বেইমান- তমালী চক্রবর্ত্তী

ব্জিভর্তি থলে নিয়ে অনেক কষ্ট করে বাড়ির দরজার তালা খুলল ফাতিমা বেগম। আজকাল আর আগের মতো দৌড়ঝাঁপ পোষায় না। ৬০ তম বসন্ত কিছুদিন আগেই পেরিয়েছে, হাঁপ ধরা স্বাভাবিক। তাও আল্লার মেহেরবানী তে সমবয়সীদের থেকে এখনও অনেক বেশী সুস্হসবল সে। উচ্চরক্ত চাপ ছাড়া আর বিশেষ কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু এইভাবে আর কদ্দিন? মাঝে মাঝে ভাবে ফাতিমা। সংসারে কাজের লোক রাজিয়া ছাড়া তো আর কেউ নেই তার দেখভাল করার মতো। সেই শহরে আসার সময় থেকে আছে। সারাদিন থেকে কাজ করে, রাতে বাড়ি ফিরে যায়। সামনেই বাড়ি রাজিয়ার।
একমাত্র পুত্র খালেদ কে অনেক কষ্টার্জিত টাকায় বিদেশে পড়তে পাঠিয়েছিল ফাতিমা। খালেদ যে লন্ডনে পড়তে গেল,আর ফিরল না। তার দেওয়া চিঠিগুলো আর ফোনই একমাত্র সম্বল ফাতিমার। তাও চিঠিগুলোতে খালেদ এর ছোঁয়া পেত ফাতিমা। কিন্তু ফোন আসার পর তো চিঠি পাঠানোটাই বন্ধ হয়ে গেল। গত ১৬ বছর ধরে খালেদ লন্ডনে। পড়াশোনা শেষ হলে চাকরী পেল। তারপর ওখানকার মেয়ে বিয়ে করে থেকে গেল। ফাতিমা জানে তার ২টি নাতনি আছে। এতদিনে বৌমা আর নাতনিদের ছবি ছাড়া কিছুই সে দেখেনি। খালেদ ও কয়েকবার আসবার জন্য চেষ্টা করেছিল। কিন্তু প্রত্যেকবারই আসতে ব্যর্থ হয়েছে কোনো না কোনো কারনে। বছরে খালেদ এক দুবার ই ফোন করে, এক ঈদে আর নিজের জন্মদিনে। তাও মিনিট দুই এর বেশী নয়। খালেদ ছোট থেকেই বেশ সাশ্রয়ী।

ফাতিমা কাছেই একটা প্রাইমারী স্কুলে পড়াতো। কয়েকদিন আগে অবসর নিলেও বিদ্যালয়ে শিক্ষিকার ঘাটতি থাকার জন্য তাকে কর্তৃপক্ষ তাকে এখনও রেখে দিয়েছে। বেশ লাগে তার বাচ্ছাদের সাথে সময় কাটাতে। রাতে বিছানায় শুয়ে ফাতিমা ভাবতে লাগল প্রায় গোটা জীবনটাই তার একাকিত্বে কেটে গেল। একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল তার ভেতর থেকে। আর কদ্দিনই বা বাঁচবে সে? নাহ!…কালই খালেদ কে ফোন করে এখানে আসতে বলতে হবে। সম্পত্তি বুঝিয়ে দিয়ে তবেই তার শান্তি।

