রহস্য গভীরে- প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়

দিগন্ত মুখার্জি বৈঠকখানায় বসে সিগারেট খেতে খেতে কাগজ পড়ছিলেন। তার সহকারী মৈনাক মিত্র চুপচাপ বসেছিলেন। এমন সময় কলিং বেল বেজে উঠলো। দিগন্ত মৈনাকের দিকে চাইতে সে দরজা খুলতেই এক মধ্যবয়স্ক খুব সুন্দরী মহিলাকে দেখতে পেলেন। মহিলাটি বললেন, দিগন্ত মুখার্জি কি আছেন? মৈনাক বলল, আছেন, ভিতরে আসুন। ভদ্রমহিলা দ্রুত ঘরে ঢুকতেই দিগন্ত বলল, বসুন। অস্থির হবেন না। ভদ্রমহিলা বসে নিজেকে একটু ঠিক করে নিয়ে বললেন, আমার নাম মধুরিমা সেন। আমার মেয়েকে হয়ত আপনারা চেনেন, তার নাম সীমা সেন। বিখ্যাত অভিনেত্রী। দিগন্ত কিছু বলার আগেই মৈনাক বললেন, চিনতে পারছি। সিরিয়াল জগতের বিখ্যাত অভিনেত্রী তো? ‘আমি বাসন্তী’ নামের মেগা ধারাবাহিকের নাম ভূমিকায় উনিই তো অভিনয় করছেন। মধুরিমা বললেন, ঠিক ধরেছেন। দিগন্ত বললেন, উনি তো কদিন আগে খুন হয়ে গেছেন! আপনি কি সেই কারণেই এসেছেন?

মধুরিমা ঝরঝর করে কেঁদে ফেললেন, ঠিক তাই। আপনার সুখ্যাতি আমি শুনেছি। আমি চাই, কেসটা আপনি নিন। দিগন্ত বললেন, আমি সিগারেট ধরাতে পারি কি, আপনার অসুবিধা নেই তো? মধুরিমা বললেন, ধরান। দিগন্ত একমনে ঘনঘন সিগারেটে টান দিয়ে বললেন, পুলিশ তো তদন্ত শুরু করেছে? মধুরিমা বললেন, তাতে কি? আমি পুলিশের ওপর ভরসা রাখতে পারছি না। আপনি নিলে আমি নিশ্চিন্ত হব। মেয়েটার খুনিটাকে ধরতেই হবে দিগন্তবাবু। আমার একমাত্র মেয়েকে এভাবে কেন খুন করা হলো? মধুরিমার চোখ জলে ভরে উঠলো। একটু অপ্রস্তুতে পড়ে গিয়ে দিগন্ত বললেন, বেশ, আপনি যখন আলাদা ভাবে আমাকে দায়িত্ব দিচ্ছেন, আমি কেসটা নেব। তারপরই মৈনাকের দিকে চেয়ে বললেন,  কি বলো হে মৈনাক? এটা দিগন্তর অভ্যাস, সেটা জানে মৈনাক। সে ঘাড় নাড়তেই দিগন্ত বললেন, কেসটা নিলাম। এবার আমাকে একটু বিস্তারিত বলুন তো।

