মন মিলান্তি (পর্ব-১~পর্ব-৩)

#মন_মিলান্তি_পর্ব_১
#মুক্তধারা_মুখার্জী

নখে নেলপালিশটার দ্বিতীয় কোট লাগাতে লাগাতে কথার চোখ বারবার ফোনের দিকে চলে যাচ্ছিল। এখনো কোনো ফোন এলো না দেবোত্তমের। কি যে ছাই পাশ করে কে জানে! অফিসে সবসময়ই নাকি তার কাজের চাপ— খালি অজুহাত। প্রতি সপ্তাহেই তো হয় লাঞ্চ নয় ডিনারের গ্রুপফি ফেসবুকে পোস্ট হতে দেখা যায়। ওর কোনো না কোনো কলিগ দেবোত্তমকে ট্যাগ করে ছবি পোস্ট করে। তাই কথাও ছবিগুলো দেখতে পায়।নয়তো দেবোত্তম যেন আজকাল কিছুই বলতে চায় না। কে জানে অন্য কাউকে মনে ধরলো কিনা!হয়তো ওর থেকেও সুন্দরী। কথা একবার আয়নার দিকে তাকিয়ে নিজেকে পরখ করে। ডানাকাটা সুন্দরী না হলেও কথাকে দেখতে মোটেই খারাপ নয়। গায়ের রং দুধে আলতা বলেই হয়তো কথার সৌন্দর্য নিয়ে প্রশ্ন তেমন ওঠে না।মুখে তেমন শ্রী না থাকলেও একটা মিষ্টতা আছে। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে হাল ফ্যাশনের জামাকাপড়ে কথাকে এক নজরে স্মার্ট,ফ্যাশনেবল,ট্রেন্ডিই লাগে।

—উফ! এবার অসহ্য লাগছে। এখনো কেন ফোন করছেনা।আর কত ওয়েট করবো? একবার বরং আমিই ফোন করে দেখি।

মনে মনে ভেবেই কথা ফোনটা হাতে নিয়ে রিং করে দেবোত্তমকে।ফোনটা বেজে বেজে কেটে যায়। আরও দুবার চেষ্টা করে,একই অবস্থা। রাত সাড়ে এগারোটা বাজে।হয়তো ঘুমিয়েই পড়েছে।ভুলেই গেছে ফোন করতে কথাকে।এরকম তো কত হয়েছে এর আগে।

দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে কথার। কাল সকালেই আবার কলেজ আছে—-মর্নিং কলেজে পড়ে কথা।
ঘুম থেকে ভোর পাঁচটায় উঠতে হবে। পাঁচটা চল্লিশের বাসটা ধরতে না পারলে ফার্স্ট ক্লাসটা মিস হবে। অনার্সের ক্লাস মিস করলে চলবে না। নাঃ! এবার শুয়েই পড়তে হবে। লাস্ট একবার কি চেষ্টা করবে? ফোনটা হাতে নিয়েও বিছানার উপর ছুঁড়ে ফেলে দিলো। নাইট ল‍্যাম্প জ্বালিয়ে খাটে গিয়ে শুয়ে পড়লো। দু চোখ বেয়ে নেমে আসে নোনা জলের স্রোতস্বিনী।

কথা নিজেকে হাজারবার বুঝিয়েছে কষ্ট পেয়ে লাভ নেই। সে তো প্রথম থেকেই জানতো এরকমটা হবেই। জেনেশুনেই তো এই সম্পর্কে এগিয়েছিলো।
দেবোত্তমের সাথে তার আলাপ এক বন্ধুর দেশের বাড়িতে গিয়ে। কথা তখন সদ্য স্কুল পাশ করে কলেজে পা দিয়েছে।

কথার স্কুলের সময় থেকেই বন্ধু শ্রেয়সী। ছোট থেকেই ওরা অভিন্ন হৃদয় বন্ধু। শ্রেয়সীর দেশের বাড়ি বাঁকুড়া জেলার বানজোরা গ্রামে। সেই গ্রামেই শ্রেয়সীর বাড়ির কালীপুজোয় গিয়েছিল কথা। শ্রেয়সী কলকাতায় মামারবাড়ি থেকে পড়াশুনা করে। একে অপরের বাড়ি খুবই যাতায়াত ছিল।তাই অনায়াসেই কথা বাড়িতে রাজি করিয়েছিল।কথা কোনোদিন গ্রাম দেখেনি। সেই টানেই শ্রেয়সীর আমন্ত্রণ ফেরায়নি।

