ভয় – তমালী চক্রবর্ত্তী

লঘর থেকে বেরিয়ে মেজাজটা খিঁচড়ে গেল বিতানের। এই বোরিং পেরেন্টস্-টিচার মিটিং এ সে কোনোদিনই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে না। কতবার নিপাকে বলেছে একা যেতে। অফিসের চাপ, বসকে সামলে তার পক্ষে আসা সম্ভব নয়। কিন্তু নিপার ওই এক কথা, ঋজু শুধু তার একার ছেলে নয়। ছেলের দোষ-গুণের ব্যাপারটা তার বাবারও জানা দরকার। নিপা আর কী বুঝবে? মাথার ঘাম পায়ে ফেলে তো আর রোজগার করতে হয় না।সারাদিন ফোন, বিউটি পার্লার আর নয় হাইসোসাইটি ক্লাবের বন্ধু-বান্ধবীদের সাথেই ব্যস্ত। রোজ কোনো না কোনো কিট্টি পার্টি। এখন নিজের বাড়িটাকেও ক্লাব মনে হয় বিতানের। আগে প্রবল আপত্তি জানালেও এখন আর কিছু বলে না বিতান। ব্যাপারটা গা সওয়া হয়ে গেছে।
ঋজু কলকাতার এক নামী ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের ক্লাস সিক্সের ছাত্র। গতবছর সে ফার্স্ট হয়েছিল বার্ষিক পরীক্ষায়। বিতান যথেষ্ট গর্বিত, কিন্তু আজ ঋজুর ক্লাস টিচারের মুখে ঋজুর ব্যাপারে সব শুনে বিতান খুব অবাক হয়েছে। মার্সিডিসটা স্কুলের গেট পেরতে না পেরতেই রাগে ফেটে পড়ল বিতান।
– সারাদিন তো বাড়িতেই থাকো নিপা। ঋজু দিনের পর দিন স্কুলে যাচ্ছে না কই বলনি তো আমায়? আমি নাকি ওর বাবা, আমার সবটা জানা উচিত। তুমি মা হয়েও কী জানো যে ও স্কুল যাচ্ছে না?
– শাট আপ বিতান। তুমিও যেমন বিজি, আমিও তাই। শরীর খারাপ হয়েছিল তাই হয়ত স্কুলে যায়নি।
– আচ্ছা? শরীর খারাপের জন্য নয় এক সপ্তাহ স্কুলে গেল না। নিপা, ও গত একমাস ইরেগুলার। তার উপর ম্যাডাম বলছিলেন ওর অন্যমনস্ক ভাব। ক্লাস টেস্টে পুওর মার্কস্ পাচ্ছে। ঠিকমতো পারফর্ম করছে না। বন্ধুদের সাথেও আজকাল কম কথা বলছে। হয়েছেটা কী ওর? প্লিজ এক্সপ্লেন।
– ডোন্ট শাউট। প্লিজ সিনক্রিয়েট কোরো না। জানি না আমি। আগে বাড়ি গিয়ে সবটা জানি ওর থেকে তারপর তোমাকে জানাবো।

বাড়িতে নিজের ঘরে বসে ড্রয়িং করছিল ঋজু। দুম করে দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকল নিপা। চোখে মুখে রাগ ঝরে পড়ছে তার। বিতানের জন্য হওয়া রাগটা সোজা গিয়ে পড়ল ছোট্ট ঋজুর উপর।
– ঋজু ..তুমি স্কুলে কেন যাচ্ছো না? তুমি জান আজ মিটিং এ আমাকে, তোমার পাপাকে কত কথা শুনতে হয়েছে তোমার জন্য?
– সরি মামমাম।
– আর যেন আমি কোনো কমপ্লেন না পাই। কাল থেকে রেগুলার স্কুলে যাবে।
– মামমাম, আমার স্কুল যেতে ভাল লাগে না।
কথাটা নিপার রাগকে আরও একটু উসকে দিল।
– যাবে না মানে? আমি নিজে তোমাকে দিয়ে আসব স্কুলে। ওই স্কুলে চান্স কজন পায়? তুমি পেয়েছ। সেটাকে মর্যাদা দিতে শেখো। আমি এ নিয়ে আর কোনো কথা শুনতে চাই না।

যেমন এসেছিল তেমন ঝড়ের গতিতেই বেরিয়ে গেল নিপা।

               রাতে বিছানায় শুয়ে পরদিন স্কুলে যাওয়ার কথা ভেবেই ভয়ে সিঁটিয়ে যেতে থাকল ঋজু। অথচ গতবছর কত ভালই না সময় কাটিয়েছে বন্ধুদের সাথে, টিচার্সদের সাথে। তারমধ্যে সবচেয়ে পছন্দের ছিল মি.মিত্র। ফিজিকাল এডুকেশন ক্লাসে স্যার পি. টি. করায়। ঋজু একটু গোলগাল। ঠিকমতো পি.টি. না পারলে বন্ধুরা যখন ওকে ক্ষ্যাপাতো, তখন স্যার ওদের খুব করে বকে দিত। মাঝেমাঝে চকলেট ও কিনে দিত ঋজুকে আলাদা করে। ঋজু মনের সব কথা বলত স্যারকে, যা ও পাপা-মামমাম কে বলতে পারত না। স্যার একদম বন্ধু হয়ে গিয়েছিলো।
হঠাৎ সব বদলে গেল একদিন। পি.টি. ক্লাসের পর ঋজু যখন পোশাক বদলাতে জনহীন টয়লেটে ঢুকল তখন দেখল স্যার ও সেখানে।
– একটা গেম খেলবে ঋজু? খুব মজার গেম। বড়দের গেম। তুমি তো বড় হচ্ছো। তাই তোমাকে শেখাবো ভাবলাম।
– হ্যাঁ স্যার। কি গেম বলুন? আমি শিখে সবাইকে একদম তাক লাগিয়ে দেবো।
– তাইতো। তুমি তো ফার্স্ট বয়। সব না শিখে রাখলে তো মুশকিল। কিন্তু একটা কথা। কথাটা কাউকে বলতে পারবে না। বলে দিলে আমি কিন্তু আর শেখাবো না।
– প্রমিস স্যার। আমি সত্যিই কাউকে কিছু বলব না।

