ভূত-ভবিষ্যৎ

-প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়

 

  সহেলি পাশ ফিরে শুলো। আজ তেমন গরম নেই। কারণ ক’দিনের বৃষ্টিতে বেশ চমৎকার আবহাওয়া হয়ে গেছে। ঘরের দুটো বড় জানালা খুলে দিয়ে বিছানায় পড়ে আছে সহেলি। দক্ষিণের জানলা দিয়ে মাঝে মাঝেই মনভোলানো বাতাস ঢুকছে। যাতে শরীরে অদ্ভুৎ সুন্দর আরাম আনছে। পাশ ফিরে শুলো সহেলি। আর তখনই জানলায় নজর গেল। চমকে উঠে পড়ল না ও। চোখ বোজার ভান করে পিটপিট করে চেয়ে দেখলো, জানলায় চারটে ছায়া মূর্তি বসে আছে। প্রথমটা বেশ ভয় লাগছিল ওর। তারপর যেন ভয়টা সয়ে গেল। চোর অবশ্যই নয়, কারণ গ্রিল দেওয়া জানলার চওড়া জায়গাটায় কোনও মানুষ বসতে পারবে না না। একমাত্র বসতে পারে ভূত মানে অশীরীরা। সহেলি ভয় পেল না। বরং চোখকে আধবোজা করে ওরা কি বলছে শোনার চেষ্টা করল। অদ্ভুৎ ব্যাপার, ভূত কথা বলতে পারে! নিজের কাছেই নিজে ভীষণ দ্বিধায় পড়ে গেল। আর তখনই শুনতে পেল, ওরা কি বলছে।

একজন বলল, কোনমতেই আমাদের লোকালয় ছাড়লে চলবে না। আমরা বাঁচব কি করে? দ্বিতীয়জন বলল, কিন্তু আমাদের আর ক’জনই বা ভয় পায় বল? সবাই বরং আমাদের নিয়ে মজা করতে চায়। চ্যালেঞ্জ করতে চায়। সারা পৃথিবীতে কতগুলো ঘোষ্ট ক্লাব আছে জানিস? তাদের কাজই হল, আমাদের নিয়ে গবেষণা করা। কোথায় আমরা আছি তার খোঁজ নেওয়া।
সহেলির চোখ কপালে উঠলো, এরা বলে কি?

এমন সময় তৃতীয়জন বলল, লোকালয়ে আমরা না থাকলে আমরা ক্রমে বিলুপ্ত হয়ে যাব। জ্যান্ত মানুষই আমাদের বাঁচিয়ে রাখতে পারে নানা রকম ভাবে। চতুর্থজন বলল, যেমন, মানুষই আমাদের জাহির করতে পারে। কারণ মানুষ থাকলে ভয় থাকবেই। ভয় থাকলে আমরা থাকবই।
এই পর্যন্ত শুনেই সহেলির কাঁধ ব্যাথা করল। কিন্তু সে অন্য পাশ ফিরতে পারল না। যদি সব হাওয়া হয়ে যায় তাহলে সে এসব কথা জানতেই পারবে না। সে ওই ভাবেই শুয়ে শুনতে লাগল। এখন ভয় বলে বস্তুটা তেমন জ্বালাছে না। বরং মজা লাগছে খুবই।

প্রথমজন বলল, এই দেখ না, আমরা যে জানলায় বসে আছি, এটা শহর। কোথাও কি আমাদের থাকার জায়গা আছে! যেদিকে তাকাও সেদিকেই ঝকঝকে ফ্ল্যাট আর আলো। আমাদের ঠাঁই নেই আধুনিক ফ্ল্যাটে। দ্বিতীয়জন বলল, ঠিক কথা। পুরানো সেন্টিমেন্ট এখন আর চলে না ভাই। কোলাহলের মধ্যেই আমাদের থাকতে হবে এবং ঘন লোকালয়ে। তৃতীয়জন বলল, একটা জিনিস মাথায় রাখবি তোরা, পৃথিবী যতদিন থাকবে অন্ধকার ততদিন থাকবে। মানুষের মনের অন্ধকার আর প্রকৃতির অন্ধকার। আর অন্ধকার থাকলেই যেমন করে হোক আমরা বাঁচবই। তবে আমাদের ভয় দেখানোর ফর্মূলা চেঞ্জ করতে হবে। আধুনিক মানুষ নানা পরিষেবায় আচ্ছাদিত। তার মধ্যে থেকেই ভয় ব্যাপারটা আনতে হবে। চতুর্থজন বলল, ঠিক কথা। ভয়ের সংজ্ঞা বদলাতে হবে। মারাত্মক কোনও ব্যাপার ঘটালে বিভিন্ন ক্লাব, ঘোষ্ট হান্টাররা এসে হাজির হয়ে যাবে। এমন কি বিজ্ঞান মঞ্চ নামে কুসংস্কার বিরোধীরাও এসে হাজির হয়ে যাবে। তাই হাল্কা চালে ব্যাপারটা ঘটাতে হবে। প্রথমজন বলল, কেমন?