——–
বর্ষণমুখর এক সন্ধ্যে, রাস্তায় কুকুর-বিড়ালও অদৃশ্য। টিউশন করিয়ে একা বাড়ি ফিরতে বেশ ভয় লাগছে ফাতিমার। হাঁটতে-হাঁটতে হঠাৎ কানে এল এক মিহি কান্নার স্বর। এগিয়ে গিয়ে দেখল সামনের শেডের তলায় ডাস্টবিনে পড়ে আছে এক সদ্যজাত শিশু। তার গলায় একটা রঙওঠা চেনে ঝোলানো ॐ লেখা লকেট। বাচ্ছাটা নিশ্চই হিন্দু। ত্যাগ করলেও বাড়ির লোক বাচ্ছাটাকে ধর্মচ্যুত করেনি। ভেবেই বেশ হাসি পেল ফাতিমার। আশেপাশে একটু খুঁজল যদি কাউকে দেখা যায়। ব্যর্থ হয়ে পরম মমতায় বুকে তুলে নিল শিশুটিকে। মা এর আবার জাত হয় নাকি? আহা! খালেদ এর থেকে কতই বা বড় হবে? বড়জোর দুমাস। এই ক্ষুদে কে কিছুতেই এখানে ফেলে যেতে পারবে না সে।
বাড়ি ঢুকতে না ঢুকতেই আব্বু-আম্মীর থেকে শুনল খালেদের দুপুর থেকেই বেশ জ্বর। সদ্যজাত কে আব্বুর জিম্মায় দিয়ে ফাতিমা দৌড়ে গেল খালেদের কাছে। সদ্যজাতকে দেখে অবাক হলেও সেই মুহুর্তে কিছু বললেন না আব্বু-আম্মী, খালেদের কথা ভেবে।
ফাতিমার নিকাহ হয়েছিল বিজনেস টাইকুন রসুলের সাথে। বিয়ের তিন মাস পর ফাতিমা বুঝতে পারে রসুল কতটা খারাপ লোক। এক্সপোর্ট-ইম্পোর্টের সাথে চালাতো ড্রাগস্ আর মেয়েপাচারের ব্যবসা। এসব জানার পর ফাতিমা এক কাপড়ে নিজের ঘর ছেড়েছিল। ভাগ্যিস চাকরীটা বিয়ের আগে থেকেই করতো। না হলে যে কী হতো? আর কোনোদিন রসুলের কাছে সে ফিরে যায় নি, রসুলও আর নিতে আসেনি। আব্বুর ঘরে আসার একমাস পর ফাতিমা জানতে পারে যে সে মা হতে চলেছে। নাহ!.. রসুল কে সে জানাবার প্রয়োজন মনে করেনি। খালেদ হলো ৭ মাসের মাথায়, প্রি-ম্যাচিওর। জন্মের পরই জন্ডিস ধরা পড়ল। তারপর থেকেই খালেদ কিছু না কিছুতে ভুগছে।
ঘন্টা ২ পর ফাতিমা যখন বাইরের ঘরে এলো, আম্মী-আব্বু জিজ্ঞাসা করলে ফাতিমা শোনাল পুরো ঘটনাটা। ঠিক করা হল পরদিন ভেবেচিন্তে কিছু একটা ঠিক করা হবে।
পরদিন সকাল হতে না হতেই খালেদ ইহজগৎ ত্যাগ করল। আম্মী-আব্বু জানত যে খালেদই ফাতিমার শেষ আশা ভরসা। ফাতিমা যখন খালেদের দুঃখে পাগলপাড়া তখন অতি যত্নে সদ্যজাত কে ফাতিমার কোলে তুলে দিল আম্মী। বলল- কে বলল যে খালেদ আর নেই? এই তো তোর খালেদ। সবটাই আল্লার মেহেরবানী। খালেদের শূণ্য জায়গা নিমেষে ভরাট করে দিল সদ্যজাত। পরিপূর্ণ হলো ফাতিমার মাতৃত্ব।।খালেদের অন্ত্যোষ্টির পর ফাতিমার পরিবার শহরে চলে এল। খালেদের পরিচয়েই বড় হতে লাগল সদ্যজাত।

