ল্যাম্প – অর্পণ সামন্ত

-আরেহ্,ডাক্তারবাবু যে!
পিছনে ফিরে তাকালেন ডক্টর মহেন্দ্রলাল সরকার।সন্ধ্যার সামান্য অন্ধকার কিন্তু এই গলিটাতে নিকষ কালো অন্ধকার।বয়েস বাড়ছে,চোখের তীব্রতাও কমছে।অন্ধকার ভেদ করে কণ্ঠস্বরের উৎসের খোঁজ করলেন।পারলেন না।
-কে!
কণ্ঠস্বর ঠাওর করতে না পেরে চেঁচিয়ে উঠেছিলেন।সঙ্গে সঙ্গেই উত্তর এলো-
-আজ্ঞে বিমল।
হঠাৎই অন্ধকার ফুঁড়ে ডাক্তারের সামনে এসে দাঁড়ালো বছর চব্বিশের যুবক বিমল।শীর্ণ চেহারা।ডাক্তার উদ্বিগ্ন মুখে জিজ্ঞেস করলেন,কি রে?হঠাৎ করে এ-গলিটা এত থমথমে হয়ে গেছে রে!
অন্ধকার হলেও ডাক্তার খেয়াল করলেন বিমল অল্প হাসলো।বললো ডাক্তারবাবু,আর কতদিনের অপেক্ষা।তারপরেই শ্মশান হয়ে যাবে সব।
ডাক্তার দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন।প্লেগ ভয়ঙ্কর মহামারীর রূপ নিয়েছে।প্রতিদিনই একজন-না-একজনের শ্মশানযাত্রা হচ্ছেই।এলাকার মানুষগুলো পালাচ্ছে প্রাণের ভয়ে।বিমলের কথা ঠিক।এমনটা চলতে থাকলে শ্মশান হতে দেরি নেই।
বিমল জিজ্ঞেস করলো,কোত্থেকে ফিরছেন ডাক্তারবাবু?
– হাসপাতাল থেকে রে।এগারোজনকে আজ যমে টানলো।সংখ্যা বাড়ছে ক্রমশ।এদিকের খবর কি রে?
-জানোতো,একজন ভালো মেম এসেছিলেন।
-মেম!
-হ্যাঁ গো।নাম মার্গারেট নোবেল।
মার্গারেট নোবেল!মিস মার্গারেটের মহানুভবতার কথা শুনেছেনও বটে লোকের মুখে মুখে।এই তো সেদিনই আলবার্ট হলে একটা স্পিচ দিলেন উনি।হিন্দু ধর্মের মাহাত্ম‍্য ও মা কালীকে নিয়ে বেশ সুন্দর বক্তৃতা দিয়েছিলেন উনি।মহেন্দ্রলাল সরকার অবাক হয়ে শুনেছিলেন মিস মার্গারেটের সে-সব কথাগুলো। পাদ্রী,মিশনারি ও ব্রাম্হ নেতারা লাগাতার প্রচার করে সকলের মনে এটা প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন যে মূর্তিপূজা, বিশেষত কালীপূজা নাকি মূর্খ হিন্দুদের অশালীন উল্লাস।কিন্তু মার্গারেট বিবেকানন্দের শিষ্যা।ওইসব পাদ্রী,মিশনারিদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন তাঁর বক্তৃতায়।কালীকে অসম্মান করা যে দেশীয় সংস্কৃতির সন্মন্ধে একরকম হীনমন্যতা।সেদিন সত্যিই অবাক হয়েছিলেন মহেন্দ্রলাল সরকার।একজন বিদেশিনীর কাছে এতটা আশা করেননি তিনি সত্যিই।কিন্তু মুহূর্তের মধ্যে প্রাথমিক মুগ্ধতা কেটে গেছিলো তার।বক্তৃতা শেষে মার্গারেট কে বলেছিলেন,কি করছেন এসব!এ দেশ কু-সংস্কারছন্ন।এ দেশকে কু-সংস্কারের বেড়াজাল থেকে বার করবার দায়িত্ব আমাদেরই।কিন্তু আপনারা বিদেশিরা আবার এই কু-সংস্কার নিয়ে উঠেপড়ে লেগেছেন!
গন্ডগোল বেঁধে গেছিলো।ব্যাপারটা নিয়ে পত্রপত্রিকায় লেখাও চলেছিল বেশ ক-দিন।কিন্তু তারপর থেকে যত শুনছেন মিস মার্গারেটের সন্মন্ধে,ততই আশ্চর্য হচ্ছেন।
প্লেগের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন মিস মার্গারেট।বিভিন্ন স্তরে কাজ শুরু করেছেন তিনি।সংবাদ পত্রে জনসাধারণের কাছে আবেদন জানাচ্ছেন।বিভিন্ন সভা-সমিতি,থিয়েটারে একটার পর একটা প্লেগ বিষয়ক বক্তৃতা দিয়ে চলেছেন।পাড়ায় পাড়ায় গিয়ে প্লেগ প্রতিরোধ সম্বন্ধীয় হ্যান্ডবিল বিলি করছেন।তৈরি করছেন একাধিক স্বেচ্ছাসেবক সংগঠন।সেই সংগঠনের সাথে চলে যাচ্ছেন ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার করতে।এ দেশকে,দেশের জনগণকে আপন করে নিয়েছেন তিনি।তার কথায় ‘ভারতের উন্নতি’,’ভারতের জনগণ’,’ভারতের নারী’ নয়,তার কথায় ‘আমাদের দেশ’,’আমাদের জনগণ’,’আমাদের নারীরা’ প্রস্ফুটিত হয়।
*****************
ড. রাধাগোবিন্দ কর ধপ করে বসে পড়লেন চেয়ারে।বেশ পরিশ্রান্ত তিনি।বেয়ারা এলো।বললো,এক মেমসাহেব অনেকক্ষন আপনার জন্য অপেক্ষা করছেন।
মেম!হঠাৎ এখানে! ভ্রু কুঁচকে বেয়ারার দিকে তাকালেন ড. কর।তার চেম্বারে হঠাৎ মেমসাহেব এলেন কেন!বেয়ারা চিরকুট বাড়িয়ে দিলো।অবসন্ন শরীর একটু বিশ্রাম চাইছে।তবুও চিরকুটটা নিলেন।নাম লেখা আছে-মার্গারেট এলিজাবেথ নোবেল।
নামটা কোথায় শুনেছেন যেন!মনে পড়লো,হিন্দু ধর্ম নিয়ে ওনার বক্তৃতা নিয়ে বেশ কিছু লেখালিখি হয়েছিল পত্র-পত্রিকায়।বেশ গুছিয়ে বলার ক্ষমতা রাখেন এই মেম।
বাইরে এসে দেখলেন প্রখর রৌদ্রে চেয়ারে বসে আছেন শ্বেতাঙ্গ এক নারী।তাকেও বেশ ক্লান্ত বলেই বোধ হচ্ছে।তবুও বেশ কঠিনটা রেখেছেন শরীরে।উঠে দাঁড়ালেন মার্গারেট।তার মুখে উদ্বিঘ্নতা স্পষ্ট।কাতরকণ্ঠে বলে উঠলেন,একটিবার বাগবাজার চলুন ডাক্তারবাবু।ওর মুখ দিয়ে রক্ত উঠছে।
কার!বেশ অবাক হলেন রাধাগোবিন্দ বাবু।
আগের বারের মতোই কাতর কণ্ঠে মার্গারেট বলে উঠলেন,আমার সন্তানের।
রাধাগোবিন্দ কর একটু কঠিন কণ্ঠেই বললেন,আপনার সন্তান যখন,ভালো ইংরেজ ডাক্তার দেখলেই তো পারেন।
-তারা ঘৃণা করে আমায়।
আগের মতোই কাতর কণ্ঠে বললেন মার্গারেট।
ঘৃণা করে!অবাক হলেন রাধাগোবিন্দ কর।
মার্গারেটের সঙ্গে চললেন ডক্টর কর।ওরা ঢুকলো বাগবাজারের একটা বস্তিতে।ডক্টর কর এবার চরম অবাক হলেন।এই মেমসাহেব এখানে থাকেন!এই বস্তিতে!