গ্রামে গিয়ে মন ভরে গিয়েছিল কথার। এরকম পুকুরভর্তি মাছ,চারপাশে সবুজের সমারোহ, বাচ্চারা সব দৌড়ে বেড়াচ্ছে। শ্রেয়সীদের বাড়িটা পাকাবাড়ী।ভিতরটা সুন্দর করে সাজানো।গ্রামে ওদের বেশ প্রভাব প্রতিপত্তি আছে দেখলেই বোঝা যায়। ওদের বাড়ির সামনে অনেক বড় মাঠ। সেখানে সব চট পেতে ধান কেটে রোদে শুকোতে দেওয়া আছে। এরকম করে নাকি চার পাঁচদিন ফেলে রেখে ঝাড়ার উপযুক্ত করে নিতে হয়। তারপর দাঁতে কেটে দেখতে হবে ‘কট’ করে শব্দ হয়ে ধান দু ভাগ হচ্ছে কিনা তবেই ধান শুকনো হয়েছে বোঝা যাবে। তারপর গরু দিয়ে মাড়িয়ে ধান ঝাড়াই করা হয়।তবে ইদানিং একটা নতুন ধানকাটা মেশিন কিনেছে ওরা। সেই মেশিনে একসঙ্গেই ধান কাটা ও ঝাড়াই চলে। মেশিনের ভিতর থেকে ধান ও খড় আলাদা হয়ে বেরিয়ে আসে।এরপর আবার ধান থেকে চাল করার প্রক্রিয়া।
যত এসব শুনছে আর দেখছে কথা অবাক হয়ে যাচ্ছে। বেশি রাতে ছিল কালীপূজা।বেশ ঘটা করে পুজো হয়। সবাই যখন ভক্তি ভরে আরতি দেখছে কথা লক্ষ্য করে ভিড় থেকে দূরে মুখে একরাশ বিরক্তি নিয়ে একটি ছেলে দাঁড়িয়ে কাকে যেন খুঁজছে।

এগিয়ে গিয়ে কথা জিজ্ঞেস করে বসে,

“কাউকে খুঁজছেন?”

ছেলেটি তার দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে পা থেকে মাথা অব্দি যেন মেপে নেয়।খানিকক্ষণ পরে বলে,

“আমার মা কে। সেই কখন ঢুকেছে বেরোনোর নাম নেই। কি যে ছাই করছে এতক্ষণ,ওই কালিই জানেন”।

ছেলেটির বলার ধরণে কথার হাসি পেয়ে যায়।

“খুব হাসি পাচ্ছে না? তা তো পাবেই।পড়তেন আমার মত অবস্থায় বুঝতেন! সারাদিন খালি এই ঠাকুর ওই ঠাকুর।আজ উপোস কাল ব্রত,পরশু মানসিক। উফফ জেরবার হয়ে গেলাম। আপনি এই বাড়ির নতুন অতিথি না? মিলির বন্ধু?”

(শ্রেয়সীর ডাক নাম মিলি)

“আপনি কি করে জানলেন?”
“ওই তো মায়েরাই গল্প করছিল।শহর থেকে মিলির বন্ধু এসেছে। খুব মিষ্টি দেখতে।শহরের জল হাওয়াই ওরকম।দেখছো না আমাদের মিলির রূপই ফিরে গেছে। যত্তসব”!
“আপনার শহর ভালো লাগে না? গেছেন কলকাতায়?”
“আরে ভালো কেন লাগবে না! আমি তো থাকি কলকাতায়। চাকরি করি । তবু মা এমন সব গেঁয়ো কথাবার্তা বলে যে বিরক্ত লাগে। এত গল্প করেছি, ঘুরিয়েও এনেছি একবার তাও এমন ভাব করে যেন বিদেশ ওটা। তা অন্যদের কাছে বিদেশই বটে! কিন্তু আমার বাড়িতে এরকম কেন করবে বলুন? যেন জন্মেও যায়নি। মিলিরা কি কেউ ওরকম করে? কেউ করে না। দেখুন গিয়ে কোনো মানত ছিল এখন ভেজা কাপড়ে গড় কাটছে হয়তো!”

