মন মিলান্তি(পর্ব-৪~শেষ পর্ব)

#মন_মিলান্তি_পর্ব_৪
#মুক্তধারা_মুখার্জী

#চরিত্র_ঘটনা_কাল্পনিক,#মিল_খুঁজে_পেলে_লেখিকা_দায়ী_নন😊

বমিটা হওয়ার পর থেকেই শরীরটা কেমন করছিল যেন শ্রেয়সীর। তাই কলেজ থেকে বেরিয়ে ফাঁকা দক্ষিণেশ্বর মিনিটা সামনে পেতেই উঠে পড়েছিল। বাসে উঠেই একদম সামনের দিকে সিটে গিয়ে বসে।বাড়ি গিয়ে অম্বলের ওষুধটা খেয়ে নেবে। শরীরটা খুব আনচান করছে। বাসটা খুব জোরে চালাচ্ছে। মিনিবাসে উঠলে এই এক সুবিধা আবার পাশাপাশি ভয়ও লাগে। এত জোরে চালায় যে মনে হয় ছিটকে বেরিয়ে যাবে আবার ওদিকে বাড়িতেও পৌঁছে যায় তাড়াতাড়ি।

—– বিড়াল,বিড়াল, বিড়াল। থামাও থামাও। গেল গেল গেল।

চিৎকার করে ওঠে শ্রেয়সী। বাসটাও জোরে ব্রেক কষে দাঁড়িয়ে পড়লো। সত্যি সত্যিই একটা বেড়াল রাস্তা কেটেছে। শ্রেয়সী চোখটা একটু কুঁচকে দেখে রাস্তার মাঝ বরাবর কথা। ঠিক সময়ে বাসটা থেমে গেছে।ওদিকে একজন মহিলা কথাকে হাত ধরে টেনে সাইডে নিয়ে গেছে। হুড়মুড়িয়ে শ্রেয়সী নেমে পড়ে। কথার কাছে ছুটে যায়। দুজনের একই কলেজ হলেও সাবজেক্ট আলাদা। শ্রেয়সী বাংলা অনার্স নিয়ে পড়ছে।কলেজ থেকে বেরোনোর সময়ই কথার ক্লাসে গিয়ে খোঁজ নিতে গিয়ে শুনেছিল কথা বেরিয়ে গেছে। ক্লাস বাংক মারার মেয়ে কথা নয়। কে জানে কি হলো! যার যখনই ক্লাস শেষ হোক বেরোনোর আগে একবার বলে যায়। বেশিরভাগ দিন একসঙ্গেই ফেরে তারা। আজ কথা কিছু না বলেই চলে গেছে শুনে অবাকই হয়েছিল। কথা কিরকম একটা ঘোরের মধ্যে আছে দেখে একটা ট্যাক্সি ডেকে কথাকে নিয়ে শ্রেয়সী নিজের বাড়ি নিয়ে যায়। শ্রেয়সী মামার বাড়ি নিয়ে যায়। মামা অফিসে,মামী স্কুলে পড়ায়।বাড়ি ফাঁকাই থাকবে। ওর কাছে সবসময় একটা চাবি রাখাই থাকে। বাড়িতে ঢুকেই নিজের ঘরে কথাকে নিয়ে গিয়ে বসালো।
সারা রাস্তা কথা এরকমই পাথর হয়ে চুপচাপ বসে ছিল। যেন মনে হচ্ছিল দেহে কোনো সাড় নেই। শ্রেয়সী কথার নীরবতা আর মেনে নিতে পারছিল না।

—- আরে! কি হয়েছে বলবি তো? পুরো রাস্তা চুপ। এখনো গুম মেরে আছিস।আর রাস্তার মাঝে ওরকম করে কেউ যায়?যদি এক্সিডেন্ট হয়ে যেতো?

কথা শ্রেয়সীর দিকে তাকায়। কথার চোখের মধ্যে যেন কিরকম একটা শূণ্যতা। কি যে হলো মেয়েটার? কথাকে দু হাতে ধরে ঝাঁকিয়ে শ্রেয়সী বললো,

—– ওরকম করে তাকিয়ে কি দেখছিস? হলো টা কি বলবি না কি চড় থাপ্পড় খাবি? আমার হেব্বি রাগ ধরছে কিন্তু!

শ্রেয়সীর জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে কথা। শ্রেয়সী মনে মনে ভাবে,

কাঁদুক।মনটা হালকা হোক। তারপর ঠিক বলবে ধীরে সুস্থে।

এমনিতেও ও কোনোদিন কথাকে জোর করেনি কিছু বলতে।কথার যখন মনে হয়েছে নিজেই এগিয়ে এসে বলেছে। সবসময় সব কিছু বলে উঠতে পারে না কথা সেটা শ্রেয়সী ভালো করেই জানে। আজকে ঐভাবে না দেখলে জোর করতোও না। এটুকু হয়তো দরকার ছিল।
আস্তে আস্তে কথা শান্ত হয়।

—- কেন বাঁচালি আমাকে?মরে গেলেই ভালো হত জানিস।
—- ও মা! তোকে কোথায় বাঁচালাম। বেড়ালটা রাস্তা কাটলো তাই তো বাসটা থেমে গেলো। আমি শুধু একটু চিৎকার করেছিলাম এই যা! তুই তো জানিস,বেড়াল রাস্তা কাটলে সেটা আমি কিছুতেই পেরোই না। ভাগ্যিস বাস ড্রাইভারটাও মানে।নয়তো আজ সত্যিই তুই এতক্ষণে “বলো হরি…” যাকগে যাক। কেসটা কি বলতো?

খানিকক্ষণ শ্রেয়সীর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে কথা,তারপর মাথাটা নামিয়ে ফেলে। শ্রেয়সীকেও বলেনি এতদিন। আজ শুনলে যদি খুব রাগ করে,দূরে সরিয়ে দেয়। সেটাই তো স্বাভাবিক। এতদিন ওকে না বলাটা ভুল হয়েছে। কিন্তু….

—– আবার কোন ভাবনার সমুদ্রে ডুবসাঁতার লাগাচ্ছিস বলতো? এসব কেস তো মানুষ প্রেমে পড়লে করে….

ভ্রূ কুঁচকে কথার দিকে তাকায় শ্রেয়সী। কথা চুপ।

—- অ! বুঝলাম। তা কে সেই মহান ব্যক্তি?

কথা শ্রেয়সীর হাত দুটো ধরে বলে ওঠে,

—- আমাকে একবার তোর দেশের বাড়ি এক্ষুণি নিয়ে যাবি শ্রেয়া?প্লিজ!
—- আমার দেশের বাড়ি? কেন? মানত করেছিলিস নাকি?পুজো দিবি? কোথায় বল? আমি মাকে ফোন করে বলে দিচ্ছি। তুই যেটা বলছিলিস সেটা বল দিকিনি আগে।
—– না শ্রেয়া। আজই যেতে হবে খুব দরকার। দেবোত্তম….
—– দেবোত্তম মানে দেবুদা? তার মানে ….. ও এম জি! এই বিশ্বে আর কাউকে পেলি না? ঐটাকেই মনে ধরলো?
—– এরকম করে কেন বলছিস?
—- নাঃ! এমনিই বললাম। যা কাঠখোট্টা জিনিস। যাই হোক,সমস্যাটা কি? সেটা বল আগে।
—– তুই আজই আমাকে নিয়ে চল। নয়তো খুব দেরী হয়ে যাবে। শেষবারের মত একবার শুধু জানতে চাই আমার কি দোষ? কেন কি করেছিলাম আমি? শুধু রোজ ফোন করতাম, খেয়েছো কিনা, কি খেলে, কোথায় যাচ্ছ, কখন ফিরবে, কেন আমাকে সময় দিচ্ছ না, কেন কথা বলছো না—- শুধু এত এত “কেন” শব্দতে জর্জরিত হয়েছিল বলেই কি তার এই সিদ্ধান্ত? আমার ভালোবাসা তার গলা টিপে ধরছিল? কষ্ট হচ্ছিল শ্বাস নিতে আর তাই এইভাবে আমাকে ঠকিয়ে অন্য একটা মেয়েকে বিয়ে করছে? কিন্তু আমি আমি যে…
—- এক মিনিট এক মিনিট….বিয়ে?কার বিয়ে? দেবুদার? হুসস! তাহলে তো শুনতাম মায়ের কাছে।
—– না রে সত্যি! আজই বিয়ে। তুই প্লিজ একবার নিয়ে চলে যে করেই হোক। প্লিজ!
—- আরে দাঁড়া! এভাবে তাড়াহুড়ো করিস না। কাকু কাকিমাকে কি বলবি? আজ গেলে তো তোকে রাতে থেকে যেতে হবে।ফিরতে পারবি না।
—- আমি জানিনা।তুই আমার নিয়ে চল। নয়তো আমি….

