বাংলা ছায়াছবির বাদশা

vlcsnap-2019-03-08-00h16m24s65

শাহরুখ খানকে বলা হয় বলিউডের বাদশা। কারন তিনি “বাদশা” বলে একটি হিন্দী ছবিতে অভিনয় করেছিলেন। ছবিটি ফ্লপ করেছিল। কিন্তু তার বহু আগে এই বাংলায় “বাদশা” বলে একটি সুপারহিট সিনেমা হয়েছিল যাতে নাম ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন একজন অভিনেতা যার নাম কালী ব্যানার্জী। তাই একই যুক্তিতে তাকেও অনায়াসেই টলিউডের বাদশা বলা যায়। যদিও তিনি কিং খানের মত নায়ক চরিত্রে খুব বেশী ছবিতে অভিনয় করেন নি। তবে পার্শ্বচরিত্রে যে কাজ করে গেছেন, বাংলার সিনেপ্রেমীরা আজীবন গর্বের সাথেই তা স্মরনে রাখবেন।

বাংলা চলচ্চিত্রের অভিনেতাদের ইতিহাস সত্যিই বড় গর্বের। তার নানা কারনের মধ্যে একটি কারন হল এখানকার অভিনেতারা মঞ্চ থেকে উঠে এসেছিলেন। উত্তমকুমার, সৌমিত্র, ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়, সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়, ছবি বিশ্বাস, পাহাড়ী সান্যাল, বিকাশ রায় ইত্যাদি সবারই মঞ্চের সাথে কোন না কোন ভাবে যোগাযোগ ছিল। ফলে তাদের কখনো কোন ফিল্ম অ্যাকাডেমিতে অভিনয় শিখতে যেতে হয় নি। কালীবাবুও অভিনয় শেখেন এক কালের গর্বের নাট্য প্রতিষ্ঠান ভারতীয় গননাট্য সংঘে, যেখান থেকে উৎপল দত্ত, সলিল চৌধুরীদের মত প্রতিভা উঠে এসেছিলেন।

সিনেমা জগতে কালীবাবুর প্রথম ছবি ১৯৪০ সালে “তটিনীর বিচার”। দ্বিতীয় ছবি – “বর্মার পথে”। কিন্তু প্রথম নজর কাড়েন সুপারহিট ও কালজয়ী “বরযাত্রী” ছবিতে। সেটাতে তোতলা গনশার ভূমিকায় মাতিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। ইউটিউবে সিনেমা টা আছে সম্ভবত। সেখানে দেখতে পাবেন তার অভিনয় প্রতিভা। সেই প্রতিভাবলে এরপর তিনি অভিনয় করেছিলেন অনেকগুলি ছবিতে। কাজ করেন ঋত্বিক ঘটক, সত্যজিৎ রায়, তপন সিংহ, মৃণাল সেন,তরুন মজুমদার এর মত বড় পরিচালকদের ছবিতেও।

কালী ব্যানার্জীর অভিনীত ছবির মধ্যে মনে আসে প্রথমেই হেমন্ত মুখোপাধ্যায় প্রযোজিত ও মৃনাল সেন পরিচালিত “নীল আকাশের নিচে” ছবিটির কথা। চীনে ম্যানের ভূমিকায় সেখানে তিনি মঞ্জু দে, বিকাশ রায়ের সাথে তাল মিলিয়ে অভিনয় করেছিলেন। শোনা যায় প্রথমে এই চরিত্রটি করার কথা ছিল মহানায়ক উত্তমকুমারের। চাইনিজ সাজে মহানায়কের একটি ছবি কোথাও দেখেছিলাম। সেটা এই ছবিরই লুক টেস্ট ছিল কিনা জানি না। অবশ্য মঙ্গোলীয় সাজে উনি “ধনরাজ তামাং” এ নায়কচরিত্র ছাড়াও “চিড়িয়াখানা” ও “সব্যসাচী” তে কিছুটা অংশ করেছিলেন। তবে সেটা অনেক পরে।