কথা অবাক হয় ছেলেটার বিরক্তি দেখে। নিজের মা,নিজের বাড়ি সম্পর্কে এত বীতশ্রদ্ধ যে অজানা অচেনা মেয়েকে কত কিছু বলে যাচ্ছে। কিন্তু কথার কি বলা উচিত ভেবে পায়না। তাই চুপ করে শুনে যায়।

“যাই হোক! নমস্কার আমি দেবোত্তম সাহা। আপনার নামটা?”
“আমি কথা।কথাকলি রায় চৌধুরী।”
“আচ্ছা।আমি আজ চলি। মা যখন ফেরার নিজেই ফিরে যাবে। আমি আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছি না। পরে আবার দেখা হবে।”

বলেই হনহনিয়ে চলে যায় দেবোত্তম। তার পরদিনই কথা কলকাতা ফিরে আসে। কলকাতা ফেরার দুদিন পরেই ফেসবুকে একটা ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পায়। খুলে দেখে দেবোত্তম পাঠিয়েছে। বিন্দুমাত্র না ভেবে একসেপ্ট করে নেয়।

প্রযুক্তির জালে অনুভূতিরা একে অপরের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে যায়। বছর ঘোরে, সম্পর্ক গভীর হয়।

—- তুমি চাইলেই কলকাতায় থাকতে পারতে আমি জানি।
অভিমানের সুরে বলে ওঠে কথা।
—- কলকাতায় কোনো ভবিষ্যৎ নেই কথা। তুমি দেখলে না এই এক বছরে আমি তেমন কিছু ভালো জোগাড় করতে পারলাম না। ওই তো সব পাঁচ দশ হাজার টাকার চাকরি। আমাকে তাড়াতাড়ি ওপরে উঠতে হবে।প্লিজ বোঝার চেষ্টা করো। অফারটা খুবই ভালো ছিলো।তাই নিয়ে নিলাম। তোমার কলেজ আর বড় জোর দু বছর।যদি মাস্টার্স করো আরও দু বছর। পাঁচ বছরের মধ্যে ভালোভাবে না দাঁড়ালে বিয়ে করবো কি করে? আমি ফ্ল্যাট, গাড়ি সব করে প্রতিষ্ঠিত হয়েই বিয়ে করতে চাই।বিয়ের পর যাতে তোমাকে আমি সবরকম সুযোগ সুবিধা দিতে পারি।
—- এমনিই তোমার সাথে দেখা হয় না। বড় জোর মাসে একবার। এরপর বছরেও একবার হবে কিনা সন্দেহ!
—- আরে যাচ্ছি তো ব্যাঙ্গালোর। এমন করছো যেন সাত সমুদ্র পার করে চলে যাচ্ছি। পুজোয় তো আসবো। তখন দেখা হবে আমাদের।
—- হুম।
—- তুমি তো আজকালকার মেয়ে। মায়ের মত কোরো না প্লিজ।

কথা চুপ করে যায়। দেবোত্তম বড় বেশি বাস্তববাদী ছেলে। অপেক্ষাকৃত কম অনুভূতিপ্রবণ। খুব বেশি এক কথা ঘ্যানঘ্যান করলে ফোন কেটে সুইচ অফ করে দেয়। তার থেকে আর কিছু না বলাই ভালো। এক সপ্তাহের মধ্যে দেবোত্তম ব্যাঙ্গালোর চলে যায়। যোগাযোগের মাধ্যম শুধুমাত্র ফোন। যদিও তাদের সম্পর্কের ভিত গড়েই উঠেছিল এই যন্ত্রের মাধ্যমে। ফোনে যোগাযোগ না হলে কথা অস্থির হয়ে উঠলেও করণীয় কিছু থাকে না। এখন অনেকটাই অভ্যেস হয়ে গেছে।তবু চোখের জলে কথার অনেক রাতই সিক্ত হয়ে ওঠে।

#মন_মিলান্তি_পর্ব_২
#মুক্তধারা_মুখার্জী

ভোরের এলার্ম টা বাজতেই ধড়ফড়িয়ে ওঠে কথাকলি। একটু ধাতস্থ হতেই খেয়াল হয় কলেজ যেতে হবে। মোবাইলটা হাতে নিয়ে চেক করলো কথা। নাঃ! কোনো মিসডকল নেই। কল লিস্টে বারবার নম্বরটা খুলে দেখে,প্রত্যেকটা কল কথার করা। ওর কি ইচ্ছেও করে না একবার ফোন করতে? কথার খুব জানতে ইচ্ছে করে যদি কোনোদিন কথা ফোন না করে আদৌ কি দেবোত্তম কখনো ফোন করবে?