উঠে দাঁড়ায় কথা।

—– একদম পাগলামো করবি না। ঠাটিয়ে গাল ভেঙে দেবো। চুপ করে বস।একদম নড়বি না।

ধপ করে বসে পড়ে কথা। তার মাথা কাজ করছে না। কি করবে সে? যখনই ভাবছে দেবোত্তমের বিয়ে,দেবোত্তম অন্য কারুর হয়ে যাচ্ছে তখনই মনের ভিতরটা তছনছ হয়ে যাচ্ছে ।
ওদিকে শ্রেয়সী ফোন লাগায় বাড়িতে।

—– মিলি তুই এখন? কলেজ যাসনি?
—– গিয়েছিলাম।চলে এসেছি। আজ একটাই অনার্স ক্লাস ছিল।
—– ও। শরীর ভালো আছে তো?
—– হ্যাঁ মা। সব ঠিকঠাক।
—– দুপুরে কি খাবি?
—– মা একটা কথা বলো তো!
—– কি বল?
—– দেবুদার বিয়ে?
—– তোকে কে বলল? তোর বন্ধু কথাকলি?

দমে যায় শ্রেয়সী। মা কি তাহলে সব জেনে গেছে?

—- সত্যি দেবুর মা পারেও বটে! যা সব করছে! এই বাড়িতে এসেও খানিকটা চিৎকার করে গেছে সকালে। তোর বন্ধু ওর ছেলের জীবন নষ্ট করে দিলো এইসব বলে।তারপর নাকি ছেলেকে দিয়ে কথাকে ফোন করে কিসব বলেছে?সেসব নিশ্চয়ই তুই জানিস। আমাকে ওই দেবুর বন্ধু টোটনের মা বললো সব। ওইসব বিয়ে টিয়ে কিছুই না।এখন আবার ওই গুরুদেব এসেছেন তিনি নাকি কিসব বিধান দিয়েছেন। কথাকলি কে নিয়ে এসে নাকি অপদেবতা তাড়াবে। কবে যে এরা অন্ধকার থেকে আলোয় আসবে কে জানে! যাই হোক! তা তোর বন্ধু কি আসছে? শোন, পারলে তুইও আসিস ওর সঙ্গে।না জানি মেয়েটার মনের ওপর দিয়ে কি ঝড় বইছে!
—- মা একটা রিকোয়েস্ট করবো রাখবে?
—- বল।
—– তুমি একবার ওর বাড়িতে ফোন করে কিছু একটা বলে ম্যানেজ করবে আমি তাহলে আজই আমার সঙ্গে ওকে নিয়ে আসতাম।

কথার চোখ দুটো উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।

—– কিন্তু মিলি সেটা কি ঠিক হবে? এরা তো ওইসব গুরুদেব,পুজো না জানি কিসব করাবে, তারপর ভালোমন্দ কিছু একটা হয়ে গেলে…..
—– হুম। ঠিক আছে দেখছি।তোমায় পরে জানাবো।এখন রাখছি।

ফোনটা রেখে শ্রেয়সী কথাকে সব খুলে বললো। সব শুনে কথা খানিকটা শান্ত হলো। মনের মধ্যে তবু অনেকগুলো কাঁটা খচখচ করছে। এতটা রাস্তা এলো দেবোত্তম অন্তত পক্ষে একটা মেসেজ করেও কি বলা যেতো না। এতটাই ফেলনা সে!

মনের ভিতরটা পুড়ে যাচ্ছে যেন!

—- চল তোকে বাড়ি দিয়ে আসি।
—- আমি যেতে পারবো।
—- বিশ্বাস করছি না তোকে।
—- না রে। বিশ্বাস কর।আর কিছু করবো না আমি।
—- বেশ তো। আমি গেলে ক্ষতি কি? আমি কি যাইনা তোর বাড়ি?

ফোনটা বেজে ওঠে কথার। ব্যাগ থেকে বের করে দেখে দেবোত্তমের। ফোনটা ধরে চুপ করে থাকে কথা।

—– হ্যালো,হ্যালো। কি হল চুপ কেন?

ফোনটা হাত থেকে কেড়ে নেয় শ্রেয়সী।

—– কিছু বলবে তো? চুপ করে আছো কেন?শুনতে পাচ্ছ?
—– তা কি করবে? আনন্দে নেত্য করবে নাকি?
—– কে?
—– মিলি।
—– মিলি? ও আচ্ছা। একবার ওকে দে না।
—– কেন? তোমার তো বিয়ে। তা যাও না। ওকে কি দরকার শুনি? পরকীয়া করবে বুঝি?
—– উফফ মিলি।
—– একদম চুপ করে থাকো। যেরকম খুশি ট্রিট করবে আর ফোন করলেই আমাদের লাল ঝরিয়ে, “বলো গো হ্যাঁ গো করবো” তাই না?
—– মিলি তুই সবটা জানিসনা।
—– জানানোটা তোমার দায়িত্ব ছিল। কষ্ট দেওয়াটা নয়। কি দরকার ছিল এই সম্পর্কের? শুধু চোখের জল উপহার দেবে বলে? ওকে মরতে মাঝরাস্তায় ছেড়ে দেবে বলে?
—– না মিলি। সব যদি বলে বোঝাতে পারতাম তাহলে হয়তো সত্যিই আজ কেউ কষ্ট পেতো না। মা বাবার কাছে আমি দোষী,কথা আর তোর কাছেও আমি দোষী,তার ওপর অফিসের জ্বালাতন….আমার কষ্ট টা, আমার দিকটা কেউ ভাবিস না তোরা। হাঁসফাঁস করছি আমি, কেউ বোঝে না।
—– বোঝানোর চেষ্টাটুকু করতে পারতে দেবুদা। যাই হোক,কেন ফোন করেছ বলো। গুরুদেবের বিধান জানাতে।
—– সবই তার মানে খবর পেয়েছিস। তুই জানিস আমি এসব মানিনা। কিন্তু আজ আমি নিরুপায়। ওকে নিয়ে আসতে পারবি একবার? প্লিজ। এখানে বাঘরাই থানে পুজো দেওয়া হবে। আর গুরুদেবও থাকবেন।
—– বাঘরাই থান? তুমি কি পাগল হলে? তুমি কিনা আজকাল পিশাচ দেবতা মানছ?
—– ওখানে পুজো দেওয়া তো খারাপ নয়। অপদেবতা, ভয় এইসব থেকে নাকি বাঘরাই ঠাকুর রক্ষা করেন।
—– দেবুদা তুমি?তুমি এসব বলছো? তোমার মুখে এসব কথা কোনোদিন শুনবো স্বপ্নেও ভাবতে পারিনি দেবুদা।
—– দেখ মিলি।একবার বাড়িতে মেনে নিলে বিয়েটা করতে পারবো একদিন।বিয়ের পর ওকে তো আর এখানে থাকতে হবে না।কথাকে নিয়ে আমি চলে যাবো ব্যাঙ্গালোর।
—– তখনও তো কাকিমা একইভাবে…..
—– প্লিজ মিলি আমাকে একটু সাহায্য কর। আমি কথাকে হারাতে চাই না প্লিজ…..

ফোনটা কেটে দেয় শ্রেয়সী। রাগে মাথাটা ঝনঝন করছে। শেষে কিনা বাঘরাই ঠাকুরের পুজো! আবার ওই গুরুদেব কিসব যজ্ঞ করবেন ওখানে! শিরশির করছে শরীরটা। মনটা কু ডাকছে!