কালীবাবু সত্যজিৎ রায়ের ছবি “পরশপাথর” এ পরেশ দত্ত ওরফে তুলসী চক্রবর্ত্তীর সেক্রেটারি প্রিয়তোষের ভূমিকায় দারুন অভিনয় করেছিলেন। ফোন নিয়ে তার নিজের প্রেমিকার সাথে কথা বলার দৃশ্যটি খুব প্রশংসা পেয়েছিল। কোন মহিলা অভিনেত্রীর সাহায্য ছাড়া এটা করা কতটা কঠিন তা অভিনেতা মাত্রেই জানেন। কিন্তু এই কঠিন কাজটিই খুব সহজে উনি করে দেখিয়েছিলেন। বোঝার উপায় ছিল না যে ওরকম কোন ক্যারেকটার বাস্তবে এই ছবিতে নেই। শুধু অভিব্যাক্তি আর ভাবভঙ্গিমায় কাল্পনিক একটি চরিত্রকে তিনি পর্দাতে বাস্তব রূপ দিয়েছিলেন।

কালী ব্যানার্জী উত্তমকুমারের সাথেও বেশ কিছু ছবিতে অভিনয় করেন যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছবি ছিল – “সবার উপরে”, “সোনার হরিন” ও “কখনো মেঘ”। তিনটি ছবিতেই তিনি খুব নজরকাড়া চরিত্রায়ন করেন। মহানায়ক উত্তমকুমার যে তাকে তার অভিনয়ের জন্য বিশেষ ভাবে পছন্দ করে থাকবেন, এ আর নতুন কথা কি! উত্তমকুমার যখন উত্তমকুমার হন নি তখনই “নবীন যাত্রা” সিনেমায় তার সহশিল্পী ছিলেন তিনি। উত্তম সাবিত্রী অভিনীত মৃণাল সেনের প্রথম ছবি “রাতভোর” এও কাজ করেছিলেন কালীবাবু।

কালী ব্যানার্জীর জীবনে আরেকটি ভাল ছবি হল – “বাবর্চি”। ঋষিকেশ মুখার্জীর পরিচালনায় “গল্প হলেও সত্যি” ছবির হিন্দি রিমেকে তিনি মেজভাই অর্থাৎ বঙ্কিম ঘোষের চরিত্র টিতে অভিনয় করেছিলেন। সেই ছবিটিও দর্শকের প্রচুর তারিফ কুড়িয়েছিল। “বাবর্চি” একটি হিট মুভি যাতে রাজেশ খান্না দক্ষতার সাথে রবি ঘোষ অভিনীত চরিত্রটিতে রূপদান করেছিলেন, যদিও আর্টিস্টিক ভ্যালু তে সেই দুই অভিনয়ের আর দুটো ছবির কোন কম্প্যারিজন হয় না।

কালী ব্যানার্জীর অভিনয় কেরিয়ারে সব থেকে মিষ্টি চরিত্র যদি কেউ বলেন তবে আমার মতে তা তরুন মজুমদার পরিচালিত “দাদার কীর্তি” ছবিতে। সেখানে দেবশ্রী মহুয়ার বাবার চরিত্রে তাকে এতটাই সুন্দর লেগেছিল, যা খুব কম ছবিতেই লেগেছে। যেমন সেই সিনেমার কাহিনী, তেমন গান আর তেমনই চরিত্রায়ন। তবে তাপস পাল, মহুয়া, অনুপ কুমারের মত কালী ব্যানার্জীও এই ছবিতে লুক, জেসচার ও অ্যাক্টিং এ আলাদা ভাবে নজর কেড়েছিলেন বৈকি। ছবির গানের মতই তার মেক আপে ছিল রাবিন্দ্রীক স্টাইল। আর তাকে লেগেছিল দেবদূতের মত।

