রিইউনিয়ন

– প্রদীপ্ত দে

 কিছু কিছু ঘটনা সব মানুষের জীবনেই মনে হয় ঘটে যাতে তাঁর স্বাভাবিক ছন্দে চলা জীবনটার তাল কেটে যায় ।
আমি তখন কর্মসূত্রে মুর্শিদাবাদে থাকি এবং তখনও অবিবাহিত। দু- তিন মাসে একবার করে আমার বর্ধমানের বাড়িতে আসি আর বাকি সময় থাকি মেসে । সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটগুলো তখন সবেমাত্র হামাগুড়ি দিতে শুরু করেছে সমাজে । আমরা যারা বর্ধমানের বিদ্যামন্দির স্কুলের ১৯৯৪ সালের ব্যাচ, তাদের কয়েকজন বেশ উদ্যোগ নিয়ে সোশ্যাল নেটওয়ার্কে এবং ব্যাক্তিগতভাবেও যোগাযোগ করে একটা রিইউনিয়নের আয়োজন করে ফেলি । স্কুলের বন্ধুদের সঙ্গে দীর্ঘকাল কোনো যোগাযোগ না থাকায় এই রিইউনিয়নে উপস্থিত থাকাটা ভীষণভাবে প্রয়োজন মনে করলাম। দিনটাও সোমবার তাই আগে থেকেই ঠিক করে রাখলাম যে শনিবারই রওনা দিয়ে দেবো , দুদিনের ছুটি কাটিয়ে রিইউনিয়ন সেরে মঙ্গলবার অফিস জয়েন করবো ।

ঠিক বেরোনোর আগেই বস কতগুলো জরুরি ফাইল যদি না ধরাতেন তাহলে সব কিছুই ঠিক সময়ে হতো । বসের মন রাখতে গিয়ে জরুরী কাজ মিটিয়ে যখন বেরোলাম তখন বুঝতে বাকি রইলো না যে বাড়িতে রাতে আর পৌঁছাতে পারবো না । কিন্তু, সোমবার রিইউনিয়ন আর ছুটিও আগাম নিয়ে রেখেছি যেহেতু, চেপে বসলাম একটা বাসে । গন্তব্য প্রথমে নলহাটি স্টেশন তারপর ওখান থেকে যেকোনো ট্রেন ধরে বর্ধমান । নলহাটি যখন পৌঁছালাম তখন ঘড়ি বারোটার কাঁটা ছাড়িয়ে গেছে । দুটো বিস্কুটের প্যাকেট আর জল কিনে ওয়েটিং রুমে চলে গেলাম । বিস্কুট আর জল খেয়ে একটু হাত পা ছড়িয়ে বসতেই আলো- আঁধারি ঘরটাতে সারাদিনের ক্লান্তিতে একটু ঢুলুনি চলে এল । ঠিক কতক্ষণ হয়েছে জানি না, গায়ে হাল্কা টোকায় ঘুম ভাঙল । চোখের সামনে একজন বেশ দাড়ি-গোঁফওয়ালা লোক আমার মুখের সামনে তাঁর চিবুক ঝুলিয়ে জিজ্ঞেস করছে

“চিনতে পারছিস? “

আবছা আলোয়, খানিকটা ঘুমের ঘোরে আর কতকটা স্বভাবদোষে স্মৃতি হাতড়াতে লাগলাম। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই মনে পড়ে যায়
– আরে সৌরভ না ? কিরে কি অবস্থা করেছিস চেহারার? তোকে তো আর গোলু বলা যাবে না । তোর সেই নাদুসনুদুস চেহারা তো একেবারে চিপসে গেছে রে ! জমাট দাঁড়িও রেখেছিস দেখছি। বেশ লাগছে ! তারপর বল্, কাল জানিস তো আমাদের স্কুলের রিইউনিয়ন আছে ?

-হুম জানি তো । তুই কি ওখানেই যাবি না কি?

