বিষয় অনিল – অভিনব বসু

 

বাংলা ছবির স্বর্ণ যুগে খুব কমই অভিনেতা আছেন যারা তিন মহারথী পরিচালকের ছবিতেই অভিনয় করেছেন, ঋত্বিক, মৃণাল এবং সত্যজিত এবং এঁদের সাথে অবশ্যই জুড়বে তপন সিনহার নাম।

১৯২৯ সালের ২৫শে নভেম্বর কোলকাতায় জন্ম অভিনেতা অনিল চট্টোপাধ্যায়ের। ১৯৫২ সালে ঋত্বিক ঘটকের হাত ধরে পদার্পণ সিনেমার জগতে, নাগরিক (প্রথম শেষ হওয়া ছবি), যদিও ছবিটি ঘটকের মারা যাবার পরে ৭০এর দশকে মুক্তি পায়, তাঁর প্রথম মুক্তি পাওয়া ছবি হিসেবে অবশ্য সকলেই জানে ১৯৫৩ সালের যোগ বিয়োগ।

অর্ধেন্দু চট্টোপাধ্যায় বলেছিলে, “তোমাদের মত শিক্ষিত ছেলে মেয়েরা ছবিতে না আসলে, কি করে চলবে?” জার্মান কোলাবরেশন কোম্পানির একজন সাদামাটা বিবাহিত চাকুরে, এই কথা শুনে চাকরির একমাস ফুরানোর আগেই ঠিক করল, সে আর চাকরি করবেনা, এবং তাঁর এই সিদ্ধান্তে পূর্ণ সমর্থন দিলেন তাঁর স্ত্রী। জন্ম হল অভিনেতা অনিল চটতোপাধ্যায়ের? না, অত সহজেই কি সব কিছু হয়?

সিনেমায় এলেন অর্ধেন্দু মুখোপাধ্যায়ের সহকারী হিসেবে। ক্যামেরার পিছনে বেশ কাজ করছিলেন, কিন্তু ফিল্ডে নামতে হল, অনেকটা মহম্মদ আজহারুদ্দিনের মত, যোগ বিয়োগ ছবির শুটিং, কোন এক শিল্পী অনুপস্থিত, গোঁজ দিনে নামলেন অনিল চট্টোপাধ্যায়। কলেজে পড়ার সময় থেকেই নাটকের সাথে যুক্ত, অভিনয় করেছেন উৎপল দত্তের সাথেও, এই ইতিহাস অরবিন্দ বাবুর জানা, পাড়াতুতো আত্মীয় বলে কথা। ফিল্ডে নেমেই ছক্কা, সামনে ছবি বিশ্বাস আর সুপ্রভা মুখোপাধ্যায়, কিন্তু কি অবলীলায় এদের সামনে অভিনয় করে গেলেন এই নতুন ছেলেটি। ছবি বিশ্বাস পর্যন্ত ওঁর অভিনয় দেখে ঘাবড়ে গিয়েছিলেন, কিন্তু তাঁর ভ্রুক্ষেপ নেই।

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় রেডিও ঘোষক ছিলেন সবাই জানেন। কিন্তু রেডিও ঘোষক নেওয়ার যে পরীক্ষা (এন্ট্রান্স) হয়েছিল তাতে তিনি দ্বিতীয় হয়েছিলেন, প্রথম হয়েছিলেন অনিল চ্যটারজি।  ব্যাস্ততার কারনে সে চাকরি করেননি অনিল বাবু, কিন্তু সেই সময় থেকেই পুলুর সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব অটুট রয়ে গেছিল।

আর এক বন্ধু ও দাদা ছিলেন ঋত্বিক ঘটক। তাঁরা একই পাড়াতে থাকতেন, আসা যাওয়া লেগেই থাকত; মাঝে মধ্যে দাদা-ভাইয়ে ঝগড়াও হত, অবশ্যই সেটা দাদার অধিক মদ্যপান নিয়েই।

প্রচন্ড আমুদে মানুষ ছিলেন অনিল বাবু, তাঁর স্ত্রী অনুভা চট্টোপাধ্যায়ের একটি লেখা থেকে তুলে দিচ্ছি,

একদিন লেক মার্কেটে বাজার করতে গিয়ে টাকা কম পড়ল। বসুশ্রী-কফিহাউসে গিয়ে ওর কাছ থেকে টাকা নিলাম। আমায় ট্রামে তুলে দিল। টিং টিং করে ট্রাম ছাড়তে হঠাৎ শুনি, চেঁচিয়ে বলছে, ‘‘এই যে দিদি, শুনুন, আপনার স্বামী না আমার কাছ থেকে অনেক টাকা ধার নিয়েও ফেরত দিচ্ছে না!’’

