শিকার (থ্রিলার)

অস্তগামী সূর্যের লালাভ আভা সমূদ্রের নীলাভ জলরাশির মাঝে বিলীন হতে হতে কী অদ্ভুত এক যাদুকরী পরিবেশ তৈরি করে।  সদ্য বিবাহিত তিন্নি তার বর রিফাতের কাঁধে মাথা রেখে এই মধুর আবেশটুকু তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করছে। দূর সমুদ্রে গাংচিলগুলিরও ঘরে ফেরার তাড়া কিন্তু তিন্নি আর রিফাতকে দেখে  মনে হচ্ছে এভাবেই যদি সাগর সঙ্গমে তারা বাকি জীবনটি কাটিয়ে দিতে পারত তবে মন্দ হত না কিছু।  

ওদের বিয়ে হয়েছে আজ নিয়ে চারদিন। কাজী অফিসে বিয়েটা সেরেই হানিমুনে সোজা কক্সবাজার। জীবনের সবচেয়ে সুন্দর মুহুর্তগুলি এখনই মনে হয় পার করছে দুজন। একে অপরকে নিবিড় করে কাছে পাওয়া, একে অপরকে নতুনভাবে  চেনা, জানা, সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত রোমাঞ্চ ছুঁয়ে  আছে দুজনকেই।   

লাভ ম্যারেজ ওদের।  ফেসবুকে পরিচয় তারপর প্রেম। তিন্নির বাবা মা কেউ নেই। মফস্বলে চাচার বাসায় থেকে মানুষ। বাবার রেখে যাওয়া সামান্য টাকায় আর চাচার সহায়তায় মফস্বলের স্থানীয় একটি কলেজ থেকে কোনো রকমে  গ্রাজুয়েশন শেষ করে এখন  ঢাকায় মেয়েদের একটি হোস্টেলে থাকে।  পিছুটান নেই  তাই বাড়িতে যাওয়া হয় না তেমন। পার্ট টাইম বিভিন্ন কাজ করে নিজের খরচ নিজেই চালায় বলে  চাচা চাচীও দায়মুক্ত হয়ে হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছেন। অন্যদিকে রিফাত অবস্থাসম্পন্ন ঘরের ছেলে। ঢাকায় ছয়তলা বাড়ি আছে ওর বাবার। ও নিজে এক্সপোর্ট ইম্পোর্টের বিজনেস করে। ছয়মাস আগে অনিন্দ্য সুন্দরি তিন্নিকে ফেসবুকে দেখে প্রথম দেখাতেই ভালো লেগে যায় ওর।  তারপর ম্যাসেজ আদান প্রদান এবং অতঃপর চুটিয়ে প্রেম।     

তিন্নির পারিবারিক ব্যাকগ্রাউন্ড তেমন সন্তোষজনক নয় বলে বাবা মাকে রাজী না করাতে পারবে না বলে  রিফাত  কাজী অফিসে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেয়। তিন্নিরও আপত্তি করার কিছু ছিল না। আগে বিয়ে তো হোক, পরে পরিবারকে মানানো যাবে। চারদিন আগে তাই দুই তিনজন বন্ধু বান্ধবীকে নিয়ে কাজী অফিসে বিয়েটা সেরে সেই দিনই কক্সবাজারের ফ্লাইটে চেপেছে দুজন।  

দিনের শেষ আলোটুকুও টুপ করে আড়াল হতেই রুমে ফেরার তাড়া অনুভব করে তারা। একটু নিরিবিলি কাটাবে বলে দুজন হাঁটতে হাঁটতে বেশ খানিকটা দূরে চলে এসেছিল । প্রথম প্রথম কয়েকজন জেলে আর দুই একটা স্থানীয় ছোট ছেলেমেয়ে দেখলেও এখন আর কাউকে চোখে পড়ছে না তেমন। তাই অন্ধকার হতেই উত্তাল সাগরে নেশা ধরানো গর্জন ছাড়া আর কিছু কানে আসছে না এবং চোখেও পড়ছে না। হঠাৎ তিন্নির কেমন গা ছম ছম করতে থাকে। রিফাতকে তাড়া লাগায় হোটেলে ফেরার জন্য। রিফাতও আর না করে না। ফিরে আসতে থাকে দুজন।   

