প্রথম মিস্টার পারফেকশানিস্ট-  অস্থির কবি ( কল্লোল চক্রবর্ত্তী)

 

উত্তম পর্ব -তিন

 

ইদানিং বলিউডের আমির খানকে মিস্টার পারফেকশনিস্ট বলা হয়। যেমন এক কালে রাহুল দ্রাবিড়কে ওয়াল বলা হত। ক্রিকেট দেখা ছেড়ে দিয়েছি বহুকাল হল। আমাদের দাদাকে যখন থেকে পলিটিক্স করে বাদ দিয়ে দেয়া হল তখন থেকে। বাঙালীর দূর্ভাগ্য দাদার একটা শার্ট ওড়ানো যত লোকের মনে আছে লর্ডসের সেঞ্চুরী, বাইশ টা ওয়ান ডে সেঞ্চুরী, বহু পরে শুরু করে রেকর্ডে সচীনকে প্রায় ছুঁয়ে ফেলা আর সেঞ্চুরিয়নের ওয়ার্ল্ড কাপের ফাইনালে ওঠা টা ততটা হয়ত অনেকেরই স্মরনে মননে নেই। যাই হোক ২০১০ সাল থেকে ক্রিকেট দেখা ছাড়ার জন্য আমার কোন আক্ষেপ নেই তাতে এক দিকে আমার লাভ হয়েছে। উত্তম চর্চায় আরো গভীর মনোনিবেশ করতে পেরেছি। থিয়েটার ছেড়ে ২০১২ থেকে উত্তম কুমারকে ছ বছরে একদম আলাদা ভাবে  পেয়েছি। শৈশবের উত্তম নিয়ে লিখেছি। প্রথম যৌবনের উত্তমপ্রাপ্তি নিয়ে লেখা বাকি আছে এখনো। যাহোক ওয়াল বা পারফেকশনিস্ট এসব বিশেষন আমরা দিই মানুষকে তার কাজের নিরিখে। উত্তমকুমারকে কিন্তু সেই অর্থে প্রথম মিস্টার পারফেকশানিস্ট বলা যায়।
দেখুন উত্তম কুমার এমন একটা সাবজেক্ট যাকে এক এক বয়সে মানুষ এক এক ভাবে পায়। আবার কখনো তার পুরনো ছবি দেখলে মনে হয় প্রথম বার দেখছি, নতুন কিছু তাতে খুঁজে পাবেন। এটার কারন সেই সময়ের অসাধারন সব পরিচালক, সেই পরিবেশ আর তাল মিলিয়ে তার পারফেকশন। উত্তম কুমারের জীবনে বেশ কিছু টার্নিং পয়েন্ট এসেছে। কিছু ক্ষেত্রে তার ক্ষতি হয়েছে কিন্তু কিছু জিনিস তার ফেবারে গেছে দারুন ভাবে। ঘোড়া চালানো শেখা থেকে, ড্রাইভিং শেখা, হারমোনিয়াম বাজানো থেকে বেহালা বাজানো, পাগল সাজার জন্য পাগলকে ফলো করা তার অভিধানে কম্প্রোমাইজ বলে শব্দটি ছিল না কখনো।
যারা উত্তম কুমারকে এক দিন ফ্লপ মাস্টার জেনারেল বলেছিল তাদের কেউ পরে তাকে মহানায়ক বলে ডেকেছিল নাকি জানার বড্ড ইচ্ছে আছে। ফ্লপি বলে কেন ডাকবে না ? ফিল্ম ওয়ার্ল্ড বড় নির্দয় জায়গা। বড় কঠোর কঠিন জায়গা। আমার তো অবাক লাগে বারোটা ছবি পর পর মুখ থুবড়ে পড়ার পর টিকলেন কিভাবে! উনি কিন্তু ভাগ্যে বিশ্বাসী ছিলেন। হাত দেখিয়ে দেখিয়ে বলতেন এখানে লেখা ছিল আমি উত্তম কুমার হব তাই আমি উত্তম কুমার হয়েছি। হয়ত তাই। নইলে এক ছবি ফ্লপ হয়ে ফিল্ম জগত থেকে টা টা বাই বাই করা ল্যাজেগোবরের অভাব ফিল্ম জগতে নেই। আসলে উনি শুরুটা করেছিলেন আয়রন ডিটারমিনেশন নিয়ে। সেটা টাল খাচ্ছিল। ফার্স্ট টার্নিং পয়েন্ট বসু পরিবারের হিট হওয়াটা। দ্বিতীয় হল সাড়ে চুয়াত্তর। ওই রকম অল টাইম হিট।  