লাভ স্টোরি – শ্বেতা আইচ

‘ও দাদা একটু গাড্ডা গুলো বাঁচিয়ে চলুন না, কখন থেকে তো বলছি। কানে যায় না?’
‘চুপ কর না প্লিজ টুকি, পাশে সবাই তাকাচ্ছে তো।’
‘তুই তো মোটে কথা বলবি না, কতবার বলেছিলাম গাড়ি টা নিয়ে আসি, বাট তুই আর তোর এই অটোরিকশা অ্যাডভেঞ্চার! উফফ।’
‘আমি তোকে সবরকম ভাবে চলতে শেখাতে চাই রে, খুব দরকার এগুলো জীবনে।’
‘সেটা আজই করতে হল? ধুর।’
একটু সরে বসতে চায় টুকি।কিন্তু অটো তে আর জায়গা নেই, অগত্যা। আবার একটা গাড্ডায়, এবার সোজা কৃষের কোলের মধ্যে চলে আসে টুকি। চেপে ধরে কৃষ।
 
কৃষানু আর টুকি, ভালো নাম সুদেষ্ণা। প্রথম আলাপ হস্পিটালে, তাও দুজনের জন্মের সময়। দুজনের দাদু ছিল একে অপরের বেস্ট ফ্রেন্ড। এক মন্ডপে বিয়ে থেকে শুরু করে একই দিনে নাতি নাতনীর জন্ম, এমনই মজবুত ছিল সম্পর্ক। তাদের নাতি নাতনী যে তাদের মুখ উজ্জ্বল করবে না সেটা কি হয়? তেমনটাই হল কৃষানু আর টুকির সাথে। ছোট্ট বেলা থেকে একসাথে মানুষ হওয়া। সারাক্ষণ খুনসুটি আর ঝগড়া লেগেই থাকত দুজনের। একে অপরকে নিয়ে নালিশের শেষ থাকত না, আবার একটা দিনও দুজন দুজনকে না দেখে থাকতে পারত না। লুকিয়ে লুকিয়ে খাবার চুরি করে খেতে গিয়ে কতবার যে ধরা পড়েছে তার ইয়াত্তা নেই, কিন্তু প্রতিবারই টুকি কে আড়াল করে রাখত কৃষানু। নিজে সব দোষ মাথা পেতে নিয়ে নিত, আর টুকি শুধু মিচকি মিচকি হাসত।
 
ছেলেবেলা কেটে গেছে, কিন্তু ছেলেবেলার দিনগুলো দুজনের জীবন থেকে এখনো ফুরায়নি। স্কুল কলেজ সবই একসাথে কেটেছে দুজনের। এমনকি সাবজেক্ট ও একই ছিল, ইঞ্জিনিয়ারিং। আত্মীয় স্বজনরা কতবার না বলেছে, ‘ বিয়ে দিয়ে দাও দুজনের এবার! ‘ শুনে খুব রাগ হত টুকির, বলত ‘ এই শোন, যে যা বলছে বলুক, আমরা কিন্তু এভাবেই থেকে যাব হোল লাইফ, ওকে? ‘ কৃষানু ঘাড় নাড়ত বটে কিন্তু মনে মনে সবার কথা গুলো বেশ পছন্দ ও করত। আসলে ও কোন দিন টুকির কোন কথায় না করতে পারেনি। টুকি কে না বলার ইচ্ছে টাও হয়নি কখনো। কৃষানুর অজান্তেই ভালোবাসা টা গড়ে উঠেছিল।
 