– হ্যাঁ । শালা বসটা শেষ মুহূর্তে এতো দেরী করে দিলো নাহলে এতোক্ষনে বর্ধমান পৌছে যেতাম । উত্তরবঙ্গটা ধরবো ।

-ঠিক আছে ,তাহলে দেরী আছে । আমিও যাবো তোর সাথে ।

নিজের ব্যাগ থেকে একটা ছোট্ট দাবার বোর্ড আর একটা ঘুটির বাক্স রেখে বিজ্ঞের মতো ভাব নিয়ে চটি ছেড়ে বাবু হয়ে বসে সৌরভ ।

সৌরভের সঙ্গে আমার বরাবরের রেষারেষি দাবার বোর্ডে। আমাদের স্কুল ছুটির পরে আমরা চলে যেতাম বাঁকা নদীর তীরে । সেখানে দুটো কিশোর মস্তিষ্ক একে অপরকে চরম প্রতিদ্বন্দ্বী ভেবে রোজ সন্ধে নামাতো । তারপর সূর্যের আলো আর প্রতিদ্বন্দ্বিতা একসাথে ফিকে হয়ে আসতো সেদিনের মতো ফেরার পথে চলতো একে অপরের চাল নিয়ে আলোচনা যার সঙ্গী থাকতো কখনো আইসক্রিম বা কখনো ঝালমুড়ি।

হঠাৎ সৌরভের দাবা খেলার প্রস্তাব আমাকে নিয়ে চলে যায় সেই লালচে আলোর বিকেলগুলোতে ।সৌরভ বরাবরই বিজ্ঞ। আমাদের ব্যাচের অঘোষিত নেতা ,ত্রাতাও বটে । মনে আছে একবার আমাদের সন্দীপ অঙ্কের খাতায় কম নাম্বার পেয়েছিল । সন্দীপ বাবার রামপিটুনির ভয়ে অঙ্কের খাতায় বাবার সই নকল করে ধরা পড়ে । সেবারে সন্দীপকে স্কুলের হেডস্যারের আর বাবার হাত থেকে বাঁচাতে সৌরভ নিজেই এসে সব দোষ নিজের ঘাড়ে নিয়ে নেয় । তাতে কয়েকদিন ওর স্কুলে আসা বন্ধ হলেও আমাদের চোখে ও হিরো হয়ে গেল ।

পুরো দাবার বোর্ড সাজিয়ে আমাকে বলল -” নে শুরু কর্ ।”

আমি অবাক হয়ে বললাম- তুই এখনো দাবার বোর্ড নিয়ে ঘুরিস, একটুও পাল্টাসনি ! শুধু চেহারাটাই যা হাড়গিলে হয়েছে ।

এরপর শুরু হয়ে গেল আমাদের সেই পুরনো মগজের কুস্তি । কিছুক্ষণ পরেই আমার মুখ থেকে হাসি আর “চেকমেট” শব্দটা একসাথে ছড়িয়ে পড়ে ফাঁকা ওয়েটিং রুমে। ঘড়ি দেখলাম, ট্রেন আসার সময় চলে এসেছে । উঠতে যাবো এমন সময় হাত ধরে টান সৌরভের-

“হেরে উঠে যাবো? মন খুঁতখুঁত করছে। চল্, আরেকটা দান ।”

গুটি সাজাতে লাগে সৌরভ, মুখে স্মিত হাসি ।
আমি বললাম ” তোর জিত এতো প্রিয় যে এখনো হার মানতে শিখলি না । সেই আগের মতোই রয়ে গেলি,না জিতে উঠবি না। ট্রেনটা ফালতু মিস্ করবো । তেমন হলে বলতিস একটু আলগা খেলে তোকে জিতিয়ে দিতাম।”

“পরেরটায় যাবি । আমিও তো যাবো । ওভাবে জিতে কোনো মজা নেই । “

কিছুক্ষণ পরেই উত্তরবঙ্গ এক্সপ্রেস প্ল্যাটফর্মে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে বেরিয়ে চলে গেল। খেলা তখন মাঝখানে ।

“আমার কিন্তু মনে হলো আগের খেলাটাতে তুই বেশ কয়েকটা চাল হাল্কা দিলি । তোর থেকে এতোটা কাঁচা খেলা তো আমি কোনোদিন দেখিনি । কি ধান্দা বলতো তোর?” মনে হঠাৎ একটা সন্দেহ দানা বাঁধল ।

“না রে । দাবা সঙ্গে নিয়েই শুধু ঘুরে বেড়াই, খেলতে পারিনা । প্র্যাক্টিসের অভাবে হাত কাঁচা হয়ে গেছে ।”

সময় যতটা যেতে লাগলো, পরের দানের বিভিন্ন চাল প্রমাণ দিতে লাগল ওর পুরনো উৎকর্ষের । মনে অনেক প্রশ্ন ভীড় করতে লাগল । পরের দানটা সৌরভই জিতল এবং প্রশান্তির হাসি হেসে জায়গা থেকে উঠে খুব তাড়াতাড়ি গোটা বোর্ডটা আর ঘুটিগুলো ব্যাগের মধ্যে চালনা করে বলল – কি রে চা খাবি তো ?