যদি শুধু ছবির নান্দনিকতাই বিচার্য হয়, সেই দিকে তপন সিংহ হলেন অনেকের মত আমার ও প্রিয়তম পরিচালক। তার পরিচালিত “কাবুলিওয়ালা” ছবিতে একটি উল্লেখযোগ্য চরিত্রে অভিনয় করেন কালী ব্যানার্জী যে কথায় কথায় কাবলে ছবি বিশ্বাসকে উত্যক্ত করত। কিন্তু পরবর্তীতে দূর্ভাগ্যের শিকার হয়ে সেই চরিত্রের বেদনাহত হওয়া ছিল দেখার মত, শেখার মত অ্যাক্টিং স্কিল। তপন সিংহের “টনসিল” ছবিতে ভানু ব্যানার্জীর সাথে অভিনয় করেছিলেন কালী ব্যানার্জী, যে সিনেমাটি না পাবার ও না দেখার আক্ষেপ আপনাদের অনেকের মত আমার ও জীবনে মেটার নয়। দুই দিকপাল অভিনেতা কি ম্যাজিক করেছিলেন সেই ছবিতে বাংলা সিনেমার হতভাগা দর্শকদের কাছে তা অধরাই রয়ে গেল। “ওগো শুনছ” নামে আর একটি অদেখা ছবিতে এই দুই লেজেন্ড একসাথে কাজ করেছিলেন। “আমার দেশ” নামে তপন সিংহের তথ্যচিত্রে উত্তম সুচিত্রার সাথে কাজ করেছিলেন কালীবাবুও।

“অযান্ত্রিক” একটি খুব উজ্জ্বল ছবি কালী ব্যানার্জীর অভিনয় জীবনে। ঋত্বিক ঘটক এর মত পরিচালক এর সাথে কাজ করার সুযোগ পান এই ছবিতে তিনি এবং নিজেকে উজাড় করে দিয়ে অভিনয় করেছিলেন। ঋত্বিক ঘটকের “নাগরিক” এবং “বাড়ি থেকে পালিয়ে” ছবিতেও তিনি উল্লেখযোগ্য ভূমিকায় অভিনয় করেন।

কালীবাবু শেষ দিকে অঞ্জন চৌধুরীর ফাটাফাটি চিত্রনাট্য ও নির্দেশনায় বেশ কিছু ছবিতে অভিনয় করেন এবং সেগুলোর জন্য কমার্শিয়াল ছবির দর্শকের কাছে চরিত্রাভিনেতা হিসাবে নতুন করে খুব নাম হয় তার। “গুরুদক্ষিনা”, “ছোট বউ”, “দেবতা” ইত্যাদি সিনেমায় প্রৌঢ় কালী বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেকে প্রমান করেন সম্পূর্ন আলাদা ভাবে। অঞ্জন বাবুর চোখা চোখা সংলাপ যা রঞ্জিত মল্লিক পরবর্তীকালে নিজের ট্রেডমার্ক বানিয়ে নেন, “ছোটবউ” ছবিতে তা কালী ব্যানার্জীর লিপে দর্শকেরা ভীষন উপভোগ করেছিলেন। যারা যারা সিনেমাটি দেখেছেন, আশা করি আমার সাথে দ্বিমত হবেন না। “গুরুদক্ষিনা”য় গানের মাস্টারমশাই রূপে তাকে যথেষ্টই বিশ্বাসযোগ্য লেগেছিল।

শুরু করেছিলাম যেখানে, সেখানেই হবে শেষ। কালী ব্যানার্জীর “বাদশা” আমার লেগেছিল বেশ। হয়ত আপনাদের ও লেগেছিল। অধ্যাপক শঙ্কর ঘোষ সেই ছবিতে শিশু চরিত্রে অভিনয় করেন। ছিলেন অতীতের দিকপাল শিল্পী অসিত বরন ও বিকাশ রায় । কিন্তু অগ্রদূত পরিচালিত সেই ছবিতে সবাইকে ছাপিয়ে গেছিল বাদশা রূপী কালী ব্যানার্জী। এক পাষান হৃদয় মানুষের অন্তরের কোমলতাকে পর্দায় ফুটিয়ে তোলা মোটেই সহজ কাজ ছিল না। কিন্তু সেটা কালী ব্যানার্জীর মত অভিনেতা হলে অসম্ভব কখনোই নয়।