#মন_মিলান্তি_পর্ব_৫
#মুক্তধারা_মুখার্জী

খুব ক্লান্ত লাগছে । নিজের বাড়ি ফিরে কথা খাটের উপর শরীরটা এলিয়ে দেয়।কথার কেন জানি বারবার মনে হতে লাগলো সে ঠকে গেছে…..জীবনের কাছে। দেবোত্তমের স্পষ্টবাদী, বাস্তব যে রূপকে সে ভালোবেসে ফেলেছিল আজ সে দূরে দাঁড়িয়ে হাসছে যেন। প্রথমদিকে এক মুহূর্ত যদি দেরী হতো কথার ফোন ধরতে বা মেসেজের রিপ্লাই দিতে দেবোত্তম ফোনের পর ফোন করে যেতো। কোনোদিন মুখে বলেনি ঠিকই কিন্তু কথা অনুভব করতে পারতো দেবোত্তমের কাছে কথা যেন অক্সিজেন।
আজ কর্মজীবনের ব্যস্ততার বেড়াজালে নাভিশ্বাস তুলছে ভালোবাসার নরম ভেজা মুহূর্তগুলো। কাজের চাপ, উন্নতির শীর্ষে ওঠার প্রবল চেষ্টা সবই তো ওর জন্য করছে এই ভেবে নিজেকে ভুলিয়ে নেয় কথাকলি। সময় পাল্টেছে যুগ পাল্টেছে কিন্তু অগ্নিপরীক্ষা আজও মেয়েদের জন্য বরাদ্দ। মন থেকে মেনে নিতে পারছে না কথা। কেন দেবে সে এই পরীক্ষা? তাও আবার তার জন্য যে তার অনুভূতির সাথে খেললো। একবার শুধু একবার ফোন করতে পারলো না বাড়ি ফেরার আগে?আজ এতটা অপ্রয়োজনীয় সে?
না না!এসব কি ভাবছে সে? হয়তো পরিস্থিতি সত্যিই প্রতিকূল ছিল। নিজের দিকটা ভাবতে গিয়ে হয়তো ওর দিকটাই বুঝতে পারছে না সে। কিন্তু বাড়িতে এখন কি বলবে? সব সত্যি বলে দেবে? আত্মবিশ্বাস তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে যেন! ওরা যদি ফিরিয়ে দেয়? আর কোনোদিন বাবা মায়ের চোখে চোখ রাখতে পারবে সে?
—– কি রে?কি হলো? হাঁফাচ্ছিস কেন?
বাইরের ঘরে মায়ের গলার আওয়াজ শুনে কথা উঠে বসে। কার কি হল আবার? কে এসেছে? আরেকটা কার গলা মনে হচ্ছে!বেরিয়ে দেখা উচিৎ না কি?
—– আরে! কাঁদছিস কেন বলবি তো?
কথা বেরিয়ে শ্রেয়াকে দেখে অবাক হয়ে যায়। শ্রেয়া তখন ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলছে,
—– কাকিমা, ঠাকুমা মারা গেছে।
—– সে কি? কিন্তু তোর ঠাকুমা তো….
—– না না কাকিমা। একদম নিজের নয়। সে নিজের ঠাকুমাকে তো মনেই নেই আমার। পাশের বাড়ির।কিন্তু কি বলবো তোমায় একদম নিজের ঠাকুমা ছিলেন।ছোট থেকে কম আদর খেয়েছি। কোনোদিন ঠাকুমার অভাবই বুঝতে পারিনি।
—— ওহো! কি হয়েছিল?
—– অনেক বয়স হয়েছিল। শয্যাশায়ী ছিলেন। খালি নাকি আমার কথা বলছিলেন।
—– আহা রে!
—– শোনার পর থেকেই…..
—– আহাহা! অত কাঁদিস না। শরীর খারাপ করবে।কি করবি বল? সবাইকেই একদিন যেতে হয়। কষ্ট পাচ্ছিলেন একদিকে তো ভালোই। তা বাড়ি যাবি তো?
—– হ্যাঁ।বলছিলাম কি কাকিমা,এতটা রাস্তা। শরীরটাও ভালো লাগছে না। একা যেতে সাহস পাচ্ছি না। খালি কান্না পাচ্ছে। তার মধ্যে মাইগ্রেনের ব্যথাটা….
—– তা মাইগ্রেনের আর দোষ কি? এত কাঁদলে শরীর খারাপ তো হবেই। তা একা যাবিই বা কি করে?
—– কথা কে যদি….
কথার হৃদপিন্ডটা লাফিয়ে গলার কাছে এসে যেন আটকে যায়।
—– কথা? কিন্তু….
—– না না কাকিমা।চিন্তা করবেন না। আমাদের বাড়িতেই থাকবে।ওই বাড়ি ওকে নিয়ে যাবো না।শুধু এতটা পথ…..যদি আমার মাথা ঘুরে যায় ….লোকজন তো আর তেমন সুবিধের নয়…জানোই তো আজকাল।
—–হ্যাঁ।ঠিকই বলেছিস। ঠিক আছে। বুবুন,যা দুটো সালোয়ার,রাতে পরার জামা আর টুকটাক যা নেওয়ার আছে নিয়ে যে।মেয়েটার সাথে যা।
—– আচ্ছা মা।
চুপচাপ ভেতরে চলে যায় কথা। তাড়াতাড়ি করে তৈরী হয়ে নেয়। দুজনে মিলে বেরিয়ে পড়ে।
—–আসছি আমরা।
—–সাবধানে যাস। পৌঁছে জানাস।
তাড়াতাড়ি পা চালায়। একটা ট্যাক্সি নেয়।
—— মিথ্যে বললি?
—– আর কোনো উপায় ছিল?
—– তা বলে?
—– বাদ দে। আমি এমনিতেই বেয়াড়া সেটা তুই জানিস।আর জ্ঞান দিতে আসিস না। আর দেবুদা যেগুলো বলছে সেগুলোও আমার দু চোখের বিষ। কিন্তু তোর চোখের জলও আমি মেনে নিতে পারি না। মিথ্যে বলে নিয়ে যাচ্ছি।তাই এই মুহূর্ত থেকে তোর সব দায়িত্ব আমার। আর কোনো কথা সেটা যাই হোক না কেন লুকোবি না কিন্তু! কোনোরকম ভালো মন্দ ঘটে গেলে আমি কাকিমার কাছে অপরাধী হয়ে যাবো।
চোখ ছলছল করে কথার। শ্রেয়ার হাত দুটো চেপে ধরে।
—– থাক থাক।আর অত নাটকের প্রয়োজন নেই। আবার তো তার সাথে পিরিত হলে আমায় ভুলে যাবি।হুঁহ! আর শোন, টিকেটের পয়সাটা ডিউ রইলো কিন্তু।
বলেই হেসে ওঠে।
দুজনে হাওড়া স্টেশনে এসে নামে। আগে থেকেই শ্রেয়া দেখে নিয়েছিল আজ একটা স্পেশাল ট্রেন আছে বেলা একটায় । বিকেল পাঁচটার মধ্যে পৌঁছে যাবে। অনলাইনে টিকিটও কেটে রেখেছে।
মনে মনে সেও খানিকটা চিন্তায় আছে।যদিও সেটা কথার সামনে প্রকাশ করা যাবে না। দেখাই যাক না কি হয়!
স্টেশন থেকে নেমে অনেকটা যেতে হয়। শ্রেয়া বাড়িতে বলেই রেখেছিল। বানজোড়া গ্রামে পৌঁছনোর পর দেবোত্তমের মা এলো শ্রেয়ার বাড়িতে। কথা প্রণাম করতে এগিয়ে যেতেই ছিটকে দূরে চলে গেলেন।
—- থাক,থাক। দূরে থাকো। শোনো মেয়ে, যতক্ষণ না পুজো হচ্ছে আমার ছেলের আশেপাশেও যেন না দেখি। তাকেও বলে দিয়েছি আমি। তোমার ওপর কিসব ছায়া আছে গুরুদেব বলেছেন। নেহাত ছেলে তোমাকে ছাড়া…..যাই হোক, এই নাও নতুন শাড়ী। এই লালপেড়ে সাদা শাড়ি পরে ওই মোড়ল পুকুরে ডুব দিয়ে বাঘরাই থানে যাও। বাকি সব গুরুদেব আছেন বলে দেবেন।
—- কিন্তু কাকিমা ও পুকুরে কি করে একা নামবে? ও কোনোদিন পুকুরে নামেনি।শহরে কি এসব….
শ্রেয়া বলে ওঠে।

