মানুষের মিথ্যে বলার পিছনে বাস্তব মনোবিজ্ঞান

– পায়েল সেন

মাদের প্ৰতেকের, জীবনের কোথাও না কোথাও কাউকে না কাউকে মিথ্যে কথা বলেছি। একবার কিংবা একাধিক বার সেটা মনে রাখার বিষয় নয়, আসল কথাটাই হলো ‘মিথ্যে কথা বলা’।

শুধু মানুষ্য জাতির মধ্যেই মিথ্যে কথা বলার প্রবণতা আছে তা কিন্তু নয়, এমনি পশু-পাখিদেরও বিভিন্ন ব্যাবহারে মিথ্যে আচরণ লক্ষ করা যায়। যেমন খাবারকে লুকিয়ে রেখে অন্যদের সাথে এমন আচরণ করা যে সে নিজেও খাবারের এক কনাও পায়নি। বিশেষত, এই গুলি পাখিদের মধ্যে লক্ষ্য করা যায়।

একটা বিষয় খুব জানতে ইচ্ছে করছে যে, এটাই কি আমাদের প্রকৃতি খানিক ক্ষেত্রে নিজেকে বাঁচাতে মিথ্যের সাহায্য নেওয়া?

বস্তুত, এটা দুটি পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে। প্রথমত, নিজেকে গুরুতর কোনো প্রতিকূলতার হাত থেকে রক্ষা করতে। যেমন তার মান, সম্মান ও আগ্রহ। দ্বিতীয়ত, নিজেকে পরিতৃপ্ত করার জন্য। যেমন, আমি বলতেই পারতাম, “আমি ভূগোল নিয়ে পড়ি”, যদিও সেটি একটি মিথ্যে কথা কিন্তু আমি সেটি না বলে অন্য বললাম, “ আমি পদার্থ বিজ্ঞান নিয়ে পড়ি”। অর্থাৎ কোনো বিশেষ ক্ষেত্রেও মিথ্যে কথা বলতে গেলে আমরা বিভিন্ন মিথ্যে কথা গুলির মধ্যে থেকে আমাদের পছন্দ মতন মিথ্যে কথাটাই বেছেনিই।

আমরা অনেক ক্ষেত্রেই মিথ্যে কথা বলি, তবুও সমস্ত মিথ্যে কথা গুলিকে এক সাথে নিয়ে নির্দিষ্ট দুটি শ্রেণিগত বিভাগে রূপান্তরিত করা যায় তা হলো-

১. নিজেকে মিথ্যে কথা বলা

নিজের সাথে মিথ্যে কথা বলার প্রবণতা বর্তমান সময়ে প্রচন্ড লক্ষ করা যায়।
কোনো অস্থির পরিস্থিতিতে নিজেকে মিথ্যের সহযোগিতায় চূড়ান্ত নিরাপত্তা দেওয়া। যেমন কোনো মৌখিক ক্যান্সার আক্রান্ত রুগী তামাক সেবন করার পূর্বেই এটা জানত যে তামাক ক্যান্সারের মূল কারণ তবুও সাময়িক আনন্দ উপভোগের জন্য এক অদ্ভুত মিথ্যের বশ্যতা লাভ করে নিজেকে চূড়ান্ত কঠিন বেদনা দায়ক ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দেওয়া। মনস্তাত্ত্বিক লরান নর্ডগ্রেন (২০০৯) দেখেছেন যে ধূমপান ত্যাগ করার চেষ্টা করছেন এমন ব্যক্তিদের একটি গ্রুপের মধ্যে, যারা তাদের নিজের ক্ষমতাশালীদের বিশেষ করে উচ্চমানের রেটিং দিয়েছেন, তারা ব্যর্থ হতে পারে।নিজের প্রতি অত্যধিক বিশ্বাস জনক ব্যক্তিরাও মনে করেন যে এই অত্যধিক বিশ্বাসের কারণে তারা অন্যদের থেকে খুব সহজেই কোনো পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে কিন্তু বহু ক্ষেত্রেই এই ধরণের বিশ্বাসের বিপর্যয় ঘটে।

কোনো বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকরা নিজেদের সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের থেকে অনেক ওপরে ভাবতে থাকে। শিক্ষা দেওয়ার জন্য শিক্ষকদের যে শুধু মাত্র কাঙ্খিত ডিগ্রির উপধারী হতে হবে তা কখনই বাঞ্চিত নয়, তার যোগ্যতা প্রকাশ পাবে সমসাময়িক গুণাবলিকে বিচার করেও।

