ছে কিন্তু বাবা হিসেবে কি শুধু এটুকুই করার? আমাকে না হয় মানতে পারেনি, কিন্তু অরি যে ওর নিজের রক্ত, তাকেও মেনে নিল না? আবারও প্রশ্ন এসে জমা হয় কুমুদিনীর মনে। হাজার হাজার নিরুত্তর প্রশ্নের আড়ালে কেটে যায় চারটে বছর। শ্বশুরমশাই খুব অসুস্থ, ডাক্তার জবাব দিয়ে দিয়েছে। প্রাণপণে চেষ্টা করে চলেছে কুমুদিনী, কিন্তু ভগবান শেষ অবধি সঙ্গ দিলেন না। দুমাসের মধ্যে চলে গেলেন সমীরের বাবা।

সারাদিন বাড়িতে একা একা কাটে কুমুদিনীর। অরি নতুন স্কুলে ভর্তি হয়েছে। সমীরের কাছে তো আর কিছু আশাই করে না। অনেক ভেবে ঠিক করল যদি একটা কিছু চাকরি বা ঘরে বসে কিছু করা গেলে খারাপ হয় না। ভাবল কথাটা সমীর কে জানানো দরকার। সেদিন রাতে ডিনারের পর সমীর স্টাডিতে বসে অফিসের কিছু কাজ করছিল।

‘আসব?’, আস্তে করে দরজাটা খুলে অনুমতি চাইল কুমুদিনী।

‘ও তুমি? এসো, ইনফ্যাক্ট আমি তোমাকেই ডাকব ভাবছিলাম।’

‘তুমি ঠিক বলছ?’, বিশ্বাস হয় না কুমুদিনীর।

‘ডাকতে তো হতই, কথা রাখার সময় এসেছে যে। মনে আছে তো?’

বুকটা ছ্যাঁৎ করে ওঠে কুমুদিনীর। তার মানে সমীর…..

‘ডোন্ট ওয়ারি, তোমার জন্য একটা গুড নিউজ ও আছে। একটা কোম্পানিতে কথা বলেছি তোমার জন্য। মোটামুটি ইজি জব, যা স্যালারি পাবে তাতে দুজনের ভালোভাবে চলে যাবে। আর আমি মাসে মাসে যা পাঠাব তাতে….’

‘কবে বিয়ে করছ?

‘হঠাৎ এই প্রশ্ন?’, চমকে যায় সমীর।

‘না মানে সেই অনুযায়ী ডিভোর্স পেপারটা পাঠিয়ে দিও।’

‘পাঠাবো মানে? কোথায় যাচ্ছ তুমি?’

‘আমরা, আমি আর আমার ছেলে যাচ্ছি। অনেক ভেবেছ তুমি আমাদের জন্য। অনেক ধন্যবাদ।’, সপাটে দরজাটা মুখের উপর বন্ধ করে চলে যায় কুমুদিনী।

ছেলের অনেক প্রশ্নের উত্তর দিয়ে আর জিনিসপত্র সব‌‌‌ গুছিয়ে নিয়ে রাতে আর ঘুমানোর সময় হয়নি কুমুদিনীর। সকালে উঠে সমীরের ঘরে একবার উঁকি দিল,কাল রাতে স্টাডিতেই ঘুমিয়ে পড়েছে সমীর। আলতো করে দরজাটা ঠেলে ঢুকল কুমুদিনী। অঘোরে ঘুমাচ্ছে ওর স্বামী, অনেকটা নিশ্চিন্ত লাগছে ওর মুখটা দেখে। সেটাই তো স্বাভাবিক। বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো কুমুদিনীর, মিথ্যে হলেও সংসারটা তো ছিল। জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছা করল সমীরকে। এতগুলো বছরে একটি বারের জন্যও কি আমাকে ভালোবাসতে পারেনি? আমি কি এতটাই অযোগ্য? আচ্ছা আমার চাকরির ব্যবস্থা করে দেওয়ার মধ্যে কি কোথাও ওর ভালোবাসা লুকিয়ে আছে? ও কি তবে আমার পরীক্ষা নিচ্ছে? অজস্র সান্ত্বনার জালে নিজেকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলতে চায় কুমুদিনী। সমীরের ফোনটা অনেকক্ষণ ধরে ভাইব্রেট করছে। একটা আনসেভড নম্বর, রিসিভ করল  কুমুদিনী। কিন্তু হ্যালো বলার আগেই-

“কাল রাতে কথা হয়েছে কুমুদিনীর সাথে? চাকরির কথাটা বলেছ তো? বাবা আজ সন্ধ্যায় তোমাকে আসতে বলেছে। ডিভোর্সের ব্যাপারটা নিয়ে দত্ত কাকু কথা বলবেন, উনি ও আসবেন। সব মিটলে এবার বিয়েটা ফাইনাল করবে বাবা মা। কি হলো তুমি কিছু বলছ না যে?’

‘আপনাদের বিয়ের জন্য অগ্রিম শুভেচ্ছা রইল’, দৃঢ় স্বরে জবাব দিল কুমুদিনী, ‘চিন্তা করবেন না, সমীরকে আমি মুক্তি দিয়ে দিলাম।’

অন্যদিক থেকে কিছু বলার আগেই ফোনটা কেটে দিল কুমুদিনী। আর কিছু শোনার বা বলার মতো ক্ষমতা ওর নেই। এতক্ষণ ধরে যে মিথ্যে পৃথিবীর স্বপ্ন দেখছিল তার এক নিমিষে ভেঙে তছনছ হয়ে গেল। সমীর এখনো ঘুমাচ্ছে, ওর মুখের শান্ত ভাবের কারণটা এখন পরিষ্কার কুমুদিনীর কাছে।

‘বাবা যাবে না আমাদের সাথে?’, ছোট্ট অরির প্রশ্নের সম্মুখীন সমীর আর কুমুদিনী।

‘না সোনা, তোমার বাবার এখন অনেক কাজ সামনে। নতুন অতিথি আসবে যে বাড়িতে।’

সমীর অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে কুমুদিনীর দিকে।

‘ কি ভাবছ? আমি কি করে জানলাম? সংসারটা তোমার জন্য মিথ্যে হলেও আমি কখনো তা ভাবিনি। তোমাকে একটু হলেও তো চিনেছি। গত চার বছর ধরে যে সম্পর্কটাকে পরিণতি দিতে পারোনি, আজ তাকে স্বীকার করে নাও। এটুকু দেখে অন্তত শান্তি পাব যে কেউ তো তোমার দ্বারা স্বীকৃতি পেল। আর ধন্যবাদ, চার বছর আগের আমার দেওয়া প্রতিশ্রুতিটা এত সুন্দর ভাবে মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য। ভালো থেকো সমীর।’

এই প্রথম সমীরকে তার নাম ধরে ডাকলো কুমুদিনী। একফোঁটা জল ও মেয়েটার চোখের কোণে লেগে ছিল না সেদিন।

_____


ADMIN

Author: ADMIN

Comments

Please Login to comment