শিশুর মতো হাসলেন মার্গারেট।বললেন,আমার আসল ঠিকানা তো এটাই।আমার আত্মীয় পরিজন সব এখানেই থাকেন।
বেশ লজ্জিত হলেন ডক্টর কর।মাথা নামিয়ে বললেন,আসলে ওভাবে বলতে চাই নি আমি।
মার্গারেট বললেন,ভেদাভেদ যত তাড়াতাড়ি মুছবে,ততই ভালো…ততই মঙ্গল।প্রথমে কেউই আসতো না কাছে,মেম বলে।ভয় পেতো, মিথ্যে সম্মান দিত।আমরা সবাই তো মানুষ।তবে কেন সবাই সবার সাথে মিসবো না!একসাথে থাকবো না!স্বামীজির সাথে সেদিন যদি ভারতবর্ষে না আসতাম,এ জন্মে আর মহাতীর্থ দর্শন হতো না।এখানে আসবার জন্যই আমার জন্মগ্রহণ।
চমকে উঠলেন ডক্টর কর।ফিরিঙ্গি তো পরের কথা,নিজের দেশের উচ্চ-শিক্ষিত মানুষজনরাই এ দেশকে নোংরা বলছে,নিচু বলছে।ঘৃণা করছে এ দেশের মানুষকে।আর একজন পরদেশী মহিলা নিজেকে এদেশের জন্য উৎসর্গ করেছেন!
আবর্জনাময় গলি দিয়ে হেঁটে চললেন ওরা।চার-পাঁচজন বস্তিবাসী ছুটে এলেন।গৃহবধূদের শরীরে শতছিন্ন বিবর্ণ শাড়ি।পুরুষদের গা-খালি।কঙ্কালসার জীর্ণ দেহ।ডুকরে কেঁদে উঠলো,কোথাও যেওনা মা গো।

