মজুমদারবাবু

– প্রিয়া সরকার

 

 সে অনেককাল আগের কথা,তা বিশ পঁচিশ বছর আগের তো বটেই।আমি তখন ক্লাস সেভেনে পড়ি,হাফ ইয়ার্লি আর অ্যানুয়্যাল সাকুল্যে দুটি পরীক্ষা হত ইস্কুলে। সে এক মজার সময় ছিল, অ্যানুয়াল পরীক্ষাকে আমরা তখন হাফ ইয়ার্লির মত ছন্দ মিলিয়ে অ্যানুয়্যালি বলতাম। সারাবছরে মাত্র পরীক্ষার মাসদুটি বাদ দিয়ে বাকি আট মাস আনন্দে সাঁতার দিয়ে পার হত। সিক্স থেকে সেভেনে উঠতে না উঠতেই ছোটকাকা সাইকেল কিনে দিয়েছিল।

আমাদের নৈহাটির টালিখোলা, বরা, তালপুকুর, কাঠগুদাম হেন কোনো জায়গা ছিল না যেখানে আমি আমার লোহার পক্ষীরাজে যাইনি। সাইকেল চালাতে চালাতে বিপরীতমুখী হাওয়া এসে চোখেমুখে ধাক্কা দিত, আমার রোগা পাতলা শরীরের শার্ট কেমন পিছন পানে ফুলে উঠত, একটু ফাঁকা জায়গা দেখলেই উঁচু ক্লাসের দাদাদের দেখাদেখি হাত ছেড়ে সাইকেল চালানোর প্র্যাকটিস করতাম। গোঁফের রেখা তখনও ফোটেনি, ঘামলে পরে নাকের নীচে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমত। ইস্কুলে সাইকেল নিয়ে যাওয়া মানা ছিল বাড়ি থেকে, রেললাইন পেরিয়ে স্কুলে যেতে হত কিনা;  রেলব্রিজের তলায় সোনাদার গ্যারেজে সাইকেল জমা থাকত। স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে হরেক রকমের ফেরিওলার সাথে মুলাকাত হত। আমাদের গার্লস স্কুলের মেয়েগুলো হামেশাই আলুকাবলি, তেঁতুলমাখা, কাসুন্দিমাখা কাঁচা আম কিনে কিনে খেত। আমার বিশেষ পছন্দের ছিল কাসুন্দিমাখা কাঁচা আম। তবে ছেলে হয়ে মেয়েদের সঙ্গে একই লাইনে দাঁড়িয়ে ওসব কিনতে বাধো বাধো ঠেকত, পাছে কেউ দেখে ফেলে প্যাঁক দেয়। মাকে বিরক্ত করতাম তাই গরমকাল পড়লেই। তবে মণিমেলার মাঠের কাছে যে ধূলোমাখা কাঁচা আম কাসুন্দি দিয়ে বিক্রি হত, মা হাজার চেষ্টা করলেও সেই স্বাদের ধারে কাছে আসতে পারত না।