—-কিরে বুবুন? আজ কি কলেজ টলেজ নেই? বসেই আছিস যে তখন থেকে! শরীর ঠিক আছে তো?
মায়ের আওয়াজে হুঁশ ফেরে কথার।
—- এই তো মা! এক্ষুনি তৈরি হয়ে নিচ্ছি।

বলেই এক দৌড়ে বাথরুমে ঢুকলো কথা। আর দেরী করলে ফার্স্ট ক্লাসটা নিশ্চিতভাবে মিস হবে। ঝড়ের গতিতে তৈরী হয়ে নিলো কথা।
সকালের বাস টা মারাত্মক ভিড় থাকে।সব কলেজের বিভিন্ন ক্লাসের মেয়েরা থাকে। হৈ হৈ করতে করতে কলেজ পৌঁছে যায়। ফিলোসফি অনার্সের পিরিয়ডটা শেষ হতেই ফোনটা কেঁপে কেঁপে ওঠে। ব্যাগ থেকে বের করে দেখে দেবোত্তম ফোন করছে।ক্লাসরুম থেকে বেরিয়ে বাইরের দালানটায় দাঁড়িয়ে ফোন টা ধরে কথা,

—-বলো।
—–গুড মর্নিং।
—- মর্নিং।
—–কাল বড্ড রাত হয়ে গিয়েছিল। এসেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।
—– হুম।ঠিক আছে।
—– আর একটা সমস্যা হয়েছে বুঝলে?
—– কি?
—–বাড়িতে বিয়ের জন্য মেয়ে দেখেছে মা। ফোন করেছিল কাল। মেয়ে তাদের খুব পছন্দ।
কথা চুপ করে থাকে।
—–আমি বলেছি এক্ষুণি আমি রাজি নই। কিন্তু মা বড্ড ঝামেলা করছে। ‘মরা মুখ’ দেখবি এসব বলছে। ভাবছি একবার বাড়ি যাবো। সামনা সামনি সব বুঝিয়ে বলতে হবে। কিন্তু মা কি বলবে বুঝতে পারছি না।
—–হুম।
—- কি হুম হুম করছো বলতো? তোমার বাড়িতেও কি মানবে? তোমার বাড়িতেও তো কেউ জানে না।
—– আমার বাবা আমার কোনো কথা ফেলেন না। রাজি হবেন আমার মুখের দিকে তাকিয়ে।

“দেবুদা বেরোলাম” পিছন থেকে একটা মেয়ের গলা শুনতে পেলো কথা। তবে কি তার সন্দেহই ঠিক?মনে অন্য রং লেগেছে?গলার কাছে একটা কান্নার দলা পাকিয়ে উঠছে।

—– মা যা গোঁ ধরে বসেছে…..সে নাকি কাকে পছন্দ করে এসেছে তাকেই বিয়ে করতে হবে।একেবারে পাকা কথা দিয়ে এসেছে নাকি! অদ্ভুত সব। যাই হোক, টিকেট কেটে তোমায় জানাচ্ছি কবে যাচ্ছি।

কোনোমতে নিজেকে সামলে কথা বলে ওঠে,

—– তোমার ঘরে মনে হলো কারুর আওয়াজ পেলাম।কে ছিল?
—– কই? কেউ না তো! এই বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছি তো হয়তো রাস্তার কোনো আওয়াজ পেয়েছো!
কথা অবাক হয়ে গেলো। দেবোত্তম কেন লুকোচ্ছে তার কাছ থেকে? কথা তো স্পষ্ট শুনলো।ভুল শোনার প্রশ্নই ওঠে না।
—-চল রাখছি। আবার অফিসেও বেরোতে হবে। পরে কথা হবে।
—– টাটা।