মধুরিমা শুরু করলেন, দীর্ঘ বছর হলো আমার স্বামী গত হয়েছেন। তখন সীমা খুব ছোট। আমার স্বামী খুব ভালো চাকরি করতেন না। যা হোক করে চলে যেত আমাদের। তবে আমি নিজেও কিছু রোজগার করতাম অভিনয় করে। বিভিন্ন ক্লাব, নাটকের দল আমাকে ভাড়া করে নিয়ে যেত। অভিনয় করে পাওয়া বেশ কিছু টাকা সংসার খরচে ব্যয় হতো। আমার স্বপ্ন ছিল একদিন সিরিয়াল বা ছবিতে নায়িকার চরিত্রের সুযোগ পাব। বুঝতেই পারছেন, আমায় যথেষ্ট ভালো দেখতে তার সঙ্গে সমানতালে অভিনয়টা করতে পারতাম। না না, এটা আমার অহংকার ভাববেন না। লোকেরা তাই বলতেন। আমার স্বামী মারা যাবার পর অভিনয়ে আরও মনোযোগ দিলাম। সেই টাকাতেই সংসার চালাতে লাগলাম। মেয়েটাকে মানুষ করতে লাগলাম। ক্রমে মেয়েটা বড় হয়ে উঠলো। আর আমার চেয়ে রুপসী হয়ে উঠলো। সীমা যখন ছোট ছিল আমি ওকে সঙ্গে নিয়েই অভিনয় করতে যেতাম। তখনই অজান্তে ওর মনে অভিনয়ের বীজ রোপণ হয়ে থাকবে। তাতে আমি অবশ্য সুখী ছিলাম। আস্তে আস্তে ও বড় হয়ে উঠলো, শিক্ষায় দীক্ষায়। হঠাৎই ও একজন পরিচালকের নজরে পড়ে গেল। তিনি আমাদের পাড়াতেই থাকতেন। সিরিয়ালে প্রথম সুযোগ তিনিই দেন। আমি যা পারিনি মেয়েটা পারতে আমি খুব আনন্দ পাই। ক্রমে ও নাম করে ফেলে। সুযোগ পায় ‘আমি বাসন্তী’ মেগাধারাবাহিকে। একটি মেয়ের মারাত্মক জীবন সংগ্রামের কাহিনি। দ্রুত হিট করে যায় সিরিয়ালটি। ছড়িয়ে পড়ে ওর অভিনয়ের প্রশংসা এবং রূপেরও। এই পর্যন্ত খুব দ্রুত বলে থামলেন মধুরিমা।

দিগন্ত ফের সিগারেট ধরিয়ে মৈনাকের মুখের দিকে তাকাল। মৈনাক সিগারেট খায় মেপে। সকালে, দুপুরে খাওয়ার পর আর রাতে খাওয়ার পর। কিন্তু এখন দিগন্তর প্যাকেট থেকে সিগারেট নিয়ে ও ধরালো। দিগন্ত মধুরিমার দিকে চেয়ে বললেন, তারপর? আর ইশারায় মৈনাককে সব নোট করতে বললেন।
মধুরিমা আবার  বলতে শুরু করলেন, আমার মেয়ে সীমা হঠাৎ একটা বিগ বাজাটের ছবিতে নায়িকার রোলে অফার পেয়ে গেল। যা ছিল আমারও স্বপ্ন কিন্তু আমি সুযোগই পাইনি। সীমা অনেকদিন ধরে এমন একটা ব্রেকই চাইছিল। সে চিত্রনাট্য শোনার পর ছবিটায় সাইন করে। তবে তার আগে ওই মেগাধারাবাহিকের প্রযোজক ও পরিচালকের পারমিশন নিতে চায়। পরিচালক খুব একটা অরাজি ছিলেন না। কিন্তু বেঁকে বসলেন প্রযোজক শ্যামসুন্দরবাবু। তিনি ছাড়তে রাজি হচ্ছিলেন না। পরিচালক বিচিত্র রায় তাকে অনেক বুঝিয়েছিলেন। বলেছিলেন, কিছুদিনের জন্য অ্যাডজাস্ট করে নেওয়া হবে। মেগার নায়িকাকে বিদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হবে অথবা তার অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে দেখান হবে। তা না হলে সে নিখোঁজ দেখানো হবে। পরে অতি নাটকীয়তায় তাকে আবার ফিরিয়ে আনা হবে। শেষ পর্যন্ত কি হলো জানি না, প্রযোজক এবং পরিচালক দুজনেই বেঁকে বসলেন।

আমি নিজে গিয়ে তাদের অনুরোধ করেছিলাম, তবুও কাজ হয়নি। শেষে সীমা জোর করে ছবিটায় সাইন করেছিল। প্রযোজক ওর নামে কেস ঠুকেওছিল। কিন্তু কোথা দিয়ে কি হলো, একদিন ধারাবাহিকটার শুটিং করে ফেরার পথে সে খুন হয়ে যায়। রাজ্যজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়। বিভিন্ন চ্যানেলগুলো আলোচনায় বসে, কাগজে অনেকরকম গল্প প্রকাশ হতে থাকে। যেখানে সীমার চরিত্র নিয়ে পর্যন্ত টানাটানি হয়। আলটিমেটলি কাজের কাজ কিছু হয় না। পুলিশ এখনও কোনও সূত্রই বার করতে পারেনি। মধুরিমা কান্না চাপতে মুখে রুমাল দিলেন।

