বর্তমান – সমর্পণ মজুমদার

   

    মানুষ স্বপ্ন দেখতে খুব ভালোবাসে। অতীতের স্মৃতিরোমন্থন করে সুখ লাভ করে। ভবিষ্যতের ইচ্ছেগুলো কল্পনা করেও রোমাঞ্চিত হয়। আমরা বেশিরভাগই চিন্তা করি আমাদের স্কুল জীবনের কথা, কলেজ জীবনের কথা, ছোটবেলায় ফেলে আসা সঙ্গীদের সাথে বিভিন্ন খেলাধুলোর কথা ! গর্ব করে বলি, ছোটবেলায় এই করতাম, সেই করতাম ! এখন আর সেই দিন নেই ! ফেলে আসা দিনগুলোই সেরা ছিল। সেই সুখ, সেই আনন্দ আর কোনোদিন ফিরবে না… এই ভাবতেই আমরা বেশিরভাগ অভ‍্যস্ত। আর ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করতে গিয়ে আমরা প্রথমত অনিশ্চয়তায় ভুগি আর তার সঙ্গে সুখস্বপ্ন দেখি। অর্থাৎ আমরা যা যা করতে পছন্দ করি সেগুলি ভবিষ্যতে করবো ভেবে রোমাঞ্চিত হয়ে থাকি।

         কিন্তু বর্তমানের প্রতি মুহূর্তে সুখী হওয়া আমাদের আর হয়ে ওঠে না। অতীত আর ভবিষ্যতেই যেন আমাদের সকল সুখ। কিন্তু এটাও ভেবে দেখতে হবে যে, এই বর্তমান এক সময় আমাদের সুখচিন্তায় ভবিষ্যৎ ছিল। আবার এই বর্তমানই একসময় অতীত হবে। একইভাবে অতীতের যে সময়কার কথা আমরা চিন্তা করে আনন্দলাভ করছি, তা কি বাস্তবেই খুব সুখকর ছিল ? অর্থাৎ আমি যদি বর্তমানে সুখ না পেতে পারি, তাহলে সেদিনটা যখন বর্তমান ছিল, তখন কি আমি সেই মুহূর্তটা উপভোগ করেছিলাম, যতটা এখন কল্পনায় মনে হচ্ছে ? ভবিষ্যতের ক্ষেত্রেও একই কথা। যা করবো ভেবে আমরা রোমাঞ্চিত হয়ে উঠছি, সেই সময়টা এলে আমরা কি সত্যিই ততটা আনন্দ পেতে পারবো ? আসলে না। পারবো না। যতক্ষণ না আমরা বর্তমানে বাঁচতে শিখবো, বর্তমানে স্বতঃস্ফূর্ত হতে শিখবো ততক্ষণ পারবো না। ততক্ষণ নয়, যতক্ষণ না বর্তমানটাকে গুছিয়ে উঠতে পারবো, যতক্ষণ না দৃঢ়ভাবে বর্তমানের যাবতীয় কাজকর্ম করতে পারবো ! তারপরেই বুঝতে পারবো আমরা, যে সবচেয়ে বেশি আনন্দলাভ করা যায় শুধুমাত্র বর্তমানে ! না অতীতচিন্তায়, না ভবিষ্যতচিন্তায়। আমাদের এটা বিশ্বাস করতে হবে, অতীতের ফেলে আসা দিনগুলোর থেকেও আরো বেশি আনন্দের মুহূর্ত আমরা বর্তমানে আর ভবিষ্যতেও সৃষ্টি করতে পারি। লালমোহনবাবুর করা একটা প্রশ্নের জবাবে ফেলুদা বলেছিল যে, সে আগে থেকে কিছু ভেবে রাখে না– যখন সে কোনো পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়, তখন কি করতে হবে সেটা নিজে থেকেই তার মাথায় চলে আসে। এটা তার পক্ষেই হওয়া সম্ভব, যে বর্তমানে প্রচন্ড প্রাণবন্ত হয়ে বাঁচে।