——-

মাস দুই পর অবশেষে ফিরল খালেদ, এত বছরের অপেক্ষার অবসান করে। ১৬ বছর পর খালেদের চেহারা একইরকম থাকবে ভাবাটা অস্বাভাবিক। খালেদের রঙ কিছুটা উজ্বল হয়েছে, ওজনটাও খানিক বেড়েছে, কয়েকটা চুলেও রূপোলী ঝিলিক। যাক!..এখন ফাতিমা মরলেও শান্তি পাবে। এতবছরের আশা পূর্ণ হল। আর কোন চাহিদা নেই তার। রাতে খাওয়ার পর ড্রয়িংরুমে খালেদ কে ডেকে পাঠালো ফাতিমা। খালেদ এলে তাকে বলল
– তোমাকে বলেছিলাম যে আমি কেন ডেকেছি?
– হ্যাঁ আম্মী। বলেছিলে সব সম্পত্তি বুঝিয়ে দেবে।তাই তো এত কাজ ফেলে আমি চলে এলাম আজকের জন্য।
ফাতিমা মুচকি হাসল ।
– বাবা..তুমি তো জানোই আমি অবসর নিয়েছি। রোজগার যা করতাম খুবই অল্প। তাই টিউশনিও করেছি যাতে তোমার কখনও অসুবিধা না হয়। এটাও জানো যে তোমার পড়াশোনার জন্য কত খরচ হয়েছে, আমার যত পি.এফ, এফ.ডি সব ভেঙেছি তোমার স্বপ্ন সত্যি করতে। গয়নাও বেচে দিয়েছি।
খালেদের ভ্রু কুঞ্চিত হল।
– এগুলো তো আমি সবটাই জানি আম্মী। বিদেশে কত খরচ। তার উপর বিবি-বাচ্ছারা আছে। সেইসব খরচ সামলে উঠে তোমাকে খরচ পাঠাতে পারি না বলে কী আমাকে এসব বলছ? কিন্তু তুমি তো স্কুলে চাকরী করতেই। ওতেই তো তোমার খরচ চলে যাওয়ার কথা।
– না না বাবা তোমার টাকা আমার লাগবে না।আমি দিব্যি আছি। আমি শুধু তোমাকে মনে করিয়ে দিলাম যে আজ অবধি তুমি কী পেয়েছ।
– সেটা তো সবার আব্বু-আম্মীরাই করে থাকে। এটা আবার নতুন কী?
– হ্যাঁ, নিশ্চই। মানুষ সন্তানের জন্য করবে না তো কার জন্য করবে? আমি তোমাকে এটাই জানাতে চাই যে আমার সম্পত্তি বলতে এই বাড়িটা আর পাশের জমিটা ছাড়া এইমুহুর্তে কিছুই নেই। সারাজীবনের সঞ্চয় তোমার পড়াশোনাতে লেগেছে। আমার পেনশান থেকেই আমার বাকী খরচটুকু চলে যাবে।
– বাড়ি জমি নিয়ে ভেবো না আম্মী। আমি এখানকার প্রোমোটারের সাথে কথা বলেই রেখেছি।
– তোমাকে অনেক কিছু দিয়েছি। এখন যখন শেষজীবনে আমার খরচা নিজেকেই চালাতে হবে তখন আমি নিজের জন্য কিছু ভেবেছি। আমি একটা উইল করেছি। আমার অবর্তমানে রাজিয়া আমার সব সম্পত্তির মালিক হবে। কারন গত কয়েক বছরে যদি আমাকে কেউ নিঃস্বার্থভাবে সেবা করে থাকে তো সেটা রাজিয়া। আর তোমার জন্যও কিছু আছে।
ফাতিমা একটা কাঠের বাক্স এগিয়ে দিল খালেদের দিকে। খালেদ খুলে দেখল একটা রঙচটা চেনের মধ্যে একটা ॐ লেখা লকেট।
– খালেদ এটাই তোমার পারিবারিক সম্পত্তি। তোমাকে যখন তোমার পরিবারের লোকেরা ডাস্টবিনে ফেলে গিয়েছিল, তখন তোমার সঙ্গে এটা ছিল। তোমাকে তুলে এনেছিলাম সেদিন। আমার নিজের সন্তান খালেদ পরদিনই মারা যায়।আমি সেদিনই তোমাকে তার জায়গা দিই। কখনও তোমাকে এসব বলিনি। শিক্ষা দিয়েছি নিজের মতো। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে বুঝেছি এক গাছের ছাল কখনও অন্য গাছে লাগে না। যাই হোক,ভালো থেকো বিবি-বাচ্ছাদের সাথে। কাল সকালে তোমার ফ্লাইট। আর বোধ হয় এই জীবনে দেখা হবে না। বিবি-বাচ্ছাদের আমার আশীর্বাদ দিও। অনেক রাত হল, যাও শুয়ে পড়ো।
ফ্যাকাশে মুখে খালেদ সোফায় বসে রইল। ফাতিমা নিঃশব্দে বেডরুমের দিকে এগিয়ে গেল।

(সমাপ্ত)


FavoriteLoading Add to library
ADMIN

Author: ADMIN

Comments

Please Login to comment