ফিরবেনা জেনেও – পদ্মাবতী মন্ডল

“লেখা,এই লেখা ….আছিস বাড়িতে? “
“দেখ না ওর কী হয়েছে সকাল থেকে দরজা বন্ধ করে শুয়ে আছে ”  লেখার মা ওর বান্ধবী কে উদ্দেশ্য করে বললো ।
“ও কী আজ টিউশন যাবে না কাকিমা? “
“কে জানে? মেয়ের তো ক্ষণে ক্ষণে মুড চেঞ্জ হয় ।ঐ জানে কী করবে “
“তুই চলে যা সন্ধি, আমি আজ যাবো না ।” ঘরের ভিতর থেকেই লেখা ওর সহপাঠী সন্ধি কে বোললো ।ওরা দুজনেই বি এ পার্ট টু তে পড়ে দুজনেরই ইংলিশ এ অনার্স ।আজ বিকালে স্যারের টিউশন ছিল ।কিন্তু লেখা কিছুতেই যাবে না ।ও টিউশন গেলেই ওকে নানা প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে আজও ।তাই ও ঠিক করেছে আর পড়তেই যাবে না ।কিন্ত মা বাবা মানবে কেন? মাসে মাসে ওর জন্য কত টাকা দিতে হয় ওর বাবাকে ।মা বাবা শুধু টাকা টাই দেখে, লেখার যে ওখানে পড়তে যেতে একদম ভালো লাগে না সেটার কেউ খোঁজই রাখে না ।নৈহাটি তে থাকার সময় ও বলেছিল আর কখনও সে এসবের মধ্যে জড়াবেনা কিন্তু মা বাবা কেউ শোনে নি ।জোর করে আবার কলেজে ভর্তি করে দিয়েছে ।আসলে মা বাবা লেখার মন টাকে পড়েই দেখেনি কোনোদিন ।এসব টিউশন কলেজ কিচ্ছু লেখার ভালো লাগে না ।প্রথম কদিন যায় বা যাচ্ছিল কিন্ত আর  ভালো লাগছে না ওর ।ওখানে গেলেই আবার….. ।অতনু স্যার ঐ শ্রুতি নামটা ধরে ডাকবেন  যেটা লেখার কাছে বড্ড অসহ্য ।নিজের নামটা যে কেন এমন বিরক্তিকর লাগে লেখার কাছে তা ও জানে ।কিন্তু পৃথিবী, ওখানকার মানুষ জন ওদের তো  বোঝানো যাবে না ।ঐজন্যই আর টিউশন যাবেনা বলে ঠিক করেছে সে ।
*************
 “তোমার নাম?” কলেজের অ্যাডমিশন এর সময় জানতে চাইলো ।
“শ্রুতিলেখা মুখার্জি”
“কোন কোন সাবজেক্ট নেবে”
“আমি ইংলিশে অনার্স পড়তে চাই ” সব কিছু ঠিঠিকঠাক ফিলাপ করে নৈহাটি কলেজে ভর্তি হলো শ্রুতিলেখা ।বেস চনমনে আর প্রাণবন্ত এই শ্রুতিলেখা ।আর ছেলেবেলা থেকেই পড়াশোনার প্রতি ভীষন সৌখিন ।প্রত্যেক টা বই এর মলাট থেকে  শুরু করে নেমস্টিকার লাগিয়ে নিজের নামটাও পরিপাটি করে লিখে রাখে ।আর পড়াশুনো? ওতো স্কুলে স্ট্যান্ড করত ।সবাই ওর প্রতিভাতে মুগ্ধ ছিল ।স্কুলের প্রত্যেক টা বিষয়ে সব থেকে উপরে যে নামটি সবসময় লেখা থাকতো তা হচ্ছে ঐ শ্রুতিলেখা মুখার্জি।সব বিষয়ে লেটার মার্কস নিয়ে শ্রুতিলেখা ভর্তি হল কলেজে ।সেখানেও কয়েকটা দিনেই হয়ে উঠলো সবার মধ্যমণি ।কলেজের অধ্যাপক থেকে শুরু করে ছাত্র ছাত্রীদের সব্বার প্রিয় হয়ে উঠলো সে ।সবাই ওর নামের সংক্ষিপ্ত করন করে দিল ।ওর নাম দিল লেখা ।শুধু কলেজের একজন শ্রুতি বলে ডাকতো ।ওর বেস্ট ফ্রেন্ড স্বপ্নময় ।তবে স্বপ্নময়ের সাথে যে ওর শুধু বেস্টফ্রেন্ডের সম্পর্ক তা কলেজের কেউ মানে না ।মনেহয় স্বপ্নময় নিজেও না ।
“এই যে শ্রুতি একটু শোনো ” রাস্তাই দাঁড়িয়ে থাকা স্বপ্নময় স্রুতির দিকে তাকিয়ে বোললো ।
“তুমি আমায় সবসময় শ্রুতি বলে ডাকো কেন? ” একটু আবেগী গলায় বলে ওঠে লেখা ।
“তুমি সাড়া দাও বলেই ডাকি “স্বপ্নময় বলে লেখা কে ।
“তুমি আমার সাথে এভাবে কথা বল বলে কলেজের কেউ মানতেই চায়না আমরা শুধু ফ্রেন্ড ” লেখা স্বপ্ন ময়কে বোললো ।
” তোমাকে কে বোললো যে আমরা শুধু ফ্রেন্ড?  “
“ফ্রেন্ড নই? কী তবে?”
