ময়ূরকণ্ঠি জেলি-কিছু আলোচনা

IMG_20190309_230358

প্রসঙ্গ সত্যজিৎ
পর্ব – ২
সত্যজিৎ রায় সাহিত্যের দিক থেকে মূলত কিশোর সাহিত্যিক হিসেবেই পরিচিত। তবে গুটিকতক গল্প তিনি প্রাপ্তবয়স্কদের জন্যও লিখেছেন, এইরকম একটি গল্প হল `ময়ূরকণ্ঠি জেলি’।গল্পটিকে কল্পবিজ্ঞান গোত্রের অন্তর্ভুক্ত করা যায়, তবে সত্যজিৎ রায় নিজে এই গল্পটিকে বলেছেন সায়েন্স ফ্যান্টাসি। সায়েন্স ফিকশন বা সায়েন্স ফ্যান্টাসি হলেও আমার ব্যক্তিগতভাবে মনে হয়, এই গল্পে মনস্তত্ত্বের একটা বিরাট ভূমিকা আছে। কেন একথা মনে হয় তা ব্যাখ্যা করার আগে গল্পটির বিষয়বস্তু অতি সংক্ষেপে বলে দিই।
প্রদোষ সরকার এক জিনিয়াস বৈজ্ঞানিক, যিনি সদ্য প্রয়াত হয়েছেন। এই সদ্য প্রয়াত বৈজ্ঞানিকের শেষ অপ্রকাশিত গবেষণা তার বন্ধু শশাঙ্কশেখর বোস খুঁজে পেয়ে নিজের নামে চালাতে চেষ্টা করে। গবেষণার বিষয় ছিল দীর্ঘ জীবন লাভ করার ওষুধের আবিষ্কার করার। শশাঙ্ক তার বন্ধুর গবেষণা অনুযায়ী কাজ করতে থাকে,এই কাজ করার আগে তার বিবেক তাকে বাধা দিলে সে বিবেক বিসর্জন দেয়। তার এই দুর্নীতির কথা তার ও প্রদোষের কমন ফ্রেন্ড অমিতাভ জানতে পারলে অমিতাভকে শশাঙ্ক খুন করে। কিন্তু গবেষণা অনুযায়ী সে যে পদার্থের জন্ম দেয়, তা দীর্ঘ জীবন লাভ করার ওষুধ নয়, বরং তৈরি হয়, এক অদ্ভুত জেলির, যার নাম শশাঙ্ক দেয় ময়ূরকণ্ঠি জেলি। শেষে এই জেলির দ্বারাই শশাঙ্কের মৃত্যু হয়। তার মৃত্যুর পর জেলি থেকে এক হাত বেড়িয়ে এসে কাগজে কিছু লেখে। পরে পুলিশ এসে দেখতে পায় কাগজে লেখা আছে – আমার মৃত্যুর জন্য দায়ী আমার বিবেক।
এই লেখাটির জন্যই গল্পের মনস্তত্ত্বের বিষয়টি প্রকটিত হয়। আসলে শশাঙ্কের মৃত্যু হয়েছে বিবেকের দংশনে। কিন্তু গল্পে আমরা দেখি শশাঙ্ক আগেই তার বিবেককে বিসর্জন দিয়েছে, তবে? লেখক হয়তো বোঝাতে চেয়েছেন বিবেকের কখনো মৃত্যু হয়না। মানুষ ছোটবেলা থেকে সমাজে বাস করে, এবং এই সমাজ থেকেই মানুষের বিবেক ভালো ও মন্দের একটা ধারণা তৈরি করে নেয়। কিন্তু মানুষ যত বড় হয় এবং পরিস্থিতির চাপে পড়ে বা কোনো স্বার্থ রক্ষার জন্য যখন তাকে তার ন্যয়বোধের বিরুদ্ধে কাজ করতে হয় তখন বিবেক তাকে বাধা দেয়। তবে মানুষ অনেক সময় বিবেকের বাধাকে অগ্রাহ্য করে অন্যায় করে ফেলে কিন্তু এর জন্য তাকে সারা জীবন বিবেকের দংশন সহ্য করতে হয়। শশাঙ্কের ক্ষেত্রে তাই হয়েছে।
বিবেক দংশনের বিষয়টি সত্যজিৎ রায়ের অন্যান্য সৃষ্টিতেও লক্ষ্য করা যায়। যেমন -` নায়ক’ ছবিতে অরিন্দম তার গুরুর কথা অমান্য করায় নিজেই নিজের কাছে অপরাধী, তাই অরিন্দম স্বপ্ন দেখে সে টাকার চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে। `ছিন্নমস্তার অভিশাপ’ উপন্যাসে দেখা যায় মহেশবাবু তরুণ বয়সে ক্রোধের বশে তার এক চাকরকে খুন করে। এরপর বিবেকের দংশনে সেই চাকরের ছেলেকে নিজের ছেলের মত মানুষ করে। `জন অরণ্য’ ছবির শেষ দৃশ্যে দেখা যায় সোমনাথ তার বিবেকের বিরুদ্ধে কাজ করার ফলে সে তার বাবার চোখে চোখ রেখে কথা বলতে পারে না।
সত্যজিৎ রায় মনে হয় বিশ্বাস করতেন অন্যায় করে বাইরের পৃথিবী থেকে মানুষ পালাতে পারলেও নিজের বিবেকের কাছ থেকে পালাতে পারে না। তাই তো সিধু জেঠা `সোনার কেল্লা’, ছবিতে ফেলুদাকে বলেছেন -মানুষের মনের অন্ধকার দিকটা নিয়েই তোমার কাজ কিন্তু তা বলে নিজের মনটাকে অন্ধকার হয়ে যেতে দিও না।

