মাস্টারপিস – শ্বেতা মল্লিক

অ্যালার্ম টা বাজতেই বাস্তবের মাটিতে ফিরে এলাম। একবার কলম ধরলে আর ছাড়া যায় না,এমন কথাটাই প্রযোজ্য লেখক দের জন্য। আরও যদি পছন্দসই লেখার মাধ্যমে পাঠকদের মন একবার জয় করে নেওয়া যায় তাহলে চাপটা আরও বেড়ে যায়। তেমনটাই আমার ক্ষেত্রে হয়েছে। রিটায়ারমেন্টের পর সখের গল্প লিখতে লিখতে কখন যে সম্পাদকীয় কলমে ঢুকে পড়েছি, তা টেরই পাইনি। ছোট গল্প, কিশোর উপন্যাস পার করে এবার একটি আত্মজীবনী তে হাত দিয়েছি। অখিলেশ কুমার রায়ের নিজ জীবন সম্পর্কে পাঠকদের কি জানানোর আছে তার নিয়ে ইতিমধ্যেই সাড়া পড়ে গেছে। একজন বাংলা সাহিত্যের প্রফেসর, পাঁচ বছর হল অবসর নিয়েছেন,অবিবাহিত-এমন মানুষ সম্পর্কে কারোর কিছু জানার আগ্রহ হয়ত থাকবে না। কিন্তু এই আত্মজীবনী শুধু অন্য কে আনন্দ দেওয়ার জন্য আমি লিখছি না। এই লেখনীর পিছনে এক অন্য উদ্দেশ্য আছে।

অ্যালার্ম টা বন্ধ করে জানলার ধারে এসে দাঁড়ালাম। যেখানে প্রায় সারা কলকাতাময় ফ্ল্যাট আর হাউজিংয়ের ছড়াছড়ি, সেখানে আমার এক টুকরো পৈতৃক ভিটেটা আঁকড়ে পড়ে থাকার মধ্যে এক অন্য সুখ আছে। ঠাকুরদার আমলের এই বাড়িতে এখন আমরা দুটি প্রাণী অবশিষ্ট, আমি আর সনাতন দা। সনাতন দা আমার একপ্রকার অভিভাবকই বটে। রান্নাবান্না, ঘর গোছানো, এমনকি রাত জেগে যাতে লেখার মধ্যে ডুবে না থাকি তার জন্য এই অ্যালার্মের ব্যবস্থাও সনাতন দা-ই করে রাখে। আমার আর সনাতন দার সম্পর্কের কথা ভাবতে ভাবতে সবেমাত্র বিছানার দিকে পা বাড়িয়েছি,এমন সময় একটা অদ্ভুত শব্দে নজরটা আবার জানলার বাইরে রাস্তার দিকে চলে গেল। একটা মেয়ে রাস্তার ওপার থেকে ছুটে আসছে। কোন দিকে যাবে বুঝতে পারছে না, ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে এদিক ওদিক তাকাচ্ছে। কিছু সময় এভাবে কাটানোর পর আস্তে আস্তে মেয়েটা এগিয়ে এলো, আমারই বাড়ির গেটের বাইরে এসে দাঁড়ালো। চারিদিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে লোহার গেট টা আলতো করে ঠেলে উঠোনে পা রাখল। উঠোনের আলোটা কিছুদিন ধরে খারাপ হয়ে আছে, তাই মেয়েটি কোনদিকে গেল বুঝতে পারলাম না। কিছুক্ষণ দেখার চেষ্টা করে অগত্যা নীচে যাওয়ার জন্য পা বাড়াবো ভাবছি, দেখি সনাতন দা দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে।

‘ এখনো ঘুমাওনি সনাতন দা?’

