অমানুষ, এক অমর উত্তম গাথা-

– অস্থির কবি (কল্লোল চক্রবর্ত্তী)

(উত্তম পর্ব ২)

ত্তম কুমারের প্রায় শেষ দিকের অভিনয় জীবনের এক মাস্টার স্ট্রোক হল – “অমানুষ”। এই ছবির পর তিনি বম্বেতে নিজের পুরানো বদনাম ঘোচান ও প্রমাণ করে দেন ঠিক সময়ে যোগ্য ডিরেক্টর পেলে তিনি শুধু বাংলার না, সারা ভারতের মহানায়ক হয়ে উঠতেন।

“অমানুষ” ছবিটির কথা বলতে গেলে ডবল শক্তির কথা মনে আসে প্রথমেই। একজন পরিচালক শক্তি সামন্ত আরেকজন এই ছবির উপন্যাস নয়া বসত এর লেখক যিনি পরে এই ছবিটির চিত্রনাট্য তৈরি করেন সেই শক্তিপদ রাজগুরু। সুন্দরবনের পটভূমিতে লেখা এই উপন্যাস নয়া বসত। লেখক সুন্দরবনের বাদাবন এলাকায় কিছুদিন ছিলেন। সেখানকার মৎসজীবীদের জীবনযাত্রা তিনি ভালো ভাবে লক্ষ্য করেছিলেন। তারই ফলশ্রুতি – নয়া বসত উপন্যাস ও তার অবলম্বনে ছবি- “অমানুষ” । শক্তিপদ রাজগুরু এখানে তার কলকাতার এক মাছ ব্যবসায়ী বন্ধুর ফাঁকা বাংলোবাড়িতে এসে উঠতেন। শক্তি সামন্ত তার সাথে এখানে শুটিং স্পট দেখার জন্য বেড়াতে আসেন। এই গ্রামে থাকতে এসে মশার কামড়ে সারা রাত তার ঘুম হয় না। এবং তিনি বলেন এখানে শুটিং অসম্ভব। কাল অন্য কোন বর্ধিষ্ণু  গ্রামে যাব। কিন্তু প্রাতঃকালে ঘুম থেকে উঠে এক অপার্থিব দৃশ্য দেখে তিনি তার সিদ্ধান্ত বদলান। তিনি দেখেন সিঁদুরের গোলার মত এক সূর্য  উঠছে। সারা আকাশ লাল। টলটলে নদীর জলে বয়ে চলেছে নৌকো। ভেসে আসছে মাঝিমাল্লাদের গান। তিনি একটাই কথা বলেন – এই সিনেমা যদি কোথাও হয় তবে সেটা এখানেই, আর কোথাও নয়। সেই অনুযায়ী প্রচুর টাকা খরচ করে গোটা গ্রামটাকে ঢেলে সাজানো হয়।

ছবির কাহিনীটি এরকম – রায় চৌধুরী পরিবারের বিগড়ে যাওয়া ছেলে মধুসূদন এই সিনেমার নায়ক। মধু (উত্তমকুমার) তার বড়লোক কাকার সাথে থাকে। সুন্দরবনের এই এলাকায় মূলত মৎসজীবীদের বাস। মধু সরল, মিশুকে, গরীবদরদী ছেলে। সে ভালবাসে ডাক্তার আনন্দবাবুর বোন লেখা (শর্মিলা ঠাকুর) কে। মধুর কাকার বাজার সরকার মহিম ঘোষাল (উৎপল দত্ত) আদতে কুটিল,লোভি ও লম্পট চরিত্র। সে চায় মধুকে বঞ্চিত করে সম্পত্তির দখল নিতে। মধু ও লেখার সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যায় তৃতীয় মহিলা সৌরভীর প্রবেশে, আদতে যা ছিল মহিমেরই চক্রান্ত। মধুর কাকার টাকা চুরিতে  মধু দোষী সাব্যস্ত হয় এবং জেল খেটে যখন সে বাইরে আসে দেখে তার প্রিয় কাকাকে ওষুধের নামে বিষ খাইয়ে মেরে সমস্ত সম্পত্তির মালিক হয়ে বসেছে তাদেরই একদা কর্মচারী মহিম ঘোষাল। যার জন্যে আজ তার এই পরিণতি সেই সৌরভী নিখোঁজ। তাকে লেখা অপমান করে তাড়িয়ে দিলেও এক গ্রাম্য সরল মেয়ে মাতন মধুবাবুকে তার ঘরে আশ্রয় দেয়। কারণ  একদিন এই মধু চৌধুরীর জন্যই বাঘের হাতে বাপ মা মরা মেয়েটা গ্রামের ছাউনি ঘরে আশ্রয় পেয়েছিল। লেখার বিরহে মধু হতাশায় মদ্যপান শুরু করে। এসময় স্থানীয় থানায় আসেন নতুন দারোগা ভুবন বাবু (অনিল চট্টোপাধ্যায়) যিনি সৎ এবং বুদ্ধিমান। তিনি প্রথমে মধু কে ভুল বুঝলেও ধীরে ধীরে তার মধ্যে লুকিয়ে থাকা চরম মনুষ্যত্বের খোঁজ পান। তার চেষ্টাতেই মধু ভাল কাজ পায়। হিংসেয় জ্বলে মধুর আবার  ক্ষতি করতে গিয়ে ধরা পড়ে যায় মধুর কাকার আসল হত্যাকারী ও সমস্ত চক্রান্তের নায়ক মহিম ঘোষাল। লেখা ও মধুর মিল হয়ে যায়। যদিও মূল উপন্যাসে ছিল ভুবন দারোগা লেখাকে বিয়ে করে নিয়ে চলে যাবে আর মধু আগের থেকে ভাল মানুষ হয়ে সৎ ভাবে জীবন কাটাবে কিন্তু এক শক্তির অনুরোধে আরেক শক্তি ছবির কাহিনী পাল্টাতে রাজী হন এবং সেটা ছিল একদম খাপে খাপ ফিল্মি ডিশিসন।

