মাসতুতো

–  সৌম্যদীপ সৎপতি

(১)

   অন্ধকার গলির ভেতরের নীল রং এর বাড়িটা থেকে বেরিয়ে এল রমেশ।তার মনের মাঝে আজ এক অদ্ভূত অনুভূতি, আর সেই অনুভূতিটা সুখ এবং অস্বস্তির মিশ্রন।
আজ রমেশের আনন্দের সীমা নেই।গুরু আজ তার শিক্ষা শেষ হবার পর তার পিঠ চাপড়ে দিয়ে বলেছেন, “এ লাইনে অনেক দুর যাবি তুই।” এমনকি, তার আশ্চর্য উন্নতিতে তিনি এতটাই খুশি হয়ে উঠেছিলেন যে, পকেট থেকে পাঁচটা দু’হাজার টাকার নোট বের করে তার একটার উপর পেন্সিল দিয়ে  ‘রমেশকে—–গুরুর উপহার’ কথাটা লিখে দিয়ে তার হাতে ধরিয়ে দিয়েছেন তিনি।
জীবনে প্রথমবার এ ধরনের প্রশংসা পেয়ে রমেশের খুশি হওয়া উচিত, কিন্তু তার দুঃখ এই যে, এ কোনও লেখাপড়ার শিক্ষা নয়, এ হল পকেটমারির শিক্ষা।অনেকেই হয়তো কথাটা বিশ্বাস করবে না, কিন্তু এমনটাও হয়।
বড় রাস্তায় এসে সামনের বাসটাতে উঠে গেল রমেশ।বাসে যাত্রী খুব একটা নেই, জানালার ধারের একটা সীট দেখে বসে পড়ল সে।
অথচ এমনটা হওয়ার কথা ছিল না।কিন্তু ছোটোবেলায় বাপ-মা মারা যাবার পর যখন রমেশের সামনে ভিক্ষাবৃত্তি ছাড়া আর কোনও পথ খোলা ছিল না, তখনই হঠাৎ তার দেখা হয়ে গিয়েছিল পাড়ার মস্তান হারান দাসের সাথে।হারানদা-ই তাকে নিয়ে যায় গুরুর কাছে, আর সে থেকেই পিছনে  (নাকি সামনে? ) তাকাতে হয়নি রমেশকে।সে থেকেই তার এ বিদ্যেয় হাতেখড়ি, যেটা শেষ হল আজ।
চিন্তায় মশগুল রমেশের চিন্তার সুতোটা ছিঁড়ে গেল, যখন হঠাৎ শব্দ করে বাসটা চলতে আরম্ভ করল। ভালো করে উঠে বসল রমেশ।এমন সময় তার খেয়াল হল, পাশে কে যেন বসে পড়েছে ইতিমধ্যেই। মুখ ফিরিয়ে সে দেখল, বছর পঁয়তাল্লিশের এক ভদ্রলোক পাশের সীটে বসে খবরের কাগজ পড়ছেন।
এমন সময় কন্ডাক্টর এসে সামনে দাঁড়াল, “টিকিট।” ভদ্রলোক হাতের কাগজটা একপাশে রেখে পকেট থেকে মানিব্যাগটা বের করে তার মুখ টা খুললেন।
সঙ্গে সঙ্গে মানিব্যাগের ভেতরের পদার্থটির পরিমাণ দেখে রমেশের মুখ হাঁ হয়ে গেল।কিন্তু তাড়াহুড়ো করা একদম চলবে না, ধীরে সুস্থে সময় সুযোগ বুঝে তাকে কাজ হাসিল করতে হবে, নইলে সমস্ত মাটি হবে।
“মশায়ের কদ্দুর যাওয়া হচ্ছে? ”
পাশ থেকে প্রশ্নটা শুনে চমকে ঘুরে তাকাল রমেশ, দেখল ভদ্রলোক ঠোঁটের কোণে একটু হাসি নিয়ে চেয়ে আছেন তার দিকেই।
“রঘুনাথপুর”, একটু হাসার চেষ্টা করল রমেশ, “আর আপনি? ”
“আমি আর তিনটে স্টপেজ পরেই নেমে যাব।”
সর্বনাশ! তবে তো কাজটা খুব তাড়াতাড়ি করে করতে হবে রমেশকে। গুরু কিন্তু শিক্ষার প্রথমদিনেই পইপই করে বলে দিয়েছেন, তাড়াহুড়োই হল ‘হস্তশিল্পীদের’ প্রধান শত্রু।তাই রমেশ বসে রইল সঠিক সুযোগের আশায়।
আর সে সুযোগ এল কিছুক্ষণের মধ্যেই।
বাসটা কিছুদুর যেতেই ভদ্রলোক উঠৈ দাঁড়ালেন।তারপর তাঁর ব্যাগ থেকে একটা ইয়ারফোন বের করে সেটা কানে দিয়ে গান চালিয়ে পা ছড়িয়ে চোখ বুজে গা এলিয়ে আরাম করে বসলেন।
রমেশ ঠিক এই সুযোগের অপেক্ষাতেই ছিল।
ধীরে ধীরে উঠে বসল সে।এই সুযোগ কোনও মতেই হাতছাড়া করা যায় না।তার অভীষ্ট বস্তুটি ভদ্রলোকের পকেট থেকে উঁকি দিচ্ছিল, সেটি এখন চলে এল রমেশের প্যান্টের পকেটে।