‘ একবার নীচে এসো।’

সনাতন দার পিছন পিছন ড্রয়িং রুমে ঢুকলাম। কিছুক্ষণ আগে যে মেয়েটিকে খুঁজতে নীচে নামার কথা ভাবছিলাম, সে এখন আমারই চোখের সামনে, সোফায় বসে আছে। সবুজ রং-এর সালোয়ার কামিজ পরা, চুলগুলো এলোমেলো, কাঁধে একটা শান্তিনিকেতনী ঝোলা ব্যাগ। সনাতন দা একগ্লাস জল এনে দিতেই এক ঢোকে সবটা শেষ করে একটা গভীর শ্বাস নিল।

‘ ক্ষমা করবেন, কিন্তু আমার আর কোন উপায় ছিল না আপনাদের বাড়িতে ঢুকে পড়া ছাড়া। আমি একজন রিপোর্টার, একটা খবরের সূত্রে পাশের বস্তিতে গেছিলাম। সেখানকার গুন্ডা গুলো আমার পিছু নিয়েছে। ওদের থেকে বাঁচতে বাধ্য হয়ে এখানে ঢুকলাম। বিশ্বাস করুন।’

সনাতন দা কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, ওকে ইশারায় রান্নাঘর থেকে কিছু নিয়ে আসতে বললাম। সনাতন দা চলে যাওয়ার পর মেয়েটিকে প্রশ্ন করলাম,

‘কোথায় থাকো তুমি? সরি তুমি করেই বললাম কারন তুমি অনেকটাই ছোট আমার থেকে।’

‘হ্যাঁ নিশ্চয়ই। আমি মানিকতলায় একটা মেসে থাকি।’

‘মেসে কেন? বাড়ি কোথায় তোমার?’

‘বীরভূম।’

নাম টা শুনতেই বুকের ভিতরটা ধড়াস করে উঠলো। এই একটি নাম যা আতঙ্ক ও অপরাধবোধ কে একসাথে স্মরণ করিয়ে দেয়। আমাকে চুপ করে বসে থাকতে দেখে মেয়েটি প্রশ্ন করল,

‘ গেছেন কখনো বীরভূম?’

‘হু!!! মানে ঐ আর কি! দাঁড়াও তোমার জন্য কিছু খাবারের ব্যবস্থা করি।’

উঠে রান্নাঘরে চলে এলাম। আমাকে অস্থির দেখে সনাতন দা জিঞ্জেস করল,

‘ একটা অজানা অচেনা মেয়ে কে এভাবে বাড়িতে ঢুকতে দেওয়া টা বোধহয় ঠিক হল না। এটাই ভাবছো তো?’

‘হুমম?’

‘ একটু অন্যমনস্ক লাগছে দেখছি তোমাকে, কি হল?’

‘কিছু না। ফ্রিজে কিছু খাবার থাকলে নিয়ে এসো।’

কথাটা বলে বাইরের ঘরে এসে বসলাম। মেয়েটি সোফার পাশের দেয়ালের বুক সেলফ থেকে একটা বই নিয়ে নাড়াচাড়া করছিল। আমাকে দেখে প্রশ্ন করল,

‘ আপনার তো দেখছি পড়াশোনার অনেক সখ। বেশ ভালো কালেকশন আছে।’

‘ ঐ একটু আধটু আর কি।’

‘ শুধু পড়ার নয়, লেখার ও সখ আছে।’, হাতের ট্রে টা টেবিলের উপর রাখতে রাখতে সনাতন দা বলল।

‘ তাই নাকি? তো কি লেখেন আপনি?’, নিজের জায়গায় ফিরে এসে বলল মেয়েটি।

‘ তেমন বিশেষ কিছু না। ছোট গল্প, কয়েকটি উপন্যাস এসব। একটা দুটো ম্যাগাজিনে ছেপেছে।’

‘বাহ! তারমানে আপনি মোটামুটি পরিচিত মানুষ বলতে হচ্ছে।’

আমি জোরে হেসে উঠলাম।

‘ খিদে পেয়েছে নিশ্চয়ই। দুটো মানুষ থাকি, বেশি কিছু ছিল না, তাই এই স্যান্ডউইচ আর জ্যুসেই কাজ চালিয়ে নাও।’

‘ এতো ফরম্যালিটি না করলেও চলত। তো এখন কিসের উপর কাজ করছেন?’, স্যান্ডউইচে একটা কামড় দিয়ে বলল মেয়েটি।

‘ নিজের উপর।’

‘তারমানে আত্মজীবনী?’, কৌতুহলের স্বরে প্রশ্নটা এলো।

‘ কিছুটা সেরকমই বলতে পারো।’

