নিয়মিত জীবন-যাপন

– সমর্পণ মজুমদার

 

জীবনে অনেক কিছুই করতে ইচ্ছে হয় আমাদের। যা দেখেই আমরা অনুপ্রাণিত হই, সেটাই করতে ইচ্ছে করে। সেটা যে কোনো নির্দিষ্ট একটা বিষয়, তা কিন্তু নয়। বিভিন্ন স্থানে, বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন মানুষের কাজকর্ম আমাদের ভাবায়, “ইশশ, আমিও যদি…”! কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তা হয়ে তো ওঠেই না, বরং বিভিন্ন দিকে মন দেবার ফলে সমস্ত কিছুর সঙ্গে নিজের অতি প্রয়োজনীয় জরুরি নিত‍্যনৈমিত‍্যিক কাজকর্ম জড়িয়ে পেঁচিয়ে জবড়জং হয়ে যায়। তখন একটা কথাই বারবার মনে আসে আর বারবার শোনা যায়, “দু নৌকায় পা দিয়ে চলা যায় না” ! কিন্তু মুশকিলটা হলো, আমরা কি সত্যিই চলার চেষ্টা করেছিলাম ?

                অনেককিছু করাই যায় একসঙ্গে। তবে তার জন্য জীবনে যেটা দরকার, সেটা হলো নিয়ম। নিয়ম জিনিসটা আসলে হলো গোছানো ঘরের মতো। একটা ঘরে অনেককিছু জিনিসপত্র থাকে, কিন্তু প্রত‍্যেকটা জিনিস রাখা হয় সুবিধামতো উপযুক্ত জায়গা বেছে নিয়ে। ঠিক তেমনই জীবনের বিভিন্ন কাজের জন্য দৈনন্দিন বা সাপ্তাহিক শিডিউলে নির্দিষ্ট সময় সুবিধামতো রেখে দিলে সবদিকেই নজর দেওয়া সম্ভব হবে। এবার, ঘরের সব জিনিসের নির্দিষ্ট জায়গা তো বেছে ফেললাম, কিন্তু দেখতে হবে জিনিসগুলো সেই স্থানেই রাখছি কিনা। অর্থাৎ এটা হল নিয়মের পালন। যখন যা কর্তব্য, তখন সেটা ছাড়া অন্য যে কোন কিছুই ‘অকাজ’ বলে মনে করতে হবে। পড়াশোনার জন্য নির্ধারিত সময়ে যোগব্যায়াম করাও ‘অকাজ’ বলে ধরতে হবে। আবার, ছবি আঁকার সময় পড়াশোনাও তাই‌‌। একটা নির্দিষ্ট সময়ে, প্রত্যেকদিন নির্দিষ্ট কাজকে, বরাবর অভ্যাস করতে থাকলে কাজটা উৎকৃষ্ট হয়। সাধারণত যারা একা থাকেন, যেমন কর্মসূত্রে বা পড়াশোনার জন্য মেসে বা হোস্টেলে থাকেন, তাঁরা নিজের কাজ নিজে করেন। আর তাঁদের ক্ষেত্রে দেখা যায় মারাত্মক অনিয়ম হয়। তাঁদের শুধু জোর করে অভ্যাস করতে হবে নিয়মের অনুশীলন। তখন সব কাজে সাফল্য আসতে পারে। আমি নিজে মেসবাসী হয়ে এটার উপলব্ধি করেছি।

              অনেককেই বলতে শুনেছি, নিয়মিত জীবন নাকি বড্ডো একঘেঁয়ে। আমার কাছে তো নিয়ম পালন করা একটা দারুন আনন্দদায়ক জিনিস। যে মানুষ নিয়মের মধ্যে থাকে, অর্থাৎ যার গতিবিধি ছন্দোবদ্ধ হয়, সে প্রত্যেকটা কাজে চরম আনন্দ লাভ করে। প্রত্যেকটা কাজ বেশ দৃঢ় হয়। একঘেঁয়েমি কাটানোর জন্য যার যা যা করতে ইচ্ছে হয়, তার সেইগুলোকেও নিজের নিয়মের মধ্যেই রাখা উচিত। আমি যেমন নিয়ম করে বিকেলে ঘুরতে বের হই। বেশিরভাগ দিনই রাত্রে নিয়মিত আড্ডা মারি মেসের বন্ধুদের সঙ্গে। হ্যাঁ নিয়মের পালন একঘেয়েমি হয় বৈকি ! সেটা তখনই হয়, যখন জোর করে কারোর উপর নিয়ম চাপিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু নিজের জীবন যাপনের নিয়ম তো সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত।

                 আমার কথা বললে, আমি নিজের দৈনন্দিন নিয়মটা প্রধানতঃ চারটে স্তম্ভ দিয়ে ধরে রেখেছি। প্রথমত, ঘুম থেকে ওঠার সময়টা নির্দিষ্ট। আমি সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠেই নিয়মিত ছাদে যাই আর যোগাসন করি। সকালের সূর্যালোক গায়ে লাগালে, ‘ডোপামিন’ নামক এটা হরমোন ক্ষরিত হয় দেহে, যাকে বলা হয় ‘ফিল গুড হরমোন’ ! যা আপনাকে সারাদিন তরতাজা রাখবে। দ্বিতীয়ত, স্নান ও খাওয়া দাওয়ার সময়টা আমার নির্দিষ্ট। সাড়ে নটা থেকে সাড়ে দশটা, কি বড়জোর এগারোটার মধ্যে আমি স্নান খাওয়া-দাওয়া করে পরবর্তী কাজের জন্য তৈরি হয়ে যাই। তৃতীয়ত, বিকেলে ঘুরতে বেরনো। দারুন ভালো লাগে এটা। নিজের প্রতি ভালোবাসার জন্মে যায় বিকেলবেলায় হাঁটলে। চতুর্থত, রাত্রে নির্দিষ্ট সময় ঘুমানো। আমি দেখেছি, এই চারটে ব্যাপার ঠিক রাখলেই দিনের বাকি সমস্ত কাজ সম্ভাব্য চরমে পৌঁছতে পারে !

                 Denzel Washington এর একটা বক্তৃতায় শুনেছিলাম, উনি বলেছেন অনেকগুলো লক্ষ্য (goals) নির্দিষ্ট করে এগোতে। Early goals, monthly goals, weekly goals, daily goals; আমি বলি, hourly goals টাও দারুন একটা জিনিস !


ADMIN

Author: ADMIN

Comments

Please Login to comment