—– অতশত জানিনা বাপু। সে তুই যা তাহলে সঙ্গে।কি করবি দেখ! পুজোর জায়গায় কিন্তু ও একা থাকবে। পৌঁছে দিয়ে চলে আসবি।আশেপাশেও থাকবি না। সব শেষ হতে রাত হবে উনি বলেই রেখেছেন। গুরুদেব খবর পাঠাবেন আমাদের বাড়ি। তখন যাওয়া যাবে একমাত্র।
আমি চললাম এখন।
দেবোত্তমের মা চলে যেতেই শ্রেয়া বলে,
—–এখনো ভেবে দেখ কথা। সময় আছে। আমি বারণ করে দিতে পারি। এইসব বুজরুকীতে আমার বিশ্বাস নেই।
—– পুজোই তো করবো! কি আর আছে তাতে! চল।
দুজনে হাঁটা লাগায় জঙ্গলের দিকে। জঙ্গলের ভিতরে বেশ অনেকটা সোজা হেঁটে গেলে পড়বে মোড়ল পুকুর। সেই মোড়ল পুকুর পেরিয়ে ডান দিকে কিছুদূর গিয়ে পড়ে এক বিশাল বড় আকাশ ছোঁয়া তাল গাছ। সেই তাল গাছের তলায় বাঘরাই ঠাকুরের থান। জঙ্গলে পা দিতেই কথার কিরকম গা ছমছম করতে লাগলো। চারদিক কিরকম নিস্তব্ধ । অস্বস্তি কাটাতে কথা বলে ওঠে,
—- শ্রেয়া, এই বাঘরাই ঠাকুরের পুজো কিভাবে হয়? তোরা দিয়েছিস কখনো পুজো?
শ্রেয়ার মুখ থমথমে ; কিরকম যেন রক্তশূণ্য!

#মন_মিলান্তি_পর্ব_৬
#মুক্তধারা_মুখার্জী
(১)

—- কি হলো শ্রেয়া? তোর মুখটা এরকম লাগছে কেন?
—- দেখ,আমি আগেই বললাম এসব করার দরকার নেই। কিন্তু….
—- প্রসঙ্গ এড়িয়ে যাচ্ছিস তুই।
—- কারণ এগুলো কুসংস্কার। আর প্রথাগুলো শুনলে যে কোনো মানুষ যেন ভয় পায় এই ভেবেই করা।
—- তাও তুই বল।
—- আচ্ছা বেশ। শোন তাহলে,

এই গ্রামে বাঘরাই ঠাকুর খুব জাগ্রত। সবাই যেমন ভয় পায় আবার তেমন মন থেকে মানেও। লোকে বলে,বাঘরাই ঠাকুর নাকি পিশাচদের দেবতা। কেউ কোনো ভয় পেলে,কারুর ওপর অপদেবতা ভর করলে এই ঠাকুরের থানে এসে পুজো দেয়। লোকের বিশ্বাস ভয় থেকে মানুষকে এই দেবতা রক্ষা করেন। পুজোর জন্য অনেক অদ্ভুত জিনিসের প্রয়োজন হয়। তার মধ্যে একটা হল, ঠাকুরকে শুয়োরের মাংস নিবেদন করা হয়। পুজোর প্রসাদ হিসেবে চিঁড়ে, কাঁচা দুধ,কলা,ফল ও মিষ্টি দেওয়া হয়। কলাপাতায় সাজিয়ে দেওয়া হয়। পুজোয় কোনো ভুল ত্রুটি হলে বলা হয় বাঘরাই ঠাকুর তার প্রাণ বলিদান নিয়ে নেন।

—– এর আগে এরকম কিছু হয়েছে জানিস?
—– সবই শোনা কথা রে। তবে মুকুন্দ কাকার মেয়ের ছিন্নভিন্ন দেহ একবার ওই জঙ্গল থেকে উদ্ধার হয়েছিল।
—– কি বলছিস?
—– হুম। সবাই বলেছিল বাঘরাই ঠাকুর অসন্তুষ্ট হয়েছেন। মুকুন্দ কাকার বড় মেয়ে বুড়ি দিদি পুজোর মাঝে নাকি উঠে পালিয়ে যাচ্ছিল। তাতে ঠাকুরের রোষে পড়ে। মুকুন্দ কাকার পুরো পরিবার শেষ হয়ে গিয়েছিল। মুকুন্দ কাকার ছোট মেয়েটার লাশ ওই মোড়ল পুকুরে ভেসে উঠেছিল। আর কাকী গলায় দড়ি দিয়েছিলেন।কাকা তারপর থেকেই কিরকম একটা পাগল পাগল হয়ে ঘুরে বেড়াতেন।
—–তারপর?
—– তারপর আর কি? প্রথমে গ্রামের কিছু কিছু লোক দয়া করে খেতে দিতো। আস্তে আস্তে সবাই বিরক্ত হতে লাগলো।পাড়ার ছেলেপুলেরা পাথর ছুঁড়ে মারতো। একদিন সকালে এই জঙ্গলেরই একটা গাছে ঝুলন্ত লাশ পাওয়া গিয়েছিল।

চমকে ওঠে কথা।

—– কি বলছিস?
—–হুম। কিন্তু এর মধ্যে কতটা বাঘরাই ঠাকুরের অভিশাপ তা আমি জানিনা। আমি তখন বেশ ছোট। এখানেই থাকতাম। তবে এরকম নাকি আগেও ঘটেছে গ্রামের বয়স্করা বলে থাকেন। সত্যি মিথ্যে জানিনা।

মোড়ল পুকুর এসে গেছে। দুজনেই থমকে দাঁড়ায়। সুন্দর করে বাঁধানো ঘাট।

—– তুই শাড়ীর প্যাকেট টা নিয়ে দাঁড়া আমি বরং স্নান করে আসছি।
—– তুই জীবনেও নেমেছিস পুকুরে?
—– ন-না।
—– তাহলে? চল আমি নামছি তোর সাথে।
—– আচ্ছা।
হাতের প্যাকেটটা ওপরে রেখে দুজনে হাত ধরে পুকুরে নামে। শ্রেয়া কথাকে জাপটে ধরে থাকে। কোনোমতে স্নানটা সারে। তারপর দুজনে ওপরে উঠে আসে। শ্রেয়া প্যাকেট খুলে শাড়ীটা কথার হাতে দেয়।
—– শুধু শাড়ী? সায়া ব্লাউজ?
—– শুধু শাড়ী পরেই পুজো দেয়। সেলাই করা কোনো কাপড় নাকি পরতে নেই।আমি তোকে গুছিয়ে পরিয়ে দিচ্ছি। চিন্তা করিসনা।
—– কিন্তু এখানে তো পুরো খোলা।
—– চল ওদিকটায়। এমনিতেও এই জঙ্গলে কেউ আসে না সচরাচর। আর যেদিন পুজো থাকে সেদিন জঙ্গলের মুখে পাহারা থাকে।কেউ ঢোকে না। আমাকেও তো চলে যেতে হবে তোকে পৌঁছে দিয়েই।
শ্রেয়া কথাকে একটু ঝোপ দেখে নিয়ে যায় একটা ধারে। সুন্দর করে শাড়ী পরিয়ে দেয়। ভেজা শরীরে লালপেরে সাদা শাড়ি একদম লেপ্টে যায়।
—–শাড়ীটা ভিজে যাচ্ছে রে। ইশ একটা গামছা নিয়ে এলে ভালো হতো।খেয়ালই নেই একদম।
—– না রে কথা। ভেজা কাপড়েই পুজোয় বসতে হয়।
—– ওহ।

গলাটা বুজে আসে কথার।

দুজনে চুপচাপ এগিয়ে চলে থানের দিকে। দূর থেকে চোখে পড়ে হোমকুণ্ডের আগুন জ্বলছে ধিকধিক করে। তার সামনে বসে আছেন এক সন্ন্যাসী মত লোক চোখ বন্ধ করে।

—– সাবধানে চলে যা কথা। আর ভয় পাবি না। মন থেকে পুজো দিস। সব ভালো হবে।

কথা চুপচাপ মাথা নাড়ে। এগিয়ে চলে সামনের দিকে। শ্রেয়ার মন মানে না কথাকে রেখে আসতে। কিন্তু ও থাকলে যদি সত্যি কোনো ক্ষতি হয়ে যায় কথার….. নাঃ! কথার কোনো খারাপ সে চায় না। “তুমি দেখো ঠাকুর” বলে মনে মনে প্রণাম করে শ্রেয়া ফিরে আসে।

(২)

শ্রেয়া জঙ্গল থেকে বেরিয়ে আসতেই দেবোত্তমের মা বলে ওঠেন,

—-ভাবছিলাম তুই আসছিস না কেন? এবার নিশ্চিন্দি বাবা!