খানিকক্ষণ স্তব্ধ ঘরে কোনও আওয়াজ উঠলো না। দিগন্ত আর মৈনাক চুপচাপ। মধুরিমা নিজেকে সামলে নেবার পর দিগন্ত বললেন, আজ থেকেই তদন্ত শুরু করতে চাই। আজ কি আপনার বাড়িতে যাওয়া যাবে? কোথায় বেশ থাকেন আপনি? মধুরিমা বললেন, দক্ষিণ কলকাতায়। বেশ ঠিকানাটা দিয়ে যান আমরা হাজির হয়ে যাব বললেন দিগন্ত। মধুরিমা ঠিকানা দিয়ে বেরিয়ে গেলেন।
দিগন্ত সিগারেট ধরিয়ে মৈনাকের দিকে চেয়ে বললেন, রহস্য গভীরে, কি বুঝলে হে? মৈনাক বললেন, ঠিক বুঝতে পারলাম না। তোমার মাথার সঙ্গে আমার মাথার কেন তুলনা করো? হেসে দিগন্ত বললেন, নিজেকে ছোট ভাবা ঠিক নয় হে। মনে রেখো, দুপুরেই আমরা হাজির হবো মধুরিমার ফ্ল্যাটে। দুপুর হতে আর বেশি দেরি নেই কিন্তু। তার আগে আমাদের রেডি হতে হবে।

দুপুর যায় যায় সময়ে ওরা পৌঁছালো মধুরিমার ফ্ল্যাটে। বিলাসবহুল এলাকা যেমন তেমনি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট। দরজার বেল বাজাতেই মধুরিমা ওদের সাদরে ভিতরে ডেকে নিলেন। ভিতরে ঢুকে দেখার মতই বটে ফ্ল্যাটটি। চমৎকার সাজানো, শিল্পময় রুচির ছাপ সর্বত্র। সারা ফ্ল্যাট জুড়ে বেশ কয়েকটা বড় বড় ছবি সীমার, বিভিন্ন শুটিং দৃশ্যের। দু-একটা ছবি মায়ের সঙ্গেও। সেখানে সৌন্দর্যের যেন প্রতিযোগিতা মা আর মেয়ের মধ্যে। মধুরিমা ওদের বসতে বললেন। দিগন্ত বললেন, তার আগে সীমার ঘরটা আমরা দেখতে চাই। বেশ তো আসুন, বলেই পাশের ঘরে নিয়ে গেলেন মধুরিমা।
সীমার ঘরটি আরও চমৎকারভাবে সাজানো। ঘরে ঢুকতেই বিশাল মাপের একটা ছবি সীমার। ওদিকে জানলার ধারে খাট। ঘরের ডানদিকে একটি মাঝারি টেবিল তার সঙ্গে চেয়ার। টেবিলটিতে সীমা সম্ভবত লেখালেখি বা পড়াশোনা করতেন। দিগন্ত এগিয়ে গেলেন টেবিলটার দিকে।

