জীবনের বিধান-ডঃ বিধান চন্দ্র রায়

– সমর্পণ মজুমদার

 

দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, নিষ্ঠাবান, কর্মদক্ষ, সচেতন মানুষের জীবন অতি সুশৃঙ্খল হয়। একজন সুশৃঙ্খল মানুষই এরকম হতে পারেন। তিনি হন প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসী। তাঁর কর্ম অত‍্যন্ত সুন্দর, তেজস্বী, বুদ্ধিদীপ্ত হয় ! তিনি সকল কাজে পারদর্শী হন। পশ্চিমবঙ্গের রূপকার ডাঃ বিধানচন্দ্র রায় ছিলেন এই প্রকার ব্যক্তির একজন আদর্শ উদাহরণ। তাঁর বেড়ে ওঠার পেছনে অনেক বড় অবদান তাঁর পিতা প্রকাশ চন্দ্র রায়ের। তাঁর দক্ষ অভিভাবকত্বের জন্যই বিধানচন্দ্রের জগৎজোড়া কর্ম সম্ভবপর হয়েছিল। এই ধরনের অভিভাবকত্ব সত‍্যিই বিরল।

বিধানচন্দ্র রায় ছিলেন তাঁর মাতা-পিতার পাঁচ অপত‍্যের সর্বকনিষ্ঠ। মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সে মাতা অঘোরকামিনী দেবীকে হারান বিধানচন্দ্র। এদিকে কাজের চাপে সন্তানদের যথেষ্ট সময় দেওয়া হয়ে উঠত না প্রকাশচন্দ্র রায়ের। বাকিদের সঙ্গে বিধানচন্দ্রকেও হাতে হাত লাগিয়ে ঘরোয়া কাজ-কর্ম করতে হতো। যা ছিল তাঁর কাছে একটা দারুণ ক্ষমতা অর্জনের সুযোগ। এই সময় ঘরোয়া কাজ কর্মে নৈপুণ্য অর্জন করায় তিনি সারা জীবন অবিবাহিত থেকেও সমস্ত দিক সামলাতেন অত্যন্ত ব্যস্ততার সঙ্গে, অক্লান্তভাবে, স্বতঃস্ফূর্তভাবে, সহাস্যবদনে। তাঁর জীবনে গভীর ভাবে ছাপ ফেলেছিল পিতার একটা শিক্ষা। নিজের কাজ দক্ষভাবে নিজের হাতে করার শিক্ষা, ঘরোয়া কাজকর্মে অভ্যস্ত হওয়ার শিক্ষা, আত্মনির্ভর হওয়ার শিক্ষা। তিনি শিখেছিলেন, “মানুষ অনেক কিছু হতে পারে, কিন্তু যদি সে নিত‍্য ঘরোয়া কাজ-কর্ম নিজে সামলাতে না পারে, তবে সে এখনো কিছুই হয়নি”!  এই শিক্ষা পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার, যে পায় সে অনেক বড় হয় ! বিধানচন্দ্র এই শিক্ষায় শিক্ষিত ছিলেন। তাই তাঁর জীবন-যাপন ছিল অত্যন্ত গোছানো, সুশৃঙ্খল, organised, নিয়মিত। সেজন্যই তিনি ডাক্তার হয়ে সেবা করে যেতে পেরেছিলেন রোগীদের; মুখ্যমন্ত্রী হয়ে চৌদ্দ বছর ধরে সেবা করে যেতে পেরেছিলেন রাজ্যবাসীদের।

১৮৯৭ সালে পাটনা কলেজিয়েট স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে I.A. করেন। তারপর আবার অঙ্কে অনার্স নিয়ে পাটনা কলেজ থেকে B.A. পাশ। এরপর ১৯০১ সালে একদিকে ক্যালকাটা মেডিকেল কলেজে ডাক্তারি পড়ার সুযোগ আবার ওদিকে বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার সুযোগ পেয়ে যান। তিনি বেছে নিলেন ডাক্তারি। আমরা ধরে নিতেই পারি তিনি যদি ইঞ্জিনিয়ারিংও পড়তেন, মানুষ কিছু কম উপকৃত হতো না। কারণ একজন চরিত্রবান মানুষ যাই করেন, সেটাই ফুল হয়ে ফোটে। সেই চরিত্রটা আসে নিষ্ঠা থেকে, নিয়ম থেকে, আত্মবিশ্বাস থেকে।

