মোহিনীর আতঙ্ক – শাশ্বতী সেনগুপ্ত

   জঙ্গলে পিকনিক? কথাটা শুনেই না করে দিয়েছিল রাজ। জঙ্গল এমনিতেই ভয়ঙ্কর। তার ওপর আবার এক রাত থাকা। মুখের কথা নাকি? কোনও দরকার নেই ভাই, পরিস্কার কথাটা ফোনে জানিয়ে দিয়েছিল সৌরভকে। সৌরভ নাছোড়বান্দা হয়ে বলেছিল, ভাই তুই না গেলে হবে না। সবাই যাচ্ছি চল গুরু। তাছাড়া এত ভীতু কেন তুই শালা। চল চল। দ্যাখ প্রীতম সেই রাজস্থান থেকে আসছে শুধু আমাদের এই গেট টুগেদারের জন্য। চল, প্লিজ। কিছু হবে না। সুতরাং বাধ্য হয়ে যেতে হচ্ছে রাজকে। শনি রবি প্রোগ্রাম। শনিবার বাড়ি থেকে বের হওয়া। আর রবির রাতে আবার বাড়ির বিছানায় শোয়া। নতুন চাকরি রাজের। তাই একটু চিন্তা। শনিবার অফ নিচ্ছে। বলেও দিয়েছে ওর ইমিডিয়েট বস সুদেষ্ণাদিকে। তির্যক দৃষ্টিতে সুদেষ্ণা দি বলেছিল, এখন আর অফ নিস না।

সকালবেলাই একটা পেল্লাই গাড়ি এসে হাজির। সৌরভ, দীপ, লতু, বিট, মোহন, প্রতীম, রাঘব সব ক্রমে হাজির। রাজের মা ওদের চা দিল। এরা সব রাজের স্কুল মেট। সৌরভ কলেজে রাজের সঙ্গে ছিল। ওদের কানেকশনটা বেশ ভালো। সবাই সবাইকে কনট্যাক্ট করে। যাই হোক ওরা গাড়ি নিয়ে সোজা হাজির হল ধূমকেতুর জঙ্গলে। না, জঙ্গলটার নাম ধূমকেতু না, ধ্রুম্রগড়। ওই সৌরভই নাম দিয়েছে ধূমকেতুর জঙ্গল। এই জঙ্গলের গেস্ট হাউসে ওদের রাত্রিবাস। ওই গেস্ট হাউসটা লতুর জামাইবাবু বুক করে দিয়েছেন। উনি ফরেষ্ট ডিপার্মেন্টে চাকরি করেন।
পথ চলতে চলতে প্রায় কাছাকাছি ধূম্রগড়ের। হঠাৎ মোহন বলল, ভাই একটু চা পান করলে কেমন হয়? সবাই হৈ হৈ করে উঠলো। একটু এগোতেই মিললো বেঞ্চপাতা চায়ের দোকান। গাড়ি থেকে নেমে চা খাওয়া চলছে। ড্রাইভার অর্জুন সিংও নেমেছে। চায়ের দোকানের লোকটা লতুকে জিজ্ঞ্যেস করল, দাদা কোথায় যাচ্ছেন?

ও বলল, জঙ্গলে। একদিনের জন্য। ওই জঙ্গলের গেস্ট হাউসে থাকব। কেন কি হয়েছে?
লোকটা বলল, না মানে, এই জঙ্গলে লোক আসতে ঘুরতে। আবার সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে চলে যায়। থাকে নাতো তাই বলছি।
লতুর যেন কেমন মনে হল। সে দোকানির কাছে গিয়ে বলল, কেসটা কি দাদা? একটুখানি খোলসা করে বলুন না।
লোকটা বলল, দেখুন, ওই জঙ্গলটা মোটেই ভালো নয়। মোহিনী ঘুরে বেড়ায় রাতে। ওই মোহিনীর জন্য কত লোক মরেছে।
মোহিনী মানে কোন মহিলা?
দোকানি কি একটা বলতে যাচ্ছিল। হঠাৎ তার বাবা এসে যাওয়ায় ছেলেটা চুপ করে গেল।

