মহামানবের সাগরতীরে-  সমর্পণ মজুমদার

 

   রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন “এই ভারতের মহামানবের সাগরতীরে”, যা খুব অল্প কথায় ব‍্যাখ‍্যা করে দিচ্ছে ভারতবর্ষের মহান চিরন্তন সামগ্রিকতাটিকে। সভ‍্যতার জন্মস্থান এই ভারতবর্ষে পৃথিবী বারবার এসেছে, ভাবের আদান-প্রদান করেছে, শিল্প-বিজ্ঞান-সাহিত‍্যের বিনিময় করেছে। কেউ ভালোবেসে থেকে গিয়েছে চিরকালের তরে। আজ বোধহয় পৃথিবীর সমস্ত জাতির মানুষ ভারতবর্ষের বিভিন্ন স্থানে সদলবলে বসবাস করেন। ভারতের মহান ইতিহাসে বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন স্থানে, বিভিন্ন জাতির মানুষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা হয়েছে। তাদের আগমণ, অবস্থান, অবদানের বহু কথা চাপা পড়ে গেছে, সুখ-দুঃখের বিভিন্ন ঘটনা মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে আমাদের দেশীয়দের সঙ্গে। ভারতের আত্মা প্রবেশ করেছে তাদের মধ্যে। প্রেমের চরম উষ্ণতা অনুভূত হয়েছে তাদের মধ্যে। আমরা সামগ্রিকভাবে হয়ে উঠেছি ভারতবর্ষ !

        এর একটা বড় কারণ নিশ্চয়ই ভারতবর্ষের প্রাকৃতিক অবস্থান, তার গম্ভীরা অরণ‍্য, রহস্যময় স্হানমাহাত্ম‍্য, বৈচিত্র্যপূর্ণ রঙীন পরিবেশ ! আর ততটাই গুরুত্বপূর্ণ হলো এদেশের মানুষ ও তাঁদের সংস্কৃতি ! অন্তর্জগৎ চিরকাল বহির্জগতের প্রভাবে গড়ে ওঠে। ব‍্যক্তি ও জাতি উভয়ের ক্ষেত্রেই এমন হয়। সুতরাং ভারতীয়দের মন, সমাজ, সভ‍্যতা, সংস্কৃতি, জীবন যাপন, আচার আচরণ, রীতি নীতি, রুচিবোধ সমস্তকিছুই হয়েছে বহির্জগতের মতো রঙীন, শক্তিপূর্ণ, বিচিত্র ! চিন্তাশীলতায় বেড়ে উঠেছে আমাদের সভ‍্যতা। নৈতিক মেরুদন্ড ঠিক থাকলেই পবিত্রভাবে জাগতিক সুখ স্বাচ্ছন্দ্যের চরম স্হান অর্জন করা যায়, এটা বেশ বুঝেছিলেন আমাদের পূর্বপুরুষরা। ভারতে আসা তৎকালীন বিদেশী পর্যটকদের কথায়, “একজন হিন্দু মিথ্যা কথা বলে অথবা একজন হিন্দু নারী অসতী হয়, ইহা শোনা যায় না”! ব‍্যবহারিক বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায়, চরম জ্ঞানসমৃদ্ধ দর্শনের প্রত‍্যেকটি কোণায়, সাহিত্যরসের বিশাল সমুদ্রে, শিল্পের চরম উৎকর্ষতায় ভারতের বিচরণ ছিল অত‍্যন্ত স্বাভাবিকভাবেই ! ধর্মীয় সত‍্য আমাদের জ্ঞান দিয়ে করেছে সমৃদ্ধ ও যোগের তেজ আমাদের দিয়েছে কর্মের দৃঢ়তা !

           ভারতবর্ষের সুন্দর, মনোরম ও বসবাসের জন্য অত্যন্ত উপযোগী ভৌগলিক পরিবেশ, অতিথি পরায়ণ মানুষজন, ধনসম্পত্তির প্রাচুর্য স্বাভাবিকভাবেই সারা বিশ্বকে আকর্ষণ করেছিল। স্থান দিয়েছিল কোলে। কিন্তু সবাই মুগ্ধতায় মজে, ভালোবাসা নিয়ে আসেনি। অনেকে এসেছে তার বর্বরতা নিয়ে হাতিয়ার উঁচু করে, দলন করার ও শোষণ করার মানসিকতা নিয়ে। একটা সময় ভারতের সবচেয়ে বড় যে গুণ, সেই ঐক‍্যেরই অভাবে, বিদেশীদের কাছে বারেবারে নত হয়েছি আমরা। ভারতবর্ষে যদিও বীরের অভাব নেই। কিন্তু তা সত্ত্বেও, একটা বিশেষ সময়কাল ধরে একটানা বহুদিন যাবৎ বিদেশীর পায়ের তলায় থাকতে হয়েছিল শুধুমাত্র ঐক‍্যের অভাবে।