ফোন রাখার পর কথার কান্না পেয়ে যায়। কোনো মতে কান্না চেপে কলেজ থেকে বেরিয়ে যায়। কলেজ থেকে বেরিয়ে ফুটপাথ ধরে হাঁটতে শুরু করে। খুব কষ্ট হচ্ছে অথচ প্রকাশ করার উপায় নেই।কলেজে কাঁদতে পারবে না,রাস্তায় কাঁদতে পারবে না ,বাড়িতেও কাঁদতে পারবে না। ওর চোখের জলের খোঁজ কেউই রাখে না। এইসব কিছুর জন্য নিজেই দায়ী।তাই কারুর কাছে মনের কথা ভাগ করেও নিতে পারে না। পুরোনো দিনগুলো যেন বেশি ভালো ছিলো। কি করে যে ভালোবাসার রং এত তাড়াতাড়ি ফিকে হয়ে গেল আজও বুঝতে পারে না।

প্রথম যেদিন হেদুয়া পার্কে পাশাপাশি বসে গল্প করতে করতে দেবোত্তম ওর হাত ধরেছিল কথা স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। কথার হাতের মধ্যে এক গোছা পলাশ ফুল ধরিয়ে বলেছিল,

“আমার রঙে নিজেকে রাঙিয়ে নিতে পারবে ?”

কথার বুকের ভিতর তখন দামামা বেজে উঠেছিল যেন। ঠোঁট কাঁপছিল,কি বলবে ভেবে পাচ্ছিল না। কথার ‘সব কথা’ কোথায় যেন হারিয়ে গিয়েছিল। মাথা নেড়ে শুধু সম্মতি জানিয়েছিল। প্রতিটা দিন,প্রতিটা মুহূর্ত তখন যেন স্বপ্নের মত ছিল। ঘুম ভাঙত দেবোত্তমের গলার স্বর শুনে,সারাদিনের পর রাতটুকুও ছিল শুধু একে অপরের কাছে উজাড় করে দেওয়ার জন্য।

হাঁটার গতি বাড়িয়ে দেয় কথা।যত পুরোনো স্মৃতি মনে পড়ে,মনটা দুমড়ে মুচড়ে যায় যেন। শরীরের কষ্ট যদি মনের কষ্ট কে সামান্য লাঘব করতে পারে তাই এইভাবে হাঁটছে সে। আজ হেঁটেই ফিরবে।পা যন্ত্রণায় খসে পড়ুক তবুও কলেজ স্ট্রীট থেকে দক্ষিণেশ্বর আজ হাঁটবে সে।
কি করে যে সময়ের চাকা ঘুরলো আর একটু একটু করে সম্পর্কটার পাপড়িগুলো শুকিয়ে গিয়ে ঝরে পড়ে যেতে লাগলো সে ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি। আগে রাত কেটে ভোরের আলো ফুটে যেত কথা শেষ হতো না আর আজকাল শব্দগুলো কোথায় যেন নিরুদ্দেশ হয়ে গেছে। তার চাহিদাগুলো কি বড় বেশী হয়ে গিয়েছিল? শুধু তো রোজ নিয়ম করে তার গলা শুনতে চায়,সারাদিন কি কি করলো জানতে চায়, কলেজে কোন বন্ধুর সাথে কি হলো এইসব বলতে চায়, প্রতিটা মুহূর্ত ভাগ করে নিতে চায়। বড় বেশী কি লতায় পাতায় বেঁধে ফেলেছিল সম্পর্ক টা কে? এত প্রশ্নের জট—-মাথাটা যন্ত্রণায় যেন ছিঁড়ে যাচ্ছে।

ফোনটা বাজছে।অনেকক্ষণ থেকে বেজেই চলেছে। ধরতে ইচ্ছে করছে না একদম। কিন্তু যদি দেবোত্তম হয়….রাস্তার এক ধারে দাঁড়িয়ে ফোনটা ধরে।

—–হ্যালো
—– কথাকলি?
—— হ্যাঁ বলছি।
—– আমি দেবোত্তমের মা বলছি। তোমার সাথে কিছু কথা আছে ।
—– বলুন।
—– শোনো, আমার ছেলের সাথে আর একদম সম্পর্ক রাখবে না।ওকে রোজ ফোন করে বিরক্ত করার চেষ্টা করবে না। ওর আজ বিয়ে। বেশি বাড়াবাড়ি করলে ফল ভালো হবে না।
—– বিয়ে?
—– হ্যাঁ। এই কি রে এদিকে আয়।এই নে ওকে বলে দে।
—- হ্যালো।
—– দেবোত্তম তুমি? তুমি যে বললে….
—– আর ফোন কোরো না কোনদিন। পলাশের রং মুছে ফেলো তোমার জীবন থেকে….

