বিশেষ ধরণের অপ্রচলিত শক্তির ব্যবহার – বর্তমান ও ভবিষ্যৎ – ইন্দ্রজিৎ ঘোষ

ভারতবর্ষে জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে শক্তির চাহিদা ক্রমশ বেড়ে চলেছে | আর এই শক্তির বেশিরভাগই আসে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে | যা পরিবেশ বান্ধব নয় | বর্তমানে কিছু পরিবেশ বান্ধব শক্তি যেমন – সৌরশক্তি,জোয়ারভাটা শক্তি,বায়ুশক্তি,বায়োমাস শক্তি থেকে তড়িৎশক্তি উৎপন্ন করা হয় এবং ব্যবহার করা হয় | এই শক্তিগুলোর ব্যবহার যদিও ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে,তবুও প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম উৎপন্ন করা হচ্ছে | আলোচ্য অংশে বিশেষ কিছু শক্তির কথা আলোচনা করবো যা ভবিষ্যৎ এ শক্তির চাহিদা অনেকাংশে মেটাতে সাহায্য করবে | যেমন —

১) বজ্রপাত থেকে উৎপন্ন শক্তি :-
প্রকৃতিতে যে বজ্রপাত হয় তা থেকে প্রচুর পরিমাণ শক্তি উৎপাদন করা সম্ভব | ভূপৃষ্ঠে প্রতিটা বজ্রপাতে পাঁচ বিলিয়ন জুল শক্তি উৎপন্ন হয় যা ১৪০০ kwh বৈদ্যুতিক শক্তির সমতুল্য | সমগ্র বিশ্বে প্রতিবছরে যে তড়িৎশক্তি ব্যয়িত হয়,অন্ততপক্ষে তার 80% বজ্রপাত থেকে পাওয়া যেতে পারে | এখন প্রশ্ন হলো বজ্রপাতের ফলে উৎপন্ন শক্তিকে কীভাবে গ্রহণ করা সম্ভব হবে ? উক্ত শক্তিকে নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে সুদীর্ঘ টাওয়ারের প্রয়োজন | আনুমানিক আইফেল টাওয়ারের উচ্চতার সমান এবং ১ মাইল ব্যাসার্ধের বৃত্তাকার ক্ষেত্রের কেন্দ্রে টাওয়ারটিকে স্থাপন করতে হবে | যা ১টি টাওয়ারের জন্য ২০ কোটি বর্গ মি. ক্ষেত্রফলের জমির প্রয়োজন | যার ফলে ৩০ মিলি সেকেন্ডের মধ্যে বজ্রপাতের দরুণ উৎপন্ন তড়িৎশক্তিকে ধারণ করা সম্ভব হবে | বর্তমানে এই পরিমাণ তড়িৎশক্তি গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রযুক্তির  অভাব   রয়েছে | আগামীদিনে উন্নততর প্রযুক্তির দরুণ উক্তশক্তি গ্রহণ করা সম্ভব বলেই বিশ্বাস করা যায় |

২) নিউক্লিও শক্তি :-
সমগ্র বিশ্বের প্রায় ১৫% তড়িৎশক্তি বর্তমানে নিউক্লিও শক্তি থেকে উৎপন্ন হয় | ফ্রান্সের প্রায় ৮০% তড়িৎশক্তি আসে নিউক্লিও শক্তি থেকে এবং সমগ্র ইউরোপের ২৫% তড়িৎশক্তি আসে নিউক্লিও শক্তি থেকে | এই শক্তির সুবিধে হলো গ্রীনহাউস গ্যাস ছাড়াই তড়িৎশক্তি উৎপন্ন করা সম্ভব | অর্থাৎ পরিবেশ দূষণের সম্ভবনা প্রায় থাকে না | তাই এটিকে ‘কার্বনশূন্য’ বলে | নিউক্লিও বিভাজন প্রক্রিয়ায় শৃঙ্খল বিক্রিয়ার মাধ্যমে ১ gm(U – 235) আইসোটোপে থেকে যে পরিমাণ শক্তি উৎপন্ন হয় তা প্রায় ৩০০০ টন কয়লা পোড়ালে উৎপন্ন শক্তির সঙ্গে প্রায় সমতুল্য | অর্থাৎ নিউক্লিও-রি-অ্যাক্টরের সাহায্যে নিউক্লিও বিভাজন প্রক্রিয়া ঘটিয়ে তা থেকে উৎপন্ন তাপশক্তিকে তড়িৎশক্তিতে রূপান্তরিত করলে কয়লার ব্যবহার অনেকাংশে কম করা যাবে | একইসঙ্গে পরিবেশ দূষণের হাত থেকেও রক্ষা পাওয়া যায় | বর্তমানে ভারতবর্ষ নিউক্লিও শক্তি উৎপন্ন হচ্ছে ৬৭৮০ MW যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম | ভবিষ্যৎ এ আরও কিছু পাওয়ার প্ল্যান্টে নিউক্লিও শক্তি থেকে তড়িৎশক্তি উৎপন্ন হলে তা প্রচলিত শক্তির চাহিদা অনেকাংশে পূরণ করতে সক্ষম হবে এবং তা একইসঙ্গে পরিবেশ বান্ধব হবে | বর্তমানে ২২টি নিউক্লিও রি-অ্যাক্টর থেকে শক্তি উৎপন্ন হচ্ছে | আরও ১১টি রি-অ্যাক্টরের কাজ চলছে | যা সম্পূর্ণ হলে ৮১০০ MW ক্ষমতা পাওয়া যাবে |