ছবিটি ছিল দ্বিভাষিক। কিন্তু ডাবড নয়। আলাদা আলাদা ভাবে হিন্দি ও বাংলার শুটিং হয়। প্রথমে হিন্দি পরে বাংলা এভাবেই কাজ এগোতে থাকে। বাংলা চিত্রনাট্যতে উত্তমকুমারের একটু অসুবিধা হচ্ছিল। সেই সমস্যা সমাধানে এগিয়ে আসেন সহ পরিচালক প্রভাত রায়। উনি উত্তমকুমারের ডায়লগ বলার স্টাইল জানতেন। সেই ভাবে উনি স্ক্রিপ্টের পরিমার্জন করেন। উত্তমকুমারকে যখন এই ছবিতে কাস্ট করা হয়, অনেকে সমালোচনা করেন। কারন হিন্দি ছবিতে তার আগে “ছোটিসি মুলাকাত” ফ্লপ হওয়ায় উত্তমকুমার ও সাহস পাচ্ছিলেন না। কিন্তু বন্ধু দেবেশ ঘোষকে ধরে শক্তিবাবু তাকে রাজী করিয়ে ফেলেন। এতে কিছুটা মনক্ষুণ্ন হন রাজেশ খান্না কারণ  তখন শক্তি সামন্তের সিনেমা মানেই তার হিরো রাজেশ খান্না। তখন শক্তি বাবু তাকে নিয়ে “আজনবি” ছবি করার ঘোষণা করেন এবং তাকে বোঝান যে উত্তমকুমারকে নিয়ে তার সিনেমা করার অনেক দিনের শখ কিন্তু মনের মত চিত্রনাট্য পাচ্ছিলেন না। এই চরিত্রটি একটি মাঝবয়েসী চরিত্র এবং এটা এতটাই বাঙালী চরিত্র যে একজন বাঙালী অভিনেতা ছাড়া এই চরিত্রটিতে উতরানো  প্রায় অসম্ভব। যাহোক রাজেশ খান্না উত্তম কুমার সম্বন্ধে যথেষ্ট শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। তিনি আর কথা বাড়ান নি।

“অমানুষ” এর শুটিং হয় সুন্দরবনের সন্দেশখালির ভাঙাতুষখালি গ্রামে। চলচ্চিত্রে অবশ্য দেখানো হয়েছিল সেই গ্রামের নাম ধনেখালি। শুটিংয়ের প্রয়োজনে এখানে প্রায় চল্লিশ খানি ঘর, জমিদার বাড়ি, ডাক্তার-খানা, বাজার, রাধা গোবিন্দ মন্দির, থানা, স্কুল তৈরি হয়। সেই রাধাগোবিন্দ মন্দির এবং উত্তম কুমার যে কাঠের বাড়িতে থাকতেন সেটি ভাঙাচোরা অবস্থায় আজও আছে। শুটিং চলাকালীন সহজেই গ্রামের লোকের সাথে মিশে যেতেন উত্তম কুমার। বাচ্চাদের কোলে নিতেন, মানুষকে অর্থ দিয়ে সাহায্য পর্যন্ত করেছেন। তাইতো আজও ২৪ শে জুলাই তার মৃত্যু দিনে সেখানে তার ছবিতে মালা দেয়া হয়, হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। কিছুটা শুটিং হয় টেকনিশিয়ান্স স্টুডিও তে।