মার্গারেট আশ্বস্ত করবার চেষ্টা করলেন,কোথাও যাবো না আমি।তোমাদের সাথেই থাকবো।
এগিয়ে চললেন মার্গারেট।পেছনে ডক্টর কর।সঙ্গে ওই বস্তিবাসীরা।একটা ছোট্ট স্যাঁতস্যাঁতে খুপরির মধ্যে ঢুকে দাঁড়ালেন ওরা।ঘরের দেওয়ালে ঝুল।মেঝেতে ইঁদুর মাটি তুলেছে বুদে দানার মতো।সেই ঘরের এক কোণে একটা ছেলে শুয়ে আছে।মার্গারেট ছুটে গিয়ে তার মাথাটা কোলে তুলে নিলেন।মুখ থেকে রক্ত বমি উঠছে।মার্গারেট পরম মমতায় তার মুখ মুছিয়ে দিচ্ছেন।ছেলেটা ‘মা গো’ বলে কেঁদে উঠলো।ডক্টর করের পাশ থেকে একজন ডুকরে কেঁদে উঠে বললেন,হতভাগার মা কবেই মরে গেল।
ডক্টর কর ছেলেটির কপালে হাত দিলেন।পুরে যাচ্ছে কপাল।অসহ্য কষ্টে,বিকৃত মুখে ছেলেটা তখন শুধুই ‘মা-মা’ বলে ডেকে উঠছে।ডক্টর কর জ্বর মাপলেন।তারপর একটা ইনজেকশন দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিলেন তাকে।
বাইরে বেরিয়ে ডক্টর কর বললেন,বড্ড নোংরা পরিবেশ।মহামারীর সিংহভাগটাই এর জন্য দায়ী।
মার্গারেট সায় দিলেন সে কথার।উত্তর দিলেন,ওহঃ ইয়েস ডক্টর।আপনিই ঠিক বলেছেন।আজই এগুলো পরিষ্কারের কাজে নামতে হবে।
মাথা নাড়লেন ডক্টর কর,কিন্তু সমস্ত দেশেই যে একই অবস্থা।এটুকুটা পরিষ্কার করলেই কি হবে!
মার্গারেট বললেন,এখানটাও ভারতবর্ষ।এখানকার মানুষজনও ভারতবাসী।শুরু তো করি আগে।
ডক্টর কর তাকালেন মেয়েটার মুখের দিকে।একটা শান্ত প্রশান্তির আলো খেলা করছে তার মুখে।হঠাৎ করেই মনে পড়ে  গেল স্বামীজির এই শিষ্যার নাম,নিবেদিতা।
ডক্টর আর জি করের মনে হলো একটা অদ্ভুত সাদা আভা বেরোচ্ছে ওর শরীর থেকে।সে আভা সব অন্ধকারকে দূরে সরিয়ে দেবে।সে আভায় মিশে রয়েছে অকৃত্তিম ভালোবাসা…মমতা….আদর…স্নেহ।এ দেশে আলো এসেছে,এবার সকাল হবে।

____


FavoriteLoading Add to library

Up next

বোকা বউ ও একটা গয়নার বাক্স – পুলিশমানুষ শিবন... এই শেষ দশ দিন কল্যাণী কখনো ভুলবে না। কি থেকে কি হয়। ভাবলেও গা হাতপা ঠান্ডা হয়ে আসে। অরিন্দম আজ নার্সিংহোম থেকে ছাড়া পাবে। গত দশদিন যমে মানুষে টানাটান...
লাভ স্টোরি – শ্বেতা আইচ... 'ও দাদা একটু গাড্ডা গুলো বাঁচিয়ে চলুন না, কখন থেকে তো বলছি। কানে যায় না?' 'চুপ কর না প্লিজ টুকি, পাশে সবাই তাকাচ্ছে তো।' 'তুই তো মোটে কথা বলবি ন...
আত্মোপলব্ধি -দীপ্তি মৈত্র... সাহিত্যের রূপ দুটি,তথ্য ও সত্য। তথ্যের মধ্যে জ্ঞান থাকে, সত্যের মধ্যে বোধ। সাহিত্যের সত্য আর অন্তরের সত্য মিলে সৃষ্টি হয় নতুন সত্ত্বা- তার নাম আ...
কনে দেখা - মুক্তধারা মুখার্জী ---আহাহা! দারুন পাত্র জানিস তো! ইঞ্জিনিয়ার,বিদেশে থাকে, সুন্দর দেখতে। তুই এবার আর কোনো ব্যাগড়া দিস না আগে থেকেই বলে রাখলাম। আম...
বেল – অদিতি রায় সাইকেল নিয়ে ফিরলে আর বেল দিতে শুনিনা সজোরে, যে বেল এর সঙ্গে ছিল সান্তার থলির থেকে অনেকটা আনন্দের হুড়মুড়িয়ে বেরিয়ে আসার নির্মল আওয়াজ৷ দূরের কোনো...
ADMIN

Author: ADMIN

Comments

Please Login to comment