ভালোবাসার চিঠি -স্নিগ্ধা রায়

প্রথম ভালোবাসার প্রথম দিনের গল্পটা তিতিরের আর পাঁচটা মেয়ের মতোই ছিল। দুদিকে দুটো বেনী ঝুলিয়ে, অনভ‍্যস্ত লাল পেড়ে সাদা শাড়ি সামলাতে সামলাতে স্কুলে যাওয়া। ক্লাস নাইন। শাড়ি তো পড়তেই হবে। স্কুলে যেতে হতো ট্রেনে, তারপর বাসে। স্টেশনে ট্রেনের জন্য অপেক্ষার মাঝে বন্ধুদের সাথে একটু আড্ডা, আর আড়চোখে কলেজ ফেরৎ একঝাঁক উচ্ছ্বল ছেলে মেয়েদের তারুণ্য উপভোগ করা। মনে মনে ভাবতো উফ কবে যে বড়ো হবো, আর কলেজে পড়বো। কলেজ মানেই যেন একটা অলিখিত স্বাধীনতার ছাড়পত্র। তিতির কদিন ধরেই লক্ষ্য করছিল কলেজের ছেলে মেয়েদের ভীড়ের মধ্যে থেকে দুটো চোখ যেন তাকেই দেখে রোজ। মাঝে মাঝে সেই চোখ দুটোর সাথে চোখাচুখি হলেই অন্য দিকে চোখ ঘুরিয়ে নেয়। আড়চোখে একবার দেখে নেয় বন্ধুদের কেউ দেখে ফেললো না তো? বা একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা স্কুলের দিদিভাইরা?

সেদিন ভোরবেলায় সাইকেলে করে পড়তে যাচ্ছিল তিতির। সিতাংশুবাবুর কাছে, ইংলিশ। রাস্তার একটা বাঁক ঘুরতেই মনে হলো যেন কেউ পিছনে আছে। সাইকেল থামিয়ে পিছন ঘুরে কাউকেই দেখতে না পেয়ে আবার সাইকেল চালানো শুরু করলো। কিছুটা দূর যেতেই উল্টোদিক থেকে একটি সাইকেল এসে তার পথ আটকে দাঁড়ালো। তিতিরের একদম সামনে, সেই একজোড়া চোখ। নিজের অজান্তেই সে হাঁ করে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ। কান গরম হয়ে মনে হচ্ছে যেন ধোঁয়া বেরোচ্ছে। বুকের ভিতরের হৃদস্পন্দন হয়তো সেই সময় ওই জোড়া চোখের মালিকটিও শুনতে পাচ্ছিলেন। সম্বিৎ ফিরলো উল্টো দিকের সাইকেল আরোহীর কথায়। “মুখটা বন্ধ করো, অমন ভাবে হাঁ করে থাকলে তো মশা, মাছির সাথে সাথে আমিও ঢুকে যাবো।” লজ্জায় মুখ লাল হয়ে গেল তিতিরের। মাটির দিকে তাকিয়ে রইলো। কি করবে ভেবে পাচ্ছে না। কোনো এক অদৃশ্য শক্তি যেন হাত পা অবশ করে দিয়েছে। শত চেষ্টাতেও সাইকেলটা এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার শক্তি নেই তার। “আমি বুকুন, রোজই তোমাকে দেখি, কখনো কলেজে যাতায়াতের পথে স্টেশনে, আবার কখনো বা পড়তে যাওয়ার সময় এই রাস্তায়। অন্য সময় আমি তোমার পিছনে থাকি, একটু দূরে। মাঝে মাঝেই ভাবি ডেকে কথা বলবো, কিন্তু তোমার বন্ধুরা থাকে বলে তোমাকে আর অস্বস্তিতে ফেলতে চাইনি। আজ একলা আছো দেখে আগের গলি দিয়ে ঢুকে তোমার সামনে চলে এলাম।” কথাগুলো এক নিঃশ্বাসে বলে চলেছিল বুকুন। আর তিতির এদিক ওদিক দেখছিল কেউ দেখছে না তো তাকে এইভাবে একটা ছেলের সাথে ভোরবেলা রাস্তায় দাঁড়িয়ে কথা বলছে। ভয়ে হাত পা ঠান্ডা হয়ে যাওয়ার জোগাড়। “তোমার কোনো প্রবলেম হচ্ছে না তো কথা বলছি বলে?” উত্তরে তিতির মুখটা বেজার করে একটু হাসার চেষ্টা করে ঘাড়টা দুদিকে হেলিয়ে না বলার চেষ্টা করলো। তাতে হ‍্যাঁ বোঝালো নাকি না, তা তিতিরো জানে না। বুকুন হঠাৎ বলে উঠলো “আমি চলি, কোন্নগর যেতে হবে পড়তে। দেরী হয়ে যাচ্ছে।” বলেই হাতের মুঠো থেকে একটা কাগজের দলা ওর হাতে গুঁজে দিয়ে চলে গেল।