“ওরা যা ভাবছে তাই “
“না না স্বপ্ন তোমার জন্য আমার তেমন কোনো ফিলিংস নেই “লেখা স্পষ্ট জানালো ।
“সে নাহয় বুঝলাম, কিন্তু কলেজের সবাই তো আমাকে সানি বলে ডাকে তুমি স্বপ্ন বলে ডাকো কেন? “স্বপ্নময় বলে ওঠে ।
এবার বিন্দু বিন্দু ঘামছে সে, ছেলেটা যে কলেজের অন্য সবার থেকে একটু আলাদা তা লেখা প্রথমদিন থেকেই বুঝতে পারতো ।আর কিছু বলার নেই ওর ।
স্বপ্নময় ফিজিক্স এর স্টুডেন্ট ।ভীষন মেধাবী আর স্ট্রেট ফরওয়ার্ড ।তবে অনেকের ধারনা ছিল যাদের পড়াশোনার বিষয় সাইন্স তারা কোনোদিন রোমান্টিক হতে পারেনা ।এই ধারণা কে ভুল প্রমানিত করেছিল স্বপ্নময় ।ওর পড়াশুনার প্রতি যেমন একটা আগ্রহ ছিল তেমনই লেখার প্রতি একটা ফিলিংস ছিল ।তবে ওর প্রেম নিবেদন নজির রেখেছিল আধুনিক ছেলে মেয়েদের মাঝে ।শুধু নিজের ইচ্ছেটাকে প্রাধান্য দেয়নি সে ।ওর একান্নবর্তী ফ্যামিলির সকলকে নিয়ে একদিন লেখাদের বাড়ী এসেছিল ।
এরকম একটা কিছু হবে তা শ্রুতির ধারনার বাইরে ছিল ।ও কখনও আন্দাজই করতে পারেনি যে স্বপ্নময় এরকম করবে ।কিন্তু লেখার বাবা মা স্বপ্নময় এর ফ্যামিলি দেখার পর বেশ খুশী হয়েছিলেন ।দুবাড়ীর লোকজন মত দিয়েছিলেন সেদিন স্বপ্নময় এর ইচ্ছেতে
তবে ওদের দুজনেরই ইচ্ছে ওরা পড়াশোনা শেষ করে নিজের মত সেটেলড হয়ে তারপর বিয়ে করবে ।সেটাকেও সম্মান দিয়েছিল স্বপ্নময় এর উকিল বাবা ।আর লেখার শিক্ষক বাবা ।আর স্বপ্নময়ের পছন্দের তারিফ করেছিল সেদিন বাড়ীর সবাই ।ওদের আশীর্বাদ ও হয়ে গিয়েছিল ।দুজনেই খুব বিশ্বাস আর ম্যেচেউরিটির সঙ্গে ওদের সম্পর্ক টা টেনে নিয়ে যাচ্ছিল ।ওরা সপ্তাহে একদিন দেখা করতো তাও একঘন্টার জন্য ।ভালোবাসার মধ্যে আদিখ্যেতা ছিলনা কাররই ।আর দেখা হলেই কে কতটা পড়াশোনা করেছে এসব নিয়ে আলোচনা হত ।কিছু কিছু প্রেম হয়ত এমনও হয় ।
“শ্রুতি, তুমি আর আমি একই জায়গাই জব করবো, তাহলে আর বিয়ের পর তোমাকে বেশী মিস করতে হবে না “স্বপ্নময় কলেজ ক্যান্টিনে বসে থাকা লেখা কে বোললো ।
“তুমি আমাদের বাড়ীতে ওরকম সদলবলে প্রেম নিবেদন করতে এসেছিলে কেন? “
“আমার তোমাকে ভালো লেগেছিল তাই “
“আরে আমাকে বললে পারতে “লেখা বললো
“তোমাকে তো শুধু ভালোবাসার কথা বলতে পারতাম, তোমাকে বিয়ে করার কথাটা তাহলে বলা হতনা ।তাই সেটার পাকাপাকি ব্যবস্থা করলাম ।এতে দুজনেরই ভালো ।”
“ভালোবাসো? ” লেখা এবার আস্তে আস্তে শ্রুতি হতে শুরু করেছে ।এখন শ্রুতি নামটা শুনে অসম্ভব একটা তৃপ্তি হয় লেখার ।আর ও স্বপ্নময় কে স্বপ্ন বলে ডাকে ।
“আমাদের দুজনের জব হয়েগেলে আমরা বিয়ে করবো ।আর আমাদের একটা মিষ্টি মেয়ে হবে যার নাম দেব স্বপ্নলেখা ।”হেসে উঠলো দুজনেই ।