শ্রেয়সী কোনো জবাব দেয় না । রাগ চেপে নিজের বাড়ির দিকে হাঁটা দেয়। মনটা বড় অশান্ত লাগছে। বাড়িতে পা দিতেই দেখে দেবোত্তম বসে আছে । দেখেই মাথাটা গরম হয়ে যায় তার। চিৎকার করে বলে ওঠে,

—- লজ্জা করে না? সব তোমার ভড়ং বাজী না? খালি বড় বড় কথা। এই মানিনা সেই মানি না। আর এখন এগুলো কি হচ্ছে হ্যাঁ? হিপোক্রিট কোথাকার!
—– তুই বিশ্বাস কর মিলি।
—- কিছু বিশ্বাস করবো না। এরকম সম্পর্কের দরকার কি ছিল যেটা নিজের বাড়িকে বুঝিয়ে বলতে পারবে না? তুমি তো জানতে তোমার বাড়ি কিরকম! তাহলে শুধু শুধু একটা মেয়ের জীবন নিয়ে খেলার কি অধিকার আছে তোমার?
—– আমি ভেবেছিলাম মাকে ঠিক বুঝিয়ে নেবো।
—– আর আজ যদি বুড়ি দিদির মত কথার কিছু ঘটে যায়?
—– মিলি!
—- আমি কিন্তু কোনোদিন তোমায় ক্ষমা করবো না দেবুদা। আমি তোমাকে শ্রদ্ধার চোখে দেখতাম। তোমার মানসিকতা দেখে মনে হতো একদিন আমরা ভাই বোনে মিলে এই গ্রামে আলো ফোটাতে পারবো। আজ বুঝতে পারছি সব সব ভুল ভাবতাম। তুমি কিনা শেষে এইসব গুরুদেবের বিধান মানছ? ছিঃ! ঠাকুর পুজো আমার বাড়িতেও হয়। শ্রদ্ধা করে হয়। মনের তাগিদে হয়। এইভাবে জ্যোতিষীর বিধান মেনে ভয় দেখিয়ে নয়। পুজোয় তুমি কোনোদিন পা দাও না এই বাড়িতে। অথচ আজ দেখো পরের বাড়ির মেয়েটার জীবন নিয়ে তুমি ছিনিমিনি খেলছো। আর আফশোষ হচ্ছে আমিই হাত ধরে তাকে এখানে নিয়ে এলাম।তাকে কতটুকু আনন্দ দিয়েছো তুমি বলতে পারো? শুধু কষ্ট দেওয়ার জন্য বলেছিলে ভালোবাসি?

এক নাগাড়ে কথাগুলো বলে হাঁপাতে থাকে শ্রেয়সী। চোখমুখ রাগে গনগন করছে। সহ্য করতে পারছে না সে দেবোত্তমকে। বিড়বিড় করে চলে সে,

“ভুল করে ফেলেছি,মস্ত বড় ভুল। ভেবেছিলাম তোমরা সামনা সামনি এলে অভিমান কমবে। সব মিটে যাবে। তুমি এসব কিছুতেই হতে দেবে না। তুমি তো নিজেই এসব মানতে না! কি হবে মেয়েটার এবার?”

দেবোত্তমের মুখটা থমথম করছে। চুপ করে বেরিয়ে আসে সে। শ্রেয়সীর কথাগুলো কানে বাজছে। সে ভন্ড? সে শুধু কষ্ট দিয়েছে কথাকে?বুড়িদিদির মত হবে তার ‘কথা’র অবস্থা? মুকুন্দ কাকাকে মনে আছে তার। পাগল হয়ে ঘুরে বেড়াতো। আর “আমি সব জানি,সব জানি” বলে চিৎকার করতো। একদিন তার হাত ধরে চুপিচুপি বলেছিল,

“আমি সব জানি সব জানি, কিন্তু বলা বারণ। নয়তো সে মেরে দেবে। ঠিক যেভাবে আমার ছুটকিটা কে…..হা হা হা। বলবো না।বলবো না। মিথ্যে মিথ্যে।সব মিথ্যে।ঠাকুর মিথ্যে।”

বলতে বলতেই আবার চলে গিয়েছিল। মুকুন্দ কাকা কেন বলেছিল এসব? কোনোদিন কাউকে বলেনি সে। সত্যিই কিছু বলতে চেয়েছিল কাকা? নাকি সব পাগলের প্রলাপ? কথার কিছু হবে না তো?

(৩)

কথা উপস্থিত হয় পুজোর জায়গায়। থানের চারপাশে ঘন ঝোপঝাড় ভর্তি।

—- বোস মা।

গুরুদেবের গলা গমগম করে ওঠে। কথা বসে পড়ে। তাকিয়ে দেখে ঠাকুরের কোনো মূর্তি নেই। আছে পোড়ামাটির হাতি ঘোড়া এবং কয়েকটি গোলাকার কালোপাথর। তারই সামনে অনেক ফুল আর সিঁদুরে মাখামাখি। আর খুব উৎকট গন্ধ ভেসে আসছে।বমি পাচ্ছে কথার। মুখটা বিকৃত হয়ে যায় নিজের অজান্তেই। নাকে হাত চাপা দেয়।
হা হা করে গুরুদেব হেসে ওঠেন।

—- ঘেন্না করছে মা?
—- ন-না মানে…কিসের একটা গন্ধ….
—– দেখ তো এটার কিনা?

বলেই সামনে একটা পাত্র ঠেলে দেয়। সেখানে কিছু কাঁচা মাংস রক্তে মাখামাখি অবস্থায় পড়ে আছে। উৎকট গন্ধটা ওটা থেকেই আসছে। কথা নাকে দু হাত চাপা যায়।

—– এই মাংসটা ধুয়ে ফেল মা। ঐখানে দেখ ঠাকুরের কাছে ঘটিতে জল আছে। ওই জল এনে ধুয়ে ফেল। তারপর ঠাকুরকে নিবেদন করতে হবে।

কথা জীবনে কোনোদিন মাছও ধোয়নি। সেখানে এই উৎকট গন্ধের শুয়োরের মাংস যে সে কি করে ধোবে? গা গুলিয়ে ওঠে তার। দেবোত্তমের মুখটা ভেসে ওঠে। নাঃ!পারতেই হবে। শ্রেয়ার মায়ের কাছে তো শুনলো দেবোত্তমের মা কতটা বাধ্য করেছে ওকে। তাও তো ওর হাত ছেড়ে দেয়নি। অন্য মেয়েকে বিয়ে করতে কিছুতেই রাজি হয়নি। কুয়োয় নাকি ঝাঁপ দিতে গিয়েছিলেন ওর মা।তাই তো বাধ্য হয়ে রাজি হয়েছে। আর শ্রেয়া যা যা বললো তা যদি সত্যি হয়? না না।ওর নিজের জন্য কারুর ক্ষতি হতে দেবে না।কিছুতেই না। মনে জোর এনে ঠাকুরের কাছে এগিয়ে যায় । ঠাকুরের দিকে তাকিয়ে দেখে। পোড়ামাটির এরকম ধরণের কত মুর্তি সে শখ করে মেলা থেকে কিনে বাড়িতে সাজিয়ে রেখেছে। খুব ভালো লাগে। একই তো দেখতে! ভয়ের তো কোনো কারণ নেই। পিশাচ দেবতা শুনে মনে হয়েছিল হয়তো মূর্তি দেখেই ভয় লাগবে। জলের ঘটি টা এনে মাংস ধুতে থাকে। সব পরিষ্কার করে আরেকটা পাত্রে মাংসটা ঢেলে দেয়।
—– দে এবার পাত্রটা এইদিকে।