‘ তোর কেসটা কি বলত? অটো জার্নির পর কি এবার হাঁটিয়ে মারবি?’, শাড়ির কুচি ধরে মাঝপথে দাঁড়িয়ে পড়ল টুকি।
‘ আহা চল না, এইতো এসে গেছি প্রায়।’ , একটু দম নিয়ে বলল কৃষানু।
‘ সকাল থেকে শুনছি এইতো এসে গেছি, বিকেল হয়ে গেল তাও তোর ডেস্টিনেশন এল না।’ , আর ধৈর্য রাখতে পারছে না টুকি।
‘ হবু বরের কথা একটু শুনতে হয় সোনা’ , গাল টা আলতো করে টিপে দেয় কৃষানু।
‘বর?????? ইস্ কি টিপিক্যাল সব ডাক’।
‘ সে তুই যা বলিস, এসব ডাকের আলাদা একটা ইয়ে আছে। এই তোর মনে আছে আমাদের প্রথম প্রোপোজাল টা?’
‘ বাবা! তোর ঐ কান্না ভোলা যায়?’ , হেসে ফেলে টুকি।
কদিন ধরে টুকির ফোন টা খুব বিজি পাচ্ছে কৃষানু। কফি সপের ঝগড়ার পর থেকে মেয়ে টা একটা কল অবধি করল না। বাড়িতে গেলেও দেখা নেই। কমন ফ্রেন্ডরা ও কিছু বলতে পারছে না, কলেজে ও আসছে না। কি করবে কিছুই বুঝতে পারছে না কৃষানু। এরকম তো আগে কখনো করেনি টুকি। না! এর একটা হেস্তনেস্ত করা দরকার,  একটা সপ্তাহ কেটে গেছে। রবিবার সন্ধ্যা, কৃষানু সোজা হাজির হল টুকির বাড়ি। কাকু কাকিমা বাড়ি ছিল না, বেল বাজাতেই টুকি এসে হাজির।
‘ ব্যাপারটা কি তোর?’
‘মানে? বুঝলাম না।’, কিছুটা অবাক হয়ে বলল টুকি।
‘ কতবার কল করেছি তোকে দেখেছিস? ফোন টা কোথায় ছিল তোর? তুই নিজেই বা ছিলিস কোথায়? তোর বাড়ি অবধি এসেছি কতবার সে খবর রাখিস?’, এক নিঃশ্বাসে বলে গেল কৃষানু।
‘বেশ করেছি ফোন ধরিনি, বেশ করেছি বাড়ি ছিলাম না।’ , চোখ টা ছলছল করে উঠলো টুকির।
কাঁধের উপর হাত রাখল কৃষানু। নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল টুকি, কিন্তু পারল না। ডুকরে কেঁদে উঠলো টুকি। এই প্রথম ওর চোখে জল দেখল কৃষানু। মেয়েটাকে খুব কষ্ট দিয়েছে সেদিন। কি আর এমন করেছিল ও, একটা ফ্রেন্ডের প্যাচ আপ করাতে গিয়ে আটকে পড়েছিল সেখানে। যদিও কৃষানু ওকে অনেক বার বারণ করে এসব বিষয়ে না জড়াতে। তাই তো সেদিন খুব রাগ হয়ে গেছিল বলে সবার সামনে টুকি কে বেশ জোরেই ধমকটা দিয়ে ফেলেছিল।
‘তুই আমাকে একটুও বোঝার চেষ্টা করিস না রে।’, কৃষানুর বুকের মধ্যে মুখ গুঁজে রেখেছে টুকি।
‘এভাবে বলিস না রে, তোর জন্য সবসময় চিন্তা হয় আমার। সেটা কি তুই বুঝিস না?’, অঝোর ধারায় কেঁদে উঠলো কৃষানু।
‘এই তুই কেন কাঁদছিস পাগল? চোখ মোছ আগে বলছি।’, ধমকে দেয় টুকি। 
‘তুই সত্যি বুঝলি না আমি কি চাই?’, একভাবে কেঁদে চলেছে কৃষানু।
‘ জানিস তো আমি বুঝি কম, বুঝিয়ে দে।’ জড়িয়ে ধরে কৃষানুকে।
আর কিছু বলতে পারেনি দুজনে। কারণ ঠোঁট দুটো একে অপরকে আলিঙ্গন করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল।
 
‘আগে বলতে পারিসনি যে আজ আমাদের প্রি-ওয়েডিং হবে, ইডিয়ট।’ কৃষানুকে বেশ জোরেই চিমটি কেটে দেয় টুকি,’ কিন্তু ঐ বয়স্ক মানুষ দুজন কারা রে?’
দুজনে এখন দাঁড়িয়ে আছে গঙ্গার তীরে।
‘আজ ওনাদের পোস্ট ওয়েডিং সুট হচ্ছে, আমরা দেখতে এসেছি।’ একদৃষ্টে কাপলটির দিকে তাকিয়ে বলল কৃষানু।
‘ মানে? এর জন্য এতদূর টেনে আনলি আমাকে?’, রাগ টা বাড়ছে আরো টুকির।
‘আমরা ও একদিন এভাবে এরকম বয়সে এসে পোস্ট ওয়েডিং করব দেখিস।’ একটা বিশ্বাস নিয়ে কথাটা বলল কৃষানু।
‘সত্যি?’
‘হুমম, যদি তুই ঠিক এইভাবে আমার পাশে থাকিস তো।’ টুকির হাত টা নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে নিল কৃষানু।
‘আই অ্যাম সরি রে, তোকে আমি বড্ড কষ্ট দিয়ে ফেলি তাই না?’, টুকির চোখে এক অদ্ভুত আবেগ দেখে কৃষানু।
‘ধুর পাগলী, ওটাই তো তোর ভালোবাসা। আমি কি বুঝি না নাকি? আমি চাই আমরা যতদিন বাঁচবো একসাথে বাঁচবো। ঠিক ঐ কাপল-এর মতো। এইজন্য তো তোকে আজ এখানে নিয়ে আসা, দেখানোর জন্য যে আমি ঠিক কতটা ভালোবাসতে চাই তোকে।’
 
একলাফে কৃষানুর বুকের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ল টুকি, ক্যামেরা ম্যানের ফ্ল্যাসের শব্দ টা এবার ওদের বেশ কাছ থেকেই এল বলে মনে হল।
____


ADMIN

Author: ADMIN

Comments

Please Login to comment