সনাতন দা ঘরে ঢুকল।

‘ একটু চোখ বুজে নিলে ভালো হত না?’, একটা লম্বা হাই তুলে বলল সনাতন দা।

মেয়েটি ওর হাতঘড়ি টা দেখল।

‘ আপনাদের খুব ঝামেলায় ফেলে দিলাম তাই না? একটু দিনের আলো ফুটবলেই আমি বেরিয়ে যাব।’

‘ না না,, সনাতন দা সেভাবে বলতে চায়নি। এক কাজ কর সনাতন দা, তুমি একটু বিশ্রাম নিয়ে নাও। আমি তো কাল সারাদিন বাড়ি থাকব, বেলায় একটু শুয়ে নেব। তাছাড়া সূর্য উঠলে ওকে একটা ট্যাক্সিতে তুলে দিতে হবে। বিপদ এখনো পুরোপুরি কাটেনি।’

সনাতন দা আর কথা বাড়ালো না। নিজের ঘরে গিয়ে দরজা টা বন্ধ করে দিল।

‘ তো কি কি থাকছে আপনার আত্মজীবনী তে?

‘ আমার মত একজন সাধারণ মানুষের জীবনে অসাধারণ কিছু তো আর থাকতে পারে না। তাই সিম্পল বিষয়ই সব।’

মেয়েটি আমার দিকে তাকালো, নজর টা খুব দৃঢ়। এরকম চাহনি এতক্ষণ তো খেয়াল করিনি আমি।

‘ সত্যি কি আপনার জীবনে অন্যরকম কিছু ঘটেনি?’, গলার স্বর পাল্টে গেছে মেয়েটির।

‘ মানে? কি বলতে চাইছো তুমি?’

‘ মিনু সোরেনের কথা এত তাড়াতাড়ি ভুলে গেলেন?’

মিনু সোরেন!! এই নাম মেয়েটি কিকরে জানলো? গলা শুকিয়ে যাচ্ছে আমার। হাত পা যেন অবশ লাগছে। কি বলবো বুঝে উঠতে পারছিলাম না। যে ভয়ঙ্কর অতীত কে পনেরো বছর আগে চাপা দিয়ে এসেছিলাম,তা আজ আবার বেড়াজাল ভেঙে বেরিয়ে আসছে। আজও ভুলতে পারিনি সেই সময়টা।

সেবছর কলকাতায় শীতটা খুব বেশি পড়েনি।তাই ডিসেম্বরে কয়েকটা দিন শান্তিনিকেতনে কাটানোর জন্য রওনা দিয়েছিলাম। একা ট্রাভেল করতে আমার বেশ লাগত,সেবারও একাই ছিলাম। প্রথম দিনটা বেশ ভালই কেটেছিল, বিশ্বভারতীর আনাচে কানাচে ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত হয়ে হোটেলে ফিরে এলাম। কিন্তু ঘটনাটা ঘটেছিল তার পরের রাতে। সারাদিন স্থানীয় গ্রামের পরিবেশে কাটিয়ে ফিরতে একটু রাত হয়েছিল। রাস্তা টা নিরিবিলি, কিছুটা জঙ্গলের ভিতর দিয়ে। বেশ ঠাণ্ডা ছিল, সাথে অন্ধকার ও। যাহোক করে ছোট্ট টর্চ টা জ্বালিয়ে তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে ফিরছিলাম। হঠাৎ দেখি সামনের ঝোপ থেকে কয়েকজন ছুটে আসছে। টর্চের আলো ফেলতে একজনের মুখ দেখতে পেলাম, আজ দুপুরেই গ্রামের উৎসবে দেখেছিলাম। কিন্তু এ এখানে এই অবস্থায়? টর্চের আলো মুখে পড়তেই এক ধাক্কায় আমাকে ঠেলে ফেলে পালিয়ে গেল। সাথে আরো দুজন ছিল কিন্তু তাদের মুখগুলো দেখতে পেলাম না। অনেক কষ্টে উঠে দাঁড়ালাম, বুঝলাম হাঁটুতে বেশ জোর লেগেছে। হাতের টর্চটা খুঁজতে যাবো এমন সময় ঐ ঝোপের পিছন থেকে একটা আর্তনাদ কানে এলো।

‘ কে আছো? বাঁচাও আমাকে।’