(মতামত ব্যক্তিগত)

পর্ব – ১ এর জন্য ক্লিক করুন 

প্রসঙ্গ সত্যজিৎ


FavoriteLoading Add to library

    Up next

    করিডোর - বর্ষা বেরা   ব্ল্যাক করিডোর,কানে হেডফোন,কফিতে চুমুক        হাতে ব্যোমকেশ। মুখে সাদা ধোঁয়া,গুনছে প্রহর,এক ঝড়েতেই    সবশেষ ।। হঠাৎ বসন্ত,...
    অমাবস্যার রাত – প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়...      আমার দাদু বরুণদেব মুখোপাধ্যয়ের জীবনে এমন ঘটনা লক্ষ্য করেছিলেন মৃত্যু পাঁচ বছর আগে থেকেই। অমাবস্যার রাতেই এই ঘটনা একমাত্র ঘটতো। দাদুকে বহু ডাক্তার...
    একটা খুন – বৈশাখী চক্কোত্তি... কি ভেবেছিলে, তুমিই করবে ঠিক আমার মনের খুন? ধারালো বিভিন্ন যন্ত্র দিয়ে খুঁচিয়ে রক্তক্ষরণ ঘটাবে বহুক্ষণ?? ভুলে গেছো, যন্ত্রনা পাবার নতুন করে আর নেই...
    ফুল – অরূপ ওঝা          দৃশ্যানুভূতি বিতরণের তরে           কেন পাঁপড়ি মেলে আছো তোমার ও তো জীবন আছে            সেটা নিয়েই বাঁচো। কখনো তুমি ঝরে পড়ো           ...
    অপারেশন ব্লুস্টার – অঙ্কুর কৃষ্ণ চৌধুরী... অমৃতসরের স্বর্ণমন্দির, শিখ ধর্মাবলম্বী তথা ভারতবাসীর পবিত্রভূমি। প্রতিদিন এখানে বহু ভক্তের আগমন হয়, আগমন হয় বহু পর্যটকের। এমন এক ধর্মীয় স্থান যুদ্ধক্...
    Ankur Krishna Chowdhury

    Author: Ankur Krishna Chowdhury

    জীবনের ছাত্র

    Comments

    Please Login to comment