(২)

    “রঘুনাথপুর, রঘুনাথপুর!! ”
কন্ডাক্টরের হাঁকে ধড়মড় করে উঠে বসল রমেশ।উফ, কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছে তা সে নিজেও জানে না।বড় বাক্স আর ব্যাগটা নিয়ে বাস থেকে          নেমে পড়ল সে।
রঘুনাথপুরের এই ভাড়াবাড়িটা হারানদা-ই তার জন্য ঠিক করে দিয়েছে।রমেশ নিজেও অবশ্য এসে দু-একবার দেখে গেছে, তাই ঠিকানা ভূল হবার      কোনও চান্স নেই।
বাড়িটা দুর থেকে দেখতে সত্যিই দারুণ সুন্দর।তার উপর সামনে হোটেল থাকায় খাবার সুবিধে, ভাড়াও আজকের বাজারে অনেক কম।
বাড়ির চাবিটা ছিল বুকপকেটে।বাড়ির সামনে এসে চাবিটা খুঁজতে পকেটে হাত দিতেই বুক টা ধড়াস করে উঠল রমেশের।
না, চাবিটা আছে ঠিকই, আর  আছে যথাস্থানেই।
শুধু চাবির পাশ থেকে উধাও হয়েছে গুরুর উপহার দেওয়া নোটগুলো।
প্রথমে হতভম্ব হয়ে গেলেও পরে সামলে উঠল রমেশ।দশহাজার গেছে তো কী হয়েছে, যা গেছে তার অন্তত দশগুণ ফেরত এসেছে।তবুও গুরুর দেওয়া উপহার চলে যাওয়ায় মনটা খারাপ হয়ে গেল তার।
দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল রমেশ।এক জনের থাকার পক্ষে ঘরটা একটু বেশিই বড়, কিন্তু খুব সুন্দর।বাক্স থেকে জিনিসপত্র বের করে গোছাতে শুরু করল সে।
জিনিস পাতির বেশি বালাই নেই, ঘন্টাখানেকের মধ্যেই গোছগাছ শেষ হয়ে গেল।
রমেশের আপাতত আর কোনও কাজ নেই, সে ভাবল একটু ঘুমিয়ে নেওয়া যাক।
ঘুমটা তার ভেঙে গেল কিছুক্ষণের মধ্যেই, আর ভাঙল একটা অদ্ভুত স্বপ্ন দেখে।সে দেখল, সে যেন একটা টাকার সমুদ্রে ডুবে যাচ্ছে, শত চেষ্টা করা সত্ত্বেও সেখান থেকে উঠতে পারছে না।গুরু যেন কাছেই একটা নৌকায় বসে তার দিকে তাক করে বন্দুক ছুড়ছেন, সেটা থেকে গুলির বদলে বেরিয়ে আসছে শুধু টাকা আর টাকা।আর প্রত্যেকটি টাকার উপরেই লেখা, ‘রমেশকে—গুরুর উপহার।’

ঘুমটা ভাঙতেই রমেশের হাসি পেল।কী বিদঘুটে স্বপ্ন রে বাবা! কিন্তু এই স্বপ্নের জন্যই তার মনে পড়ে গেল সেই মানিব্যাগটার কথা।
সঙ্গে সঙ্গে একটা অজানা আনন্দ আর কৌতুহলে বুকটা ঢিপঢিপ করে উঠল তার।পকেট থেকে মানিব্যাগটা বের করে উপুড় করে ঢেলে দিল সে জানালার সামনের বিছানায়।
সত্যি, প্রথম চেষ্টাতেই যে এতটা সাফল্য আসবে তা সে স্বপ্নেও ভাবেনি।ব্যাগের ভেতরে সমস্তটা জুড়ে থাকে থাকে সাজানো রয়েছে শুধু টাকা আর         টাকা।এত টাকা বাপের জন্মেও দেখেনি রমেশ।কিন্তু ও কী! একটা ভিজিটিং কার্ডও যে বেরিয়ে পড়ল তার থেকে!
একটু আধটু ইংরেজি পড়তে জানে রমেশ।কার্ডটা তুলে নিল সে।তাতে লেখা— প্রফেসর রাধানাথ দত্ত,……… ইউনিভার্সিটি। চমকে উঠল রমেশ।রাধানাথ দত্তর ছবি কালকের কাগজেই বেরিয়েছিল, স্পষ্ট মনে আছে তার। বাসে দেখা সেই লোকটা প্রফসর রাধানাথ দত্ত নয়।
তবে কে সে?
হঠাৎ জানালার দিক থেকে একটা দমকা বাতাস এসে বিছানায় রাখা টাকাগুলোকে ইতস্তত ছড়িয়ে দিল। একটা দু-হাজার টাকার নোট উড়তে উড়তে এসে ঠেকল রমেশের কপালে।সেটা তুলে নিয়ে দেখল রমেশ। দেখেই বোঁ করে মাথাটা ঘুরে গেল তার।
নোট টার উপর পেন্সিল দিয়ে গোটা গোটা হরফে বাংলায় লেখা,
“রমেশকে—-গুরুর উপহার”।

——-


Admin navoratna

Author: Admin navoratna

Happy to write

Comments

Please Login to comment