কাঁচা আমআলাটার কাছে একটা হলদেটে লম্বা ডান্ডির চামচ থাকত, সেটা দিয়ে তুলে তুলে কাসুন্দি মাখাতো আমের গায়ে,সবজে হলুদ কাঁচামিঠে আমের গা বেয়ে বেয়ে সে রস গড়াত আর আমি মুগ্ধ হয়ে সেপানে তাকিয়ে থাকতাম। দিব্যি কাটছিল দিনগুলো, বাধ সাধল ক্লাস সেভেনের হাফ ইয়ার্লি পরীক্ষার ইংরাজীর নাম্বার। সে সময় চৌত্রিশ নম্বরে পাশ নম্বর ছিল, আমি পেয়েছিলাম ত্রিশ। আমার মত নৈহাটি নরেন্দ্র বিদ্যানিকেতনের ক্লাস সেভেনের আরও গোটা বিশেক ছেলেপুলে ইংরাজীতে ডাব্বা পেয়েছিল। ইংরাজী আর অঙ্কে ডাব্বা পাওয়াটা আমার বাড়িতে মানুষ খুনের সমতুল্য অপরাধই ছিল। বাড়ির কাকা জ্যাঠা সকলেই ইংরাজী নাহলে অঙ্কে স্কলার ছিলেন। এহেন স্কলারদের বংশে আমার মত কদাকার কি করে জন্মালো তা নিয়ে সবাই চিন্তিত হয়ে পড়লেন। এক সপ্তাহ ধরে কেউ না কেউ কান মুচড়ে দিয়ে যেতেন। শেষে রক্ষা করলেন ঠাকুমা, বাবাকে ডেকে পাঠালেন।ঠাকুমার ঘরটি ছিল আমাদের লম্বা এল শেপের বাড়ির একপ্রান্তে, মেরেকেটে ফুট পাঁচেকের মহিলাটি মোটেই গোপাল বা অন্য কোনো ঠাকুরদেবতার পুজো নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন না। সকাল সন্ধ্যে তিনি তার এক পাল নাতি নাতনিকে গল্প পড়ে শোনাতেন। শীর্ষেন্দু, সুনীল, সঞ্জীব এইসব আধুনিক লেখকদের কিশোরপাঠ্য গল্পে হাতেখড়ি আমাদের ঠাকুমার হাতেই। বাবার সাথে ঠাকুমার সেদিনের কথাগুলো মনে আছে এখনও আমার,“রবি,অমল অমন মুখ চুন কইরা ঘুরতাসে ক্যান? আইজ হপ্তাখানেক ধইরা পোলাটার চাঁদপানা মুক শুকাইয়া ফেলাইছিস তরা। আর ইস্কুলের মাস্টারদিগের বলিহারি। পড়াখান কেলাসে শিখায়নি ক্যান?হক্কলে পাশ কইরল না ক্যান?তরা ওকে বাড়িতে গাইড করিসনি ক্যান?”

এই বাক্যবাণের জোয়ারে আমার নিরীহ বাবা গঙ্গাজলে পানকৌড়ির মত ডুবে ডুবে ভাসতে লাগলেন। বলা বাহুল্য, আমার ইংরাজীতে এই অপরিসীম কৃতিত্বের সম্পর্কে আমার বাবা উদাসীন ছিলেন। জীবনে যে কোনো সমস্যায় তার একটাই সমাধান ছিল, “সময়ে সব ঠিক হয়ে যাবে।” এমনই মানুষ ছিলেন, বড় ছোটো সকলকেই ভয় পেতেন। অন্যান্য দাদা ও ভাইদের তুলনায় তার মাসিক রোজগার কম ছিল বলে মনে হয় হীনমন্যতায় ভুগতেন।

তাই দুবেলা যে আড়াইপ্যাঁচ কানমুচুড়ি পাওনা ছিল আমার,তা নিয়ে আপত্তি থাকলেও মুখে প্রকাশ করতে পারতেন না।অথচ কি করলে আমার এই নাদানখাস্তা ইংরাজী উন্নত হবে সেই গভীর চিন্তার সমাধানও তার কাছে ছিল না। ঠাকুমার কথা এক মনে মাথা ঝুঁকিয়ে শুনছিলেন,কোনো মতে মাথা উঁচিয়ে বল লেন, “আচ্ছা দেখি কি করা যায়।”

