অনুপ কুমার-আমার দৃষ্টিকোণে – অস্থির কবি(কল্লোল চক্রবর্তী)

জ একজন দিকপাল অভিনেতাকে নিয়ে আলোচনা করব তাঁর  নাম হল অনুপ কুমার দাস,যিনি সকলের কাছে অনুপ কুমার নামেই বেশী পরিচিত । অল্প বয়সে তিনি কিন্তু সিনেমা জগতে পা রাখেন। আমাদের সৌভাগ্য যে অনেকদিন পর্যন্ত আমরা তাঁকে পেয়েছি। শুরুটা কিন্তু উনি  উত্তম-সুচিত্রার আগেই করেছিলেন। ১৯৩৮ সালে ডিজি বা ধীরেন্দ্রনাথ গাঙ্গুলীর “হালখাতা” ছবিতে। ওনার প্রথম দিককার ছবির মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছবি হলো “বিদ্যাসাগর”, “বাঁশের কেল্লা”, “পাশের বাড়ি”, “বরযাত্রী”, “পথে হল দেরি”,  “অগ্নি পরীক্ষা”, “অন্নপূর্নার মন্দির”, কানন বালার “দেবত্র”, ভানু ব্যানার্জীর “জয় মা কালী বোর্ডিং”, তপন সিনহার “টনসিল”, “গলি থেকে রাজপথ”, “একটি রাত” এইসব ছবি যার কিছু হয়তো ক্যারেক্টার রোল আর কিছু কমেডিয়ান।

পরবর্তীকালে তাঁকে তরুণ মজুমদার অন্যধরনের সিনেমা করার সুযোগ দিয়েছিলেন। একদম রোমান্টিক নায়ক চরিত্র । সন্ধ্যা রায়ের সাথে জুটি বেঁধে “পলাতক”, “ঠগিনী”, “নিমন্ত্রন”, “আলোর পিপাসা”, “একটুকু বাসা”, অরবিন্দ মুখার্জীর “নতুন জীবন”, রাজেন তরফদারের “জীবন কাহিনী”, অন্য ধরণের পারিবারিক রোল করেন উত্তমকুমারের সাথে “নিশিপদ্ম”, “কলঙ্কিত নায়ক”, “বিরাজ বৌ” । আরেকটু বয়েস বাড়তে অনেক ছবিতে  কমেডি করে মাতিয়ে দেন যেমন “রাগ অনুরাগ”, “ফুলেশ্বরী”, “মৌচাক”, “প্রতিশোধ”, “টগরী”, “ঘটকালী”, “দাদার কীর্তি”, “শত্রু”, “ভালোবাসা ভালোবাসা”, “অনুরাগের ছোঁয়া” , “সুরের আকাশে”, “ইন্দ্রজিৎ”, “প্রিয়া”, “মন মানে না” ইত্যাদি। বেশ কিছু ছবিতে মানবিক অভিনয় করেন। যেমন মনে পড়ে অঞ্জন চৌধুরীর ছবি “মঙ্গলদীপ” এবং খুব সুন্দর মানিয়েছিল আরেকটি অঞ্জন বাবুর ছবি – “সংঘর্ষ”।

একই ধরনের ক্যারেকটার রোল করেন “নবাব” – এ। নীতিশ রায়ের ছবি – “এক পশলা বৃষ্টি”। অঞ্জন চৌধুরী বেশ কিছু সিনেমায় একদম ১০০% সিরিয়াস বা কিছুটা ট্র‍্যাজিক ক্যারেকটার রোলে ওনাকে ব্যবহার করেছিলেন।  উনি এতটাই ভার্সেটাইল অ্যাক্টর ছিলেন যে জীবনে কোনদিন কোন ধরনের অভিনয়েই তাকে মাত দেয়া যায়নি। ব্যক্তিগত জীবনে মানুষটি ছিলেন ভীষণ ভাল। বামপন্থী ছিলেন। অভিনেতৃ সংঘ ছিল তাঁর সংগঠন। কিন্তু উত্তমকুমার যেদিন মারা যান, হাউ হাউ করে কেঁদেছিলেন যে কান্নায় কোনরকম লোকদেখানি ব্যাপার ছিল না।

অভিনয়ের রেঞ্জ এতটাই বেশী ছিল যে কমেডি করতে করতে কখন যে স্বাভাবিক অভিনয় করছেন আবার কখন যে ভীষণ  সিরিয়াস হয়ে যাচ্ছেন এই যে কুইক চেঞ্জটা আনতেন সেটা খুব কম অভিনেতাদের ক্ষেত্রেই দেখা যায়। অনুপ কুমার নাটকেও অভিনয় করতেন এবং শোনা যায় তার ইম্প্রোভাইজেশন বিখ্যাত ছিল। একই নাটকে একই চরিত্রে তিন দিন তাঁর অভিনয় সেম টু সেম হত না। কিছু না কিছু ইম্প্রোভাইজ করতেনই। রিহার্সালে যা করতেন,  অন স্টেজ তার থেকে অনেক ভাল করতেন। ফলে ফেটে বেরিয়ে যেত তার ক্যারেক্টার। অনেক বাঘা বাঘা অভিনেতারাও অনুপ কুমারের সাথে অভিনয় করার সময় সতর্ক থাকতেন।

