বোকা বউ ও একটা গয়নার বাক্স – পুলিশমানুষ শিবনাথ পাল

এই শেষ দশ দিন কল্যাণী কখনো ভুলবে না। কি থেকে কি হয়। ভাবলেও গা হাতপা ঠান্ডা হয়ে আসে।

অরিন্দম আজ নার্সিংহোম থেকে ছাড়া পাবে। গত দশদিন যমে মানুষে টানাটানি গেছে।

গত রবিবার খেতে বসেছে অরিন্দম আর তিতান, মাংস হয়েছে। কল্যাণী ইচ্ছে করেই একসাথে বসেনি, আজ সকালে অরিন্দম তাকে অনেক কথা শুনিয়েছে, সে বোকা, স্মার্ট নয়, কল্যাণীর বাবা যদি অরিন্দম এর মতো একটা ভালো জামাই কব্জা না করতে পারত এই সব। এসব রোজ শুনতে শুনতে কল্যাণীর গা সওয়া হয়ে গেছে। কল্যাণীর বেশি রাগ হয় যখন অরিন্দম অফিসের ববিতার কথা বলে, সে সুন্দরী , স্মার্ট, গান জানে, যাকে বলে দশ জনের সাথে আলাপ করিয়ে দেবার মতো। কাল রাতে অরিন্দম, তিতান ঘুমিয়ে পড়ার পর কল্যাণী অনেক কেঁদেছে। তার ভালবাসা তে কোনো খামতি নেই। সে অরিন্দম, তিতানের জন্য প্রাণ দিতেও পারে। সকাল থেকেই সে কিছু খায়নি। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার অরিন্দম সেটা খেয়াল পর্যন্ত করেনি।

     অরিন্দম তিতান এর সাথে গল্প করতে করতে খাচ্ছে, হাসা হাসি চলছে, অরিন্দম মোটা একটা হাড় নিয়ে সেটাকে কব্জা করার চেষ্টা করছে, ,ও হাড়ের ভেতরের মজ্জা খেতে খুব ভাল বাসে। হঠাৎই কি যে হল, অরিন্দম বিষম খেয়ে , চোখ মুখ উল্টে কেমন হয়ে গেল, কথা আটকে গেছে, গলা দিয়ে কেমন একটা ঘড় ঘড় শব্দ ,শুধু ইশারায় বোঝাতে পারল গলায় কি একটা আটকেছে।

   খাওয়া দাওয়া চুলোয় উঠলো,   পাশের ফ্ল্যাট থেকে পাল বাবুকে ডেকে ট্যাক্সি করে সোজা আর.জি.কর হাসপাতাল।

  অরিন্দম এর তখন কথা বন্ধ। আর.জি.কর এর ডাক্তার বললেন মাংস ও হাড়ের টুকরো শ্বাসনালী তে ঢুকে গেছে, অবস্হা কিছু বলা যাচ্ছে না। এডমিশন করে নেওয়া হলো। অক্সিজেন দেওয়া হয়েছে। বড় ডাক্তার না দেখা অবধি কিছু বলা যাবে না।

     বিকালে বড় ডাক্তার জানালেন যে মাংস ফুসফুসে চলে গেছে। এমন একটা অপারেশন করতে হবে যার সেট আপ এখানে নেই। পালবাবু বললেন বৌদি এখানে রেখে কোনো লাভ নেই, মেডি ভিউ তে চলুন, মানুষ টাকে বাঁচানোর চেষ্টা করতে হবে। অগত্যা আবার এম্বুলেন্স, বড় নার্সিং হোমের আই. টি.ইউ, ঝকঝকে ব্যাপার।ডাক্তার বললেন দেখুন ব্রঙ্কোস্কোপি না করলে কিছু বলা যাবে না। আপাতত ভেন্টিলেসনে থাকবে।