উত্তমকুমারের তার আগে দুবার হার্ট অ্যাটাক হয়ে গেছে তবু তিনি সিন গুলোকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার জন্য কোন রকম ঝুঁকি  নিতেই পিছপা হচ্ছিলেন না।যেদিন হাসির দৃশ্য থাকত উত্তমকুমার সবার সাথে ঠাট্টা ইয়ার্কি করতেন আর যেদিন দুঃখের দৃশ্য থাকত সেদিন কারো সাথে কথা বলতেন না। তার ব্যক্তিত্ব দেখে কেউ ধারে কাছে ভিড়তেই ভয় পেত। উত্তমকুমার সেই গ্রামের মানুষদের সাথে সহজেই মিশে যেতেন। আজো সেই গ্রামে গেলে এমন মানুষ দেখা যাবে যারা উত্তমকুমারকে সেই সময় সচক্ষে দেখেছিলেন। আজো সেখানে বেঁচে আছে সেই সব শুটিং স্পট গুলি। আছে সেই লঞ্চটিও। সরকারী হেফাজতে আছে সেটি।

মহানায়কের জনপ্রিয়তা কতটা ছিল সে ব্যপারে “অমানুষ” ছবিকে কেন্দ্র করে একটা দারুন ঘটনা আমরা জানতে পেরেছিলাম সহ পরিচালক প্রভাত রায়ের মুখে। ছবির অনেকটা শুটিং ছিল নদীতে। একদিন রাত্রে তারা দিক ভুল করে ফেলেন। পাশের নদীপাড়ে নৌকা ভিড়ানো হয়। খাবারের খোঁজ করা হয়। একটি মাত্র দোকান ছিল সেখানে । সামান্য মুড়ি ও তেলেভাজা সেখানে পাওয়া যায়। আশেপাশে কোন বাড়িঘর ও ছিল না। ওখানে বসে তারা টিফিন করতে থাকেন। কিছুক্ষণের মধ্যে তারা দেখেন জোনাকির মত প্রচুর আলো। জানা যায় হ্যারিকেন নিয়ে শয়ে শয়ে লোক সেদিকে আসছে রটে গেছে যে উত্তমকুমার এখানে শুটিং এ এসেছেন। আর চারিদিকে একটাই আওয়াজ – গুরু আর গুরু। সবাই ভয় পেয়ে যায়। তারা শুধু বলে আমরা একবার শুধু গুরুকে দেখবো। অন্ধকারে অনেকগুলি হ্যারিকেন এক জায়গায় হয়। লঞ্চের ভিতর থেকে বেড়িয়ে আসেন উত্তমকুমার। লোকেদের সাথে কথা বলেন । তারপর সবাই নিস্তার পান। তারাই তাদের সঠিক পথ দেখিয়ে দেয়।