দ্বিতীয়জন বলল, এই যেমন, হ্যাঙার থেকে কেউ জামা নিতে যাচ্ছে তখন দেখল, হ্যাঙারটা সরে যাচ্ছে। আবার পরমুহূর্তেই দেখল, হ্যাঙারটা ঠিক জায়গাতেই আছে। হাল্কা সন্দেহতে বাড়ির লোককে বলতে গেল, কেউ বিশ্বাস করল না। আবার একটু সরে গেল। জাস্ট ভয়ের বাতাবরণ তৈরি করে দেওয়া।  আবার সব ঠিকঠাক আছে, হঠাৎ বাথরুমের ভিতর দুম করে কিছু পড়ার আওয়জ। মানুষ বাথরুম খুলে দেখবে কেউ কোথাও নেই।

কনফিউজড করে দিতে হবে মানুষকে। ওদের মনে দ্বন্দ্ব তৈরি হবে, কিসের আওয়াজ হল? অথচ কিছুই দেখতে পাবে না। সব কেমন আশ্চর্যের। হঠাৎ করে ওদের মনে হবে, কেউ কি চলে গেল? খুঁজে পাবে না। একেবারে ভয়হীন করে দেওয়া নয় কিন্তু। হাল্কা ভয়ের আমেজ রেখে ওই দ্বিধায় ফেলে রাখা আর কি। তৃতীয়জন বলল, তাতে একটা সুবিধা হবে। তা হল, আধুনিক বাসস্থানে আমরা জ্যান্ত মানুষের সঙ্গে মিলেমিশে জীবনটা কাটাতে পারব।

সহেলি কি করবে ভেবে পাচ্ছে না। তার কিন্তু কোনও ভয় করছে না। কেমন যেন সহে গেছে ব্যাপারটা। চোখ পিটপিট করল। ছায়ামূর্তি গুলো একটু সরে বসল। মনে হয় পা ধরে গেছিল। এই দক্ষিণের ঘরে একাই শোয় সহেলি। তার আবার ঘরে আলো জ্বালানোর অভ্যাস নেই। তাই ঘর জুড়ে অন্ধকার চিৎপাত হয়ে পড়ে আছে। সহেলি নিজের পা-টা একটু নাড়াবার চেষ্টা করল। নাহ, নড়তেই চাইছে না। কেমন যেন পাথর হয়ে আছে সব। মনে হয়, ওদের জন্যই। বাইরে থেকে ফুরফুর করে দক্ষিণা বাতাস এসে ঘরময় বয়ে আবার চপলতায় পালিয়ে গেল।

চতুর্থজন বলল, আমাদের বাপ-ঠাকুরদারা তো অনেক ভয় দেখিয়েছে। তার ফল ভোগ করছি আমরা। মানুষ জানে ভূত মানেই ভয়, ভূত মানেই বিশ্রি ব্যাপার। এই আমেজটা কাটাতে হবে। ভূত হল, সমাজিক জীব। এই হবে আমাদের পরিচয়। লোকালয়ে আরামসে থাকব আমরা। নইলে আর ক’বছর পরে পোড়ো বাড়িও পাবি না, আর জঙ্গলঘেরা এলাকাও পাবি না। সব ঝকঝকে চকচকে হয়ে যাবে।

