ঢুলুদা ও উত্তমকুমার – অস্থির কবি(কল্লোল চক্রবর্তী)

বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে এমন কিছু গুনী মানুষ এখানে ছবি পরিচালনায় এসেছেন যাঁরা নিজেদের একটা জায়গাই শুধু তৈরী করেননি, বাংলা ছবির গুনমানকে সর্বোচ্চ স্তরে নিয়ে গেছেন। এমনই এক মানুষ হলেন ঢুলুদা ওরফে অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়। তাঁর আর একটি সহজ পরিচয় আছে। তা হল সাহিত্যিক বনফুল ওরফে ডা: বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়ের ভাই। নিজস্ব স্টাইলে একের পর এক সাহিত্যভিত্তিক মজাদার ছবি বানানোটাই ছিল তাঁর বিশেষত্ব। কমন বাঙালীর সাধারন জীবনের আবেগ পূর্ন রসবোধ তার মধ্যে মিলেমিশে যেত। বিভিন্ন ধরনের সাবজেক্ট নিয়ে ছবি করেছেন অরবিন্দ বাবু। তার মধ্যে উত্তমকুমারের সাথে তার ছবির সংখ্যা মোট ৪ টি – ‘নিশিপদ্ম’, ‘ধন্যি মেয়ে’, ‘মৌচাক’ এবং ‘অগ্নীশ্বর’। চারটিই সুপারডুপার হিট সিনেমা।

অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়ের জীবনে একটা মজার ঘটনা আছে। অল্প বয়সে উনি একবার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে দেখা করতে যান। কোন শুভাকাঙ্খী সম্ভবত তাঁকে বলে দিয়েছিল, গুরুদেব কানে একটু কম শোনেন। রবীন্দ্রনাথের মুখোমুখি বসে যুবক ঢুলু ওরফে অরবিন্দ। রবিঠাকুর তাঁকে শুধালেন – তোমার নাম কি ?  উনি দেখলেন অরবিন্দ বললে কবিগুরু চিনবেন না। চিৎকার করে বললেন – আমি বলাইয়ের ভাই। বলার সময় তাঁর কথার ডেসিবেল রবিঠাকুরের কানে গিয়ে বিঁধল। তিনি জবাব দিলেন – তা তোমার নাম কি, সানাই নাকি ?? এইসব রুচিশীল মজাগুলোই কিন্তু পরবর্তীকালে আমরা অরবিন্দ মুখার্জীর বিভিন্ন ছবিতে দেখে থাকি। জীবনে যখন মজাদার কিছু দেখেছেন তাকে নোট করে রেখেছেন এবং বুদ্ধি করে তাকে নিজের ছবিতে ব্যবহার করেছেন যা বড় ডিরেক্টরের পরিচয় ও ছবি হিট করানোর অন্যতম ফর্মুলা।

ঢুলুদার পরিচালনায় অনেকগুলো সিনেমায় উত্তম কুমার অভিনয় করেছিলেন। প্রথম ছবি ‘নিশিপদ্ম’  ১৯৬৯ সালে রিলিজ হয়।এরপর ১৯৭১ এ ‘ধন্যি মেয়ে’ এবং এরপর ১৯৭৩ এ ‘মৌচাক’ এবং শেষ ছবি ১৯৭৫ সালে ‘অগ্নিশ্বর’। এই সিনেমাগুলো আলাদাভাবে মানুষের মনে জায়গা করে নিয়েছে। এই জুটি যদি আরো বেশী সিনেমা করত আরো কিছু মণিমানিক্য আমরা হয়তো পেতাম। ঢুলুদা অনেকদিন বেঁচে ছিলেন। উত্তম কুমার ততদিন বাঁচলে আরো হাফ ডজন ইউনিক ছবি যে এই জুটির কাছ থেকে আমরা উপহার পেতাম তা বলাই বাহুল্য।