গাড়ি এসে জঙ্গলের গেস্ট হাউসে দাঁড়ালো। কেউ কোথাও নেই। সৌরভ গাড়ি থেকে নেমে বাড়ির ভিতর ঢুকতেই দেখল, দারোয়ান বের হচ্ছে। ওদের আ্যাপায়ন করে ভিতরে নিয়ে গেল। দুটি ঘর দেওয়া হয়েছে ওদের। দারুণ ঘর, একেবারে ঝাঁ চকচকে। আর চারিদিকের পরিবেশও অতি মনোরম। রাজ ঘরে গিয়ে জানলা দিয়ে সবুজের ভ্যারাইটি দেখতে লাগল।
লতু এসে রাজকে বলল, গেস্ট হাউসে আমরাই আছি। আর কেউ নেই, অথচ এটা নাকি সিজন। রাজ বলল, অত ভাবিস না, এনজয় কর। ওরা গেস্ট হাউসের সামনে পাতা টেবিলে বসে চায়ের আড্ডায় জমে উঠলো। এমন সময় মোহন বলল, দীপ, তাসটা এনেছিস তো?
দীপ বলল, এই রে, মনে হয় আনিনি। ভুলে গেছি।
মোহন বলল, তাহলে?
আরে বাজার থেকে আনছি। সামনেই বাজার তো। চল কে যাবি আমার সঙ্গে। বলল সৌরভ। ওরা দু’তিনজন মিলে তাস আনতে গেল। লতু আর রাজ গেল না। লতু কেয়ার টেকারকে দেখে বলল, এই গেস্ট হাউসটায় লোক আসে তো?
কেয়ার টেকার বলল, আসে তো। এবারে বুকিং হয়নি । নইলে সারা বছর লোক আসে। কিন্তু কেন বলুন তো?
লতু বলল, আচ্ছা মোহিনী কে? কথাটা শুনে বসে থাকা রাজ বলল, মোহিনী? সে কে রে?
লোকটা ইতঃস্তত হয়ে বলল, মোহিনী—আসলে ও কিছু নয়। লোকে কত কি বলে জঙ্গল সম্পর্কে। লোকটা এড়িয়ে গেল।

          দেখতে দেখতে দিনের আলো প্রায় শেষ। জঙ্গলে সন্ধে নামছে। গাড়ি গ্যারেজ করে অর্জুন সিং শুয়ে আছে বারান্দায়। ওরা সকলে ঘরে আছে। এমন সময় দরজায় টোকা। রাঘব গিয়ে দরজা খুলে দেখে একটা লোক। লোকটা হাসিহাসি মুখে বলল, আমি এখানকার কুক। আপনাদের ডিনারটা কি করেই দিয়ে যাব? কারণ আমি চলে যাচ্ছি। শুধু কেয়ার টেকার থাকবে তাই।
রাঘব বলল, হ্যাঁ, করে দিন।
লোকটা বলল, আচ্ছা। তবে একটা কথা, রাতে আপনারা ঘর থেকে কেউ বের হবেন না। এই জঙ্গলে হিংস্র জন্তু জানোয়ার আছে তো। আপনারা নতুন, কিছু চেনেন না। তাই আর কি। ঘরের আলো নিভিয়ে শোবেন।
ওরা বলল, আর কিছু? তারপর লোকটা চলে যেতে রাঘব বলল, যত্ত সব ভয় পাওয়ানোর কথাবার্তা।
ওদের খাওয়া দাওয়া হল। তারপর কেয়ার টেকার হাসি মুখে এসে বলল, স্যার সব ঠিক ছিল তো? ওরা বলল, সব ঠিক ছিল। তারপরই লোকটা ধুনোর সুগন্ধদায়ক কিছু একটা নিয়ে সারা গেসটহাউসে ঘুরলো। তীব্র একটা গন্ধ, কিন্তু বেশ ভালো গন্ধ।
ওরা একটা ঘরে বসেই তাস খেলছে। হঠাৎ বাইরে একটা খস খস শব্দ। শব্দটা ক্রমাগত কাছে আসছে। তখন রাজ উঠে, বড় আলোটা নিভিয়ে দিয়ে জানলার পর্দাটা সরিয়ে দেখতে লাগল। না, কিছু নেই। সৌরভ বলে উঠলো, মোহিনী নাকি?
হাসিতে ভরে গেল ঘর। শীতকাল তাই হাসির আওয়াজটা বেশি লাগলো। হঠাৎ রাজ বলল, চুপ কর, কিসের একটা নিঃশ্বাসের শব্দ পাচ্ছি। সত্যি কে যেন বিরাট নিঃশ্বাস নিচ্ছে। বিট বলল, একটু শুনতে দে। এটা সাপের নিঃশ্বাস। ও গ্রামের ছেলে তাই হয়ত জানে। সৌরভ বলল, চল চল, বেরিয়ে দেখি। বাড়ির পাশেই তো শব্দটা হচ্ছে। ঘরে বসে থেকে লাভ কি?