মধুরিমা দরজার পাশে দাঁড়িয়ে মেয়ে সম্পর্কে নানা কথা বলে যাচ্ছিলেন। সময় দ্রুত কেটে যাচ্ছিল। হঠাৎ দিগন্ত বললেন, একটু চা খাওয়াতে পারেন? খানিকটা অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে মধুরিমা বললেন, হ্যাঁ হ্যাঁ, এক্ষুণি করছি। ঘর ফাঁকা হতে টেবিলের ড্রয়রটা খুলে ফেললেন দিগন্ত। নাহ, খুঁজেও কিছু পাওয়া গেল না। মৈনাক ঘরের অন্যদিকে খোঁজ চালাচ্ছিলেন। ঘরটার এদিক ওদিক ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ দিগন্ত বাঁদিকে মাঝারি আকারের বইয়ের ‌আলমারির র‌্যাকটার দিকে এগিয়ে গেলেন। অনেকরকম বই রয়েছে কয়েকটা র‌্যাকজুড়ে। কালেকশন ভালোই। সীমার পড়ার নেশা ছিল বোধহয়। ভাবতে ভাবতে এটা ওটা বই নেড়েচেড়ে দেখতে লাগলেন দিগন্ত। হঠাৎ একটা ডায়েরি দেখতে পেলেন দিগন্ত। ডায়েরিটা হাতে তুলে নিয়ে খুলে ফেললেন। ভিতরের পাতায় লেখা ‘আমার গোপন কথা’। আর পড়লেন না দিগন্ত ডায়েরিটা ঝট করে নিজের কাছে লুকিয়ে ফেললেন। কারণ মধুরিমার আসার পায়ের শব্দ শোনা যাচ্ছিল। দিগন্ত একটু উঁচু গলায় বললেন, কি হে মৈনাকবাবু, কিছু কি পেলে? মৈনাক ঘুরে বললেন, নাহ, তেমন কিছু নজরে পড়ছে না। এমন সময় মধুরিমা ঘরে ঢুকলেন। চা খাওয়ার পরে খানিক কথাবার্তা বলে দিগন্ত উঠে পড়লেন। তারপর বাইরে এসে বললেন, চলো হে, স্টুডিওয় যাওয়া যাক। আগেই ফোন নাম্বার জোগাড় করে পরিচালক মশাইকে বলেছি, আমরা যাচ্ছি। প্রযোজককে নিয়ে অপেক্ষা করবেন। ওদের গাড়ি টালিগঞ্জের স্টুডিওর দিকে এগিয়ে যেতে লাগল।

গাড়িতে বসে সীমার ডায়েরিটা খুললেন দিগন্ত। নামটিতেই বোঝা যাচ্ছে কিছু একান্ত গোপন কথা সীমা লিখেছেন। ওর ডায়েরি লেখার নেশা ছিল বোধহয়। পাতা উলটাতে উলটাতে খাঁড়া হয়ে বসলেন দিগন্ত। কি লিখেছে সীমা! এ সব কি সত্যি! তাহলে…..। পড়ার নেশায় পড়ে গেলেন দিগন্ত। পাতা উলটাতে উলটাতে পড়ে যেতে লাগলেন। হঠাৎ গাড়ি চালাতে চালাতে মৈনাক বললেন, কি হে একেবারে যে চুপ মেরে গেলে? কিছু সূত্র মাথায় গেঁথেছ নাকি? দিগন্ত ডায়েরির শেষ পাতায় ছিলেন। ফট করে মুড়ে দিয়ে বললেন, জগৎ বড় রহস্যময় হে মৈনাক। যত ঘাঁটছি মানুষকে তত বুঝতে পারছি। মনুষ্য চরিত্র বেজায় কঠিনই বটে। বলতে বলতে ওরা টালিগঞ্জ স্টুডিওর কাছে এসে পড়েছিল। হর্ন দিতে স্টুডিওর গেটম্যান দরজা খুলে দিলেন। শব্দকে আয়ত্তে এনে ওদের গাড়ি স্টুডিওর ভিতর ঢুকে গেল। খোঁজ নিতে জানা গেল ৬নং ফ্লোরে রয়েছেন ’আমি বাসন্তী’র  পরিচালক ও প্রযোজক। খবর পেয়ে পরিচালক বিচিত্র রায় ও প্রযোজক শ্যামসুন্দরবাবু ফ্লোর থেকে বেরিয়ে ওদের নিয়ে গেলেন অফিস ঘরে। সেখানেই কথা শুরু করলেন দিগন্ত।