“তাই দ্যাখ!” বলে একমনে ঠাকুমা পান চেবাতে লাগলেন।
অতঃপর আদাহাটা রোডের যে মোড়টা গিয়ে কল্যাণী এক্সপ্রেসওয়েতে মিশেছে,সেই খানে এক একতলা বাড়ির লাগোয়া এক অ্যাসবেসটেরের চালদেওয়া প্লাস্টারহীন ক্লাসঘরে আমার ছোটকা আমায় নিয়ে গেলেন, সেখানেই মিটমিটে ষাট পাওয়ারের বাল্বের আলোয় ধোপদুরস্ত ঘিয়ে রঙের পাঞ্জাবি আর সাদা পায়জামা পরিহিত শীর্ণকায় মজুমদারবাবুর সঙ্গে আমার পরিচয় হল। ছোটকা বললেন, “প্রণাম কর,উনি তোমায় ইংরাজী শেখাবেন।” পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলাম। মাস্টারমশাই খুব খুশি হয়ে উজ্জ্বল হেসে আমার নাম জিজ্ঞাসা করলেন- “অমল কুমার বোস-বাহ্ বাহ্ খুব ভালো।”

চারদিকে চেয়ে দেখলাম, ছাত্র ছাত্রী সংখ্যা গোটা দশেক। মূলতঃ ক্লাস সেভেন, এইট ও নাইনের ছেলেমেয়েরা পড়তে এসেছে।
আমার বিখ্যাত স্কুলের একজন বন্ধুও নেই দেখে মন খারাপ হল, তবে পার্শ্ববর্তী গার্লস স্কুলের দুএকটি চেনা মুখ আছে দেখে ভরসা পেলাম। সেই সময় ছেলে ও মেয়েদের  “বন্ধুত্ব” ব্যাপারটা ঠিক গজিয়ে ওঠেনি। বিষমলিঙ্গদের সাথে বেশি ভাব থাকলে ছেলেপিলেদের বিশেষ শ্লেষ ও বিদ্রুপের সম্মুখীন হতে হত।বুঝতে পারতাম, অপর পক্ষেও তাই ছিল। অথচ,ভাব করার প্রবল অবদমিত ইচ্ছা ছিল দুপক্ষেরই। যাই হোক, প্রতি মঙ্গল, বৃহস্পতি আর শনিবার ভোর সাড়ে ছটা পড়ার সময় নির্ধারণ হল। আমি একাই প্রথম এসেছি, সাইকেলটাকে সুপুরিগাছের তলায় দাঁড় করিয়ে সবে চিন্তা করছি, স্যারকে ডাকব দেখি ক্লাসঘরের দরজা খোলা। উঁকি মেরে দেখি স্যার ঝাঁট দিয়ে ঘর পরিষ্কার করছেন। চোখে বিসদৃশ ঠেকল, এযাবৎ বাড়ির মা মাসিদের ছাড়া অন্য কারও হাতে ঝাঁটা দেখিনি। আমাকে দেখে স্যার হাসলেন, বসতে বলে বাড়ির ভিতর ঢুকে গেলেন এবং ঠিক দুমিনিটের মধ্যেই ফিরলেন। হাতে দুটি পাতলা পাতলা বই।

বেঞ্চের সামনে রাখা একটা কাঠের চেয়ার, এসে বসলেন তাতে। ঘরের জানালা খোলা, জানালা দিয়ে সকালবেলার নরম আলো সুপুরিগাছের ফাঁক দিয়ে আমার সামনে খোলা খাতার পৃষ্ঠায় আলো আঁধারির আলপনা এঁকে দিচ্ছে। ভাবছিলাম, এইবার স্যার পড়া জিজ্ঞাসা করবেন।কিন্তু আমাকে অবাক করে স্যার সেই পাতলা বইদুটোর একটা থেকে পড়তে শুরু করলেন-

“I wandered lonely as a cloud
That floats on high o’er vales and hills,
When all at once I saw a crowd,
A host, of golden daffodils;
Beside the lake, beneath the trees,
Fluttering and dancing in the breeze..”