প্রথমজন বলল, মনে করে দেখ না, বাঁশ বাগান। আগে সেখানে আমাদের কত রমরমা ছিল। সারা দিনরাতে আরামসে থেকে গেছি। এখন গ্রামে বাঁশ বাগান আছে ঠিকই কিন্তু তাদের মুর্তিগুলো দেখেছিস? ঝকঝকে একেবারে। এখন বাঁশের দাম কত জানিস? শুনলে তোর পিলে চমকে যাবে।
দ্বিতীয়জন বলল, এই যে এলাকাটায় আমরা এখন বসে আছি। মনে করে দেখ, বড় বড় বাড়ি আর কতগুলো চিলেকোঠা, ঠাকুরদানলানের অন্ধকার স্যাঁতস্যাঁতে জায়গা ছিল? এখন কেউ মনেই করতে পারবে না ওসব ছিল! তৃতীয়জন বলল, রিয়েলি আমার কান্না পায় রে, আমাদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে। চতুর্থজন বলল, একদিন মিউজিয়ামে আমাদের যেমন তেমন বানিয়ে রেখে দিয়ে জনগণকে বোঝানো হবে, ভূতের ব্যাপারটা ছিল এই। ডিসগাস্টিং।

প্রথমজন বলল, সুতারাং আজ থেকেই লোকালয়ে, আধুনিক ফ্ল্যাট ও বাড়িতে আমাদের কর্ম পদ্ধতি ঠিক করে নিতে হবে। প্রথমেই বেছে নেব তেমন বাড়ি বা ফ্ল্যাট  যেখানে দুজনই বেরিয়ে যায় পেটের তাগিয়ে। ফেরে সন্ধ্যায়। সারাদিনের ফাঁকা বাড়ি বা ফ্ল্যাটে আমরা জমিয়ে দিন কাটাব। যেই থাক না কেন, আমরা টুঁ শব্দটি করব না। জ্যান্ত মানুষের মত আমরাও জ্যান্ত ভূত হয়ে বসবাস করব। বরং হেল্প করব তাদের। যাতে আমাদের থাকাটা পাকা হয়।

হঠাৎ দুম করে একটা আওয়াজ। কোথায় যেন কি পড়ল। বোমা-টোমা হবে হয়ত। সমাজবিরোধীদের অত্যাচার যা বেড়েছে!  তারপরই চারজন চারজনেরই মুখের দিকে চেয়ে বলল, আজ এইটুকু। বাকি আলোচনা আবার কাল। ওই দেখ, মেয়েটা নড়াচড়া করছে। হঠাৎ করে উঠে পড়লে ভয়ে চিৎকার শুরু করে দেবে। তা হতে দিলে হবে না। ধীরে ধীরে জ্যান্ত মানুষকে বশ করতে হবে। ভালোবাসা জন্মাতে হবে। চল। ভুস করে ওরা চলে যেতই সহেলি চমকে বিছানায় উঠে বসল।

একটু চোখ দুটো রগড়ে নিয়ে দক্ষণের জানলায় দাঁড়াল। সারা চত্বরটা জুড়ে অন্ধকার রয়েছে। যদিও রাস্তার বিশাল মার্কারির আলো থেকে এখানে সেখানে রহস্যময় আলো পড়েছে। ঘরের দিকে তাকাল। ঘর জুড়ে অন্ধকার। এমন সময় জানলা দিয়ে ফুরফুর করে বাতাস ঢুকে এল। গায়ে লাগতেই চমকে চিৎকার করে উঠলো সহেলি।

ওর মা পাশের ঘরেই শোয়। মেয়ের চিৎকারে ঘুম ভেঙে ছুটে এসে বলল, কি হয়েছে? বলেই আলো জ্বেলে দিল। জলের বোতলটা এগিয়ে দিয়ে বলল, জল খা তো। সহেলি ঢকঢক করে খানিকটা জল খেয়ে বলল, ভয় পেয়েছিলাম মা। ওর মা বলল, মানে? তাহলে তোর পাশে শুই? সহেলি না বলল না। মায়ের পাশে শুয়ে পড়ল। শুয়ে ভাবতে লাগল, ইস, এমন একটা ফালতু স্বপ্ন ও কেন দেখলো? কারণ কি? কোথাকার কোন ভূতেরা কে জানে, পথ ভুলে এদিকে চলে এসেছিল। আমার গভীর ঘুমটা নষ্ট হয়ে গেল যে। কাল ভোরেই উঠতে হবে, টিউশন আছে। ও মাকে জড়িয়ে ধরল। ওর মা বলল, পাগলী। ভয়ও পাবে আবার একলা শোয়াও চাই!

 

(সমাপ্ত)


ADMIN

Author: ADMIN

Comments

Please Login to comment