ভাবুন, কী অবস্থা তখন আমার!

অনিল চট্টোপাধ্যায় অনেক ভালো ছবিতে নায়কের রোল করেও কখনই মূল ধারার নায়কের পর্যায়ে আসতে পারেন নি। এর মূল কারন হয়ত রোম্যান্টিক ছবির প্রতি অনীহা। একবার হাইহিল বলে একটি ছবিতে নায়কের পার্ট করার জন্য প্রোডিউসারের প্রচন্ড চাপাচাপি। তাঁদের নিরস্ত করতে অনিল বাবু পারিশ্রমিক চাইলেন সেই সময়ে উত্তমকুমারের থেকেও বেশি, প্রোডিউসার তাতেও রাজী। লজ্বা পেয়ে অনিল বাবু বললেন, “থাক আমি করে দেব, আর আমি যা নিই তাই দেবেন”।

নায়কের রোল না পাওয়া নিয়ে তাঁর খুব যে দুঃখ ছিল তা নয়। বলতেন, “হলিউড ছবিতে, সব সময় সেকেন্ড লিডে খুব জবরদস্ত অভিনেতাকে নেয়, যাতে হিরোর স্টার ইমেজের সঙ্গে টক্কর দিতে পারে। সে দিক থেকে আমি বাংলা সিনেমার কাছে ঋণী। ওরা আমাকে সেকেন্ড লিড চরিত্রটাতে সুযোগ দিয়ে এসেছে।”

অগ্নিসংস্কার ছবিতে সাইকোপ্যাথ ভিলেনের ভূমিকায় অভিনয় করে নজর কাড়লেন অনিল চট্টোপাধ্যায়। প্রেস শো দেখে উত্তমকুমার বলেছিলেন, “অনিল, তুই দেখিস, এ ছবিতে তোর খুব নাম হবে।“

অসংখ্য ভাল ভাল চরিত্র জীবন্ত করে রেখে গেছেন সেলুলয়েডে। কে ভুলবে মেঘে ঢাকা তারা-র দাদাকে। আগুন ছবির পরোপকারী তিন বন্ধুর এক বন্ধু। সাগিনা মাহাতোর শ্রমিক লিডার, কাচের স্বর্গ-তে ডাক্তার, বনপলাশির পদাবলীতে এক পা খোঁড়া রগচটা ডাক্তার, নির্জন সৈকতে’র যুবকটি, আঁধার পেরিয়ে-তে সাংবাদিক, অমানুষ-এ পুলিশ অফিসার, মহানগর-এর চাকরি চলে যাওয়া নায়ক, পোস্টমাস্টার চরিত্র, কাঞ্চনজঙ্ঘায় প্লেবয় কত বিভিন্ন এবং বিচিত্র চরিত্রকে তিনি ফুটিয়েছিলেন অনবদ্য অভিনয়ে।

দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের চরিত্র করার অফার এল। শুনেই বলে দিল, ‘‘অমন মানুষের চরিত্রে অভিনয় করার যোগ্য আমি নই।’’ কোনও ক্রমে যখন রাজি করানো গেল, ছবি দেখে দেশবন্ধু-স্ত্রী বাসন্তীদেবী পর্যন্ত প্রশংসায় ভরিয়ে দিয়েছিলেন। ওঁর মেয়ে অপর্ণা ফোন করে কেঁদে ভাসাল। বলেছিল, ‘‘কত দিন বাদে বাবাকে দেখলাম যেন!’’

শেষ বয়সে তাঁকে ধরে ব্লাড সুগারে, কিন্তু বাড়িতে লুকিয়ে চকোলেট কিনে খেতেন, মজা করেই বাঁচব, কোন বাঁধা মানব না, এই ছিল তাঁর লাইফস্টাইল।

১৯৯৬ সালের ১৫ই মার্চ, হঠাত বুকে নিদারুণ যন্ত্রনা, পরের দিন শুটিং তাই কিছুতেই হাসপাতালে যাবেন না। বাড়িতে ডাকা হল ডাক্তার, কিন্তু সে যন্ত্রনা আর থামল না, নিয়ে যাওয়া হল পিজিতে পরের দিন ভোর বেলায়, সেখান থেকে আর বাড়ি ফিরলেন না অনিল বাবু, ১৭ তারিখে চলে গেলেন সব বন্ধন কাটিয়ে।

____


ADMIN

Author: ADMIN

Comments

Please Login to comment