– “হ্যা কিন্তু, এই রাতে পাবি কোথায় ? ঘুটিগুলো আস্তে ঢোকা, বাক্সে এতো তাড়াতাড়ি ঢোকালে কিছু না কিছু পড়ে যাবে।”

ওর দাবার বোর্ড আর ঘুটি গোছানোর ব্যস্ততাটা অদ্ভুত ভাবে চোখে লাগল ।

-” ও ছাড়্ । পড়ে গেলে যাবে । কত কিছুই তো পড়ে রইল, কিছুই তো নিতে পারলাম না।”
এক ঝটকায় কথাটা বলে ও বেড়িয়ে গেল ।

শেষের কথাটার রেশ রয়ে গেল কানে। ওভাবেই খানিকক্ষণ বসে রইলাম ওর চা আনার অপেক্ষায়। মনে মনে ভাবছি সৌরভ এলে এবারে ওর এখনকার হালচাল নিয়ে জানা যাবে ।
এমন সময় বাইরে হাল্কা শোরগোলের আওয়াজ পেয়ে বেরিয়ে আসি এবং তারপর যেটা শুনি সেটা শুনে নিজের কানকেও বিশ্বাস করতে পাচ্ছি না । উত্তরবঙ্গ এক্সপ্রেস খুব ভয়াবহ দুর্ঘটনার মুখে পড়েছে এবং অনেকেই বেশ গুরুতর আহত হয়েছে ।
আমি ওয়েটিং রুম থেকে নিজের ব্যাগ নিয়ে সৌরভের খোঁজে আশেপাশে ছুটলাম আর কিছুক্ষণের মধ্যেই বুঝলাম যে ও নেই । কোত্থাও নেই ।

ভোরের আলো ফুটতেই ওখান থেকে বাসে করে বর্ধমান পৌঁছালাম । অতো বড় বিপর্যয়ের পর কেউ ট্রেন লাইনের ত্রিসীমানায় যাচ্ছে না। সবার মুখে মুখে ঘুরছে ভোগান্তি আর হয়রানির কথা । বাড়িতে পৌঁছানোর পরেও ভেবে যাচ্ছি সৌরভের কথা । গেল কোথায় ছেলেটা! স্কুলের রিইউনিয়নে আসতে পারবে তো ?

একটা দিন বাড়িতে উৎকন্ঠায় কাটিয়ে পরের দিন সকালেই রওনা দিলাম স্কুলের দিকে । সময় দেওয়া হয়েছিল সকাল ১০টা। সেদিন ছিল আমাদের স্কুলের প্রতিষ্ঠা দিবস । প্রতিষ্ঠা দিবসে সমস্ত ছাত্রদের ছুটি থাকে বলে এই দিনটা রিইউনিয়নের জন্য নির্বাচন করা হয়েছে । স্কুলের নিচের হলে সবার বসার ব্যবস্থা হয়েছে । ওপরের ধাপিটায় যেখানে সরস্বতী পুজো হতো, এখনো বোধকরি হয়, সেখানে চেয়ারে বসে আছে নতুন হেডমাস্টার আর আমাদের সময়ের কিছু স্যার । অনেক পুরনো বন্ধুদের একসাথে দেখতে পেয়ে সত্যিই খুব ভালো লাগছিল আর কৌতূহলী চোখ খোঁজ করছিল সৌরভের । গেল কোথায় সৌরভ !!

তখনও সমানে হলে ঢুকে চলেছে প্রাক্তন ছাত্ররা । তাদের কাউকে চেনা লাগছে, কাউকে লাগছে না ।
আমাদের স্কুলের আর পাড়ার বন্ধু দেবাশীষ মঞ্চে উঠে বলতে শুরু করল । শুনেছিলাম তখন ও পুরোদস্তুর রাজনীতি করে তাই হয়তো মাইকে সাবলীল । চেহারার চাকচিক্য দেখে বোঝাই যাচ্ছে যে মিটিং,মিছিলে আর আগের মতো গা ঘামাতে হয় না তাঁকে।
“আমরা আজ সবাই এখানে একসাথে সমবেত হয়েছি দেখে সত্যিই ভীষণ আনন্দিত । তবে ,আনন্দ আর দুঃখ যেহেতু জীবনের সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত তাইটা কিছু দুঃখের স্মৃতিচারণা দিয়ে শুরু করি ।
প্রথমেই জানাই আমাদের ক্লাসের মেধাবী ছাত্র, শ্রী তরুণ দাশগুপ্ত মাত্র কয়েক মাস আগে দুরারোগ্য ক্যান্সারে জর্জরিত হয়ে আমাদের ছেড়ে চলে গেছে । “