বুঝলাম, এটি একটি ইংরাজী কবিতা,সিলেবাসে নেই। লেক ,ট্রি,ডান্সিং ইত্যাদি কটা ছুটকা ছাটকা শব্দ বাদ দিয়ে অন্য কোনো শব্দের অর্থ বুঝতে পারছিলাম না, কিন্তু সেদিনের সেই ভোরবেলায় শীর্ণকায় সেই মাস্টারমশাইয়ের সুরেলা নরম আওয়াজে কোনো এক অলীক মায়াময় স্বপ্নজগতের দরজা আমার কাছে খুলে গেল। আমার মনে হল, কোনো এক পথিক, সারাদিনের ক্লান্তির শেষে এক আকাশ বিস্তৃত সবুজ ক্ষেতের মধ্য দিয়ে হেঁটে চলেছে, তার ক্লান্ত পায়ে স্নিগ্ধ শিশিরের ছোঁয়া লেগে ধুয়ে যাচ্ছে অবসাদ। শব্দগুলোর অর্থ মাথায় ঢুকল না অথচ আমার বারো বছরের মনোজগতের অন্দরমহলে তারা কড়া নেড়ে গেল। কবিতা পড়া শেষে স্যার থামলেন,জিজ্ঞাসা করলেন কেমন লাগল-জানি না কি ভেবে অনুভব প্রকাশ করে ফেললাম। স্যার বই বন্ধ করে আমার দিকে তাকালেন, দেখলাম স্যারের চোখে জল। উঠে এসে দুহাতের মধ্যে আমার মুখটা তুলে বললেন, “অমল, তুমি অনেক বড় হবে।” বড় হয়ে বুঝেছিলাম ওয়ার্ডসওয়ার্থের কবিতাটার আক্ষরিক অর্থ আমার সেদিনের অনুভূতির চেয়ে সম্পূর্ণরূপে আলাদা ছিল কিন্তু স্যার জানিনা কেন সেদিন আক্ষরিক অর্থ বাদ দিয়ে আমার অনুভূতির উপর এত জোর দিয়েছিলেন। সেই শুরু, মজুমদার স্যারের হাত ধরে ইংরাজী সাহিত্যের অজানা অচেনা অলিতেগলিতে শুরু হল আমার নির্ভার ভ্রমণ।

সিলেবাস অন্তর্গত আর সিলেবাস বহির্ভূত পাঠ্যরা রক্তমাংসের কায়া নিয়ে আমার চোখের সামনে বাঙ্ময় হয়ে উঠল। রবার্ট ফ্রস্ট, উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ, আর এল স্টিভেনসন, ওয়াল্টার ডিলা মারের রচনায় ধীরে ধীরে আবিষ্ট হতে থাকলাম। গ্রামার নিয়ে স্যার চাপাচাপি করতেন না, লিখতে দিলে আমার আজগুবি লেখাগুলোর এত প্রশংসা করতেন যে লজ্জায় মাথা নত হয়ে যেত। ছমাস যেতে না যেতেই গ্রামারের ছন্দবদ্ধ সুরটা ধরিয়ে দিলেন। অঙ্কে আমি ভালো ছিলাম,স্যারের গ্রামারের ছন্দের সঙ্গে অঙ্কের বস্তুবিশিষ্টতার মিল টের পেতাম আর লিটারেচার যখন পড়াতেন মনে হত উদাসী কোনো এক বাউল তার একতারায় মিষ্টি সুর তুলে গ্রামের বাঁকে হারিয়ে যাচ্ছে। এই হারিয়ে যাওয়ার অনুভূতিটাই বারবার আজও প্রচ্ছন্ন আদরের মত এই ধেড়ে বয়সেও মনকে নাড়িয়ে যায়। এই পড়ালেখার পরিবেশের মধ্যেও আমাদের মধ্যে হাসি,ঠাট্টা,মজা আর গুলতানির কোনো অভাব ছিল না, শুধু তাল কাটত মাস পয়লা হলে।

মাস পয়লা হলে আমাদের মজুমদারগিন্নীর সঙ্গে দেখা হত। পৃথুলা মহিলা, এতটাই মোটা করে সিঁদুর পরতেন যে এত বছর পরেও তার মুখটা মনে পড়লে তার সিঁথিটাই স্মৃতিতে জ্বলজ্বল করে ওঠে। স্যারের বাড়ির অন্দরমহল থেকে তার মেঘমন্দ্রগলায় মাঝে মাঝে চিৎকার শুনতাম। কানাঘুষোয় শুনতাম উনি পতি প্রহারেও সিদ্ধহস্তা।