            আমরা যখন organized হয়ে উঠে নিজেদেরকে গোছাতে শিখি, শৃঙ্খলাবদ্ধ হয়ে উঠে নিয়মিত জীবন যাপন করি, তখন আমরা আমাদের জীবনটাকে স্পষ্ট দেখতে পাই। আর এটাই একমাত্র শান্তির কারণ। জীবন যাপনে শৃঙ্খলা থাকলে, মানুষ স্থান-কাল-পাত্র অনুযায়ী উপযুক্ত কাজগুলো করতে থাকে। যার ফলে সবচেয়ে বেশি যে সুবিধাটা হয়, সেটা হলো, কোন পুরোনো কাজ জমে থাকে না। আমরা আমাদের জীবনে updated থাকি। একটু ভাবলেই আমরা দেখতে পাব, যে এই মুহূর্তে আমাদের প্রত্যেকেরই কিছু না কিছু পুরোনো কাজ করতে বাকি আছে, যা আমরা পরে করব বলে সরিয়ে রাখছি। এই নিষ্ক্রিয়তাই যতোরকম দুঃখের কারণ। আর আমরা যখন নিজেদেরকে গোছাই, নিজেদের পরিবেশকে গোছাই, নিজেদের কাজগুলোকে গোছাই, নিজেদের আচার আচরণগুলো গোছাই, নিজেদের সম্পর্কগুলো গোছাই, তখন আমরা একটা দারুন স্থায়ীত্বে বিরাজ করি। আমরা দেখতে পাই, নির্দিষ্ট কোনো একটা মুহূর্তে, নিজের কার্যতালিকার ঠিক কোন অংশে আমরা বিরাজমান। যে প্রতি মুহূর্তের দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করে, সে আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে। তাই আমাদের এই মুহূর্ত থেকে সচেতন থাকতে হবে, যাতে আমরা কোন কাজ জমিয়ে না ফেলি আগামীকালের জন্য ! আর এটাকেই বলে বর্তমানে বাঁচা। যে বর্তমানের প্রতি মুহূর্তে জীবনের খেলায় জয়লাভ করে চলেছে, সে তার অতীতের স্মৃতিরোমন্থন করেও যথেষ্ট আনন্দে পায়, ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখেও পায়। কিন্তু সে নিশ্চয়ই শুধুমাত্র ভাবনাবিলাসী নয়। সে ভাবে এবং কাজও করে। এই প্রকার ব‍্যক্তিরাই তাদের স্বপ্নের বাস্তবায়ন ঘটায়। পৃথিবীর যেকোনো সফল ব‍্যক্তির সাফল‍্যের নেপথ্যে এইটাই একমাত্র কারণ ! তাঁদের জীবনে ঘটা ঘটনা আলাদা আলাদা হলেও, মূল ধারাবাহিকতাটা অবশ্যই একই !

            আমরা যখন স্মৃতিচারণায় আনন্দ পাই, তখন আসলে সুখকর মুহূর্তগুলোকেই বেছে বেছে মানসপটে তুলে নিই। কিন্তু যে সময়কার কথা চিন্তা করি, তখন যে শুধুমাত্র ঐ ভালো মুহূর্তগুলোই ছিল, তা তো নয়। তখনো চিন্তা ছিল, তখনও চাপ ছিল, তখনও দুঃখ ছিল, তখনও পরিশ্রম ছিল। কিন্তু ঘরে বসে অতীতের কথা চিন্তা করতে গিয়ে এসবের কিছুই করতে হচ্ছে না। ভবিষ‍্যতের ক্ষেত্রেও তাই হয়। সুখচিন্তায় আমরা শুধুমাত্র ভালো লাগার কথাগুলোই মাথায় আনি। তার জন্য কি পরিশ্রম করতে হয় সেগুলো নয়। কিন্তু আমরা যদি বর্তমানে সক্রিয় হই, তাহলে পরিশ্রমের ভয় আমাদের থাকে না। চাইলেই যেকোনো কাজে পারদর্শীতা প্রদর্শন করতে পারি আর অসীম আনন্দে ডুবে যেতে পারি।

             শুরুটা করতে হয় একদম গোড়া থেকে। সবার আগে খেয়াল করতে হবে, আমাদের শরীর টানটান আছে কিনা। সকালের ঘুম ভাঙা থেকে শুরু করে, রাতে ফের ঘুমোনো পর্যন্ত প্রত্যেকটা কাজ করার সময়, আমাদের শরীরের প্রত্যেকটা মাংসপেশি টানটান রাখতে হবে। নিয়মিত যোগব্যায়াম করে শরীরের কার্যকারিতা ও স্থায়িত্ব বৃদ্ধি করতে হবে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে নিজেকে ও নিজের পরিবেশকে। এরপরে, কথাবার্তা-আচার-আচরণ-নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। দৈনন্দিন কাজকর্মগুলো নিয়মিতভাবে, নিখুঁতভাবে, দৃঢ়ভাবে করতে হবে। তারপর মহা উৎসাহে নিজেদেরকে জড়িয়ে ফেলতে হবে বিভিন্ন বিভিন্ন সৃজনমূলক কাজকর্মে। একেই বলে বর্তমানে বাঁচা ! একেই বলে আনন্দ, একেই বলে শান্তি !