হাতে করে গুরুদেবের কাছে গিয়ে পাত্রটা নামিয়ে রাখে।

—– এখানে বোস। ঠাকুরের সামনে।

কথা বসে পড়ে। গুরুদেব উদাত্ত কণ্ঠে কিসব মন্ত্র উচ্চারণ করতে থাকেন। বাঘরাই ঠাকুরকে মাংস নিবেদন করে ফুল দিয়ে পুজো শুরু করেন। একটা পাত্রে কিছুটা রক্ত নিবেদন করেন। এক বাটি রক্ত দেখে কথা শিউরে ওঠে চোখ বন্ধ করে ফেলে।দু হাত জড়ো করে বসে থাকে।

গুরুদেব ফিরে দেখেন কথা চোখ বন্ধ করে বসে আছে। কথার শরীরের আনাচে কানাচে গুরুদেবের লোলুপ দৃষ্টি ঘুরতে থাকে। অল্পবয়সী মেয়ের শরীরের প্রতি তার আলাদা আকর্ষণ। রোমকূপ খাড়া হয়ে যাচ্ছে। অনেকদিনের উপোষী শরীর। আর যে ধরে রাখতে পারছেন না নিজেকে। বয়স তো আর কম হলো না। তবু এখনো মাসে অন্তত একবার….. নাঃ! বেশী দেরী করলেও চলবে না আবার তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে ভুল করে ফেললেও চলবে না। আজ থেকে কয়েক বছর আগে যে ভুলটা করে ফেলেছিলেন, ঝামেলা বেড়ে যায় তাতে। মেয়েটা কে সেবার চরণামৃত না খাইয়েই ঝোঁকের বশে লাফিয়ে পড়েছিলেন। ব্যস। মেয়েটাও দৌড় লাগালো। যদিও পরে ঠিক ধরে ফেলেছিলেন। তার সাথে কি আর পেরে উঠতে পারে! তবু খুব তেজ ছিল ছুঁড়িটার। তাই তো ভোগ করার পর জঙ্গলে ঐভাবে পিস পিস করে লাশটা ফেলে রাখতে হলো। আর ওর বোনটা যে এসব দেখে ফেলবে কে জানতো। কোথায় ছিল কে জানে! সব গিয়ে বাড়িতে বলে দিলো। ওর বাপ টা শাসাতে এসেছিল। সবাইকে বলে দেবে বলেছিল। তাই তো গভীর রাতে দলবল নিয়ে যেতে হলো। বাপটা কে বেঁধে ওর সামনেই ওর বউ আর মেয়েটাকে…..যাকগে পুরোনো কথা ভেবে লাভ নেই। তারপর আরও কত মেয়ের শরীরের স্বাদ পেয়েছে সে। অজ্ঞান অবস্থায় কি হচ্ছে কেউ বুঝতেই পারে না। বা বুঝতে পারলেও আর কিছু বলার মত মুখ থাকে না। কত মেয়ে এইভাবে পাচার পর্যন্ত করে দিলো। ভালোই রোজগার হয় তার। ভাগ্যিস পৃথিবীতে এই ধর্মের ভয় ঠাকুরের ভয় ছিল, তাই তো এই বিশ্বাস নিয়ে ব্যবসা করে তার পেট আর শরীর দুটোই খাসা আছে।

পায়ে পায়ে এগিয়ে যায় কথার দিকে।

—– নে মা। ঠাকুরের চরণামৃত খা।

কথা পাত্রটা নিয়ে চরণামৃত খেয়ে ফেলে। সামনে হোমকুণ্ডের আগুনে ঘি ঢালছেন গুরুদেব। আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে উঠছে। আরো কিসব দিচ্ছেন। ধোঁয়ায় ধোঁয়া হয়ে যাচ্ছে। কথার চোখ জ্বালা করছে। তাকাতে পারছে না। আস্তে আস্তে চোখ বুজে যায়। কথা মাটিতে ঢলে পড়ে যায়। গুরুদেবের ঠোঁটে তৃপ্তির হাসি। কথাকে পাঁজাকোলা করে হাঁটতে থাকেন।

#মন_মিলান্তি_শেষ_পর্ব
#মুক্তধারা_মুখার্জী

(১)

দেবোত্তম জঙ্গলের সামনে এগোতেই দেখে বেশ কিছু লোক পাহারা দিচ্ছে। এরা কখনোই তাকে যেতে দেবে না। উল্টে মায়ের কাছে খবর যাবে। সব গন্ডগোল হয়ে যাবে। নাঃ! এদিক দিয়ে হবে না। পিছন দিকের রাস্তা দিয়ে যাওয়া যায়। ছোটবেলায় অনেক গেছে। একবার ওই রাস্তায় সাপের সামনে পড়ে গিয়েছিল। তারপর থেকে আর যেতো না। খুব জঙ্গুলে জায়গা। ঐদিক দিয়ে গেলে বাঘরাই থানে পৌঁছে যাওয়া যায়। সে কোনোদিনই কোনো কিছুর পরোয়া করে নি। যে কোনো নির্মম সত্যি মুখের ওপর বলে দিতে অভ্যস্ত। আজ মেরুদণ্ড টা কেন যে সে সোজা রাখতে পারল না?! সে নিজে হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল কথার দিকে।অথচ তার মর্যাদা রাখতে পারল না। আজও যে কোনো পরীক্ষা সবসময় মেয়েদেরই কেন দিতে হবে? সত্যিই তো! সে নিজেও তো এসবের বিরুদ্ধে। অপদেবতা আবার কি? নিজে ঈশ্বর কেই মানে না আর শেষে কিনা এসব মেনে নিলো!ছিঃ ! নিজে হলে মেনে নিতো?করতো এইসব পুজো? আর দেরী করা যাবে না। এক্ষুণি পৌঁছে সব পুজো বন্ধ করে দেবে। তাতে সম্পর্ক থাকুক না থাকুক,কথা ভালো থাকুক অন্তত। যথেষ্ট হয়েছে!

এইসব ভাবতে ভাবতে দেবোত্তম পুজোর জায়গায় পৌঁছে দেখে মিলি দাঁড়িয়ে হতভম্ব হয়ে।

—– কিরে মিলি? তুই এখানে!

চমকে ওঠে শ্রেয়সী। তারপরই কেঁদে বলে ওঠে,

—– কথা নেই দেবু দা।এখানে কোত্থাও নেই….ওর নিশ্চয়ই কোনো বিপদ হয়েছে। কি হবে এবার?

দেবোত্তম থম মেরে যায়।

—- আমি চিন্তায় আর থাকতে না পেরে ওই লুকোচুরি খেলতাম জঙ্গলের যে পিছন দিকটায় ঐদিক দিয়ে….
—– আমিও তাই এসেছি মিলি। কথার কিছু হতে আমি দেবো না ।ওকে খুঁজে বার করতেই হবে।চল আমরা একসাথে খুঁজি।

মিলি ছলছল চোখে তাকায় দেবোত্তমের দিকে।

—– এই গ্রামের সবচেয়ে ডাকাবুকো মেয়ে তুই ভুলে যাস না। কথাকে আমরা উদ্ধার করবোই।

দুজনে খুঁজতে লাগে।

ওদিকে ততক্ষণে গুরুদেব জঙ্গলের মধ্যে তার এক গোপন আস্তানা অনেক কালের পুরোনো পোড়ো বাড়িতে কথাকে মাটিতে শুইয়ে দিয়েছে। কথার ভেজা শরীর তাকে উত্তেজিত করে তুলেছে। আর তর সইছে না। তাড়াতাড়ি করে শাড়ী টেনে খুলতে থাকে। কথার নরম শরীরে নিজেকে যতক্ষণ না সম্পূর্ণ মিশিয়ে দিতে পারছে এই আগুন ঠান্ডা হবে না।

আঃ! মাগো!

আচমকা কঁকিয়ে ওঠেন গুরুদেব। হাত দিয়ে দেখেন পিঠে যেন কেউ কিছু দিয়ে জোরে আঘাত করেছে,রক্তে মাখামাখি। অতি কষ্টে পিছনে ফিরে আতঙ্কে ভাষা হারিয়ে ফেলেন।

—- মা তু-তুই?
—- লজ্জা করে না মিনসে তোর? আমাকে মা বলছিস, আবার ওই মেয়েটার সব্বনাশ করছিস!