যাই হোক, প্রতি মাস পয়লায় গুরুপত্নী একনিষ্ঠভাবে এসে দাঁড়াতেন এবং টিউশন ফিজ হিসাবে চল্লিশটাকা প্রত্যেক ছাত্রছাত্রীর কাছ থেকে গুনে গুনে নিতেন। কেউ কোনো কারণে ডেট মিস করলে তার দুর্গতির সীমাপরিসীমা থাকতনা। আমাদের সাথে বিল্লেশ্বর বলে একটি দুর্ভাগা ছেলে পড়ত, আমরা তাকে বিল্টু বলে ডাকতাম। নৈহাটি কাত্যায়নী গার্লস হাই স্কুলের একটি মেয়ের সঙ্গে তার একটু ওই যাকে বলে প্রেম প্রেম ভাব ছিল। ততদিনে আমরা একটা ইংরাজী ইডিয়ম শিখেছি- “go weak at the knees”-অর্থাৎ কাউকে দেখে দুর্বল হয়ে পড়া। বিল্টুকে দেখলেই আমরা হাঁটুতে হাত দিয়ে “উফ কি ব্যথা মরে গেলাম মরে গেলাম”বলে চেঁচিয়ে খিল্লি করতাম। কাত্যায়নীর মেয়েটি, নাম ছিল শিপ্রা, শুনে মুচকি মুচকি হাসত আর বিল্টু তেলেবেগুনে জ্বলে উঠত। এহেন বিল্টুর বাবার সাইকেলের দোকান ছিল।কোনো এক মাস পয়লায় বিল্টু স্যারের ফিজ আনতে পারেনি, দেখি মজুমদারগিন্নী তাকে যারপরনাই ধোলাই দিচ্ছেন-“ফিজ দিতে পারোনা, সাইকেলের দোকান সামলাও, ইংরাজী বুকনি শিখে কি হবে খোকা?”

বিল্টু দেখি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে, শিপ্রার মুখ কালো। স্যারের দিকে তাকিয়ে দেখি জানালার দিকে মুখ করে বসে আছেন, চোখমুখ দেখা যাচ্ছে না শুধু হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরা চক গুড়িয়ে ধূলো করছেন, একটার পর একটা।গুরুপত্নী প্রস্থান করলে উঠে দাঁড়ালেন, বিল্টুর মাথায় হাত বুলালেন, তারপর হাউ হাউ করে বিল্টুর সাথে একসাথে কেঁদে উঠলেন। উপস্থিত বারো তেরো বছরের কিশোর কিশোরীদের চোখে তখন জল।সেদিনের সেই নোনা জলের ধারা পান করতে করতে বুঝেছিলাম, আমাদেরই মতো কোথাও না কোথাও বড়রাও অসহায় হয়।
সেভেন থেকে ক্লাস এইটে উঠলাম, ইংরাজীতে পঁয়ষট্টি পেলাম। স্যারের কাছে বাবার সাথে গেলাম,এক বাক্স সন্দেশ নিয়ে। বুকে জড়িয়ে ধরলেন আমায়, স্যারের বুকের ওম নিতে নিতে মনে হল বাবার গায়ের গন্ধ আর স্যারের গায়ের গন্ধ কোথাও যেন এক হয়ে মিশে গেল।