“অমানুষ” ছবিটি চলাকালীন দৃশ্য গ্রহণ নিয়ে উত্তমকুমার ও শক্তি সামন্তের একাধিক বার মত পার্থক্য ঘটে। কিন্তু উত্তমকুমারের উপর আস্থা রেখে তার মতকেই বেশি প্রাধান্য দেন শক্তিবাবু। “অমানুষ” রিলিজের পর রেকর্ড হিট হয়। বাংলা টা আগে রিলিজ করে। টেনশনে উত্তমকুমার তোপচাচী চলে যান। সেখান থেকে টেলিফোনে ভাই তরুন কুমারের কাছে শোনেন এ ছবি হলে লেগে গেছে। শুধু গুরু গুরু আওয়াজ আর লোকে মুঠো মুঠো পয়সা ছুড়ে মারছে। একবার দেখে কারোই মন ভরে না। কেউ কেউ দশ বার বিশ বার করে দেখে। মাসের পর মাস সিনেমা চলতেই থাকে। একদম মেগাহিট। এবার এল হিন্দি ভার্সনটা রিলিজের পালা। কোন পরিবেশক নেই। নায়কের নাম উত্তম কুমার শুনে বম্বের কোন পরিবেশক এগিয়ে এলেন না। কিন্তু শক্তিবাবুর রোখ চেপে গেছে। বাংলায় এ ছবির যে ক্রেজ তিনি দেখেছেন, বম্বেতে এ ছবি সুপারহিট না হয়ে যায় না। রাতারাতি নিজেই খুললেন পরিবেশক কোম্পানি।  “শোলে” রিলিজ হয়েছে সবে। রিলিজ হয়েই বম্বে সহ সারা ভারত দাঁপিয়ে বেড়াচ্ছে। রাত্রে কোন হলে “অমানুষ” এর জন্য জায়গা পাওয়া যায়নি। দিনের বেলায় দুপুর ১২ টার ম্যাটিনি শো তে “অমানুষ” একটি মাত্র সিনেমা হলে রিলিজ করে। কিন্তু মানুষের ছবিটি এতটাই ভাল লাগে যে এরপর ছবিটি বম্বেতেও হিট করে যায়। সিলভার জুবিলি করে।  আর বাংলা “অমানুষ” তো গোল্ডেন জুবিলি হয়। এতটাই ভাল হয় সিনেমাটি যে এটা কল্পনা না বাস্তব ঘটনা তা কোন কোন সময় দর্শকরা ঘোরে পড়ে যান।

শোনা যায় তরুন কুমারের সিনেমাটি ভাল লাগেনি। তিনি বলেন এটা যাত্রা। এই কথাটাকে বর্তমানে অপব্যাখ্যা করা হয়। হ্যাঁ এটা ঠিক ১৯৭৫ এ দাঁড়িয়ে কারো কাছে এটা যাত্রা হতে পারে কারন মেলোড্রামাটিক সিনেমার সূচনা হচ্ছিল তখন। বম্বে আস্তে আস্তে কলকাতা ইন্ডাস্ট্রির উপর হাবি হচ্ছিল। ঢিসুম আওয়াজের মার, একটু কোমরবেঁকি ড্যান্স না দিলে সেই ছবির গ্ল্যামার কোশেন্ট কমে যাচ্ছিল। সাহিত্য থেকে গল্পটি নেয়া হলেও তাতে অনেক মশালা এলিমেন্ট ঢোকানো হয়েছিল যদিও সবটাই খুবই দরদ দিয়ে করা। তরুন কুমার চাননি উত্তমকুমার বাংলায় যে লেভেলের সাহিত্যে নায়ক হয়েছেন, বম্বে গিয়ে তিনি সেই আভিজাত্য হারিয়ে চটুলপনার শিকার হন। যদিও উত্তমকুমার বুঝেছিলেন, সময়ের দাবি মেনে কিছুটা অ্যাডজাস্টমেন্ট তাকে করতে হবে। ইদানিং যে হারে মাত্রাতিরিক্ত, অপ্রয়োজনীয় ঝাঁ চকচকে জিনিস আমরা সিনেমায় দেখছি তাতে আজকের দিনে দাঁড়িয়ে কিন্তু “অমানুষ” কে যাত্রা বলা শোভনীয় নয়। সেই তুলনায় কিছুই নেই “অমানুষ” এ ।  বুড়ো কুমার তার দাদার কেরিয়ার, উচ্চতা ইমেজের আশঙ্কায় সেটা বলতে পারেন কিন্তু আমরা সবাই তো আর বুড়ো কুমার নই। বুদ্ধিতে, অভিজ্ঞতায়, কোয়ালিটিতে আমরা তার কাছে সবাই ছুড়োকুমার। তার নিজের দাদা, বাংলার গুরুও তার সাথে অভিনয়ের সময় সতর্ক থাকতেন। তা ছাড়া অন্যেরা যা বলবে আমাদেরও তাই বলতে হবে, নিজের বিবেক বুদ্ধি নেই !  ফিল্ম দেখা বোঝা পছন্দ করা কিন্তু একদম সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত একটা বিষয়।  তবে এটা ঘটনা যে এই ছবি কতটা উচ্চমানের তা নিয়ে তর্কে যাচ্ছি না, কিন্তু অসম্ভব হৃদয়স্পর্শী ছবি এটা নইলে আজো “অমানুষ” এতোটা জনপ্রিয় থাকত না। বক্স অফিস বলছে আমি বলছি না, “অমানুষ” ই উত্তম কুমারের কেরিয়ারের সব থেকে বানিজ্য সফল ছবি।

(চলবে)


ADMIN

Author: ADMIN

Comments

Please Login to comment