তাঁর ডাক্তারি পড়তে পড়তেই ১৯০৫ সালে লর্ড কার্জনের ঘৃণ্য বঙ্গভঙ্গ ঘোষিত হয়। তখন থেকেই তাঁর রাজনীতিতে প্রবেশ, তবে সরাসরি নয়। ওই বছরেই তিনি ডাক্তার হয়ে নিজেকে কঠোরভাবে রোগীসেবায় নিয়োজিত করেন। ১৯০৯ এ তিনি ইংল্যান্ড যাত্রা করেন উচ্চশিক্ষার জন্য। লন্ডনের  St. Bartholomew’s Hospital এ তাঁর আবেদন প্রত্যাহার করে দেওয়া হয়। কারণ ছিল একটাই, তিনি এশিয়ান। কিন্তু বোকা ইংলিশমেন জানতো না ইনি বিধানচন্দ্র রায় ! পরপর আরো তিরিশবার আবেদন পাঠান তিনি। অবশেষে বিধানচন্দ্রের আবেদন গৃহীত হয়। মাত্র দু’বছর লেগেছিল তাঁর MRCP ও FRCS ডিগ্রি পেতে, যা অত্যন্ত বিরল। ১৯১১ সালে প্রত‍্যাবর্তন করেন দেশে। ক্যালকাটা মেডিকেল কলেজে শুরু করেন শিক্ষকতা। এরপর তিনি ক্যাম্পবেল মেডিকেল কলেজ এবং কারমাইকেল মেডিকেল কলেজেও শিক্ষকতা করেছিলেন। মেয়েদের নার্সিং পড়ানোর জন্য কলেজ খুলেছিলেন বিধানচন্দ্র। মেডিকেল কাউন্সিল অব ইন্ডিয়া (MCI)র প্রথম প্রেসিডেন্ট হন তিনি।

সরাসরি রাজনীতিতে যোগদান ১৯২৫ সালে। মুখ্যমন্ত্রীত্ব ১৯৪৮ এর ২৩ শে জানুয়ারি থেকে। মাঝে একবার কলকাতার মেয়রও হয়েছিলেন বিধানচন্দ্র। আমৃত্যু ঐ পদে ছিলেন তিনি। অত্যন্ত ব্যস্ততার মাঝে নিজের জীবন সামলেছেন অবিবাহিত থেকে, রোগীদের রোগ সামলেছেন অনায়াসে, রাজ্য সামলেছেন নিপুণভাবে ! হয়ে উঠেছিলেন পশ্চিমবঙ্গের রূপকার। পাঁচটি বড় শহরের পত্তন ঘটান তিনি। দুর্গাপুর, বিধাননগর, অশোকনগর, কল্যাণী ও হাবড়া হল সেই পাঁচ শহর।

তাঁর জীবন-যাপন, রোগী দেখার পদ্ধতি নিয়ে অনেক অদ্ভুত ও মজার কথা শুনতে পাওয়া যায়। মানুষের সঙ্গে মিশতে ভালোবাসতেন তিনি। অনেক ক্ষেত্রেই রোগীর মুখ দেখে রোগ আন্দাজ করতে পারতেন। তাঁর খাওয়া দাওয়া ছিল অদ্ভুত। প্রত্যেক দিন বিকেলে আট-দশটা কাঁচা বাদাম খেতেন, যা ছিল তাঁর বিকেলের টিফিন। দিনরাত শুধু কাজে ডুবে থাকতেন। বলতেন, তিনি কাজকেই বিয়ে করেছেন ! তাঁর মধ্যে ছিল প্রকৃত প্রেমিক সত্তা। প্রেমে পড়েছিলেন বিখ্যাত ডাক্তার নীলরতন সরকারের মেয়ের। বিধানচন্দ্র বিবাহের প্রস্তাব নিয়ে গেলে ডাঃ সরকার বলেন, তাঁর মেয়ের দৈনন্দিন খরচ বিধানচন্দ্রের মাসিক আয়ের থেকেও ঢের বেশি। প্রেয়সীকেই চিরকাল মানসী করে রেখে দেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রী হয়ে তাঁর নির্মিত একটি শহরের নামকরণ করেন প্রেয়সী কল‍্যাণী সরকারের নামেই।

পয়লা জুলাই ভারতবর্ষে Doctors’ day উদযাপন করা হয় বিধানচন্দ্র রায়ের জন্ম ও মৃত্যুদিনকে স্মরণ করেই। আর আমাদের উচিত তাঁকে স্মরণ করা একজন সুশৃঙ্খল, দৃঢ়, নিয়মিত, গোছানো, আত্মবিশ্বাসী মানুষ হিসেবে। আমাদের শুধু আলস্য কাটিয়ে লেগে পড়তে হবে নিজের কাজে। সকালে ঘুম থেকে ওঠা থেকে শুরু করে আবার রাত্রে ঘুমোনো পর্যন্ত প্রতিটি ছোটবড়ো কাজ করতে হবে মনযোগ দিয়ে, যত্ন করে। শরীরের প্রত্যেকটা পেশি থাকবে টানটান, মনের প্রত্যেকটা কোণা থাকবে সচেতন। নিজের কাজ করতে হবে নিজেকে, যথাসময়ে, যথাস্থানে, যথার্থভাবে। তবেই না আমাদের মধ্যে জন্ম হবে এরকম অনেক অনেক বিধানচন্দ্র রায়ের !!

 

——


FavoriteLoading Add to library
ADMIN

Author: ADMIN

Comments

Please Login to comment