_____


FavoriteLoading Add to library
Up next
বিচার – শুভদীপ্ত চক্রবর্তী... মন্দিরের চাতালে ছোট্ট একর‌ত্তি দেহটি পড়ে আছে, শরীরে একটুকরো সুতোও নেই... রক্তাক্ত ও ক্ষতবিক্ষত — নিস্পাপ খোলা দুটি চোখ ঈশ্বরকেই যেন খুঁজছে ! মিটিং...
সেই পাগলটা – বর্ষা বেরা... সেই পাগলটা তাকে প্রথম দেখেছিলাম গড়িয়ার মোড়ে | অদ্ভুত পোশাক তার,অদ্ভুত সব কার্যকলাপ কখনও নিজের চুল ছিঁড়ছে,কখনও বা ছুটছে লোকের পিছনে, তবু নেই তার আত...
ভূত-ভবিষ্যৎ -প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়     সহেলি পাশ ফিরে শুলো। আজ তেমন গরম নেই। কারণ ক’দিনের বৃষ্টিতে বেশ চমৎকার আবহাওয়া হয়ে গেছে। ঘরের দুটো বড় জানালা খুলে...
আডোম শুমারী – সৌম্য ভৌমিক... কত বডি আসে দিনের অবকাশে জ্বালা করে ওঠে চোখটা , আদম শুমারী ঘরেতে কুমারী বিড়ি ধরিয়েছে লোকটা | একদিন রাতে প্রেমিকের হাতে খুন হলো যে যুবতী , লোকট...
নির্ভুল – শ্বেতা মল্লিক... 'উফফ! সকাল সকাল এতবার ফোন করে ঘুম ভাঙ্গাচ্ছিস কেন সুমি? জানিস তো কাল কত রাতে ফিরেছি।' , ঘুম ও বিরক্তি মেশানো গলায় বলে উঠলো রণিত। ' তাড়াতাড়ি হোয়াট...
উপত্যকা – প্রজ্জ্বল পোড়েল... দুই মেরু জুড়ে একাকিত্বের অবস্থান, পথ হারিয়েছে বহু নাবিক তীব্র চুম্বকীয় শক্তিতে কম্পাস স্তব্ধ। ধূসর, সাদা মৃত্যুর উপত্যকা - এখানে সারা বছর বরফ ...
স্বর্ণযুগের ছড়া – প্রথম পর্ব।... গুপ্তযুগকে সুবর্ণযুগ বলা হত ইতিহাসেতেমনি এক সোনার যুগছিল এই বাংলাদেশেসাদাকালো সেসব ছবিরঙীন তার পোস্টারলবিকার্ড আর বুকলেটেআছে সে বিপুল সম্ভারউত্তম সুচি...
মেট্রো ঘটনার কয়েক মিনিট পরে... - অর্পণ দাস(অন্তিম)   উজ্জ্বল বাবু মুখে কীসব বিড় বিড় করতে করতে মেট্রো স্টেশন দিয়ে বেরোলেন। সিঁথিরমোড়গামী অটোর লাইনে দাঁড়িয়েও নিজের বাহাদুরি ন...
ফিরে পাওয়া - গার্গী লাহিড়ী    মা তুমি এসেছ ? আর কখনো আমাকে ছেড়ে চলে যাবে না তো ? আমি তোমাকে আর ছাড়বই না। ঘুমের মধ্যে বিড়বিড় করে কানাই। চোখের কোন বেয়ে জল...
আতঙ্কের সেই কালো রাত – সরোজ কুমার চক্রবর্তী...     আমরা তিন থেকে চারজন সবাই অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী | সবার বয়স প্রায় সত্তরের ঊর্ধ্বে | আমরা যেখানে থাকি জায়গাটা হলো দমদম স্টেশনের কাছাকাছি | এখানে আমাদে...
ADMIN

Author: ADMIN

Comments

Please Login to comment