দিনের প্রথম আলো ছুঁয়ে গেল তিতিরের সারা শরীর। আলতো আঙুলের ছোঁয়া সারা শরীরে এঁকে দিল এক অদ্ভুত ভালো লাগা। হাতের মুঠোয় তখন এক দলা কাগজ। জীবনের প্রথম ভালোবাসার চিঠি।

-সমাপ্ত-


FavoriteLoading Add to library

Up next

শ্রীকৃষ্ণ বিচ্ছেদে – রুমাশ্রী সাহা চৌধুরী... শ্রীকৃষ্ণ বিচ্ছেদ অনলে মোর অঙ্গ যায় জ্বলিয়া..কানে হেডফোন মনে বিরহযন্ত্রণা,চোখটা আজ বড় ছলছল করছে শ্রীরাধার। ট্রেনের জানলা দিয়ে মুখটা বাড়ায় বাইরে, সবাইক...
ইলিশ মাছ ভাপা - মালা নাথ    "একে তো ফাগুন মাস দারুণ এ সময় লেগেছে ভীষণ চোট কী জানি কী হয়, অঙ্গে চোট পেলে সে ব্যথা সারাবার হাজার রকমের ঔষধি আছে তার, মরমে...
দত্তক – সায়ন্তনী ধর চক্রবর্তী... ।।১।। এতদিনের প্রচেষ্টায় আজ ফাইনালি C.F.O. হতে পারলো সুদিপ্ত, এই পোস্টটা পাওয়ার জন্য প্রচুর খেটেছিল ও। খবরটা পেয়েই অফিস থেকে রেডি হয়ে বেরিয়ে পড়ল দী...
সেই তুমি – পূবালী ব্যানার্জী মুখার্জী... - "ঠান্ডা লেগে যাবে তো, গায়ে কিছু জড়াওনি কেন?" একটু চমকে গেলাম। পেছনে তাকিয়ে দেখি বারান্দায় মহুয়া দাঁড়িয়ে। - "তুমি উঠে পড়েছ? কখন এলে? বসবে এখানে?" আ...
দূর্গামায়ের সিন্দুরকৌটো – স্বরূপ রায়... ১ আজ চতুর্থী। টুনু আর ফজিল বসে ঠাকুর গড়া দেখছিল। টুনুদের বাড়িতে প্রতি বছর দুর্গাপূজা হয়। টুনুর প্রপিতামহ সৌরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী এই অঞ্চলের জমিদার। ...
দত্তক - গার্গী লাহিড়ী মধ্যরাতে বারান্দার কোনটিতে একলা বসে লেখিকা অনুসূয়া আজ সে বড় ক্লান্ত পোষমানা স্মৃতির পাতাগুলো বিতর্কের ঝড়ে এলোমেলো অবাধ্য এত ক্ষো...
বেকার – সরোজ কুমার চক্রবর্তী... আমরা কজন পড়াশোনা শিখলাম পায়ে পায়ে একসাথে কত পথ চললাম, দেখতে দেখতে কবে বড় যে হলাম স্কুল,কলেজ পরে মাস্টার ডিগ্রী একসাথে শেষ করলাম l একদিন হটাৎ সবাই...
তবু ভালোবাসি – সায়ন্তনি ধর... ।। ১।। -“হ্যালো মা, আমি সুমি বলছি। আমরা পৌঁছে গেছি, তুমি চিন্তা কর না, রনি সবসময় আমার সাথেই আছে” মা কে কথা গুলও বলে ফোনটা রেখে আবার রনজয় কে ফোন করল স...
ভয়টা কীসের – সৌম্যদীপ সৎপতি... বড়াই শুনে মনে তো হয় উল্টে দেবে সরকারই, শুনতে পেলুম সেই তোমারই ভূতের নাকি ডর ভারি! লজ্জা কিসের? আচ্ছা রোসো, ধৈর্য ধরে খানিক বসো, বাতলে দিচ্ছি ভূত ভ...
ফাঁস - সিদ্ধার্থ নীল   জুতো জোড়ার ডানপায়েরটি ডান ও বাঁপায়েরটি বাঁয়ে ক্ষয়ে এসে একটু হেলে থাকছে। বহুদিনের অত্যাচার, রোদ বৃষ্টি সয়ে সয়ে আজ এই অবস্থা।...
ADMIN

Author: ADMIN

Comments

Please Login to comment