বুকের ওপর কষে একটা লাথি খেয়ে গুরুদেব চিৎ হয়ে পড়ে যান। চোখের সামনে এ কাকে দেখছেন! কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছে না যে! শেষে কিনা এই মেয়েমানুষের কাছে হেরে যাবে? শরীরের সব জোর এক করে উঠে দাঁড়ায় গুরুদেব।

—- তোর এত সাহস আমার গায়ে হাত দিস?

খপ করে মহিলার গলাটা টিপে ধরেন গুরুদেব।

—- তুই কি ভেবেছিস এত সহজ আমাকে হারিয়ে দেওয়া? পিছনে ছোরা মারিস? তুই এখানে লুকিয়েছিলিস কেন বল আগে? আর কাকে কি বলেছিস বল এক্ষুণি। তুই তো তোর ছেলের জীবনে এই মেয়েটাকে চাস ই নি। তবে কেন এসেছিস এখানে? বল কেন? তোর ছেলে কই?

দেবোত্তমের মায়ের দম আটকে আসছে। খুব জোরে গলাটা টিপে ধরেছে। হাতে দা টা ধরা আছে এখনো। গায়ের সবটুকু শক্তি জড়ো করে দা দিয়ে গুরুদেবের পায়ের ওপর সজোরে কোপ বসিয়ে দেয়। চিৎকার করে গুরুদেব পা ধরে বসে পড়েন। দা টা তুলে আরেক কোপ মারে দেবোত্তমের মা। গুরুদেবের হাতে গিয়ে পড়ে। গুরুদেবের চিৎকারে জঙ্গলের নীরবতা খানখান হয়ে যায়। দেবোত্তমের মা বলে ওঠে,

—– তোকে মারবো বলেই তো এসেছি এখানে।

গুরুদেব তাকিয়ে দেখেন সাধারণ বোকাসোকা ধর্মান্ধ গ্রামের মহিলার চন্ডীরূপ।

এদিকে খুঁজতে খুঁজতে দেবোত্তম আর শ্রেয়সী পোড়ো বাড়ির দিক থেকে আর্তনাদ শুনতে পেয়ে দৌড়ে যায়। বাড়িটায় ঢুকে দুজনেই হতবাক। সামনে দা হাতে দেবোত্তমের মা দাঁড়িয়ে,নিচে মাটিতে রক্তাক্ত অবস্থায় গুরুদেব পড়ে আছে ,অদূরেই রয়েছে অর্ধনগ্ন অজ্ঞান কথা।

—- মা তুমি ? তুমি এখানে?

শ্রেয়সী দৌড়ে কথার কাছে যায়।

—-কথা,এই কথা।ওঠ না। কি হয়েছে তোর?কথা!
—- ওর জ্ঞান নেই মিলি। কথা ঠিক আছে। দেবু এটাকে বেঁধে নিয়ে যেতে হবে।গ্রামের মোড়লরা এর বিচার করবে। ফোন লাগা মিলির বাবার ফোনে।লোক নিয়ে আসতে বল এখানে।

দেবু ফোন লাগায়। লোকজন এসে গুরুদেবকে নিয়ে যায়। কথাকে কোলে তুলে দেবোত্তম মিলির বাড়িতে নিয়ে যায়।

রাত হয়ে গেছে অনেক। মিলির বাড়ির সামনে মাঠে সবাই জড়ো হয়েছে। গুরুদেবকে একটা গাছের সাথে বেঁধে রাখা হয়েছে।

—- মা,আমি তো কিছুই বুঝছি না।
—- হ্যাঁ গো দেবুর মা, কি হয়েছে বলো এবার।
—- বলছি সব। তোমরা তো জানো , ঠাকুর দেবতা খুব মানি আমি,এসবেও বিশ্বাস করতাম।সেই বিশ্বাস ভেঙেছিল আগেরবার । আমার দাদা যেবার তার মেয়েকে নিয়ে এসেছিল।মেয়েটার বিয়ে হচ্ছিল না ।এই গুরুদেবের বিধানমত যজ্ঞ করাতে নিয়ে গেলো। রাতে ফিরলো। রক্ত থামছিলো না মেয়েটার। তখনই সন্দেহ হয়েছিল। কিন্তু কাকে কি বলবো? ভাইঝি টাকে নিয়ে পরের দিন দাদা চলে গেল। মাসখানেক পর আমার ওই ভাইঝি টা গলায় দড়ি….

এতদূর বলে হাউহাউ করে দেবোত্তমের মা কেঁদে ফেললেন।

—- হ্যাঁ। টুম্পা আত্মহত্যা করেছিল।কিন্তু কেন করেছিল সেটা তো….
দেবোত্তম বলে উঠলো।

—- কোন মুখে বলতাম আর কিই বা বলতাম? আমিই দায়ী ওর মৃত্যুর জন্য। মেয়েটা সন্তানসম্ভবা জেনেই গলায় দড়ি দিয়েছিল।নয়তো লোকসমাজে মুখ দেখাতো কি করে? কি বলতো? কে বিশ্বাস করত ওর কথায়?
কিচ্ছু করতে পারিনি। আমাদের অন্ধবিশ্বাসের জন্য অকালে চলে গেলো আমার ভাইঝি টা। তাই এবারে গুরুদেব বেশ কিছুদিন আগে যখন গ্রামে এসে আস্তানা গড়লেন তখন দেবুর বিয়ে দেবো বলে গুরুদেবের কাছে গেলাম। উনি বললেন দুদিনের মধ্যে গণনা করে জানাবেন কোন মেয়ে ভালো হবে ছেলের জন্য।টোটনের মায়ের কাছে বিয়ের ব্যাপারটা বলতেই টোটন জানালো দেবুর নাকি মেয়ে ঠিক করা আছে। সঙ্গে সঙ্গেই ঠিক করে নিই, যে করেই হোক এবারে এই গুরুদেবের খেলা শেষ করবোই। কথাকে দিয়ে মিলি যখন বেরিয়ে আসে তখন তোমরা যারা পাহারা দিছিলে তোমাদের ‘খেয়ে নাও খেয়ে নাও’ বলে ব্যস্ত করে তুলি। আর সবাই জানতো মিলি একমাত্র কথার জন্য ঢোকার চেষ্টা করতে পারে। ও বেরিয়ে আসতেই সকলকে খাবার দেওয়ার নাম করে সরিয়ে দিই কিছুক্ষণের জন্য। এখানে টোটনের মা কে খাবারের দায়িত্ব দিয়ে সেই সুযোগে আমি ঢুকে গিয়েছিলাম। বাড়িতে মন্দিরে যাচ্ছি বলে বেরিয়ে যাই। পৌঁছে দেখি কথা একটা পাত্র থেকে কি যেন একটা খাচ্ছে। তারপরই অজ্ঞান হয়ে যায়। গুরুদেব কি করে সেটার অপেক্ষায় ছিলাম শুধু। তারপর আর সইতে পারিনি……

গ্রামের সবাই সব ঘটনা শুনে হতবাক। দেবোত্তম এগিয়ে এসে মাকে জড়িয়ে ধরে।

—- মা তোমার ছেলে বলে পরিচয় দিতে আমার আর কোনো লজ্জা নেই ।
—- আমার জন্য তোরা খুব কষ্ট পেলি রে দেবু। পারলে আমায় ক্ষমা করিস।
দেখ গিয়ে কথার জ্ঞান ফিরলো কিনা? মেয়েটার অনেক দুর্ভোগ গেলো আমার জন্য। ওকে বলিস পারলে যেন আমায় ক্ষমা করে দেয়। আমি প্রাণ দিয়ে হলেও ওর ক্ষতি হতে দিতাম না।
—– বলবো মা।

(২)