দরজা খুলে ওরা বের হল। মেন গেটের দিকেই যেতেই দেখল, কেয়ার টেকার দাঁড়িয়ে। তার হাতে ফুল মালা আর দুধ। ওদের দিকে তাকিয়ে বলল, যান ঘরে যান।
মানে? কিসের একটা শব্দ পেলাম আমরা। মনে হল নিঃশ্বাসের। পশু না মানুষ আমরা দেখব না? আপনি সরুন।
না শুনুন, প্লিজ বের হবেন না। আমার কথা শুনুন। এখানে এত কথা বলা উচিতও নয়। আচ্ছা একটা কাজ করুন। ওই দেওয়ালটার পিছনে দাঁড়ান। তাহলেই সব বুঝতে পারবেন, বলল কেয়ার টেকার।
ওরা সরে গেল। লোকটাও ফুল, মালা দুধ নিয়ে এক দৌড়ে সরে গেল।
নিঃশ্বাসের শব্দটা ক্রমাগত এগিয়ে আসছে। সৌরভ ঈশারা করে বলল, কি কেস বলত? দূর যত ঢপের চপ। চল চল। ওরা বের হতে যাবে এমন সময় গেটের দিকে চোখ পড়তেই সকলের রক্ত হিম হয়ে গেল। প্রকাণ্ড হাঁ করে এক অজগর এগিয়ে আসছে। ওই ফুল মালা আর দুধের বাটির দিকে।
ফুল মালা চিবিয়ে খেল। দুধ এক নিমেষে শেষ করে লোহার গ্রিলটাতে জোর ধাক্কা দিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে গেল। তখনও পুরো দেহটা যায়নি। কেয়ার টেকার এগিয়ে এসে ওদের ঘরে যেতে বলল।
সকলেই খুব বিধ্বস্ত হয়ে গেছে। কেয়ার টেকার ওদের জল-টল দিয়ে বলল, এটা একটা বিরল প্রজাতির অজগর। দিনেরবেলা কোনওদিন ওকে দেখা যায় না। রাতে কোথা থেকে যেন উদয় হয়। তা কেউ জানে না। একে জঙ্গলের লোক বনদেবীর বাহন বলে। ওরা মোহিনী নামে পুজো করে। কেউ যদি অসৎ উদ্দেশ্য নিয়ে জঙ্গলে ঢোকে, তাহলে মোহিনী তাকে শাস্তি দেয়। মানে প্রাণ যায় তার। সারারাত মোহিনী ঘুরে বেড়ায় গোটা জঙ্গলে। প্রতিরাতে এখানেও আসে আমরা তাকে মানি বলে। তাই ফুল, মালা দুধের ভোগ দিই। মোহিনী জানে আপনারা এখানে আছেন। ওই যে নিঃশ্বাসের শব্দ পেয়েছিলেন? ও চারধার ঘরে তবেই এখানে আসে। যদি আপনারা অসৎ হতেন, তাহলে বাড়িতে ঢুকেই মোহিনী আপনাদের নিয়ে যেত। যাক গে, শুয়ে পড়ুন আপনারা। কালই তো আপনাদের ফেরা।

সারারাত আর কারোর ঘুম হল না। ওই আতঙ্কই রাতের ঘুম কেড়ে নিল। ভোরের আলো ফুটতেই তাড়াতাড়ি রওনা দিল সবাই। রাজ বলল, আর আসবি জঙ্গলে? সব্বাই একবাক্যে বলল, গুডবাই জঙ্গল।