FavoriteLoading Add to library

    Up next

    সিগারেট – ঋতব্রত মজুমদার... ছাতের সিঁড়ি বেয়ে দৌড়ে উঠল পটল। বারোটা ধাপ। মুখস্ত তার। দুটো করে ধাপ টপকে টপকে সিঁড়ির শেষে একচিলতে ল‍্যান্ডিং। বাঁদিকে ঠাকুরঘরের দরজা, ছিটকিনিতে ছোট্...
    আমার তুমি- মুক্তধারা মুখার্জী...   “কিগো, তাড়াতাড়ি এসো না। মশারিটা তাড়াতাড়ি টাঙিয়ে দিয়ে যাও না। আর কতক্ষণ বসে থাকবো। বসে বসে তো গাঁটের যন্ত্রণাটা বেড়ে গেল”। “তো আমি কি করবো? আম...
    তোমাকে দিলাম – সৌম্য ভৌমিক... তোমাকে দিলাম ভোরের লালচে আকাশ শরৎ মাখা নদীর ধারের কাশ , তোমাকে দিলাম ড্রইং খাতার রং মেঘ চিরে যাওয়া শঙ্খচিলের ঢং | তোমাকে দিলাম আমার ভাবনাগুলো ছ...
    বলিউডের দুই দেশি বয়েজের টক্কর- রাজদীপ ভট্টাচার্য্...      ১৫ই আগস্ট গোটা বলিউড দেখবে দুই দেশি বয়েসের টক্কর কারণ অক্ষয় কুমারের গোল্ড এবং জন আব্রাহামের সত্যমেব জয়তে স্বাধীনতা দিবসের দিন একই সাথে মু...
    আতঙ্কের সেই কালো রাত – সরোজ কুমার চক্রবর্তী...     আমরা তিন থেকে চারজন সবাই অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী | সবার বয়স প্রায় সত্তরের ঊর্ধ্বে | আমরা যেখানে থাকি জায়গাটা হলো দমদম স্টেশনের কাছাকাছি | এখানে আমাদে...
    মহাকাশে কিং খান - রাজদীপ ভট্টাচার্য্য       এবার সম্পূর্ণ নতুন রূপে বড়ো পর্দায় শাহরুখ খান কে দেখতে পাওয়া যাবে, সম্প্রতি অর্ল্যান্ডো তে ফিল্ম জিরো র শুটিং শ...
    বসুধার কান্না – গার্গী লাহিড়ী... ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত অবনি নিতে চায় অবসর, উত্তরে বলে বিশ্ব বিধাতা আরো পর আরো পর | কাতর কণ্ঠে ধরা বলে যায় আমার সবুজ সকলই শুকায়, এত অন্যায় এত অবিচ...
    বিরল বিবাহ -বিভূতি ভূষন বিশ্বাস... হিন্দু সমাজে আট রকম বিবাহের কথা বলা আছে তার মধ্যে চার রকমই দেখা যায় তবে বিখ্যাত হলো দুই রকম ১) দেখা শুনা করে বিয়ে । ২) প্রেম করে বিয়ে । আচ্ছা সব বুঝল...
    সামলে রাখো জোছনাকে …..... "---সামলে রাখো জোছনাকে" "ও চাঁদ, সামলে রাখো জোছনাকে ", ওই জোছনা তোমার কেন আবার, আমায় পিছন থেকে ডাকে।। জোছনার ফাঁদে পা দিলেই যাবো সর্বনাশের ফাঁকে, ঝ...
    সম্পর্ক – বিভূতি ভূষন বিশ্বাস... আমি তখন ক্লাস সিক্সে পড়ি ।  ১৯৮০ সালের এক ঘন বর্ষার দিন প্রায় এক সপ্তাহ ধরে রিমঝিম করে অনবরত বৃষ্টি পড়েই চলেছে থামার কোন নাম গন্ধ নেই । গ্রামের রাস্তা...
    Asthir Kabi

    Author: Asthir Kabi

    3
    Comments

    Please Login to comment
    3 Comment authors
    Ankur Krishna ChowdhuryAsthir KabiLeftist Koushik Recent comment authors
    newest oldest most voted
    Ankur Krishna Chowdhury
    Member

    অজানা অনেক কিছু জানতে পারলাম। ধন্যবাদ।

    Leftist Koushik
    Member
    Leftist Koushik

    অসাধারণ লাগলো দাদা