শুরু করা যাক ‘নিশিপদ্ম’ ছবির কথায়। এই ছবিটি গ্রামের সাধারণ মেয়ের  নিষিদ্ধ পল্লীতে চলে যাওয়া এবং তারপর সুস্থ স্বাভাবিক সামাজিক জীবনের সাথে তার যে টানাপোড়েন তা তিনি ছবি জুড়ে সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন। এই ছবিটি বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়  এর ‘হিংয়ের কচুরি’ নামে  একটি মাত্র দুপাতার ছোটগল্প থেকে নেয়া। এর চিত্রনাট্যটি তৈরি করেছিলেন অরবিন্দ মুখোপাধ্যায় স্বয়ং। ‘রাজার পঙ্খী’ গানটিও অরবিন্দ বাবু নিজেই লিখেছিলেন। আরেকটি গান -‘আজ রাতে আর যাত্রা শুনতে যাব না’, মূল চিত্রনাট্যে ছিল না। গৌরীবাবু মানে গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার অন্য কোন ছবির জন্য এই গানটি লিখেছিলেন। সেটা এই সিনেমায় ঢোকান অরবিন্দ বাবু। জহর রায় অভিনীত ‘নটবর’ চরিত্রটির আগমন সেই সূত্রেই ঘটে। চরিত্রটি মূল চিত্রনাট্যে ছিলই না। গানটি সুপারডুপার হিট হয়। উত্তম কুমার, সাবিত্রী চ্যাটার্জী এই ছবিতে অসাধারণ অভিনয় করেন। ছবিটি সুপারডুপার হিট হয় এবং পরবর্তীকালে বম্বেতে রিমেক হয়। সেই ছবির তখন নাম হয় ‘অমর প্রেম’। এই ‘অমর প্রেম’ ছবিটিতে অভিনয় করেছিলেন রাজেশ খান্না। এবং তার নায়িকা ছিলেন শর্মিলা ঠাকুর। এই ছবিতে অভিনয় করার জন্য রাজেশ খান্না সিনেমাটি ২৭ বার দেখেছিলেন। দেখতে দেখতেই তিনি উত্তমকুমারের ভক্ত হয়ে যান। তিনি বলেছিলেন, দাদা আমি অনেক চেষ্টা করেছি। কিন্তু আপনার মত হয়নি। পরবর্তীকালেও বহুবার তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন যে এই ছবিটি উত্তম কুমারের মত তিনি অভিনয় করতে পারেননি যদিও বাংলা ‘নিশিপদ্ম’ এর মতো বোম্বের ‘অমর প্রেম’  সুপার-ডুপার হিট হয়েছিল আর রাহুল দেব বর্মনের সুরে গানগুলো তো এত সুন্দর হয় যে আজও মানুষের চিত্ত হরণ করে। বাংলার একটি সামান্য ছোটগল্প তা সে কি বিশাল পরিনতি পেয়েছিল ভাবা যায়! সেই যুগে বাংলা সাহিত্যের মান কোন জায়গায় ছিল এই একটি উদাহরনই তার জন্য যথেষ্ট।

এরপরে কথা হবে ‘ধন্যি মেয়ে’ ছবি নিয়ে। সেই ছবিতে যিনি প্রযোজক ছিলেন অর্থাৎ চন্ডীমাতা ফিল্মসের কর্ণধার সত্যনারায়ন খাঁ,  তার নিজের যে গ্রাম অর্থাৎ হাওড়ার জগতবল্লভপুরের গোহালপোতা, সেখানে তিনি এই ছবিটির শুটিং করিয়েছিলেন। সেই গ্রামে গেলে এখনো সেই ধন্যি মেয়ের শুটিং স্পটগুলি দেখতে পাওয়া যাবে চাক্ষুষ। যে কেউ সেখানে গেলে দেখতে পাবে সে খেলার মাঠটি । সেই বাড়িটি যেটা সত্যনারায়ন বাবুর নিজের বাড়ি। সেই স্কুল বাড়িটি যেখানে কলকাতার দলকে থাকতে দেয়া হয়েছিল। সেই চায়ের দোকানটি যেখানে ‘এ ব্যথা কি যে ব্যথা’ শুট হয়েছিল। হাওড়া স্টেশন থেকে জগৎবল্লভপুরে তখন ন্যারো গেজের লাইন ছিল। সেখানে দু কামরার একটি ট্রেন চলত। তাতেই সব খেলার সেরা বাঙালীর তুমি ফুটবল গানটার শুটিং হয়। ‘ধন্যি মেয়ে’ ছবিতে উত্তমকুমার ফুটবল পাগল এক দাদার ভূমিকায় অসাধারণ অভিনয় করেছিলেন। ভাল অভিনয় করেন সুখেন দাস ও। ছিলেন নবাগতা জয়া ভাদুড়ী যিনি পরে বম্বের মস্ত নায়িকা হন ও অমিতাভ বচ্চনকে বিয়ের পর জয়া বচ্চন নামে পরিচিত হন। যদিও কখনো উনি তার অরবিন্দ কাকাকে ভোলেননি। এই ছবির টাইটেল কার্ড ডিজাইন করেন বিখ্যাত কার্টুনিস্ট চন্ডী লাহিড়ী। এত সুন্দর সেরিব্রাল অথচ মজাদার ছবি অরবিন্দ মুখোপাধ্যায় ছাড়া কারো হাত থেকেই বের হতোই না ।