—– কেমন লাগছে কথা?
—– মাথাটা কেমন ধরে আছে। আর কিছু মনে করতে পারছি না। চরণামৃত খেলাম তারপর যে কি হলো….
—– ধরে নাও,দুঃস্বপ্ন ছিল কেটে গেছে।
—– দুঃস্বপ্ন? কেন?
—– এমনি বললাম। আমায় ক্ষমা করতে পারবে কথা?
—– কি বলছো কিছুই বুঝতে পারছি না।দুঃস্বপ্ন?ক্ষমা?
—– আজ তোমাকে এই যে বিপদের মধ্যে পড়তে হলো,সবই তো আমার জন্য।
—– বিপদ তো তেমন কিছু হয়নি।
—– তোমাকে ‘একা’ করে দেওয়ার জন্য সরি কথা। পিষে যাচ্ছিলাম তোমার আর মায়ের মধ্যে। কিন্তু বিশ্বাস করো আমি তোমাকে বাঁচাতে সব পিছনে ফেলে দৌড়ে গিয়েছিলাম।
—– আমাকে বাঁচাতে? প্লিজ হেঁয়ালি কোরো না।আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।সব খুলে বলো।

দেবোত্তম একে একে সব ঘটনা খুলে বলে।শিউরে ওঠে কথা। এমন সময় ঘরে শ্রেয়সী ঢোকে।

—- দেবুদা গ্রামের লোক ক্ষেপে গেছে বলছে শয়তানটাকে জ্যান্ত জ্বালিয়ে দেবে। ওর সব জামাকাপড় খুলে নিয়ে যে যা পারছে তাই দিয়ে মারছে।বলছে পুরুষাঙ্গ কেটে নেবে।
—– তাই করা উচিত। মেরে দিক। ছেড়ে দিলেই তো আবার কোনো না কোনো মেয়ের সর্বনাশ ঘটাবে।
—– তাই বলে এতগুলো লোক খুনের দায়ে….
—– কে দেখতে আসছে বলতো? বাদ দে। যা খুশি হোক। আমাদের দেখার দরকার নেই।
—– তোরা ওকে পুলিশের হাতে তুলে দে না।
কথা বলে ওঠে।

—– বাবা গেছে বোঝাতে। নিশ্চয়ই বাবা ব্যবস্থা করবে।বাবার কথা তো কেউ ফেলতে পারবে না। তবে ঠাকুর দেবতা ভুত এসবের ভয় দেখিয়ে মেয়েদের সর্বনাশ যে বন্ধ হলো এই গ্রামে এতে আমি খুব খুশি।
—– ঠিক বলেছিস। আমাদের সবাইকে একসাথে আরো বোঝাতে হবে পুজো করুক,ভগবান মানুক।কিন্তু অন্ধ কুসংস্কার ভালো নয়। এইসব সাধু সন্ন্যাসীরা কখনোই ভগবানের পাঠানো দূত নয়। এরা শুধু লোক ঠকানোর ব্যবসা করে।
—– যাই হোক, এবার আসল কথা শোনো তোমরা। আমার ট্রিট বাকি কিন্তু অনেকগুলো। কবে আমায় খাওয়াবে ভালো মন্দ বলে ফেলো দিকিনি! আর এই যে মানেশ্বরী ঝগড়া মিটেছে তো?
—– তুই সুযোগ দিলি কই?
—- অ! এখন আমি কাবাব মে হাড্ডি হয়ে গেলাম! আচ্ছা বেশ। কেটে পড়ছি। কিন্তু কলকাতা ফিরে টাকা,ট্রিট সব চাই বলে দিলুম।

বলেই শ্রেয়সী হাসতে হাসতে বেরিয়ে গেলো।

দেবোত্তম কথাকে জড়িয়ে ধরে। কথা ফুঁপিয়ে ওঠে।

—– কেঁদো না প্লিজ। আর কোনোদিন তোমায় কষ্ট দেবো না। আর কোনোদিন তোমায় আমার ফোনের জন্য অপেক্ষা করতে হবে না। আমার খুব শিক্ষা হয়েছে। এই কান ধরছি আর করবো না।
তোমার জন্য একটা জিনিস এনেছি।দেখবে?

কান্নাভেজা গলায় কথা বলে ওঠে,
—– কি?

পকেট থেকে দেবোত্তম একটা নীল আবিরের প্যাকেট বের করে কথার গালে রং লাগিয়ে গুনগুনিয়ে ওঠে,

“রাঙিয়ে দিয়ে যাও যাও যাও গো এবার যাবার আগে
তোমার আপন রাগে,তোমার গোপন রাগে…….”

কথার মনে তখন ভালোবাসার রামধনু রং উঁকিঝুঁকি
দিয়ে যাচ্ছে।

(সমাপ্ত)


FavoriteLoading Add to library

    Up next

    মোহিনীর আতঙ্ক – শাশ্বতী সেনগুপ্ত...    জঙ্গলে পিকনিক? কথাটা শুনেই না করে দিয়েছিল রাজ। জঙ্গল এমনিতেই ভয়ঙ্কর। তার ওপর আবার এক রাত থাকা। মুখের কথা নাকি? কোনও দরকার নেই ভাই, পরিস্কার কথাটা ফ...
    বিজ্ঞান ও ঈশ্বর - ইন্দ্রজিৎ ঘোষ   বিজ্ঞান শব্দের অর্থ বিশেষ জ্ঞান অর্থাৎ ধারাবাহিক পরীক্ষা,পর্যবেক্ষণ,গণনা ও সিদ্ধান্তের মাধ্যমে অর্জিত জ্ঞানই হলো বিজ্ঞান । ...
    আত্মোপলব্ধি -দীপ্তি মৈত্র... সাহিত্যের রূপ দুটি,তথ্য ও সত্য। তথ্যের মধ্যে জ্ঞান থাকে, সত্যের মধ্যে বোধ। সাহিত্যের সত্য আর অন্তরের সত্য মিলে সৃষ্টি হয় নতুন সত্ত্বা- তার নাম আ...
    পণ্যগ্রাফি -কৌশিক প্রামাণিক বোনটি তো আমার সেদিনই কেঁদেছিল যেদিন ও প্রথম পৃথিবীর আলো দেখেছিল, লোভী চোখের দৃষ্টিগুলোতে চিন্হিত হলো সে মেয়ে তখন জন্মেই তাকে শুনত...
    বিরল বিবাহ -বিভূতি ভূষন বিশ্বাস... হিন্দু সমাজে আট রকম বিবাহের কথা বলা আছে তার মধ্যে চার রকমই দেখা যায় তবে বিখ্যাত হলো দুই রকম ১) দেখা শুনা করে বিয়ে । ২) প্রেম করে বিয়ে । আচ্ছা সব বুঝল...
    প্রমাণ – সৌম্যদীপ সৎপতি... "আরে আরে, রাজেন না কি? কদ্দিন পর দেখা, এত রাত্রে বনের পথে যাচ্ছ একা একা? একসঙ্গেই যাওয়া যাবে, বাড়ি ফিরছ না কি? চলো তবে, আমিও এখন কাছাকাছিই থাকি। ...
    লাভ স্টোরি – শ্বেতা আইচ... 'ও দাদা একটু গাড্ডা গুলো বাঁচিয়ে চলুন না, কখন থেকে তো বলছি। কানে যায় না?' 'চুপ কর না প্লিজ টুকি, পাশে সবাই তাকাচ্ছে তো।' 'তুই তো মোটে কথা বলবি ন...
    Google এর উৎপত্তি - দিব্যেন্দু গাঙ্গুলী   বর্তমানে সর্বাধিক ব্যবহৃত ও সবচেয়ে জনপ্রিয় আন্তর্জাতিক ও‍‌‌‍য়েবসাইটটি হল ‘www.google.com’। এটি তৈরি হয়েছিল ১৯৯৬ সাল...
    দৃষ্টি চকিত চোখের মধ্যে চোখ রেখে দেখি পাপড়ি মেলছে রোদের কুসুম ; যেখানে বর্গ ইঞ্চিতে সাঁতার কাটে চোরা ঘূর্ণী , মায়ার চন্দন লেপে দেয় নবমীর ললাটে , বুকের ভিতর দগ...
    শুধু তুমি চাও যদি – পদ্মাবতী মন্ডল... ফোনটা সাইলেন্ট মোডে ছিল। অনেক কটা মিসড্ কল হয়েছে।বাড়ীতে থাকলে ফোনটা সাইলেন্টই থাকে। মা বা বাপি কেউ জানতে পারলে আর রক্ষে নেই । আসলে বৃন্দার কাছে যে ফোন...
    Muktodhara Mukherjee

    Author: Muktodhara Mukherjee

    Comments

    Please Login to comment