তবে কিছু ক্ষেত্রে আমার মনে হয়, নিজেকে মিথ্যে কথা বলা মানুষের ইতিবাচক পরিবর্তনেও সাহায্য করে, দৃঢ়তা দেয় অনেক বেশি। ধরে নেওয়া যাক কোনো ব্যক্তি তার সমসাময়িক ব্যক্তিগনের থেকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে পড়েছে। সমস্ত ক্ষেত্রেই সে নিজেকে অন্যের থেকে ছোটো মনে করছে। যদিও এই সমস্ত পরিস্থিতিতে সে তার নীতিবাচকতায় সঠিক। তবুও এমন সত্য তাকে আরও অনেকটাই পিছিয়ে যেতে সাহায্য করছে। অপর দিকে যদি ক্ষণিকের জন্যে সে এই মিথ্যেটাই মেনে নেয় যে, সে অতো টাও পিছিয়ে নেই, লক্ষ্য স্থানে পৌঁছাতে তার কিঞ্চিৎ দেরি। তবে সেও পারে ওই মিথ্যের সাহায্যে বাকি সকল বিষণ্ণতাকে কাটিয়ে স্বাভাবিক গতিতে এগিয়ে যেতে।

২. নিজের পরিবেষ্টিত মানুষ জনের সাথে মিথ্যে কথা বলা

যারা মিথ্যে বলছে তারা যদি বিশ্বাস করে যে সে কোনো অনৈতিক বা সত্যির সাহচর্যের অক্ষমতায় কোনো কাজ করছে, তাহলে সে তার প্রিয়জন দের থেকে ক্রোধ, ঘৃণা, অসন্তোষ ইত্যাদির বশবর্তী হবে। আর এটা আমরা কখনোই চাইবো না যে আমরা আমাদের প্রিয়জনদের হারিয়ে ফেলি কিংবা তাদের চোখে নেতিবাচক রূপে শনাক্তকরিত হয়ে যাই।

মানুষ তার নিজেদের বা অন্যকে আঘাত থেকে রক্ষা করতেও মিথ্যে কথা বলে, যদিও তা সাময়িক। যেমন কোনো মরণাপন্ন ব্যাক্তিকে সাময়িক কষ্ট নিবারণ করতে বলা হয় সে বেশ কিছুটাই সুস্থ এবং সে সময়ের সাথে সাথে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে যাবে। এভাবে তাকে মিথ্যে কথা বলার যুক্তি একটাই যাতে সে ভেঙে না পরে, অন্তত বাঁচার চেষ্টা টুকু করে। অথবা এমন কোনো পরিস্থিতি যেখানে কোনো নির্দিষ্ট ব্যাক্তির সাথে ভয়াবহ কোনো দুর্ঘটনা ঘটেছে (কোনো এক্সিডেন্ট, হামলা,কোনো প্রকার সামাজিক বা শারীরিক বিপর্যয়) যাতে তার নিকটস্থ পরিজনরা চিন্তিত হবে তাই সে মিথ্যের সাহায্য নেয় পরিবারকে খানিক স্বস্তি পৌঁছাতে।

বর্তমান সময়ে যেসব যুবক-যুবতীরা ব্যাক্তিগত কোনো সম্পর্কে আবদ্ধ রয়েছে অথবা স্বামী-স্ত্রী দের মধ্যে এক অন্য ধরনের মিথ্যে কথা বলার ধরণ সব থেকে বেশি। সেটি হলো হয়তো কোনো পরিস্থিতিতে দুজনের মধ্যে ভালোবাসার পরিমান কমে গেছে অথবা একে বারেই নেই তবুও শুধু মাত্র সম্পর্ককে সামাজিক ভাবে টিকিয়ে রাখার খাতিরে ভালোবাসার মিথ্যে অভিনয় প্রতিনিয়ত করা। শুধু তাই নয়, কোনো নতুন সম্পর্কে আসার সময়ে অতীতের সম্পর্ক সম্বন্ধে অযাচিত মিথ্যে কথা বলা ও কিছুটা নিজের ব্যাপ্তি প্রকট করার খাতিরেও
অনেক সময় নিজের কষ্ট দায়ক অতীতকে ভুলে যেতেও টনিকের মতন কাজ করে “সেল্ফ লাই”।