তৃতীয় হল শ্যামলী নাটকে তার টানা স্টেজ শো করে যাওয়া। চতুর্থ অগ্নিপরীক্ষা আর শাপমোচন হিট হওয়া। যার ফলে পর পর কমার্শিয়াল ছবি এবং উত্তম সুচিত্রা মিথের জন্ম। এর পরের টার্নিং পয়েন্ট হল বেনুদির সাথে তার সংসার পাতা, তার পরেই আসবে নায়কে তার অভিনয়। এরপর এল ধাক্কা। ছোটিসি মুলাকাত। জীবনের সব চেয়ে বড় ভুল। এই অবধিই যাব আপাতত। এই লেখাটায় অন্তত। কারন পপুলারিটির চরম ধাপ তখন। কেরিয়ারের মধ্য গগন। এই যে মায়াডোর টু ছোটিসি ও তার পরবর্তী অভিনয় জীবন – এই যাত্রায় তার মধ্যে কি বদল এসেছে এটা বুঝতে হবে। ক্রমশ পারফেক্ট থেকে পারফেক্ট তর হয়েছেন। তাকে দেখেই কিন্তু রাজেশ খান্না থেকে ধর্মেন্দ্র অমিতাভ বচ্চন অনেক কিছু শিখেছেন। পরবর্তীকালে আমীর খান কে শুনলাম আমরা সবাই বলছে মিস্টার পারফেকশনিস্ট। কিন্তু আমীর যা করেছে কোন ক্যারাকটারে ঢুকতে ঢক্কানিনাদ করেছে তার চতুর্গূন। আমীর ভক্তরা ক্ষমা করবেন, উত্তমকুমার কিন্তু নিরবে নিজের কাজ করে গেছেন।
প্রতিটা চরিত্রকে জীবন্ত করার জন্য উত্তমকুমার সেই সাহিত্য টিকে আগে ভাল করে পড়তেন যার উপর সিনেমা তৈরি হচ্ছে। তার উপর চলত তার হোমওয়ার্ক। সেই চরিত্রকে যা যা করলে মানাবে তাই তাই করতেন আবার তাকে এটাও মাথায় রাখতে হত যে উত্তম কুমারকে সেই রূপে লোকে মেনে নেবে কিনা ! নায়ক চরিত্রে নায়কের মত করে আর ক্যারেকটার রোল যেখানে করছেন, সেখানে তার মত করে নিজেকে গড়ে পিঠে নেয়া। ডেডিকেশন। শুটিং চলাকালীন মেক আপ করতেন নিজের মাথা খাটিয়ে। সে ভাবেই তাকে সাজানো হত। অবশ্যই ডিরেক্টরের সাথে আলোচনা সাপেক্ষে। একটা সিন বার বার রি টেক। এ সবই তার ডেডিকেশনের প্রমান।
আমি টার্নিং পয়েন্ট গুলোর কথা বলেছি। যে টুকু বলেছি তা যেন অনেকটা সিঁড়ির মত। যা দিয়ে মানুষ ওপরে ওঠে। উত্তম কুমার সে ভাবেই উঠেছেন। প্রথমত বলি, সেযুগে নায়কেরা গান গাইত। সে কারনে তাকে রীতিমত গান শিখতে হয়েছিল। এটা যে তার কত কাজে লেগেছিল তা আমরা বিভিন্ন ছবিতে লিপিং এর সাথে ওনার জেসচারে বুঝতে পারি। হলিউড ছবিতে তো আর প্লেব্যাক হয় না কিন্তু ইন্ডিয়ান সিনেমায় আমি অন্তত এরম অদ্ভুত পারফেক্ট লিপিং আজ অবধি কাউকে করতে