স্যার ঋজুকে নিয়ে টয়লেটের একটা ছোট কামরায় ঢুকল। তারপর সময় না নিয়েই ঋজুর প্যান্ট খুলে দিল। হতভম্ব ঋজু কিছু বুঝে ওঠার আগেই মুখে রুমাল গুঁজে দিয়ে তার হাতদুটো পিছমোড়া করে বেঁধে ফেলল স্যার। কোমোডের সামনে ঋজুকে উপুর করে ফেলে পৈশাচিক যৌনতায় মত্ত হয়ে উঠল জানোয়ারটা। যন্ত্রণায় ঋজুর প্রাণ বেরিয়ে গেলেও মুখ দিয়ে একটাও শব্দ বের করতে পারল না। কতক্ষণ এই পৈশাচিক বৃত্তি চলেছিল ঋজুর মনে নেই। কিন্তু ছেড়ে যাওয়ার আগে স্যার যেগুলো বলেছিল সেগুলো ঘুমের মধ্যে রোজ তাকে তাড়া করে বেড়ায় ঋজুকে।
-“কাউকে কিছু বোলো না ঋজু। তোমার ভালোর জন্যই বলছি। যখনই কাউকে বলবে, কেউ বিশ্বাস করবে না। উলটে তোমাকেই নোংরা ভাববে। পাপা-মামমাম তোমাকে হস্টেলে দিয়ে আসবে। আর আমিও প্রিন্সিপালকে বলব যে তুমি কতটা খারাপ। কেঁদো না। তাতে সবাই সন্দেহ করবে তোমাকে। রেডি হয়ে ক্লাসে যাও।”
সত্যিই তো। কে বিশ্বাস করবে তাকে? পাপা শুনলে হয়তো হস্টেলেই পাঠিয়ে দেবে। পাপা কান্নাকাটি একদম পছন্দ করে না। পাপা বলেও ছিল ঋজুকে যে – ” বিগ বয়েজ রা কাঁদে না।” নাহ!..ঋজু আর কাঁদবে না।
এরপর থেকে নানা ছুতোয় স্যার তাকে ডেকে পাঠায়। চলতে থাকে পৈশাচিক ক্রিয়া। না..এখন আর কাঁদে না ঋজু। সে বিগ বয় না? কিন্তু ঋজুর মনের উপর প্রভাব পড়ে। শরীরের উপরেও। ঋজুর খুব ব্যাথা করে, ঠিকমতো হাঁটতে পারে না। বসতে গেলেও লাগে। স্কুলে যেতে ভয় পায় সে এখন। কখন তার ডাক পড়ে এই ভেবে।
কাল মামমাম তাকে স্কুলে নিয়ে যাবেই। না না..কাল কিছুতেই সে স্কুল যাবে না।

পরদিন জোর করে ঋজুকে স্কুলে নিয়ে গেল নিপা। ঋজু মনে মনে প্রস্তুতই ছিল। সঠিক সময়ে তার ডাক এল। নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছে সে নিজেই নিজের প্যান্ট খুলতে লাগল। স্যার খানিকটা খুশি হয়েই আজ তার হাতে দড়ি বাঁধলো না। ঋজুকে কোমোডে যথারীতি উপুর করা হল।আজ ক্রিয়ার পূর্বমুহুর্ত অবধি ঋজু তার স্নায়ূকে দুর্বল হতে দিল না। বুক পকেট থেকে সুইস নাইফ টা বের করে ঘুরে দাঁড়িয়ে সোজা চালালো স্যারের পুরুষাঙ্গের উপর। যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠল স্যার। আস্তে আস্তে সাদা মার্বেল ফ্লোর রক্তে ভেসে যাচ্ছে। ঋজু দেখল তার টার্গেট আধফালা হয়ে তখনও ঝুলছে।

খবর পেয়ে স্কুলে দৌড়ে এল বিতান ও নিপা। তারা সবটাই শুনল প্রিন্সপালের কাছ থেকে। ঘটনার পরে ঋজু বিশ্বাস করে সবটাই বলেছিল ওনাকে। প্রিন্সিপাল এও জানালেন যে তিনি যথাযথ আইনি ব্যবস্হা নেবেন। ঋজুকে তারা এখন বাড়ি নিয়ে যেতে পারেন।
দুঃখে-অনুশোচনায় ভরে গেল নিপা ও বিতান। আজ যদি তারা ঋজুর বন্ধু হতে পারত, ঋজুকে সময় দিতে পারত তাহলে ঋজুকে হয়তো এমন একটা দিন দেখতে হতো না। মার্সিডিসে ওঠার আগে বিতান ঋজুর সামনে বসে ঋজুকে বলল – “আমাদের ক্ষমা করে দিতে পারবি না?”
অশ্রুসজল চোখে নিপা ঋজুর কাঁধে হাত রাখল। ঋজু তার পাপাকে জড়িয়ে ধরল। বিতান বলল – “বিগ বয়েজ রা ও কাঁদে রে বোকা, কিন্তু পাপা-মামমামের সামনে।” ঋজু ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।

(সমাপ্ত)


FavoriteLoading Add to library
ADMIN

Author: ADMIN

Comments

Please Login to comment