ভিলেন – অর্পণ সামন্ত

মানুষের জীবন এখানেই শুরু হয়। হসপিটাল। একেবারে শুভ্র চাদর পাতা শয্যা।যেমনটা হাসপাতালে দেখা যায়।হাসপাতালের মূল ঘড়িতে বারোটা বাজলো প্রায় নিঃশব্দে। ডিজিটাল ঘড়ি তো,তাই।সবাই বোধয় ঘুমিয়ে কাদা। ব্যতিক্রম বকুল। সিক্সটি টু জির বেডের সাদা চাদরে তার দেহ। চোখে ঘুম নেই। ঘুম আসতে দেয়নি ও নিজে। হার্দিক চলে যাওয়ার পর থেকেই মনটা অগোছালো। নির্ঘুম চোখে এতক্ষণ সব কিছু গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্ঠা করছিল বকুল।কিন্তু কোথায় কি!বারবার কুশ আর হার্দিক…হার্দিক আর কুশ।ওফঃ, মাথা ঝিম ঝিম করছে বকুলের।
সাতটার সময় এসেছিল হার্দিক।জানিয়ে দিলো,ওদের বিয়েটা হচ্ছে না।অমন মুখ পোড়া মেয়েকে মা বৌমা হিসাবে চায় না।বকুল তেমন কিছুই বলতে পারেনি।শুধু তার বীভৎস মুখে একটু হাসি ফুটিয়ে বলেছিলো,ভালোই করেছিস।
আর দাঁড়ায় নি হার্দিক।হনহনিয়ে বেরিয়ে গেছিলো।বাবা এসেছিল নটার সময়।জানিয়েছিল কাল বকুলের ডিসচার্জ হচ্ছে।সাথে বলেছিলো,চিন্তা করিস না রে।ডক্টর আদক বলছিলেন প্লাস্টিক সার্জারি তে ঠিক হয়ে যাবে।

হার্দিক আর বকুলের প্রেমটা তিন বছরের।কলেজে বকুলের তখন দ্বিতীয় বর্ষ।থার্ড ইয়ারের কেমেস্ট্রির বেস্ট স্টুডেন্ট হার্দিক আগরওয়ালের কাছ থেকে  প্রেম প্রস্তাবটা আসতে, তা সঙ্গে সঙ্গেই একসেপ্ট করেছিল বকুল।এমনিতেই হার্দিকের পেশী বহুল বডি কলেজের সিংহভাগ মেয়ের ক্র্যাশ।রিয়া তো ডার্ক প্রিন্স বলেই ডাকতো হার্দিক কে।
হার্দিকই অন্যান্য প্রেমিকদের মতো বকুল কে প্রায়ই বলতো,তোমার আঙুলে আঙুলে গলিয়ে শক্ত করে বেঁধে রাখবো সারাজীবন।ঝড়ের দমকা বাতাস কখনও আলাদা করতে পারবে না আমাদের।অথচ,সেই হার্দিক আজ…..
চোখ দুটো বুঝিয়ে একটু ঘুমাবার চেষ্টা করল বকুল।হার্দিককে নিয়ে আর মাথা ঘামিয়ে লাভ নেই।এতক্ষণ ঘুমকে আসতে দেয়নি,এবার ঘুমকে ডাকতে হবে।চোখ দুটো বুঝিয়ে জোরে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মাথাটা রিফ্রেশ করতে চাইলো বকুল।কিন্তু চাইলেই কি আর করা যায়!
বকুল নামটা বাবার দেওয়া।বকুলের বয়স তখন চারদিন।মেয়েকে কোলে দোলাতে দোলাতে স্ত্রী কে সুধিয়েছিলেন,কি গো…. মেয়ের নাম কিছু ভেবেছো।
বকুলের মা মাথা নাড়িয়েছিলো।দুধে আলতা আফ্রিকানদের মতো বকুলের গাত্র বর্ণ দেখে ওর বাবাই মেয়ের  নাম দিয়েছিল, বকুল।
ওর ফোনটা ক্ষেপা ষাঁড়ের মতো শব্দ তুলে ভাইব্রেট করছে।একরাশ বিরক্তিতে বাধ্য হয়েই চোখ মেললো বকুল।কুশ কলিং..।ছেলেটা চিপকু আশিকের মতো ওর পিছনে পরে আছে।কিন্তু হঠাৎ করেই যেন কুশ কে খুব ভালো লাগছে বকুলের।ফোনটা রিসিভ করলো বকুল।
-হ্যাঁ, কুশ।বলো।
-ঘুমাও নি,না?
-ঘুমাচ্ছি এখুনি।কাল আসছো তো?
কুশের ফিসফসানি শুনতে পেলো,আসবো।এখন ঘুমাবে কিন্তু।
ফোনটা পাশের টেবিলে রেখে দিলো বকুল।আবার চোখ মুদলো।চোখ বুজলে আমরা যে কালো মতো রংটা দেখতে পাই,সেটা এইগ্রেনগ্রো।সেই এইগ্রেনগ্রোর মধ্যে হঠাৎই যেন কুশের হাসি হাসি মুখটা ভেসে উঠলো।বকুলের কি তবে কুশের প্রতি ভালোলাগা জন্মাচ্ছে!