ভারতের অধঃপতন সেদিনই শুরু হয়েছিল, যেদিন সত্যের চরম স্পর্শ লাভ করা হিন্দুধর্মের প্রধানেরা নিজেদেরকে অহংকারে, দম্ভে, আত্মম্ভরিতায় ডুবিয়ে দিয়েছিলেন। সকলের থেকে আলাদা ভাবতে শুরু করেছিলেন। আর তখনই রোপিত হয়েছিল আলাদা হবার অর্থাৎ অনৈক্যের বীজ ! দুর্বল হয়ে পড়েছিল হিন্দুসমাজ। তারপর বারংবার আক্রমণে ভারতের একচেটিয়া শক্তিশালী ক্ষত্রিয় হয়ে উঠতে বেশি বেগ পেতে হয়নি ইসলামকে। পাঠান-তুর্কি-তাতারের বর্বরতার পর মোগলীয় পৃষ্ঠপোষকতায় আবার ভারতের সৃষ্টিশীলতা জেগে উঠেছিল সামান্য কিছুদিনের জন্য। পর্তুগিজ, দানেরীয়, ওলন্দাজি, আর্মেনীয়, ফরাসি, ইংরিজির ঝড়ে ভারত এলোমেলো হয়ে যেতে লাগলো। শিক্ষাদীক্ষা হয়ে উঠেছিল শুধুমাত্র বড়োলোকের একচেটিয়া অধিকার। জাতপাতের সীমাবদ্ধতায় জর্জরিত হয়ে গিয়েছিল সমাজ। সভ্যতার গুরুদেব এই মহান ভারতবর্ষ, দাসত্ব শুরু করলেন বিদেশীদের। অতঃপর ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে আমাদের চিরশানিত ও ঊর্বরা মস্তিষ্কে জমা দুষণের কিছুটা অপসারণ হলো। কিছুদিনের জন্য হলেও আবার জেগে উঠেছিলো ভারতের গৌরব। শেষমেষ অনাহার, দারিদ্রের মত ভয়ানক অবস্থা কাঁধে নিয়ে, পরাধীনতার অভিশাপ ঘুচল ভারতের। কিন্তু এখনো ভারতীয় সমাজ বুঝলো না সে আসলে কে !

            আজকে ভারতবর্ষ বিশ্বের দ্রুততম উন্নতিশীল অর্থনীতি। অনেক অনেক ঝড় ঝাপটা, প্রলয় কাটিয়ে আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠছি আমরা। হিমালয়ে শুরু হয়েছে প্রবল তুষার ঝড়, ভারত মহাসাগরের গর্জন শোনা যাচ্ছে ! কিন্তু হায়, এসবই যেন ক্ষণিকের তরে। সব যেন এলোমেলো, বিশৃঙ্খলায় ভরপুর। অসাম‍্য, অনৈক্য চারপাশে ছড়িয়ে পড়েছে।  বিবিধ সমস্যায় আজও জড়িয়ে রয়েছি আমরা। আমাদের ফিরিয়ে আনতে হবে সেই মহান বিজ্ঞান, যা আমাদের দৃঢ় করেছিল। আমাদের সেই বিজ্ঞান “যোগশাস্ত্র” ছড়িয়ে দিতে হবে মানুষের জীবনে। তারপর “জগতসভায় শ্রেষ্ঠ আসন লাভ” করা, শুধু কিছু সময় অপেক্ষা হয়ে দাঁড়াবে !!

____


FavoriteLoading Add to library

Up next

ইলিশ মাছ ভাপা - মালা নাথ    "একে তো ফাগুন মাস দারুণ এ সময় লেগেছে ভীষণ চোট কী জানি কী হয়, অঙ্গে চোট পেলে সে ব্যথা সারাবার হাজার রকমের ঔষধি আছে তার, মরমে...
সমাপতন - সৌম্য ভৌমিক   কলম যখন যায় শুকিয়ে একলা ঘরে মুখ লুকিয়ে কাঁদি সঙ্গোপনে , ভাবনা যখন কাছে আসে না স্বপ্ন চোখে আর ভাসে না থাকি ঘরের কোণে । শ...
প্রমাণ – সৌম্যদীপ সৎপতি... "আরে আরে, রাজেন না কি? কদ্দিন পর দেখা, এত রাত্রে বনের পথে যাচ্ছ একা একা? একসঙ্গেই যাওয়া যাবে, বাড়ি ফিরছ না কি? চলো তবে, আমিও এখন কাছাকাছিই থাকি। ...
রক্তাত্ব – সৌভিক মল্লিক... একটা লম্বা ঘর এই পৃথিবী, ছাদের গায়ে ভালোবেসে আঁকড়ে ধরে আছে ফাটল। ফাটলে চুইয়ে চুইয়ে রাস্তা বানিয়ে নেয় রক্ত, সেই রক্তে সভ্যতা আর গণতন্ত্রের বাদল। ...
অবিশ্বাস্য সেই রাত – শাশ্বতী সেনগুপ্ত... বাসে বসে বসেই বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে হয়ে গেল। অমিত ড্রাইভারের পাশের সিটে বসে ‘আর কতদূর’ জিজ্ঞাসা করতেই ড্রাইভার উত্তর দিল, ‘অর থোড়াসা’। অফিসের কাজ নিয়ে এ...
ADMIN

Author: ADMIN

Comments

Please Login to comment