       কল্যাণী বাড়ি ফিরে এসেছিল, শ্বাশুড়ি কে ফোন করেছিল, শ্বাশুড়ি আসবে কাটোয়া থেকে, তিনিও বুড়ি মানুষ তাই কল্যাণী খুলে কিছু বলেনি। বাড়ি আসতেই তিতান কাঁদো কাঁদো মুখে এসে দাঁড়াল। কল্যাণী ছেলেকে বুকে টেনে নিয়ে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল, শুধু বলল ভগবানকে ডাক বাবা, বাবাই নিশ্চই সুস্থ হয়ে যাবে। কল্যাণীর খেতে ইচ্ছা করছিল না তবু ছেলেটার মুখ চেয়ে রুটি আলুভাজা বানাল রাত্রে।

      পরের দিন আবার সেই নার্সিংহোম, সকাল দশটা থেকে এগারোটা ভিজিটিং আওয়ার, মানুষটার জ্ঞান নেই। মুখে নল লাগানো, আশেপাশে টি.ভি র মতো যন্ত্র লাগানো। কল্যাণীর হাত পা ঠান্ডা হয়ে আসছে। সিস্টার দের বার বার জিজ্ঞাসা করে,” দিদি ঠিক হয়ে যাবে তো?” তারপর আবার সারাদিন বসে থাকা, বিকেলের ভিজিটিং আওয়ার এর জন্য। পাল বাবুর বউ বলেছেন তিতানকে দেখবেন। রাত্রে যখন বাড়ি ফিরল, তিতান পালবাবুদের বিছানায় ঘুমিয়ে গেছে। ওকে ঘরে নিয়ে এসে শোয়ায়।

       বিছানায় শুয়ে শুয়ে কল্যাণী আকাশ পাতাল ভাবে , ঘুম আসতে চায় না। অরিন্দম কোনোদিনই তাকে খুব ভালবাসেনি। সে খুব শিক্ষিতা নয়, দেখতেও আহামরি সুন্দরী নয়, বাপের বাড়ির আর্থিক অবস্থাও খুব ভাল নয়। অন্যদিকে অরিন্দম সরকারি চাকুরে, তার আরও একটু সুন্দরী, শিক্ষিতা মেয়ের সাথে বিয়ে হতেই পারত। তাছাড়া অরিন্দম সব সময়েই বলে এসেছে যে কল্যাণী ভীষণ বোকা, বোধ বুদ্ধি একেবারেই নেই। কল্যাণী ধীরে ধীরে মেনে নিতে শিখেছে, এসব দৈনন্দিন অসন্মান তাকে আর খুব নাড়া দেয় না,তাছাড়া তিতান জন্মেছে। ভাবছিল কল্যাণী, কিন্তু এসব আজ আর মনে করতে ভাল লাগছিল না, লোকটার অসহায় শ্বাস নেওয়া, বাঁচা মরার সন্ধিক্ষণে শুয়ে থাকা তাকে খুব কষ্ট দিচ্ছিল।

       জলের মতো টাকা বেরোচ্ছে, অরিন্দম এর একাউন্টে যা ছিল, সব শেষ। কল্যাণী কি ভাবে যে টাকা জোগাড় করছিল তা সেই শুধু জানে।

       রোজ সকাল থেকে নার্সিংহোমে, তার মতো একটা বোকা মেয়ে যে কি করে এতসব জটিল ব্যাপার বুঝছিল তা দেখলে অরিন্দমও অবাক হয়ে যেত। একটা বাঁচোয়া শ্বাশুড়ি আসায় ছেলেটাকে বাড়িতে নিশ্চিন্তে রেখে আসা যাচ্ছে।

অরিন্দমের দাদা অরুনাংশু কেন্দ্রীয় সরকার এর চাকরি করে ,সে গত পরশু দেখতে এসেছিল, কুড়ি হাজার কল্যাণীর হাতে ধরিয়ে হাত ধুয়ে ফেলেছে।

     কল্যাণী বুঝেছিল লড়াইটা তার একার। কিন্তু চেনা লোকেরা যখন দূরে চলে যায় তখন কিছু লোক এগিয়ে এল। তারা অরিন্দমের অফিস কলিগ। দুজন তিন জন করে রোজ আসল, তাকে সাহস দিল, অর্থ সাহায্যও করেছে। এমনকি অফিসের যে বোস দা ব্যাপারে অরিন্দম খুব নিন্দা করত সেই লোকটাও এসে আপন জনের মতো সব কিছু করলো। কল্যাণীর ভাবছিল মানুষের চরিত্রের কত দিক অজানা থাকে।