_____


FavoriteLoading Add to library
Up next
সেরা দুই শিক্ষিকা – রুমাশ্রী সাহা চৌধুরী... 'মা ফেসবুক খুলেছিলে?' 'না রে খোলা হয়নি।' 'আরে একবার খুলেই দেখনা?' 'আমার কি তোর মত অখন্ড সময় নাকি,সকাল থেকে রাজ‍্যের কাজ। সব সারি আগে, তারপর খুলবো...
আমার দূর্গা – প্রসেনজিৎ মুখার্জী... অশ্বিনমাসে কাশের ফুলে দূর্গা আসে সবার ঘরে আমার দূর্গার শরীর জ্বলে বধূর বেশে স্বামীর ঘরে জ্বালিয়ে আগুন তার গায়ে তোমরা মাতো দূর্গা নিয়ে আমার দুর্গ...
আবর্ত – সৈকত মন্ডল... যারা ভাঙাচোরা অতীত থেকে উঠে আসে, হটাৎ পেয়ে যাওয়া উষ্ণতার স্রোতে ভেসে, বোধ হয় তারাই জানে স্বপ্নভাঙ্গার আঘাত টা, বোঝে, মুহূর্তে নিঃস্ব হাওয়ার আকস...
ভূতের সঙ্গে এক পলক – প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়... ঘটনাটা কেউ বিশ্বাস করবে না জানি। আসলে আমিই তো এখনও বিশ্বাস করতে পারি না। অন্য কেউ করবে কি করে! তবে ফালতু কথায় লাভ নেই। আসল কথায় আসা যাক। ঘটনা খুব একটা...
সবই উল্টো - সৌম্যদীপ সৎপতি   (এক) ধড়মড় করে ঘুম থেকে জেগে উঠলাম। চারদিক অন্ধকার, মাথার উপরে ফ্যানটাও বন্ধ, লোডশেডিং।বুঝতে পারলাম ঘামে সারা শরীর ভিজে...
জাতিভেদ প্রথা ও স্বামী বিবেকানন্দ – অঙ্কুর ... ভারতীয় হিন্দু সমাজে জাতিভেদ প্রথা বহু প্রাচীন কাল থেকেই প্রচলিত রয়েছে। এই প্রথার উদ্ভব বেশ জটিল ও নানা বিবর্তনের মধ্য দিয়ে প্রথাটি তার বর্তমান রূপ পে...
মাস্টারপিস – শ্বেতা মল্লিক... অ্যালার্ম টা বাজতেই বাস্তবের মাটিতে ফিরে এলাম। একবার কলম ধরলে আর ছাড়া যায় না,এমন কথাটাই প্রযোজ্য লেখক দের জন্য। আরও যদি পছন্দসই লেখার মাধ্যমে পাঠকদ...
উল্টো ছন্দ - গার্গী লাহিড়ী   (৩) রাজপথ জনশূন্য হয়ে পড়ে ধীরে ধীরে কমে আসে যান চলাচল ঝমঝম বৃষ্টি নামে শহরে নিথর দেহ পড়ে থাকে রাস্তায় মাথায় হাত রাখার...
চল দাওকি – দেবাশিস_ভট্টাচার্য... মন খারাপ করা এক বিকেলে রুশা দাঁড়িয়ে ছিল দাওকি ফরেস্ট বাংলোর সামনের লনে। অস্তগামী সূর্যের লাল আলো ধীরে ধীরে ছড়িয়ে যাচ্ছে দূরের পাহাড়গুলোর অন্দ...
জীবনের সূর্যোদয় – দেবস্মিতা মন্ডল... অশোকবাবুর রোজ প্রাতঃভ্রমণ যাওয়াটা   বড্ড বাজে অভ‍্যাস। নাহ্ প্রাতঃভ্রমণ টা কোনো বদ অভ‍্যাস নয় তবে ঝড় বৃষ্টি কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করাটা বোধহয় সবসময়...
ADMIN

Author: ADMIN

Comments

Please Login to comment