কয়েক কদম এগিয়েছে আর তখনি মাটি ফুড়ে যেনো উদয় হয় দুই ছায়ামুর্তির। বয়স আঠার উনিশ হবে। তারা কোনো কিছু বোঝার আগেই তাদের একজন তিন্নির হ্যান্ড ব্যাগটা হ্যাচকা টানে নিয়ে নিল তার দখলে । রিফাত চিৎকার করতে যাবে কিন্তু এমন সময় এক দৃশ্য দেখে ঢোক গিলে চুপ করে যায়।  তাদের দিকে ছুরি তাক করে আছে অন্যজন। সন্ধ্যার ধোঁয়াটে আঁধারে সেই ছুরির ধারালো ফলা চকচক করতে লাগল তাদের সামনে। সাথে নববিবাহিতা সুন্দরী স্ত্রী। রিফাত তাই আর কথা না বাড়িয়ে তার মোবাইল আর  মানিব্যাগটি চুপচাপ তুলে দিলো দুস্কৃতিকারীর হাতে। ওরাও যাওয়ার আগে আতংক সৃষ্টি করার জন্য এক ধাক্কায় রিফাতকে মাটিতে ফেলে দিয়ে ছিনতাইকৃত জিনিসপত্র নিয়ে চোখের পলকে আঁধারে কোথায় মিলিয়ে গেলো।

ঘটনার আকস্মিকতায় তিন্নি বোবা হয়ে যায়। তীব্র আতংক আর টেনশনে মাথা ঘুরে পড়ে যেতে লাগে প্রায়। রিফাত ধরে ফেলে তাকে । কোনো রকমে  টানতে টানতে রিফাত তাকে নিয়ে আসে হোটেলে। রুমে ঢুকেই তিন্নি বিছানায় শুয়ে পড়ে। তিন্নির শিওরে বসে ওর মাথায় হাত রাখে রিফাত। প্রচন্ড ভয় পেয়েছে মেয়েটা। আতংকে কেমন নীল হয়ে গেছে। যাক, শুধু মোবাইল্গুলোর ওপর দিয়ে গেছে। আরও বড় ক্ষতি হতে পারত। মানিব্যাগে খুব বেশি টাকা ছিল না। হোটেলে সেফটি লকে টাকা রেখে গিয়েছিল সে। তবে ক্রেডিট কার্ড , ডেবিট কার্ড ছিল মানিব্যাগে। ওগুলোর জন্য ব্যাংকে ফোন দেয়া জরুরী।  

হঠাৎ এক লাফে উঠে বসে তিন্নি। বিস্ফারিত নেত্রে তাকিয়ে থাকে রিফাতের দিকে। চোখ যেনো কোটর ছেড়ে বেড়িয়ে আসতে চায় তার। তীব্র আতংকে কাঁপতে থাকে। ওর এই চেহারা দেখে রিফাত ভয় পেয়ে যায়।  

“কী হল তিন্নি? তুমি এমন করছ কেনো? আমি তো আছি। এটা জাস্ট একটা ছিনতাই। এমন তো হতেই পারে। রিল্যাক্স।“ রিফাত চেস্টা করতে তিন্নিকে শান্ত করতে।

তিন্নির মুখ দিয়ে অস্ফুট স্বর বেরোয়, উদ্ভ্রান্ত দৃষ্টি। ওর দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে  তাকিয়ে থাকে। ঐ দৃষ্টি দেখে কেঁপে ওঠে রিফাত।

“ কী হয়েছে তিন্নি? বল আমায়? এভাবে তাকিয়ে আছ কেনো?