তরুণ ছিল আমাদের সেকশনের চিরকালীন ফার্স্ট বয় । জানতামই না যে ও মারা গেছে । মনটা খারাপ হয়ে গেল । পেছনে একটা ছবি রাখা ছিল কিন্তু সেটা দেখে তরুণকে চিনতেও পারিনি ।

“এর পরে যার নাম করবো সে আমাদের ব্যাচের সব সেকশনের কাছেই জনপ্রিয় ছিল । সৌরভ, সৌরভ মজুমদার । যাকে আমরা তাঁর চেহারার জন্য একটা আদরের নাম দিয়েছিলাম ,গোলু । আমাদের গোলু, কয়েক বছর আগে ট্রেনের একটা ভয়াবহ্ দুর্ঘটনায় মারা যায় । আমাদের সবার তরফ থেকে এই দুজনের পরিবারের প্রতি সমবেদনা রইলো । আসুন এই দুজনের স্মৃতির উদ্দেশ্যে আমরা দু-মিনিট নীরবতা পালন করি ।”

শেষের কথাগুলো আর শুনতে পারলাম না। বুকের হৃদস্পন্দন হঠাৎ বেড়ে গেল এবং অসম্ভব রকমের পেট গুলোতে থাকলো । নতুন হেডমাস্টার যেখানে বসেছেন তার পেছনেই রাখা ছিল সৌরভের মালা দেওয়া ছবি । হেডমাস্টার নীরবতা পালন করার জন্য উঠে দাঁড়াতেই বুকের মধ্যে ছ্যাৎ করে উঠল । ফুলের মালার ওপরে ওর চোখ দুটো যেন জ্বলজ্বল করছিল।

সৌরভ পরশু রাতে আমাকে দেখা দিয়েছিল !! এ কি করে সম্ভব! মনে মনে ভাবছি কোথাও কোনো ভুল হলো না তো ? হয়তো ঘুম চলে এসেছিল তার মধ্যে স্বপ্ন দেখেছি ! হতে পারে ? তাহলে তো দুটো দান দাবা খেলা স্বপ্ন ! অসম্ভব !!
বিশ্বাস অবিশ্বাস একে অপরের সাথে কাবাডি খেলে যাচ্ছে মাথার ভেতরে ।
পরবর্তী সময়ে আমাদের উদ্দেশ্যে নতুন হেডমাস্টার প্রাক্তন ছাত্রদের আহ্বান জানান যাতে আমরাও স্কুলের উন্নয়নের লক্ষ্যে কিছু করি । আমাদের মধ্যে কয়েকজন কিছু বক্তব্য রাখল । আমি গোটা অনুষ্ঠানে কিছু আর বলতে পারলাম না । বুঝতে পারছি না এটা কল্পনায় ঘটছে না বাস্তবে । যদি বাস্তবে ঘটে তাহলে পরশু নলহাটি স্টেশনের ওয়েটিং রুমে আমার সাথে কে ছিল !!
ভাবতেই গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল । ও মারা গিয়েছে ট্রেনে ঘটে যাওয়া কোনো এক দুর্ঘটনায় ,তাই কি দুর্ঘটনার আগাম সতর্কবার্তা ও আমাকে দিতে এসেছিল অপার্থিব কোন জগত থেকে ।
ইহজগতের ওপারে থেকেও নিজের বন্ধুকে বাঁচানোর জন্য দাবা খেলার আশ্রয় নিয়েছিল ?
কোনো বন্ধুকে সাহস করে কথাটা বলতেও পারলাম না। কাউকে না । অদ্ভুত !
বাড়িতে এসেও সেই এক অস্বস্তি । কিছুক্ষণ কাটিয়ে মাকে বললাম চলে যেতে হবে । বাবা, মা দুজনেই অবাক । আমি বলেছিলাম যে রাতে থেকে ভোর ভোর বেড়িয়ে অফিস জয়েন করবো । বিভিন্ন কাজের অজুহাতে সন্ধ্যেবেলা অল্প মুখে দিয়ে চলে এলাম স্টেশনে ।

কিছুক্ষণের মধ্যেই একটা ট্রেন পেলাম আর ট্রেনে উঠে একটা সিটও পেয়ে গেলাম । চারপাশের লোকজনকে দেখছি, আবার যদি সেরকম কেউ ?…. নাহ্, এসব ভাবতে ভাবতে পাগল হয়ে যাবো না তো !