এরপর আসবো ‘মৌচাক’ ছবির প্রসঙ্গে। অসাধারণ ছবি । বাংলা সাহিত্যে এক অনবদ্য গল্প ছিল সমরেশ বসুর – ‘সেই ফুল ফোটে’। সেই গল্পটি কে নিয়ে অরবিন্দ বাবু  ‘সেই ফুল ফোটে’ ছবির পরিকল্পনা করেন কিন্তু পরবর্তীকালে সেই ছবির নাম পাল্টে ‘মৌচাক’ রাখা হয় । ‘মৌচাক’ এ অসাধারণ অভিনয় করেছিলেন উত্তম কুমার, রঞ্জিত মল্লিক, মিঠু মুখার্জী, সাবিত্রী চ্যাটার্জি, রত্না ঘোষাল, রবি ঘোষ, অনুপ কুমার, শেখর চ্যাটার্জী, তরুণ কুমার প্রমুখেরা। ছবির গানগুলো সেই সময় খুব বিখ্যাত হয়েছিল। স্টাইলে এই সিনেমায় উত্তমকুমারকে রাজকীয় লেগেছিল। সিগারেটটা হাতে নিয়ে তার সেই সংলাপ আজো কানে বাজে – ‘আপনি তো দেবতুল্য লোক মশাই। আপনার একটা  ছবি হবে, বাঁধিয়ে রাখব’। উত্তম কুমারের রাজকীয়তার পাশাপাশি ছিল রঞ্জিত মল্লিকের সরলতা, মিঠু মুখার্জীর কোমলতা, সাবিত্রীর কঠোরতা ও রত্না ঘোষালের চপলতা। মাটুদি অর্থাৎ রত্না ঘোষাল আজো বিভিন্ন জায়গায় – লিডিস ফিঙ্গার কথাটি খুব মজা করে বলেন এবং আজো সেটা তার গলায় শুনতে ইউনিক লাগে। এ ছবির টাইটেল কার্ড ও ডিজাইন করেন চন্ডীবাবু। না আছে বিদেশী লোকেশন, না আছে ভায়োলেন্স আর ভালগারিটি। তবুও বারবার এ ছবি দেখেও মন ভরে না।

এবার আসব এই জুটির শেষ ছবির প্রসঙ্গে। সেই ছবির নাম ‘অগ্নীশ্বর’। এবারের উপন্যাসটি কিন্তু তার দাদা বনফুলেরই লেখা। চরিত্রটি রিয়াল চরিত্র ছিল যিনি ছিলেন ডাক্তার বলাইচাঁদ বাবুর সিনিয়র প্রফেসর ডাক্তার। নীতি নিয়ে চলেন তাই চারিদিকে তার শত্রু। কিন্তু সবাইকে হারিয়ে কীভাবে তিনি গেয়ে উঠেছিলেন জীবনের জয়গান, তা নিয়েই ছবি। উত্তমকুমারের অভিনয় এ ছবিতে কিংবদন্তি হয়ে আছে। যেটা জানা যায় তা হল – প্রথম দিন শুটিং এর পর সবাই তারিফ করলেও উত্তমকুমারের তা মন:পুত হয়নি। পরদিন শুরু হয় আবার শুটিং। এবার উত্তম কুমার কোত্থেকে জোগাড় করে আনেন একটা চশমা আর সেই চশমাটা নাকের ডগায় নিয়ে  ডায়লগ বলা শুরু করেন। সেখানেই এই চরিত্রটি আলাদা ব্যাক্তিত্ব পেয়ে যায় এবং একদম মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে যায়। প্রথম ছবি কিছুক্ষণের পর অগ্নীশ্বরই তার সেরা ছবি এ কথা বলতে কখনো কুন্ঠা বোধ করেননি অরবিন্দ বাবু যদিও জনপ্রিয়তার বিচারে ঢুলুদার সেরা ছবি – ‘ধন্যি মেয়ে’। তার খুব কাছাকাছিই থাকবে ‘মৌচাক’। টিভিতে এই দুটো সিনেমা দিলে  আজো উত্তম ভক্ত বাঙালী কখনোই মিস করে না।

 


ADMIN

Author: ADMIN

Comments

Please Login to comment