ক্লাস এইটের অ্যানুয়াল পরীক্ষার আর মাত্র দেড় মাস বাকি, স্যার অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তখন হাই ব্লাড প্রেশারের রমরমা বাজার, প্রায়শই বড়বুড়োদের মুখে সে আতঙ্কের নাম শুনতাম। একদিন পড়াতে পড়াতে মাথা ঘুরে গেল,আমরা ধরে ধরে স্যারকে বাড়ির ভেতরে নিয়ে গেলাম। সেই প্রথমবার স্যারের বাড়ির অন্দরমহলে প্রবেশ করলাম। একটি তেলচিটে মলিন বিছানায় স্যারকে শোয়ানো হল, পাখার সুইচে হাত লাগিয়ে পাখা চালাতেই পিছন থেকে সেই বাজখাঁই গলায় চিৎকার ভেসে এল,- “ওটা শুধু রাতে চলে।রিটায়ার্ড মাস্টারের অত হাওয়া খেতে নেই।”

স্যার তখন প্রায় বেহুঁশ, আমি চোখ বন্ধ করে প্রার্থনা করেছিলাম স্যারের কানে যেন কথা না পৌঁছায়। ক্লাস বন্ধ হয়ে গেল,পড়ার চাপ উপেক্ষা করে স্যারকে দেখতে যেতাম রোজ। নিরীহ সেই নিঃসন্তান জ্ঞানবৃক্ষ চোখ বন্ধ করে শুয়ে গঞ্জনা শুনতেন- “মরা বুড়ো, মরতে বসেও পয়সা জমতে দিল না।” কিছু ওষুধ আর পথ্য স্যারের কেনার ক্ষমতা ছিল না, সে কথা আমি মর্মে মর্মে অনুভব করতাম। বাড়িতে তখন ছোটপিসির বিয়ের তোড়জোর চলছে। একদিন ভোরবেলা বাবাকে জড়িয়ে হু হু করে কেঁদে ফেললাম। মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে আমার অসহায় স্বল্প আয়ের দৈন্যের তলায় চাপা পড়া বাবা আমাকে বললেন,- “তোমার মাস্টারমশাইকে কি ভাবে সাহায্য করব অমল? সামনে তোমার পিসির বিয়ে! তুমি বড় হয়েছ, সংসারের কিছু কিছু বিষয় নিশ্চয়ই বুঝতে পারো। তাছাড়া,আমরা সাহায্য করলেও ওনারা নেবেন কেন?”

কিশোরবেলার সেই অপরিণত বুদ্ধিতে সেদিন বুঝতে পারিনি হৃদয়ে আকিঞ্চন যারা তাদেরই মানুষের সাহায্য নিতে তত বাধে। সকালবিকেল উথালপাথাল চিন্তা করতাম কি করে মাস্টারমশাইকে বাঁচানো যায়। হঠাৎ একদিন এক বুদ্ধি এল মাথায়,সাইকেলটা বেচে দিলে কেমন হয়? ছোটকার দেওয়া সাইকেল, বলে দেব চুরি হয়ে গেছে। বিল্টুর বাবার দোকানে গেলাম, কড়কড়ে আড়াইশো টাকার বিনিময়ে আমার হিরোজেট বিক্রি করে দিলাম। সাইকেলটা আমার প্রিয় ছিল, কিন্তু সেদিন সাইকেল বিক্রি করে কটা টাকা পেয়ে নির্মল আনন্দ হয়েছিল, মুঠোর ঘামে বন্দি ওই কটা টাকায় স্যারের নিরাময় মুখচ্ছবি ফুটে উঠেছিল যেন! দৌড়াতে দৌড়াতে স্যারের বাড়ি গেলাম, বাড়িতে ঢোকার আগেই বাধা পেলাম। গুরুপত্নীর আর্তনাদ,সব হারানোর মায়াকান্না। ঘরে ঢুকে দেখলাম, এক দল মহিলা ও পুরুষের মধ্যে আছাড়িপিছাড়ি কাঁদছেন ,সিঁদুরের রঙ গলে গলে সারা কপালে ধেবড়িয়েছে। পাশে, শ্বেতশুভ্র বিছানায় শ্বেতপদ্মের তোড়া বুকে নিয়ে অনন্তশয্যায় চোখ বুজেছেন আমার মাস্টারমশাই। চিরন্তন সেই হাসিটুকু যেন ঠোঁটের কোণায় লেগে আছে। ছুট্টে বেরিয়ে এলাম, দৌড়াতে দৌড়াতে বাড়ি ফিরে সোজা ছাদে। চিলেকোঠার চার দেওয়ালের ঘেরাটোপে বন্দী আমার কান্না বাইরের লোককে শুনতে দিতে নারাজ ছিলাম আমি। স্কুলে প্রার্থনাসঙ্গীত হত,  “আগুনের পরশমণি জ্বালাও প্রাণে”-তাতে একটি বিশেষ লাইনের মানে বুঝতে পারতাম না- “ব্যথা মোর উঠুক জ্বলে উর্দ্ধপানে”। মাস্টারমশাইয়ের চলে যাওয়ায় রবি ঠাকু্রের সেই গান নেমে এল চেতনায়।মনে মনে কল্পনা করলাম, অনলপাশে শুয়ে আছেন মাস্টারমশাই, তাকে ঘিরে চিতাগ্নি ছুঁচ্ছে স্বর্গরোহণের সিড়ি, তার শেষ মাথায় জ্যোতির্ময় জগতের দরজা খুলে যাচ্ছে ধীরে ধীরে।