৩)ভূগর্ভস্থ তাপশক্তি :-
পৃথিবীর অভ্যন্তরে যে তাপশক্তি রয়েছে তার মূল উৎস হলো পৃথিবীর অভ্যন্তরে সঞ্চিত তেজস্ক্রিয় পদার্থ থেকে নির্গত বিকিরণ | পৃথিবীর কেন্দ্রের তাপমাত্রা প্রায় ৫৪০০ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড | প্রাকৃতিক কারণেই আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের ফলেই প্রচুর পরিমাণ তাপশক্তি উৎপন্ন হয় | অনেকসময় পরিচালন স্রোতের সাহায্যে তাপশক্তি ভূপৃষ্ঠে স্থানান্তরিত হয় | যেমন – উষ্ণ প্রস্রবণ আনুমানিক প্রতি বর্গকিমি. ক্ষেত্রফলে ৮০KW তাপশক্তি প্রবাহিত হয় | এক্ষেত্রে সুবিধা হলো খুব সামান্য পরিমাণ সালফার,কার্বনডাই অক্সাইড,ও অন্যন্য গ্রীনহাউস গ্যাস নির্গত হয় | ফলে পরিবেশ দূষণের মাত্রা খুব কম | আবওয়া ও জলবায়ুর উপর নির্ভরশীল নয় | বাইরে থেকে কোন শক্তি প্রয়োগের প্রয়োজন হয় না |

                  বিশ্বের ৭৮টি দেশে ভূগর্ভস্থ তাপশক্তিকে ব্যবহার করা হচ্ছে | উক্ত ৭৮টি দেশের মোট উক্তশক্তির ধারণ ক্ষমতা ১০.৭ G.W. , তার মধ্যে মাত্র ৭টি দেশের উৎপাদন ক্ষমতা  ৮৮% | অ্যামেরিকা,ফিলিপাইনস,ইন্দোনেশিয়া,মেক্সিকো,ইতালি,নিউজিল্যান্ড ও আইসল্যান্ড এরমধ্যে আইসল্যান্ডে সর্বাধিক তড়িৎশক্তি(২৫%) ভূ-গর্ভস্থ তাপশক্তি থেকে উৎপন্ন করে |

                       অথচ ভারতে এখনও পর্যন্ত উক্ত তাপশক্তির  উৎপাদন বা উক্ত তাপশক্তি থেকে  তড়িৎশক্তির উৎপাদন খুব বেশী পরিলক্ষিত হয় না | যদিও ১০,৬০০MW পরিমাণ ক্ষমতা উৎপাদিত হওয়ার মতন পরিবেশ বর্তমান | উক্তশক্তিকে যদি সার্থকভাবে ব্যবহার করা যায় আগামীদিনের তড়িৎশক্তির প্রয়োজন মেটানো সম্ভব হবে |

           বর্তমানে ভারত অপ্রচলিত শক্তির ব্যবহারে প্রথমসারি দেশের মধ্যে না থাকলেও আগামীদিন যদি বজ্রপাত,নিউক্লীয় শক্তি ও ভূগর্ভস্থ শক্তি ব্যবহার করতে পারলে প্রথমসারিতে উঠে আসবে | একইসঙ্গে প্রচলিত শক্তির ব্যবহার ক্রমশ বাড়বে এবং পরিবেশ দূষণের হাত থেকে রক্ষা পাবে | বিশ্বউষ্ণায়নের হাত থেকে পরিবেশকে বাঁচানো যাবে |

_____


ADMIN

Author: ADMIN

Comments

Please Login to comment