“কেন স্বপ্নলেখা কেন?  শ্রুতিলেখা নয় কেন? “
“না ওটা শুধু আমার থাকবে ।শ্রুতির ভাগ আমি কাউকে দেবনা।”
“আচ্ছা বাবা তাই হবে ।কিন্তু আজ আর বসতে পাবো না এবার যেতে হবে নাহলে ক্লাস মিস করে যাবো ।” লেখা বলে উঠলো স্বপ্নময় কে ।
“আমারও ইমপরটেন্ট ক্লাস আছে, আমিও উঠি ।”বলেই দুজনে দুদিক দিয়ে উঠে গেল ।আবার সামনের সোমবার একই জায়গাই দুজনের দেখা হবে ঠিক একঘন্টার জন্য ।
*************
পরের সোমবার আর আসেনি স্বপ্নময় ।ওর বাড়িতে ফোন করলে সবাই বোললো যে ও হসপিটালে ভর্তি আর আর বাড়ীর সবাই ওখানেই আছে ।হসপিটালের নাম শুনে বুকটা হু হু করে উঠলো লেখার ।কী হলো স্বপ্নময়ের? বলেই বাবা মাকে সঙ্গে নিয়ে গেল সেও ।ওখানে গেলে সবাই জানালো কাল রাত থেকে এখানে অ্যাডমিট করা হয়েছে ।ভীষন ক্রিটিকাল অবস্থা ।ব্রেন টিউমার টা লাস্ট স্টেজে ধরা পরেছে ।ডাক্তার বলেছে বাহাত্তর ঘন্টা না গেলে কিচ্ছুই বলা যাবে না ।
কথাগুলো গোগ্রাসে গিলেই ও টির দিকে ছুটে গেল লেখা ।কাঁচের ছোট্ট দরজা দিয়ে মুখ বারাতেই ওর গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল ।জীবনে প্রথমবার বুঝতে পারলো স্বপ্নময় কে ও কতটা ভালোবাসে ।নিজেকে স্থির রাখতে পারেনি তখন ।আজ নিজেকে সবথেকে বেশী অসহায় লাগছে লেখার।ছুটে চলে যেতে ইচ্ছে করছে ওর স্বপ্নময়ের কাছে ।একটা ডাক্তার কে ওটি থেকে বেরোতে দেখে লেখা ইতস্তত হয়ে পোরলো
“কেমন আছে ও ডাক্তার বাবু বলুন না,?”
“দেখুন এখনই কিছু বলা যাচ্ছে না তবে আপনারা আশা রাখুন নিশ্চই ভালো হবে তবে কথা দিতে পারছিনা যথাসাধ্য চেষ্টা করবো ।আসলে একদম শেষ মুহুর্তে ধরা পরেছে ।”
পাগলের ন্যায় লেখা মূর্ছা যাচ্ছে, সব পেয়েও যেন সব হারাতে বসেছে সে ।ঠাঁই দুদিন বসে থাকার পর সে শুনতে পেল যে স্বপ্ন গুলো ও দেখতে বসেছিল স্বপ্নময় কে নিয়ে সেগুলো এবার বিসর্জনের পালা ।অপারেশন টেবিলেই কোলাপস করে গেছে স্বপ্নময় ।
*****************
তারপর দুবছর কেটে গেছে ।নৈহাটি তে থাকলে দিনদিন মেয়েটা আরো কুঁকড়ে যাচ্ছে সেটা ওর বাবা মা লক্ষ কোরলো ।তাই বদলির অ্যাপ্লায় করলো লেখার বাবা ।আর বদলি নিয়ে চলে আসার পর কিছুতেই লেখা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারছিল না ।কয়েক দিন পর সন্ধির সাথে আলাপ হল লেখার ।ওর জোরাজুরিতেই নতুন করে আবার ভর্তি হলো শ্রুতিলেখা ।কয়েকদিন পড়তে যাবার পর অতনু স্যারের সাথে আলাপ হয় লেখার ।কিন্তু অন্য বন্ধু বান্ধবীর মত সে লেখা বলে ডাকতো না ।সবসময় শ্রুতি বলে ডাকতো এটা নিয়ে অনেক বার বাধা দিয়েছিল লেখা কিন্তু অতনু কিছুতেই শুনতে চাইনা ।অতনুর বয়স বেশী নয় ,পড়াশুনো  শেষ করেই চাকরি টা পেয়েছে ।সেইসঙ্গে টিউশন ও করে, সেখানে লেখা সহ আরো চারপাঁচজন পড়ে ।কিন্তু অতনু লেখার মধ্যে খুঁজে পায় এক অনাবিল আনন্দ ।তাই কয়েকদিন পড়তে আসার পরেই ও বাধা ধরা লেখা নামটা ছেড়ে বেরিয়ে আসে ।একদিন হঠাৎই বলে বসে