শিক্ষক হয়েছি আজ বহু বছর,বাচ্চাদের অঙ্ক করাই।সাহিত্যকে অঙ্কের সাথে, অঙ্ককে সাহিত্যের সাথে মিশিয়ে ফেলি মাঝে মাঝে। গল্পের ছলে পড়াই ওদের।
ভালো কি মন্দ শিক্ষক হলাম সে বিচার আপনারা করবেন,আমার শুধু মনে পড়ে যায় আমার স্বর্গত মাস্টারমশাইয়ের একটি কথা- “ পড়ানোটা একটা শিল্প অমল, বুঝলি! শিক্ষক হওয়ার আগে তার শিল্পী হওয়া প্রয়োজন খুব।”


FavoriteLoading Add to library

Up next

সবই উল্টো - সৌম্যদীপ সৎপতি   (এক) ধড়মড় করে ঘুম থেকে জেগে উঠলাম। চারদিক অন্ধকার, মাথার উপরে ফ্যানটাও বন্ধ, লোডশেডিং।বুঝতে পারলাম ঘামে সারা শরীর ভিজে...
নিঃসীম সুদূরের আহ্বানে... - অরূপ ওঝা   ইচ্ছে হয়,যাই উড়ে অজানা জগতের পানে, ছেড়ে সমস্ত বাহুপাশ যাবো ছুটে নিঃসীম সুদূরের আহ্বানে l বড়ো দুর্বার সে ডাক সমস্ত পিছুটান যাক...
আম বাগানে কে? – শ্রাবণী সরকার... আমার মামারবাড়ি ওদলাবাড়ি। ডুয়ার্সের এক ছোট্ট চা বাগান ঘেরা মফস্বল টাউন। এখনও ভারী শান্ত। আমার মায়ের ছোটবেলায় সেটি ছিল আরো জনবিরল চুপচাপ একটি গ্রাম। মায়...
উত্তোরণ – সৈকত মন্ডল... যদি ভাবো এক লহমায় সরিয়ে নেবে নিজেকে, তবে থামো, এ সূর্য শেষ সকালের নয়... যদি মনে করো কফিনের নিস্তব্ধতায় মিলিয়ে যাবে, তবে বলে যাও, চেষ্টারও উর্দ্ধে ক...
মুখরোচক দইয়ের চপ বানিয়ে ফেলুন সহজেই – মালা ... কথায় আছে 'যে রাঁধে সে চুলও বাঁধে,' | তবে আমাদের অর্থাৎ গৃহিণীদের কাছে এই প্রবাদবাক্যটি হয়তো তেমনভাবে খাটে না মূলত আমাদের সন্তান এবং পতিদেবতার সৌজন্যে ...
Admin navoratna

Author: Admin navoratna

Happy to write

Comments

Please Login to comment