দেখিনি। শুধু তাই না, যখন হেমন্তবাবুর লিপে গাইছেন তখন মুখে সরল নিপাট ভাব, যখন মান্না বাবুর লিপে তখন ওস্তাদি চাল, আবার যখন শ্যামল মিত্রের লিপে গাইছেন তখন ঠিক যেভাবে দাঁড়িয়ে শ্যামলবাবু গাইতেন সেভাবেই গাইছেন আর অনেকটা বম্বে ধাঁচে সম্পুর্ণ খাপ খুলে বেরিয়েছেন তিনি কিশোর কুমারের গানে। কোথায় তার কাছে তখন পাত্তা পায় অন্যেরা।  যদিও দেব আনন্দ রাজেশ খান্না আর অমিতাভ বচ্চন ও কিশোর কুমারের গানে অসাধারন লিপ দিতেন বিশেষত রাজেশ খান্না।  রাজকুমারীতে খুব ভাল অ্যাডজাস্টমেন্ট টা হয়নি কিন্তু অমানুষ আনন্দ আশ্রম আর ওগো বধূ সুন্দরীতে যথেষ্টই ম্যাচ করেছে।  তবে সবার মত আমারো উত্তম হেমন্ত জুটি দারুন লাগে। মান্নাবাবু ও শ্যামলবাবু তার পরেই। যাহোক এখানে বিস্তারিত লিখতে গেলে পাতার পর পাতা শেষ হবে।
তবে প্রথমে বসু পরিবার আর সাড়ে চুয়াত্তরের হিট হওয়াটা তাকে বড় কনফিডেন্স দিয়েছিল। অগ্নিপরীক্ষা আর শাপমোচন তাকে পায়ের তলায় শক্ত মাটি দেয়। এরপরে একটা কথা, শ্যামলীর স্টেজ কিন্তু তাকে একটা দারুন সুযোগ ছিল ডাইরেক্ট দর্শকদের কাছে নিজেকে তুলে ধরবার এবং পরবর্তীকালে তা তার কাজেও এসেছে। বেনুদির সাথে তিনি সংসার পাতায় একটা সুবিধা ছিল। যেহেতু নিজে অভিনেত্রী কিছু কিছুতে রাগ করলেও অনেক ক্ষেত্রে উনি হয়ত সেই জগতের সমস্যা গুলো বুঝতেন। ফলে উত্তমকুমার তার কাছে অভিনয় নিয়ে আলোচনা করতে পারতেন। এটা কিন্তু তার স্টারডম ও অভিনয়ে  ছাপ ফেলেছিল যদিও কোন দিনই দর্শকদের বঞ্চিত করেন নি তিনি।
উত্তমকুমার একের পর এক চরিত্রকে তার রিয়ালিস্টিক অ্যাক্টিং দিয়ে জীবন্ত করে তুলেছিলেন।কিভাবে তিনি তার পারফেকশন ধরে রেখেছেন তা নিয়ে ছবি ধরে ধরে আলোচনা যদি আবার সুযোগ পাই নিশ্চই করব। তবে আপাতত কিছু চরিত্রের কথা মনে পড়ছে যেগুলো আমার খুবই প্রিয়। নায়কের অরিন্দম, বাঘবন্দীর ভবেশ বাড়ুজ্যে, স্ত্রীর মাধব দত্ত, অমানুষের মধু চৌধুরী। এসব যেন খাপে খাপ। উনি অ্যাক্টিং করছেন নাকি যদুবংশের গনা বা মৌচাকের নীতিশ সত্যি সত্যি কথা বলছে এগুলো কিন্তু দর্শককে  দোটানায় ফেলে দিতো। এগুলো সবই কিন্তু ছোটি সি মুলাকাতের পরের ঘটনা। দুই সংসারের নানা অশান্তির বোঝা মাথায় নিয়েও নিজের ক্রিয়েটিভিটির সাথে কোন আপোষ করেননি এমনই শিল্পী ছিলেন তিনি।
_____


FavoriteLoading Add to library
ADMIN

Author: ADMIN

Comments

Please Login to comment