“এই যে শ্রুতি, তোমার কি সব কমপ্লিট? “
ভীষন একটা চমক লাগলো লেখার ।আর অস্বস্তি হচ্ছিল ওর ।টানা আড়াই বছর পর কেউ ওকে শ্রুতি বলে ডাকলো ।
“আপনি আমায় ও নামে ডাকবেন না স্যার ” লেখা স্যার কে বললো ।
“আমি তোমাকে ঐ নামেই ডাকবো ।কারন সারাদিন লেখাজোখা করা আমার কাজ তাই ঐ লেখা নামটাই আমার পোষাচ্ছে না ।”
কিন্তু এই অস্বস্তিকর ডাকটাই দম বন্ধ হয়ে আসছিল লেখার ।তাই ও আর পরদিন থেকে পড়তে আসবেনা ঠিক করেছে ।
******************
পড়তে না যাবার কথা শুনে সন্ধি একাই পড়তে গিয়েছিল সেদিন ।অতনু সন্ধির কাছ থেকে লেখার ব্যাপারে জানতে চাইলো ।ও কেন আসতে চায়না সে খবর সন্ধিরও অজানা ছিল ।পরপর পাঁচদিন এভাবে না আসার জন্য অতনু আর স্থির থাকতে না পেরে সদলবলে অর্থাত বাবা, মা, ঠাম্মা, দাদু ,সবাই কে সঙ্গে নিয়ে লেখাদের বাড়ীতে হাজির ।সবাই কে এভাবে আসতে দেখে হতচকিত লেখার বাবা জিজ্ঞেস করলেন সব্বার পরিচয় ।ওনারা যে প্রস্তাব নিয়ে এসেছেন তা শুনে লেখা খুব অপ্রস্তুত এ পরে গেল ।ওর কিছুতেই মত নেই এই সমন্ধ তে ।
“আমি এখন বিয়ে করতে চাইনা “
“অতনুর মা বোললো আমরা কী বলেছি যে এখনই করতে ।তোমার যেদিন ইচ্ছে হবে সেদিন করবে ।আমরা শুধু তোমার মতামত জানতে চাই ।তুমি কী এই আমার পাগল ছেলেটাকে একটু সঙ্গ দেবে? “
“আমি বিয়ে করতেই চাইনা ।নিজেকে একটু দাঁড় করাতে চাই ।বিয়ে টিয়ে ওসব আমার জন্য নয় ।আমি কোনোদিন বিয়ে করতেই চাইনা ।আপনারা ক্ষমা করবেন “।বলেই ঘর থেকে চলে গেল লেখা ।
এভাবে প্রত্যাক্ষাত হবার পরেও অতনু ওর শ্রুতির ছবিটার দিকে তাকিয়ে হাসলো ।আর ওকে উদ্দেশ্য করে বোললো “আজ আমি চলে যাচ্ছি শ্রুতি ।কিন্তু যেদিন তুমি আমার সত্যিকারের শ্রুতি হবে ততদিন তোমার জন্য একই ভাবে অপেক্ষায় থাকবো আমি “
সেদিন অতনু কে প্রত্যাক্ষান করা মেয়েটি আজ ঐ এলাকার চিফ জাস্টিস ।প্রত্যাক্ষিত অতনু দশটা বছর কাটিয়েছে শুধু অপেক্ষাতে ।শুধু একটা আশায় যে সে ফিরবে, নিশ্চয় ফিরবে ।নাহলে তো ভালোবাসার ইতিবৃত্ত টা অপূর্ণতার আগুনে পুড়তে থাকবে অবিরত ।
এভাবেও অনেক ভালোবাসা শুধু সারাজীবন অপেক্ষা করে কাটিয়ে দেয়, অপরদিকে মানুষ টার ধারনা টা আসলে কী সেটা না জেনেই আর অপরদিকে মানুষটি কী জন্য ফিরে আসেনি তা তার বলা হয়ে ওঠেনা কোনোদিনই ।।
সমাপ্ত


ADMIN

Author: ADMIN

Comments

Please Login to comment