ফোন টা কেটে গেল। বিধ্বস্ত কথা এগিয়ে গেলো সিগন্যালের তোয়াক্কা না করে ছুটে আসা মিনিবাসটার দিকে।

#মন_মিলান্তি_পর্ব_৩
#মুক্তধারা_মুখার্জী

—- মা তুমি জানো আমি কুসংস্কারকে ঘেন্না করি। মিথ্যে বলা আমার নীতি বিরুদ্ধ।
—- সে তো বাবা তুমি ভগবান নেই বললেই আর সেটা সত্যি হয়ে যাচ্ছে না। গুরুদেব যখন বলেছেন মেয়েটির দোষ আছে তো আছে! উনি যা বলবেন সেটাই তোমাকে মানতে হবে। ওঁর দিব্য দৃষ্টি আছে।উনি সব দেখতে পান।
—- তাই নাকি? তাহলে প্রেম করার সঙ্গে সঙ্গে তোমাকে খবর দিতে পারলো না কেন তোমার ভগবান? সেই তো আমার বন্ধুর পেট থেকে কথা বের করে তবে জেনেছো। ভগবানেরও তাহলে মানুষের সাহায্য লাগে বলছো?

—– পুপান!
চিৎকার করে ওঠেন দেবোত্তমের মা।

—- একদম আজেবাজে বকবে না। যদি ঐ মেয়েকেই বিয়ে করতে হয় তাহলে গুরুদেব যেমন যেমন বলবেন তোমাকে শুনতে হবে।উনি আজ আসছেন।এসে বিধান দিন সেই মত চলবে। উনি যতদিন না বলছেন ততদিন কোনোরকম যোগাযোগ করবে না ওই মেয়ের সাথে। নয়তো তুমি তৈরি থাকো আমার মুখে গঙ্গাজল দেওয়ার জন্য।

দেবোত্তম ভিতর ভিতর ফুঁসতে থাকে। সে এসব ভণ্ডামি একদম সহ্য করতে পারে না। মা শরীর খারাপের মিথ্যে অজুহাত দেখিয়ে ডেকে এনেছে। এখানে এসে দেখে এইসব কান্ড। একটা কথাও পেটে থাকে না টোটনের। নাহয় তোর বাড়িতে গিয়ে বলেইছিলো কাকিমাকে আমার বিয়ের জন্য ভালো মেয়ে দেখতে।তা বলে তুই পাকামো মেরে কেন বলতে গেলি,

“বৌদি তো ঠিক করাই আছে কাকিমা”।

দৃশ্যটা কেমন হতে পারে চোখ বন্ধ করে ভাবলেই রাগে মাথায় আগুন জ্বলে উঠছে দেবোত্তমের। এক এক করে ঘটনাগুলো মনে পড়ে যাচ্ছে। হঠাৎ করে ফোন বাবার,

“পুপান তোর মা কথা বলছেনা রে।কেমন কেমন করছে। মাথা ঘুরে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গিয়েছিল।ডাক্তার দেখে গেছে।বলছে কলকাতায় নিয়ে যেতে।অবস্থা ভালো নয়।তুই এক্ষুণি আয় বাবা”।

অফিসের রমেনদাকে বলে টিকিটের ব্যবস্থা করেই গেট টুগেদার থেকে বেরিয়ে পড়ে। ব্যাঙ্গালোরে পি জি তে থাকে সে। তাড়াতাড়ি করে ব্যাগে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে পিজির মালিককে খবরটা দিয়েই ট্যাক্সি ডেকে বেরিয়ে যায় এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে। কথাকে আর বিব্রত করতে চায়নি।

চিরকালই দেবোত্তম বড্ড খামখেয়ালী। কখন কি করে কখন কি বলে ঠিক থাকে না।কিছুটা আবার অন্তর্মুখী স্বভাবেরও। যদিও চাকরি করার পর থেকে লোকের সাথে ভালো মিশতে পারে,স্পষ্টভাষী কিন্তু সব অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করতে পারে না। কথাকে আজকাল সে এমনিই সময় দিতে পারে না। তার ওপর বাকি ছেলেদের মত রোমান্টিক কথাবার্তা বলতেও খুব পারদর্শী নয়। “বাবু”,”সোনু”, ‘তোমাকে দেখতে কি সুন্দর লাগছে’,’তোমার চোখদুটো এইরকম, তোমার ঠোঁট দুটো ঐরকম’ এসব তার কোনোকালেই আসে না ।