একজন মহিলার কণ্ঠস্বর। মনে হল যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন। টর্চ টা কাছেই পড়েছিল, তুলে নিয়ে ঝোপের ভিতরে ঢুকে যে দৃশ্য দেখলাম, তা বর্ণনার অতীত। মাটিতে পড়ে ছটফট করছেন এক মহিলা, পরনের কাপড়টা দূরে পড়ে আছে। অর্ধনগ্ন শরীরটার দিকে একমুহুর্ত ও তাকাতে পারলাম না। গায়ের শাল টা খুলে ঢেকে দিলাম মহিলার শরীর টা।

‘ বাবু, আমায় বাঁচান। ওরা আমার ইজ্জত রাখল না বাবু, ইজ্জত রাখল না।’

ডুকরে কেঁদে উঠলেন।

‘ তোমার বাড়ি কোথায়? তোমার বাড়ির লোকজন কে তো খবর দিতে হবে।’

কিন্তু মহিলা টি আর কথা বলার অবস্থায় ছিল না। ভাগ্যচক্রে ঐসময় গ্রামের কয়েকজন লোক ও পথ দিয়ে ফিরছিল। তাদের সাহায্য নিয়ে ভদ্রমহিলাকে স্থানীয় হাসপাতালে পৌঁছে দিয়ে যখন হোটেলে ফিরে এলাম তখন প্রায় ভোর হয়ে এসেছে। কিন্তু চোখের পাতা এক করতে পারছিলাম না। একটা অসস্তি কাজ করছিল শরীরের ভিতরে। একটু বেলা হতেই হাজির হলাম থানায়। কিন্তু সেখানকার অফিসার যে কথা শোনালেন তাতে ভিতরের অস্বস্তি ভাবটা আরো কয়েক গুণ বেড়ে গেল।

‘ আমি জানি আপনি কি কারণে এখানে এসেছেন? ফিরে যান মশাই। আরে বেড়াতে এসেছেন, থাকুন, ঘুরুন আর চলে যান। এসব ব্যাপারে না জড়ানোই ভালো।’

থানার বাইরে এসে নিজেকে খুব অসহায় লাগছিল। হঠাৎ কেউ একজন এসে আমার পা দুটোটো জড়িয়ে ধরলো।

‘ বাবু, মিনুর সাথে যারা এ নোংরা কাজ করেছে তাদের শাস্তির ব্যবস্থা করেন। আমাদের কথা কেউ শুনবে না বাবু, কিন্তু আপনি বললে শূনবে। কিছু করেন বাবু, কিছু করেন।’

লোকটি মিনুর স্বামী ছিল। ঐ মুহুর্তে ওকে সান্ত্বনা দিয়ে বাড়ি যেতে বলেছিলাম ঠিকই কিন্তু ওদের জন্য কতটা করতে পারব সে বিষয়ে অনিশ্চিত ছিলাম। সেদিন রাতে হোটেলে ফিরে কিছু খেতে পারিনি। একটু চোখ বুজেছিলাম হঠাৎ দরজায় কড়া নাড়ার শব্দে তন্দ্রা ছুটে গেল। দরজা খুলতেই সজোরে একটা ধাক্কা, মেঝেতে ছিটকে পড়লাম। মাথা তুলতেই চোখের সামনে বন্দুকের নল দেখতে পেলাম। আর কানে শুনলাম একটাই কথা,

‘ মাস্টারমশাই, আপনি কিছু দেখেননি, কেমন?’

যখন চোখ খুললাম নিজেকে হাসপাতালের বিছানায় পেলাম। সারা শরীরে যেন একটা অসহ্য যন্ত্রণা। বিছানার একপাশে থানার অফিসার বসে আছেন।

‘ বলেছিলাম এসবে জড়াবেন না মশাই। এরা খুব ডেঞ্জারাস, আমাদের ও হাত বাঁধা মশাই। কেন বেকার এসবে জড়াচ্ছেন? ফিরে যান, আমি সামলে নেব এদিকটায়।’

‘ অপরাধীরা শাস্তি পাবে না তাই বলে?’