ট্রেন ঢুকছে নলহাটি স্টেশনে । বুকের হৃদস্পন্দন কিছুক্ষণের জন্য মনে হোল বন্ধ হয়ে গেল । দম বন্ধ পরিস্থিতি ! হঠাৎ তড়িৎগতিতে একটা চিন্তা খেলে গেল মাথায় । সেদিনের তাড়াহুড়োতে একটা বোড়ে মনে হলো সৌরভের তাড়াতাড়িতে নীচে পড়ে গেছিল । আমাদের সিটের ঠিক পেছনে । সেটা কি ঠিক দেখেছি? একবার দেখবো ওখানে কিছু আছে কিনা?
বিবেক- বুদ্ধি যতোবার বলার চেষ্টা করছে, যা হয়েছে সব ভুলে যা, ততোবার বাঁধভাঙা কৌতূহল তাকে চাপা দিয়ে দিচ্ছে ।

দোনোমনায় নেমেই পড়লাম ট্রেন থেকে । সামনে কয়েকটা পা হাঁটলেই ওয়েটিং রুম । পা ক্রমশ ভারী হয়ে যাচ্ছে । চারপাশে তাকাচ্ছি কেউ কিছু বুঝতে পারছে কিনা । ওয়েটিং রুমে ঢুকে দেখি একপাশে একটা পরিবার বসে কিছু খাচ্ছে । এতো দূর যখন এসেছি, শেষ দেখেই ছাড়বো । সোজা চলে গেলাম সেই বেঞ্চের পেছনে যেখানে আমরা বা আমি জানি না, বসে ছিলাম । না, কিছু নেই । স্বস্তি না অস্বস্তির জানি না তবে হাল্কা একটা নিশ্বাস পড়লো ।

“কিছু ফেলে গেছেন কি? স্টেশন মাস্টারের কাছে গিয়ে বলতে পারেন ।” ওয়েটিং রুমে বসা পরিবারের গৃহকর্তার পরামর্শ শোনার ভান করে আমি পেছনের দিকে তাকাতে তাকাতেই বললাম “না, তেমন কিছু না । এই আর কি ….” বলতে বলতে দরজার দিকে মুখ করে বেরিয়ে যাবো এমন সময় থমকে দাঁড়ালাম । ঘাড় ঘুরিয়ে বেঞ্চের সামনের পায়ার পেছনে ওটা কি উঁকি মারল ? তাড়াতাড়ি গিয়ে নীচু হয়ে নিতেই দেখলাম কালকের সেই তাড়াহুড়োতে ফেলে যাওয়া কালো রঙের বোড়ে , নিয়ে বেড়িয়ে গেলাম ওখান থেকে । তাহলে সত্যিটা কি ? সৌরভ মরেনি ? তাও তো স্পষ্ট হলো না !
চাপা অস্বস্তি নিয়েই আবার ট্রেনে উঠলাম । মুর্শিদাবাদে পৌছে সোজা মেসে চলে গিয়ে শুয়ে পড়লাম । ঘটনাটা পরিস্কার হলো পরের দিন সকালের খবরের কাগজ থেকে । যার একটা অংশে লেখা ছিল,

“ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটানোর পেছনে সন্দেহ করা হচ্ছে যে নাশকতার হাত রয়েছে এবং বেশ কয়েকজন সন্দেহভাজনকেও চিহ্নিত করা হয়েছে।
দলের মূল পান্ডা হিসাবে যাকে সন্দেহ করা হচ্ছে সে বেশ কয়েক বছর আগে ট্রেনে হয়ে যাওয়া এক অগ্নিকাণ্ডে অন্য এক মৃতদেহকে নিজের পরিচয় দিয়ে মৃত প্রমান করে আত্মগোপন করে দলের কাজ- কারবার চালিয়ে যাচ্ছে। দলে তাঁর নাম গোলাই সর্দার । “