দিগন্ত বুঝতে পারলেন, বেশ নার্ভাস হয়ে পড়েছেন প্রযোজক এবং পরিচালক। দিগন্ত সেই সুযোগ নিয়ে বললেন, খুন করাটা কি ঠিক হলো আপনাদের। এত সহজ আর হাল্কাভাবে কথাগুলো ও বলল যে, সামান্য সময় কথা বলতে ভুলে গেলেন পরিচালক ও প্রযোজক। তারপর প্রায় কেঁদে ফেলে প্রযোজক শ্যামসুন্দরবাবু বললেন, স্যার, বিশ্বাস করুন এই খুন সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না। এ কথা সত্যি, আমার বহু টাকা ক্ষতি হচ্ছে। খুনটা সিরিয়ালটার বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে। হয়ত কয়েকদিনের মধ্যে বন্ধ করে দিতে হবে। তাছাড়া অমন একজন অভিনেত্রীর অভাবটা এই সিরিয়ালের দর্শকরা মেনে নিতে পারছেন না। তার ওপর পুলিশের অর্ডারও এসে গেছে এই মেগা বন্ধ করার। সীমা ছবিতে সাইন করায় আমরা সিরিয়ালটার কথা ভেবে দিশাহারা হয়ে পড়েছিলাম ঠিকই। বাধাও দিয়েছিলাম কিন্তু নায়িকাকে খুন করার কথা স্বপ্নেও ভাবিনি। প্রযোজক মশাই চুপ করে গেলেন। পরিচালকও বললেন, সিরিয়ালটার ক্ষতি হবে জেনেও আমি চেয়েছিলাম সীমা ছবিটা করুক। তার জন্য কিছুদিনের জন্য আমরা চিত্রনাট্যটা বদলাব ভেবেছিলাম।

প্রযোজকের সঙ্গে কথাও বলেছিলাম। উনি তো সামনেই আছেন জিজ্ঞেস করে দেখতে পারেন। কিন্তু এভাবে কে বা কারা ওকে খুন করল ভেবে পাচ্ছি না। দিগন্ত চুপ করে বসে সিগারেট ধরালো। ওরা ঠান্ডা আনার কথা বলতে নিষেধ করলেন দিগন্ত। চুপ করে খানিকক্ষণ ভাবতে লাগলেন সিগারেটে টানের পর টান দিয়ে। মৈনাকের দিকে তাকালেন। মৈনাক নিশ্চুপ বসে। হঠাৎ দিগন্ত বললেন, ঠিক আছে আজ উঠি, দরকার হলে আবার আসতে পারি। দিগন্ত গাড়িতে উঠে বসে গুম হয়ে রইল।
মৈনাক বললেন, কি ব্যাপার হে, তোমায় এত গম্ভীর আগে তো দেখিনি? দিগন্ত বললেন, যা অ্যাকশন নেবার আজ রাতেই নিতে হবে। সকাল হতে দিলে চলবে না। তারপরই স্থানীয় থানার সঙ্গে যোগাযোগ করে নিয়ে ব্যবস্থা পাকা করে ফেললেন।