ব্যাক্তিগত ভাবে আমি মনে করি, প্রতিটা জিনিসেরই নিজস্ব কিছু ভালো ও খারাপ দিক থাকে। কিছু ক্ষেত্রে ভালো দিকের গুণমান বৃদ্ধি পায়, আবার কিছু ক্ষেত্রে খারাপ দিকের গুণমান বৃদ্ধি পায়। সময়ের সাথে সাথে এই মিথ্যের গুণমান তারতম্যেরও অদ্ভুত বিকাশ ঘটছে। আমরা মিথ্যে কথাকে কোনো খারাপ প্রবৃত্তির থেকে বেশি স্ব প্রেরণার কাজে ব্যাবহৃত করছি। আবার নিজস্বতা বৃদ্ধিতেও সাহায্য করছি। আবার কোনো চরম বিপদ কালীন পরিস্থিতি থেকে নিজেকে তথা অন্য কাউকেও বাঁচাতে এই মিথ্যেরই সাহায্য নিচ্ছি। তবে এটাও ঠিক, কোনো নেতিবাচক জিনিসের অতি ব্যাবহার সর্বদাই গোপন বিপর্যয়ের সম্মুখীন করে। তাই সর্বপরি মিথ্যের ব্যাবহার ব্যাবহৃত ব্যাক্তির ওপর নির্ভর করবে যে সে কিভাবে তার প্রয়োগ করছে।

 

—–


FavoriteLoading Add to library
Up next
নিয়মিত জীবন-যাপন - সমর্পণ মজুমদার   জীবনে অনেক কিছুই করতে ইচ্ছে হয় আমাদের। যা দেখেই আমরা অনুপ্রাণিত হই, সেটাই করতে ইচ্ছে করে। সেটা যে কোনো নির্দিষ্ট একটা বিষ...
ওই লোকটা – গার্গী লাহিড়ী... আবার এসেছে ওই লোকটা দু হাত মুষ্টিবদ্ধ , কাঁধে বিশাল এক ঝোলা মুঠোর মাঝে কি আছে বোঝা যায় না দুর্বোধ্য ভাষায় হেঁকে যায় গলি থেকে গলি লোকটা কি ফেরি ক...
অবিশ্বাস্য সেই রাত – শাশ্বতী সেনগুপ্ত... বাসে বসে বসেই বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে হয়ে গেল। অমিত ড্রাইভারের পাশের সিটে বসে ‘আর কতদূর’ জিজ্ঞাসা করতেই ড্রাইভার উত্তর দিল, ‘অর থোড়াসা’। অফিসের কাজ নিয়ে এ...
কাল বৈশাখী দারুন এক ঝঞ্ঝা এসে উড়িয়ে দিল এক নিমেষে, সব কিছু কি? ছিন্ন হল সব সংস্কার, সব পুরানো চিন্তার বাঁধন, সেকি কাল বৈশাখী? নতুন এক অংকুরের সৃষ্টি করে, যখন বিন...
বেল – অদিতি রায় সাইকেল নিয়ে ফিরলে আর বেল দিতে শুনিনা সজোরে, যে বেল এর সঙ্গে ছিল সান্তার থলির থেকে অনেকটা আনন্দের হুড়মুড়িয়ে বেরিয়ে আসার নির্মল আওয়াজ৷ দূরের কোনো...
বসন্তমেদুর এমনও বসন্ত দিনেখোঁজ করো আলাদিনেখুনসুটি জমে আছে কতএমনও বসন্ত রাতেআজও ছুটি ন্যাড়া ছাতেক্ষয়ে যাওয়া প্রেম অবিরতএমনও বসন্ত দিনেসোফাসেটে নীল সিনেকোল্ড ড্রিং...
তবু ভালোবাসি – সায়ন্তনি ধর... ।। ১।। -“হ্যালো মা, আমি সুমি বলছি। আমরা পৌঁছে গেছি, তুমি চিন্তা কর না, রনি সবসময় আমার সাথেই আছে” মা কে কথা গুলও বলে ফোনটা রেখে আবার রনজয় কে ফোন করল স...
দেখ কেমন লাগে – দেবাশিস ভট্টাচার্য... সাল--2218 একটু আগেই ঘুম টা ভাঙলো সায়ন এর সানাই এর আওয়াজে।মাথা টা এমনিতেই ভারী হয়ে রয়েছে।সেই ভোর রাত্তিরে মা,দিদি আরো সবাই এসে দই,চিঁড়ে দিয়ে মাখা একট...
ফেসবুক এনভি ফেসবুকে লগ ইন করতেই হোম পেজ জুড়ে মীরা চৌধুরী আর তার পরিবারের এক ঝাঁক ছবি দেখে স্ক্রল বারটা একটু থামায় পৃথা। ফেসবুকের নীল সাদা পেজটি যেন আজ পুরোটাই মীর...
বেইমান- তমালী চক্রবর্ত্তী... সব্জিভর্তি থলে নিয়ে অনেক কষ্ট করে বাড়ির দরজার তালা খুলল ফাতিমা বেগম। আজকাল আর আগের মতো দৌড়ঝাঁপ পোষায় না। ৬০ তম বসন্ত কিছুদিন আগেই পেরিয়েছে, হাঁপ ধরা স...
Admin navoratna

Author: Admin navoratna

Happy to write

Comments

Please Login to comment