শুধু শুধু এইসব শুনলে কথা দুশ্চিন্তা করবে।আরও ফোন করবে।কখন কি অবস্থায় ফোন ধরতে পারবে না এইসব ভেবে আরোই কিছু জানায়নি। ভেবেছিল কলকাতাতেই যখন মাকে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাবে তাহলে বরং একেবারে মাকে ভালো ডাক্তার দেখিয়ে তারপরই কথাকে ফোন করবে। কিন্তু গ্রামে এসে সব ঘেঁটে গেল। মা প্রথমেই বলেছিল ফোন করে সম্পর্ক শেষ করতে।কিন্তু দেবোত্তম পারেনি। ফোন করে ঐটুকুই বলে রেখে দিয়েছিল। তারপর মা এত ঝামেলা শুরু করলো যে ভাবলেও লজ্জা লাগে। তারপরই ফোন টা নিয়ে মা কথাকে ফোন করে ওইসব বলে। বাধ্য হয়ে সে সম্পর্ক টা ভেঙে দিতে বলে। কিন্তু কথা…..কথা এখন কি করছে কে জানে? সে যে বড় অভিমানী! কিছু করে বসবে না তো?

—– আসুন আসুন বাবা। শরীর ভালো তো?

মায়ের গলা পেয়ে উঁকি মেরে দেখে ওই লোকটা এসে হাজির।দাড়ি গোঁফের জঙ্গল, কপালে চন্দনের আঁকিবুকি,সাদা ধুতি আর গায়ে একটা চাদর মত—একদম সহ্য করতে পারে না এসব। কিন্তু মুখ বুজে তাই মেনে নিতে হচ্ছে আজ। কথার জন্য, মায়ের জন্য এসব যে মানতেই হবে।

—– ওসব এখন থাক মা। তোমাদের এখন বিপদ। এইসব সেবা এখন থাক।
—– বিপদ?কি বলছেন গুরুদেব?কিসের বিপদ?
—– ওই মেয়েকে তার বাবা মাকে সঙ্গে নিয়ে আসতে বল। ওই মেয়েকে বসিয়ে একটা যজ্ঞ করতে হবে।
—– মেয়েটার জন্য আমার ছেলের কোনো ক্ষতি…..
—– দেখ মা, জন্ম মৃত্যু বিয়ে তো সব ওই ওপরে যিনি বসে আছেন তিনিই ঠিক করেন। আমরা কে বল? কিন্তু যেটুকু উনি আমাদের নির্দেশ দেন সেটুকুই করি। অসহায় মানুষদের পাশে দাঁড়াবো তাদের বিপদ থেকে উদ্ধার করবো এই আমার জীবনের ব্রত। সম্পর্ক ভাঙা গড়া আমার কাজ নয় মা। ওই মেয়েটার সাথে তোরা ভালো থাকলে আমিই খুশি হব।শুধু মেয়েটার মাথার ওপর যে অপদেবতা ঘুরছে তাকে আমি নিশ্চিহ্ন করে দিতে চাই।যাতে ওর জীবনসংকট কেটে যায়। তোর ছেলেকেও বুঝিয়ে বলিস।আমি ওদের খারাপ চাই না।
—-অপদেবতা?কি বলছেন গুরুদেব?
—-হ্যাঁ রে মা। আমি ঠিক বলছি।
—- মেয়েটা কি তাহলে ভালো হবে এই সংসারের জন্য? —- কোনো মানুষ কি খারাপ হয় মা? আর মেয়েরা তো মায়ের জাত। তারা সবসময়ই ভালো।

তোরা এই কদিন আমার কথা শুনে চল। আমি এই কদিন কিছু খাবো না। আমি এবারে মন্দিরের পাশেই আমার আস্তানায় থাকবো।মেয়েটিকে আনানোর ব্যবস্থা কর। এলে জানাস। আর তোরা সবাই কটা দিন নিরামিষ খাবি। বাড়িতে সবসময় ঠাকুরঘরে প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখবি।রাতে ঘুমের সময়ও যেন ওই প্রদীপ না নিভে যায়। এই নে….আমার মন্ত্র দেওয়া ঘি। এতেই প্রদীপ জ্বালাবি। মঙ্গল হোক। আজ উঠি।
আড়াল থেকে সব শোনে দেবোত্তম। কই যেমন ভেবেছিল তেমন কিছু তো হলো না? লোকটা তাদের বিয়ে হবে না এইসব তো বললো না।তাহলে কি সত্যিই কথার বিপদ? কথা ভালো আছে তো?