ভর্তি হবার দিন পাঁচেক পরে হঠাৎ রাত্রি একটায় নার্সিংহোম থেকে ফোন, আপনি এখনই চলে আসুন, পেশেন্ট এর ব্যাপারে কিছু ডিসিশন নিতে হবে। কল্যাণীর মনে হচ্ছিল ও পড়ে যাবে। উপায় না পেয়ে শেষমেশ অফিসের সরকার দাকে ফোন করল। তারা যখন পৌঁছল তখন রাত আড়াইটে। অরিন্দম কে ফুল অক্সিজেন সাপোর্ট দিতে হচ্ছে। অবস্থা ক্রিটিকাল।

এভাবেই যমে মানুষে টানাটানি গেছে দশ দিন ধরে। সকালে শ্বাশুড়ি, ছেলের জন্য রান্না করে দুটো নাকে মুখে গুঁজে নার্সিং হোম, রাত আটটায় বাড়ি ফেরা, দীর্ঘ দুশ্চিন্তার রাত।

       ভাবছিল কল্যাণী, তার মতো একটা বোকা, অকর্মন্য মেয়ে এত কিছু কি করে সামলাতে পারছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যুদ্ধটা সে জিতল। আজ অরিন্দম বাড়ি আসছে, ওর দাদা আর দুজন অফিস কলিগ গেছে।

কল্যাণী খুব খুশী, সে মা কালীর ছবিতে বার বার প্রণাম করলো। ভাবল আজ একটু সাজবে, ভাল করে টান টান করে চুল আঁচড়ে নিল। একটু রূপটান। গয়নার বাক্সটা বের করল, খুব হালকা হয়ে গেছে। ভেতরে মাত্র এক জোড়া কানের দুল শুধু পড়ে আছে। তাতে তার দুঃখ নেই,  মানুষটা তো সুস্থ হয়ে ফিরছে। অরিন্দমের আনস্মার্ট, চলনসই, বোকা বউ কল্যাণী ফাঁকা গয়নার বাক্সটাকে বুকে আঁকড়ে ধরে আনন্দে কেঁদে ফেলল…

____


FavoriteLoading Add to library

Up next

নষ্ট – সৌম্য ভৌমিক... আজকে জীবন রজস্বলা, উর্বর হবে কাল সে, লাটাইখানা সঙ্গে নিয়ে একলা ছাদের আলসে। আজকে জীবন স্মৃতিমেদুর, দায়ভার ঝেড়ে ফেলে, কুলুঙ্গিটা অপেক্ষাতে স্নেহের...
সাধ - তমালী চক্রবর্ত্তী     সকাল থেকেই আজ বেশ হিমশিম খাচ্ছে সুজাতা। মৌ এর সাধ। সময়মতো মৌ এর জন্য রান্না শেষ না করতে পারলে...কথার অন্ত থাকবে না।...
ভৌতিক সন্ধ্যা – প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়... কত কি না ঘটে। যার ব্যাখ্যা আমরা পাই না। যতই তর্ক বিতর্কে জড়াইয়া না কেন, কেন ঘটে বা ঘটল তার হদিস কে দেবে? এই ঘটনাটাই পড়ুন। আশ্চর্য হবারই কথা। আমিও হয়...
কল্পবৃক্ষ – সুস্মিতা দত্ত রায়... নদীর পাড়ে ঝাঁকড়া অশ্বত্থ গাছটায় হেলান দিয়ে বসেছিল কালু। এই অশ্বত্থ গাছটা থেকে পশ্চিমে কিছুটা গেলেই জঙ্গলের সীমানা শুরু। জঙ্গল আস্তে আস্তে গভীর থেকে গভ...
স্মার্টফোনের দুনিয়া কাঁপাতে আসছে Xiaomi A2... - অভিষেক চৌধুরী   বহু প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে মোবাইল দুনিয়ায় বিপ্লব ঘটাতে আসতে চলেছে xiaomi A2। ভারতের বাজারে Xiaomi- র জনপ্রিয়তা নিয়ে নতুন কর...
ADMIN

Author: ADMIN

Comments

Please Login to comment