কুশের সঙ্গে আলাপ,তাও নয় নয় করে বছরখানেকের।বকুলের বাবার অফিসেই কাজ করতো কুশ।বাবা-মা নেই।ওর কাকা-কাকিমা নিঃসন্তান।কাকার কাছে মানুষ।এমনিতে ভালো ছেলে কুশ।নেশা-টেসাও নেই।বকুলের থার্ড ইয়ারটা কমপ্লিট হতে তখনো এক মাস বাকি।বকুলের বিয়ে দেওয়ার জন্য উঠে পড়ে লেগেছিলো ওর বাবা।পাত্র কুশ।মার্চের এক সন্ধ্যায় প্রথম কুশকে দেখেছিল বকুল।কাকা-কাকিমার সাথে হবু বউ বকুলকে দেখতে এসেছিল।বয়স বেশি নয়।হার্দিকের সমবয়সী।বা হার্দিকের চেয়ে দু-তিন বছরের বড় হবে হয়তো।শ্যামবর্ণ,মোটামুটি হ্যান্ডু বললেই চলে।বকুল সেবার কুশকে সরাসরিই বলেছিলো,আমি এঞ্জেজড।অন্য কাউকে ভালোবাসি।
কুশ ছেলেটা ভালো।মেয়ে পছন্দ হয়নি বলে,নিজেই বিয়েটা কাটিয়ে দিয়েছিল।তারপরেও বহুবার দেখা হয়েছে কুশের সাথে।কুশের চোখের গভীরতা বকুলকে যেন বারবার বলতে চেয়েছে,ভালোবাসি।কিন্তু কুশ বলেনি।
বকুলও চোখের ও ভাষা কে পাত্তা দেয়নি একবারও।

     ঘটনাটা দুদিন আগেকার।ভোরে জগিং এ বেরিয়েছিল বকুল।জগিং-এর জন্য ভোরটাই ওর প্রিয়।রাস্তা-ফুটবল মাঠ সব শুনসান থাকে।ডিসেম্বরের শুরু।কুয়াশার একটা আস্তরণ রহস্যময় কোনো আবহের প্রস্তুতি নিচ্ছিলো যেন।ঘটনাটা ঘটলো ফুটবল মাঠটার কাছে।রাধাচূড়া গাছটার নিচে।সত্তর পার্সেন্ট দিন ওখানটাতেই মিনিট পাঁচেক দাঁড়ায় বকুল।সেদিনও দাঁড়িয়েছিল।ফুল বিহীন পাতা ঝাঁকড়া রাধাচূড়া গাছটাও যেন রহস্যর পাখনা মেলে দাঁড়িয়ে ছিল।আচম্বিতেই কেউ যেন একরকম তরল জাতীয় কিছু পদার্থ ছুড়েদিয়েছিল ওর দিকে।লেগেছিলো ওর থুতনিতে আর বাঁ গালটায়।এক তীব্র জ্বলুনি অনুভব করেছিল আর অস্ফুটে চেঁচিয়ে উঠেছিল।তীব্র জ্বালা ধরানো অনুভুতিটা ওর চোখ দুটোকে আপনা-আপনিই বন্ধ করতে বাধ্য করেছিল।কে যে ওর মুখে অ্যাসিড ছুড়েছিল,তা আর জানা হয়নি বকুলের।তারপর সেই জনবিরল ভোরে কতক্ষণ সেই রাধাচূড়া গাছের নিচে পড়েছিল……কিভাবে ও হসপিটালে অ্যাডমিট হয়েছিল,তার কিছুই জানা নেই বকুলের।