(চলবে)


FavoriteLoading Add to library
    Up next
    আতঙ্কের সেই কালো রাত – সরোজ কুমার চক্রবর্তী...     আমরা তিন থেকে চারজন সবাই অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী | সবার বয়স প্রায় সত্তরের ঊর্ধ্বে | আমরা যেখানে থাকি জায়গাটা হলো দমদম স্টেশনের কাছাকাছি | এখানে আমাদে...
    দুঃখ দিতে চেয়েছো – বৈশাখী চক্কোত্তি... "তুমি অনেক যত্ন করে আমায় দুঃখ দিতে চেয়েছো", আমার মনোভূমিতে একটি একটি, কাঁটা তারের বেড়া পুঁতেছো ।। যন্ত্রনায় ছটফট করেছি আমি, স্বপ্নের ডানা দুমড়ে মুচড়...
    ভালো থেকো বাবা - মুক্তধারা মুখার্জী   “কি ব্যাপার? হঠাৎ এখানে? এতদিন পর ?” “কেন বাবা আমি কি আসতে পারিনা ? তোমার কথা খুব মনে পড়ছিলো,তাই....” “থাক,থাক।মিথ্য...
    জন্ম শতবর্ষে সত্য চৌধুরী – শ্রদ্ধাঞ্জলি R... "তখনো ভাঙেনি তখনো ভাঙেনি প্রেমেরও স্বপনখানি। আমারও এ বুকে ছিল প্রিয়া, ছিল রাণী। আজ যত দূরে চায় আসে শুধু এক ক্ষুধিত জনতা প্রেম নাই, প্রিয়া নাই...
    ভূত-ভবিষ্যৎ -প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়     সহেলি পাশ ফিরে শুলো। আজ তেমন গরম নেই। কারণ ক’দিনের বৃষ্টিতে বেশ চমৎকার আবহাওয়া হয়ে গেছে। ঘরের দুটো বড় জানালা খুলে...
    শৈশবের উত্তমকুমারকে ফিরে দেখা... - অস্থির কবি (কল্লোল চক্রবর্তী)  উত্তম পর্ব- ১ ছোট বেলা। সবে জ্ঞান হয়েছে। একটা চিত্র প্রদর্শনীতে গেছি। হাসিমুখের এক ব্যাক্তির ছবিতে চোখ আটকে গেল। বল...
    কনফেশন – তমালী চক্রবর্ত্তী...  থানায় ঝড়ের বেগে ঢুকল এক অল্প বয়সী ছেলে। অফিসার কে বলল স্যার আমি কিছু বলতে চাই। অফিসার তার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে জলের গ্লাস টা এগিয়ে দিল। একবারে জল শেষ...
    সহজেই বানান পনির পাতুরি... - মালা রাণী নাথ   কোন অনুষ্ঠান বাড়িই হোক কিংবা প্রতিদিনকার ঘরের খাবার,নিরামিষ পদটি আমাদের রন্ধনশিল্পের সাথে যেন অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত হয়ে আছে।  এমন অন...
    ।।ঠোঁটের ভালোবাসা।।... ফেসবুক থেকে বেডরুমের জার্নিটা তোর মনে আছে?কি যে বলিস? ভোলার জো আছে?তোর এক ডাকেতেই কিভাবে ছুটে গেছিলাম নর্থ টু সাউথ?দরজায় তোর ফার্স্ট অ্যাপিয়ারেন্সেই...
    পণ্যগ্রাফি -কৌশিক প্রামাণিক বোনটি তো আমার সেদিনই কেঁদেছিল যেদিন ও প্রথম পৃথিবীর আলো দেখেছিল, লোভী চোখের দৃষ্টিগুলোতে চিন্হিত হলো সে মেয়ে তখন জন্মেই তাকে শুনত...
    Muktodhara Mukherjee

    Author: Muktodhara Mukherjee

    Comments

    Please Login to comment