“ছবি, আমাদের ছবি আর ভিডিও” ক্ষীন কন্ঠে কোনোরকমে বলে তিন্নি।

“কিসের ছবি, ভিডিও?” রিফাতের কন্ঠে উৎকণ্ঠা।

আমাদের ভিডিও যেগুলো তুমি করেছিলে তোমার মোবাইলে, সেটা এখন ওদের কাছে । বলতে বলতে হাউমাউ করে কাঁদতে থাকে তিন্নি। এবার সব কিছু জলের মত পরিষ্কার হয় রিফাতের কাছে। আর ব্যাপারটি বুঝতে পেরে ভয়ের একটা স্রোত শীরদাড়া বেয়ে নেমে যায় তার শরিরে। তীব্র আতংকগ্রস্থ হয়ে এবার তারা তাকিয়ে থাকে একে অপরের দিকে।    

প্ল্যানটা রিফাতের। তিন্নি হাজারবার নিষেধ করেছিল কিন্তু সে শোনেনি। হোটেলের রুমে তাদের অন্তরংগ মুহুর্তগুলো সে ধারন করেছিল মোবাইলে। জাস্ট ফান এবং  ঢাকায় ফিরে গিয়েই ডিলিট করে দিবে এমন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বলে তিন্নি অবশেষে রাজী হয়ে গিয়েছিল। তখন কে জানত এই মোবাইল ছিনতাই হবে। এখন ছিনতাইকারী ওর ভিডিওগুলি সার্চ করলেই পেয়ে যাবে সব। আর তারপর!!! আর কিছুই ভাবতে পারছে না তিন্নি। শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে রিফাতের দিকে। রিফাত বারবার ক্ষমা চায় তিন্নির কাছে কিন্তু তিন্নির কোনো প্রতিক্রিয়া হয় না। সে মোটামুটি একটা ট্রমার মধ্যে আছে। মজা করে করা ছোট্ট একটি ঘটনা তাদের জীবনে যে এমন  বিভীষিকা আনতে পারে তা বোধ হয় তারা  ভাবতেও পারেনি।

রুমের ইন্টারকমের শব্দে দুজনেই চমকে ওঠে।  রিসিপশনিস্ট জানায় ওদের খোঁজ করছে কেউ ফোনে। এত রাতে কে ফোন করতে পারে? ছিনতাইকারীরা নয় তো?  বিদ্ধস্ত রিফাত কাঁপা কাঁপা হাতে ফোন ধরে। 

“তোর বউকে যদি পর্ণস্টার না বানাইতে চাস, আগামীকাল বিকেলে দশ লাখ টাকা নিয়ে কলাতলি বিচে এসে দাঁড়াবি। তোর হোটেলের রিসিপশনে বাম দিকে দুই নম্বর সোফার নিচে আমার লোক একটা সিমকার্ড রেখে আসছে। এই নাম্বারে তোর সাথে যোগাযোগ করব আমরা। পুলিশকে জানানো বা অন্য কোনো চালাকী করলে এলাকার প্রত্যেকের মোবাইলে তোর বউএর ছবি থাকবে।” আঞ্চলিক টোনে এক তরুন বলে যায় কথাগুলো।     

ধড়াস করে ওঠে রিফাতের হৃদপিন্ড। এই ভয়টাই সে করছিল। বুঝতে পারছে  তিন্নির হ্যান্ড ব্যাগে ওদের রুমের চাবি দেখে ওরা ওদের হোটেল আর রুম নম্বর খুঁজে পেয়েছে। এখন কী করবে সে? শয়তানগুলো দশ লাখ চাচ্ছে। এত টাকা ওদের দিয়ে দেবে সে? বললেই হল?  

“ ভাই আপনি কে? আমাদের সাথে এমন কেনো করছেন? আপনার কাছে হাত জোড় করি আমাদের মোবাইলটা দিয়ে দেন। এত টাকা আমি কই পাব বলেন? আমি কিছু টাকা দিচ্ছি আপনাদের খুশী করতে , আপনি দয়া করে ভিডিওগুলি কপি না করে ফেরত দিয়ে দেন।“  রিফাতের কন্ঠে প্রবল আকুতি।

“ বউ এর সম্মান যদি বাঁচাতে চাস তাইলে বেশি কথা না বলে দশ লাখ টাকা নিয়ে বিকেলে চলে আয়। নইলে তোর মোবাইলে যত ভিডিও আছে সব ছড়িয়ে যাবে।তোর ফেসবুক থেকে সব ইনফরমেশন আমরা পাইছি, তুই কে, কই থাকিস, কী করিস সব । চালাকী করলে তোর বাবা মা সহ তোর ফ্রেন্ড লিস্টের সবার ইনবক্স এ এই ভিডিওগুলো চলে যাবে। আশা করি বুঝতে পারছিস টাকা না দিয়ে তোর উপায় নাই।ভদ্রমত টাকা দিয়ে দিলে সব ভিডিও কোনো কপি ছাড়াই ডিলিট হয়ে যাবে”  বলেই রিফাতকে কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে ঠক করে ফোন রেখে দেয় ছিনতাইকারী।  