হসপিটাল থেকে ওকে ডিসচার্জ করেছে সেই সকালে।আপাতত বকুল এখন তার নিজের ঘরে।ওর বাঁ গাল আর ঠোঁটের নিচটার চামড়া গুলো কীরকম যেন অস্বাভাবিক হয়ে গেছে।দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলো কুশ।হাসিমুখে বসলো খাটের উপর।তারপর বললো,কেমন বোধ করছো?
বকুল ঠোঁটে আলগা হাসি এনে বললো,কেমন বোধ করার কথা?যেমনটা করার কথা,তেমনটাই করছি।
কুশ একটু হাসলো।বললো,তোমার হাসিটা কিন্তু খুব সুন্দর।
বকুল হাসিটা আরও চওড়া করলো।তারপর ‘থ্যাঙ্কিউ’ বলে হঠাৎ চুপ মেরে গেল।মুখের হাসিটাকে মলিন করে বললো, পোড়া মুখের হাসিও সুন্দর!
কুশ এবার হঠাৎই যেন সাহসী হয়ে গেল।বকুলের ঠোঁট দুটোর নিচে থুতনিতে ছোট্ট করে একটা চুমু খেয়ে বললো,চামড়া টা সৌন্দর্যের শেষ কথা নয় বকুল।
দুজনেই চুপ।বকুল অবাক নয়নে তাকিয়ে কুশের দিকে।নিস্তব্ধতা ভেঙে কুশ হঠাৎই প্রস্তাব দিলো,আমায় বিয়ে করবে বকুল?
বকুলের মুখের হাসিটা ফিরে এলো।আগের মতোই তাকিয়ে রইলো কুশের দিকে।

কুশের কথা-আপনার জানতে ইচ্ছা করছে না,অ্যাসিড কে ছুড়েছিল বকুলের মুখে।তবে বলেই ফেলি।রহস্য বাড়িয়ে লাভ নেই।ওই কাজটা আমিই করেছিলাম।শেষ অবধি নয় যে গল্পের ভিলেনটা আমিই হলাম।
ওদের তিন বছরের প্রেম।ভাঙাটা আমার জন্য এতটাও সহজ ছিল না।তাই আলতো করেই তরলটা ছুড়েছিলাম ওর বাঁ গালে।বকুল যখন চেঁচিয়ে উঠেছিল,আমিও তখন যেন দুমড়ে মুচড়ে গেছিলাম ব্যাথায়।আসলে খুব ভালোবেসে ফেলেছিলাম ওকে।বকুলকে আমার নিজের করে পাওয়াটা দরকার ছিল। হার্দিক নামের প্রেমিকটাকে দু-চার ঘা দিলে হয়তো সরে যেত বকুলের থেকে।কিন্তু বকুলের মন থেকে নয়।আমি মন থেকে সরিয়ে দিতে চেয়েছিলাম।বকুলের মনের হার্দিকের নিউরণগুলো একবারে ধ্বংস করে দিতে চেয়েছিলাম।তারপরেই কাজটা করে ফেললাম।খারাপ একটা কাজ।এবার নিজের করে নিতে কতক্ষণ।ওর এক্স তো রাস্তা থেকে সরে গেছে।এখন আমিই হিরো…..আর আমিই ভিলেন…..।
লোকে বলে প্রেমের জন্য সবকিছুই ‘জায়েস’।তাই না!এভিরিথিং ফেয়ার ফর লাভ এন্ড ওয়ার।হু….হারে হারে টের পাচ্ছি।

 

____


ADMIN

Author: ADMIN

Comments

Please Login to comment