‘ কি মনে হয় আপনার? আপনি বললেই এদের শান্তি হয়ে যাবে? কি প্রমাণ দেবেন? জঙ্গলে অন্ধকারে কাকে দেখেছেন ঠিক করে বলতে পারবেন? কেউ বিশ্বাস করবে না। আর ধরেও নিলাম যে জেল হল, কি হবে তাতে? দুদিনের মধ্যে ছাড়া পেয়ে যাবে। তার চেয়ে বাদ দিন। ঐ পরিবারকে কিছু টাকা ধরে দিলে সব ঠিক হয়ে যাবে। আপনি এদের চেনেন না মশাই। গরীব মানুষ, টাকা পেলেই চুপ। যাহোক আমি উঠলাম। টিকিট টা পাশের টেবিলে রাখা আছে। ব্যাগপত্র নিন, ট্রেনে চাপুন আর বাইবাই বলুন।’

হোটেল থেকে বেরোনোর সময় সিঁড়িতে মিনুর স্বামী আর মেয়ের সাথে দেখা। এই প্রথম মেয়েটিকে দেখলাম। বাচ্চা মেয়ে, খুব বড়জোর বছর দশেক বয়স হবে। একদৃষ্টে আমার দিকে তাকিয়ে ছিল। ওর বাবা যখন আমার পা জড়িয়ে ধরে কাকুতি মিনতি করছিল,তখনও ঐ একই ভাবে নিষ্পলক চোখে চেয়েছিল। কেন জানি না,ঐ চাহনির মধ্যে অনেক কিছু লুকিয়ে ছিল। যেন বলতে চাইছিল,

‘ তুমি দোষী, তুমি পাপী। ওদের থেকে তোমার পাপও কম কিছু নয়।’

‘ জলটা খেয়ে নিন।’

হাতে জলের গ্লাস নিয়ে আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে সবুজ সালোয়ার পরা একটি মেয়ে। খুব চেনা লাগছে, বিশেষত ঐ নিষ্পলক চোখের চাহনি টা। এতগুলো বছরে যা আজও আমাকে তাড়া করে বেড়ায়।

মুখ খুললাম,

‘ কে তুমি?’

‘ এখনো বুঝতে পারেননি?’

‘ কি চাও তুমি?’

‘ আমার বাবা মায়ের মৃত্যুর প্রতিশোধ।’

একলাফে সোফা থেকে উঠে পড়লাম।

‘ কি বলছো?’

‘ যা শুনছেন। লোকে বলে আমার মা ব্লিডিং-এর জন্য মারা গেছে, আমার বাবা নাকি সেই শোকে মদ খেয়ে খেয়ে মরে গেছে। কিন্তু আমি জানি, আমাকে অনাথ আমার মা বাবা বানাইনি, বানিয়েছে এই সমাজ। ঐ শয়তান গুলো অন্যায় করেছিল। আর আপনি ওদের অন্যায় কে প্রশ্রয় দিয়েছিলেন। আপনি চাইলে সেদিন আমাদের পরিবার টাকে বাঁচাতে পারতেন। কিন্তু কাপুরুষের মত পালিয়ে গেছিলেন। তবে আমি হাল ছাড়িনি। বড় হয়ে সব কয়টাকে নিজের হাতে শেষ করেছি। আপনার সম্পর্কে সব খবর জোগাড় করে কলকাতা এসেছি। পুলিশ আমার পিছনে, কিন্তু আমার শেষ কাজটা না করে যে আমি ধরা দেব না।’

আমার গলা শুকিয়ে যাচ্ছে, কথা বেরোচ্ছে না। কি ওর শেষ কাজ? তবে কি এবার আমার পালা?

‘ তু-মি ভুল বুঝছো আমায়। আমি চেয়েছিলাম তোমাদের পাশে দাঁড়াতে। কিন্তু বিশ্বাস করো, ওরা আমাকে প্রাণের ভয় দেখিয়েছিল। হ্যাঁ আমি ভীতু ছিলাম, কিন্তু কাপুরুষ আমি নই।’

‘ কিন্তু আমি যে ভীতু নই। আর কোন পিছুটান ও আমার নেই। মা বাবা দুজনেই চোখ বোজার আগে একটাই কথা বলেছিল, ঐ বাবু চাইলে আমাদের বাঁচাতে পারতেন কিন্তু পালিয়ে গেলেন। কথা গুলো আজও আমার কানে ভাসে। শাস্তি তো আপনাকে পেতেই হবে।’

‘আমায় একটা সুযোগ দাও, আমি কথা দিচ্ছি,যা সেদিন তোমাদের সামনে করতে পারিনি তাই গোটা শহরের সামনে করব। আমার অন্যায়ের শাস্তি আমি নিজেকে দেব।’

‘ তার মানে?’