আমাদের দেওয়া নামেরই একটা রূপে ও এখন পরিচিত । মনের ভেতর দু-তিনদিন ধরে রাখা একটা ভারি পাথর যেন সরলো । তবে আমার তরফ থেকে সাহস করে কাউকে কিছু বলতেও পারলাম না।

~ সমাপ্ত ~


FavoriteLoading Add to library
Up next
আম বাগানে কে? – শ্রাবণী সরকার... আমার মামারবাড়ি ওদলাবাড়ি। ডুয়ার্সের এক ছোট্ট চা বাগান ঘেরা মফস্বল টাউন। এখনও ভারী শান্ত। আমার মায়ের ছোটবেলায় সেটি ছিল আরো জনবিরল চুপচাপ একটি গ্রাম। মায়...
স্মার্টফোনের দুনিয়া কাঁপাতে আসছে Xiaomi A2... - অভিষেক চৌধুরী   বহু প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে মোবাইল দুনিয়ায় বিপ্লব ঘটাতে আসতে চলেছে xiaomi A2। ভারতের বাজারে Xiaomi- র জনপ্রিয়তা নিয়ে নতুন কর...
সেদিনের রাতটুকু - মুক্তধারা মুখার্জী   খাটে শুয়ে সেই কখন থেকে এপাশ ওপাশ করছে মিতিন। কিছুতেই ঘুম আসছে না। ওদিকে দেওয়াল ঘড়ির টিকটিক শব্দটা যেন কানে তালা ধরিয়ে ...
দাতা – অরূপ ওঝা কাল তো সে এসেছিল, নিয়ম করেই আসে রোজ। যখন দীপন অফিসে কাজের ফাঁকে দুপুর দেড়টার সময় টিফিন করতে বসে, ঠিক তখনই সে হানা দেয় “জয় মাতাজী, জয় মাতাজী” স্লোগান দ...
অভিমান- শ্বেতা আইচ   আজ একটু তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরল অভীক। তাড়াতাড়ি মানে রাত ১০টা আর কি। শ্রীময়ী কে সারপ্রাইজ দেবে। অনেকদিন পর…… বছর খানেক হতে চলল অভীক আর শ্রীময...
ব্যর্থ স্বাধীনতা – সৌমিক মান্না... বেলাশেষে রবি বিদায় নিল দূর দিগন্ত হতে। আকাশটাও ক্ষত -বিক্ষত অচেনা রক্তপাতে॥ আহত আকাশ বার্তা দিল ,ভারত হয়েছে পরাধীন। রক্তাক্ত মাতৃভূমি তখন ব্রিটিশ শ...
দুঃখ দিতে চেয়েছো – বৈশাখী চক্কোত্তি... "তুমি অনেক যত্ন করে আমায় দুঃখ দিতে চেয়েছো", আমার মনোভূমিতে একটি একটি, কাঁটা তারের বেড়া পুঁতেছো ।। যন্ত্রনায় ছটফট করেছি আমি, স্বপ্নের ডানা দুমড়ে মুচড়...
ফাঁস - সিদ্ধার্থ নীল   জুতো জোড়ার ডানপায়েরটি ডান ও বাঁপায়েরটি বাঁয়ে ক্ষয়ে এসে একটু হেলে থাকছে। বহুদিনের অত্যাচার, রোদ বৃষ্টি সয়ে সয়ে আজ এই অবস্থা।...
এবং পার্থ – শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়... (গতবছর প্রয়াত অভিনেতা পার্থ মুখোপাধ্যায়ের জন্মদিনে বিশেষ শ্রদ্ধার্ঘ্য। যিনি ছিলেন উত্তম-সুচিত্রা ও স্বর্ণযুগের ছবিতে নূতন যৌবনেরই দূত। ) স্বর্গের অমর...
মৃতের তালিকায় প্রেমিকা খুঁজি – তুষার চক্রবর্...  অলকাকে আমি প্রথম দেখি, কলেজ থেকে ফেরার পথে বাস স্ট্যান্ডে। তখন অবশ্য ওর নাম জানতাম না। হাত ঘড়িতে দেখলাম, বাস আসতে তখনও মিনিট দশেক বাকি আছে। পাশের গুম...
ADMIN

Author: ADMIN

Comments

Please Login to comment