তখন বেশ রাত। পুলিশ নিঃশব্দে ঘিরে ফেললো চত্বরটা। যারা দেখতে পেয়েছিলেন তারা কানাকানি শুরু করে দিয়েছিলেন। দিগন্ত পুলিশ অফিসারকে বলেছিলেন, দ্রুত কাজটা সারতে হবে যাতে অন্য কিছু না ঘটে যায়। পুলিশ সেই মতো দিগন্তর সঙ্গে দ্রুত উঠে এলো মধুরমা সেনের ফ্ল্যাটে। দরজায় আঘাতের পর আঘাত করতেও দরজা খুলল না কেউ। অগত্যা দিগন্ত বললেন, এক্ষুনি দরজা ভাঙুন। দরজা ভেঙে ফ্ল্যাটের ভিতরে ঢুকে পড়লেন দিগন্ত সঙ্গে পুলিশও। সোজা মধুরিমার ঘরে। ইতিমধ্যে চত্বরের লোকজন জেগে উঠছেন। কোনোভাবে খবর পেয়ে মিডিয়াও হাজির। দিগন্ত দ্রুত মধুরিমার ঘরে ঢুকে পড়লেন। মধুরিমা বিছানায় ঘুমিয়ে আছেন। দিগন্ত তাকে স্পর্শ করার পরই ঠিকরে সরে এলেন, যেন শক খেয়েছেন। তারপরই হতাশ হয়ে বললেন, দেরি হয়ে গেল, মধুরিমা সুইসাইড করেছেন। তার হাতে ধরা একটি নোট। পুলিশ সেটি যত্ন করে তুলে নিতে দিগন্ত কাগজের টুকরোটা খুলে ফেললেন। তাতে কয়েকটা কথা লেখা, মধুরিমা লিখে গেছেন দিগন্তবাবু, আমি বুঝতে পেরেছিলাম আপনি সব বুঝতে পেরেছেন। বুঝতে পেরেছেন, আমার মেয়ের হত‌্যাকারী কে? সেদিন যখন আপনি মেয়ের ডায়েরিটা পেয়েছিলেন আমি আড়াল থেকে দেখতে পেয়েছিলাম। কিন্তু তখন আর কিছু উপায় ছিল না। মেয়ে যে ডায়েরি লিখতো আমি ধারণাও করতে পারিনি। তাই আমি জেল খাটতে পারতাম না। কারণ বেঁচে থেকে মানসিক যন্ত্রণায় শেষ হতে পারতাম না। মেয়ের খ্যাতি আমার সহ্য হতো না। ওই খ্যাতি তো আমার পাবার কথা ছিল। তাই হিংসা আর ঈর্ষায় মেয়েকে আমিই খুন করিয়েছি। আজ আর আমার বেঁচে থাকার কোনও অর্থই নেই। বাঁচলে লজ্জা ঢাকব কোথায়?  দিগন্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, আমাকে প্রমাণ করতে হলো না। সত্যিটা নিজেই স্বীকার করে গেছেন মধুরিমা। গাড়িতে উঠে মৈনাক বললেন, কি দ্রুত কেসটা সলভ করলে তুমি! দিগন্ত বললেন, আসলে সূত্রটা তৈরি করে রেখেছিলেন সীমাই। আমি কাজটা শুধু করেছি। সত্যি কি বিচিত্র মানুষের চরিত্র!

_____


FavoriteLoading Add to library

Up next

ভয় – তমালী চক্রবর্ত্তী... হলঘর থেকে বেরিয়ে মেজাজটা খিঁচড়ে গেল বিতানের। এই বোরিং পেরেন্টস্-টিচার মিটিং এ সে কোনোদিনই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে না। কতবার নিপাকে বলেছে একা যেতে। অফিসের ...
দৃষ্টিভেদ – শুভেন্দু সামন্ত... হিমের ভোর-জানালার রোদ শিখার মতো তোমার মায়াভরা দৃষ্টি , বুক ভেদ করে যায় চোলে । এ-প্রান্ত থেকে ও- প্রান্ত ।এ বড় মধুর দহন , যেন স্বপ্নের দেশে স্ব...
মায়ের আঁচল- বিভূতি ভূষণ বিশ্বাস ...   আরে বাপরে ১০ টা বেজে গেছে,সর্বনাশ করেছে ১০ টা থেকেই তো ডিউটি । তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে পড়লাম । কি আর করবো সব কাজই তো আমাকে করতে হয় । যাবার সময় মা ...
হাঁটি হাটি পা পা – সৌম্য ভৌমিক... বাহ ডি.পি. টা তো বেশ চমৎকার. মেয়েটি বেশ ইয়ে তো! গোবরগণেশ হাটি। বয়স ৬০। একমাস হলো রিটায়ার করেছেন। যদিও ফেসবুকে নামটা সুমন চাটুজ্জে নামে সেট করে দিয়েছি...
অপরাধী – সৌভিক মল্লিক... একদিন তোমার চোখের দিকে চেয়ে কেঁপে উঠেছিল আমার হতভম্ব কন্ঠস্বর। ওই কাজলের গায়ে জন্মানো বেদনা চিঠিতে বলেছিলে, আমি তোমার রক্তে অমর। কত সন্ধ্যা ভা...
Admin navoratna

Author: Admin navoratna

Happy to write

Comments

Please Login to comment