‘ এক মিনিট।’

আমি দৌড়ে আমার ঘরে এলাম। টেবিলের উপর থেকে আমার লেখার খাতা টা নিয়ে ড্রয়িং রুমে চলে এলাম।

‘ এটা পড়ো।’

‘ স্বীকারোক্তি’ নামক পর্বটি মেয়েটির সামনে খুলে দিলাম। কিছুক্ষণ চোখ বুলিয়ে নিয়ে খাতাটা বন্ধ করে দিল। নিজেকে আর সামলাতে পারলো না। হাউ হাউ করে কেঁদে উঠলো। আমি নিজের বুকে যন্ত্রণা অনুভব করলাম।

‘ আমি সেদিন পালাতে চাইনি। বিশ্বাস করো। আমি আজও রাতে ঘুমোতে পারিনা। আমার বিবেক আমায় তাড়া করে বেড়ায়। এই আত্মজীবনী আমার শেষ লেখা হবে।’

‘ লোকাল থানায় একটা কল করুন। আমি কথা বলব।’

ঘন্টাখানেকের মধ্যে পুলিশের গাড়ি চলে এলো। সনাতন দা কে এরমধ্যে ছোট করে ঘটনাটা বলে দিয়েছিলাম। ও যেন এখনো বিশ্বাস করতে পারছে না।

দুজন মহিলা কনস্টেবল মেয়েটিকে গাড়িতে তুলে নিল। অফিসার আমার সাথে হ্যান্ডশেক করলেন।

‘ অনেকদিন ধরে খুঁজছিলাম মেয়েটিকে। এত ডেসপারেট মেয়ে আমার কেরিয়ারে আগে দেখিনি। এনিওয়ে থ্যাংকস অ্যালট মিস্টার রায়।’

আমি একদৃষ্টে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে ছিলাম। জেল যাওয়ার আগে জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে বলল,

‘ মাস্টারপিস-এর একটা কপি পারলে পাঠিয়ে দেবেন। পড়তে আমি খুব ভালোবাসি।’

_____


FavoriteLoading Add to library

Up next

তবু ভালোবাসি – সায়ন্তনি ধর... ।। ১।। -“হ্যালো মা, আমি সুমি বলছি। আমরা পৌঁছে গেছি, তুমি চিন্তা কর না, রনি সবসময় আমার সাথেই আছে” মা কে কথা গুলও বলে ফোনটা রেখে আবার রনজয় কে ফোন করল স...
শুধু তুমি চাও যদি – পদ্মাবতী মন্ডল... ফোনটা সাইলেন্ট মোডে ছিল। অনেক কটা মিসড্ কল হয়েছে।বাড়ীতে থাকলে ফোনটা সাইলেন্টই থাকে। মা বা বাপি কেউ জানতে পারলে আর রক্ষে নেই । আসলে বৃন্দার কাছে যে ফোন...
চল দাওকি – দেবাশিস_ভট্টাচার্য... মন খারাপ করা এক বিকেলে রুশা দাঁড়িয়ে ছিল দাওকি ফরেস্ট বাংলোর সামনের লনে। অস্তগামী সূর্যের লাল আলো ধীরে ধীরে ছড়িয়ে যাচ্ছে দূরের পাহাড়গুলোর অন্দ...
লাভ স্টোরি – শ্বেতা আইচ... 'ও দাদা একটু গাড্ডা গুলো বাঁচিয়ে চলুন না, কখন থেকে তো বলছি। কানে যায় না?' 'চুপ কর না প্লিজ টুকি, পাশে সবাই তাকাচ্ছে তো।' 'তুই তো মোটে কথা বলবি ন...
প্রথম মিস্টার পারফেকশানিস্ট-  অস্থির কবি ( কল্লোল ...   উত্তম পর্ব -তিন   ইদানিং বলিউডের আমির খানকে মিস্টার পারফেকশনিস্ট বলা হয়। যেমন এক কালে রাহুল দ্রাবিড়কে ওয়াল বলা হত। ক্রিকেট দেখা ছেড়ে দি...
ADMIN

Author: ADMIN

Comments

Please Login to comment