গান পিকচারাইজেশনেও তাঁর কমেডি এক দেখবার মত বিষয় ছিল। “দাদার কীর্তি” গান তো আছেই, তাছাড়া “প্রতিশোধ” ছবির – “হয়তো আমাকে কারো মনে নেই” এবং “মিলন তিথির পূর্নিমা চাঁদ” গান দুটিতে এমন অঙ্গভঙ্গি করেন যে দর্শক হেসেই খুন। অঞ্জন চৌধুরীর ছবি “ইন্দ্রজিৎ” এ – “মন হয়েছে ঝাড়ের বাতি” গানটি শুধু তাঁর উপরেই পিকচারাইজ করা হয়। শেষ বয়েসেও এ গানের লিপিং ও অভিব্যক্তিতে  তিনি চিনিয়ে দিয়েছিলেন নিজের জাত।

শেষ দিকে তিনি জটায়ুর রোল ও করেন সন্দীপ রায়ের টেলি সিরিজে। যদিও সেই চরিত্রটি এতটাই অভিশপ্ত যে একের পর এক অভিনেতার সেই চরিত্র করার পর মৃত্যু হয়েছিল। এও এক রহস্য। সন্তোষ দত্ত, রবি ঘোষ, অনুপ কুমারের পর ভক্ত প্রহ্লাদ এর মাস্টার বিভু – বিভু ভট্টাচার্য্য ও এই রোল করে মারা যান। “ঠগিনী” শেষ দৃশ্যটা মনে করুন। ঠগিনী সন্ধ্যা রায় তাঁকে প্রনাম করে বিদায় নিচ্ছেন। মন থেকে ভালবেসে ফেলেছেন তাঁকে । তাই গয়নাগুলো রেখে দিয়ে চলে যাচ্ছেন। হঠাৎ জ্বলে উঠল আলো। ফোকাস অনুপকুমারের মুখে। বলছেন – “ওগুলো রেখে যাচ্ছো কেন।  নিয়ে যাও”। সন্ধ্যা রায় কাঁদছেন। সাথে কেঁদে উঠছে দর্শক। সবার চোখে জল। অনুপ কুমার কথা বলেই চলেছেন। একজন শিল্পীর রোল এ কি অসাধারন অভিনয়।

তরুনবাবুর মত বিদ্বান পরিচালক না থাকলে এই অনুপকুমার কে কি আমরা কখনো পেতাম ?  কে জানে ?

 

_____


FavoriteLoading Add to library

Up next

অসুখ – তমালী চক্রবর্ত্তী... "ডাক্তারবাবু হামার মরদ কে দয়া করে বাঁচিয়ে লিন।" - প্রবল কান্নায় ভেঙে পড়ল লছমী। গত রাত থেকে অসহ্য পেটের ব্যাথায় কাতরাচ্ছে বাবুলাল। আজ তাই লছমী বাবুলাল ...
আমি তোমায় ভালোবাসি – সুব্রত কুমার ঘোষ... কথাটা তোমায় বলবো ভেবেছিলাম তবুও আর বলা হয়ে ওঠেনি বক বক করা অজস্র শব্দ প্রলাপ হয়ে আছে তারা আর কথা হয়ে ওঠেনি। যে নদী সমুদ্র পায় না থেমে যায় মাঝপথে ...
প্রথম মিস্টার পারফেকশানিস্ট-  অস্থির কবি ( কল্লোল ...   উত্তম পর্ব -তিন   ইদানিং বলিউডের আমির খানকে মিস্টার পারফেকশনিস্ট বলা হয়। যেমন এক কালে রাহুল দ্রাবিড়কে ওয়াল বলা হত। ক্রিকেট দেখা ছেড়ে দি...
নষ্ট প্রেম – প্রিয়তোষ ব্যানার্জী... দু হাত দিয়ে মেখেছি তোমার লজ্জার আবীর গোপনে, নির্জনে,অন্দ্ধকারে ছুঁয়েছি শরীর - তোমার ঠোঁটের মধ্যে খুঁজেছি উত্তেজনা রক্তিম গালে পেতে চেয়েছি সুখ কামনা...
সে যে মানে না মানা বলেছিলাম অনেক কথা বলিনি তবে কিছু গোপন থেকে সব কথাকে ই বলে দিয়েছি কিন্তু,বুঝলেন না!গুলিয়ে গেলো,আমার ও ঘেঁটে ঘ,প্রেম কিন্তু বড্ড জটিল,প্রেম জটিলতার জট!"...
ADMIN

Author: ADMIN

Comments

Please Login to comment