হতভম্ভ হয়ে রিফাত শুণ্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। পাশে তিন্নি চোখ বড় বড় করে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। গালে অশ্রুর রেখা তখনো বিদ্যমান।

“ কী বল্ল ওরা? মোবাইল ফেরত দিবে?” তিন্নি উদবিগ্ন কন্ঠে জিজ্ঞেস করে।

“ দশ লাখ টাকা চায়, নইলে ভিডিওগুলি ছড়িয়ে দিবে বলছে ।” যন্ত্রের মত বলে যায় রিফাত।

কী? দশ লাখ!! তার মানে ওরা ভিডিওগুলো দেখেছে। এখন কী হবে? হায় হায় আমার সুইসাইড করা ছাড়া কোনো উপায় থাকবে না, হাজারবার তোমাকে নিষেধ করেছিলাম, তারপরও তুমি এমন করলে। ” বলেই আবার কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে তিন্নি।

“ চিন্তা কর না , আমি তো আছি। দেখি কী করা যায়” তিন্নিকে আস্বস্ত করার চেষ্টা করে রিফাত।

“তুমি কী করবে এখন? , পুলিশকে ইনফর্ম করবে? নাকি টাকা দিয়ে দিবে?” কান্না জড়িত  কন্ঠে জিজ্ঞেস করে তিন্নি।  

“পুলিশকে ইনফর্ম করা যাবে না। তাতে ওরা যদি ভিডিওটি আরও বেশি ছড়িয়ে দেয়। তার চেয়ে ওদের সাথে আলোচনা করে টাকার পরিমান  কমানোর চেষ্টা করা যায় কি না দেখি।“

“যাই কর, ভিডিওগুলো উদ্ধার কর। নইলে আমার মুখ দেখানোর উপায় থাকবে না।“ বলেই বিছানায় মুখ গুজে তিন্নি ফোঁপাতে থাকে।

রিফাত কিছু না বলে বের হয়ে আসে। রিসিপশনে সোফার নিচ থেকে ওদের দেয়া সিমকার্ড খুঁজে বের  করে। বাইরে গিয়ে কমদামী একটা মোবাইলও কিনে ফেলে সিমটা এ্যাক্টিভেট করে সে। কিন্তু এখন সে কী করবে?  দুশ্চিন্তার ছাপ পড়ে তার কপালে। দশ লাখ টাকা অনেক। টাকা দিলেও যে ওরা ভিডিও ছড়িয়ে দেবে না তার কী নিশ্চয়তা? কিন্তু পুলিশে খবর দিলে তো আরও বিপদ। বুঝতে পারে কঠিন এক ফাঁদে পড়ে গেছে সে। এ থেকে পরিত্রাণের উপায় সহজ হবে না। অনেক চিন্তা করে অনেক হিসেব নিকেশ করে সে শেষ পর্যন্ত  টাকা দেয়াই মনস্থির করে রিফাত।    

পরদিন, সকালের ফ্লাইটেই ওরা ঢাকা এসে তিন্নিকে ওর হোস্টেলে রেখে দশ লাখ টাকা ম্যানেজ করে বিকেলের ফ্লাইটে আবার কক্সবাজার ফেরত যায় সে।

কলাতলি বিচে ওদের কথামত টাকার প্যাকেটটি রেখে রিফাত যখন ফেরত আসে তখন সন্ধ্যা পেরিয়ে গেছে। কিছু দূর  এগোতেই  স্থানীয় একটি বাচ্চা ছেলে ওর হাতে মোবাইলটি দিয়ে চলে যায়। মোবাইলটি ফেরত পেয়েই রুদ্ধশ্বাসে ভিডিও চেক করতেই স্তম্ভিত হয়ে যায় সে। মোবাইলে কোনো ছবি বা ভিডিও কিছুই নেই।  বিদ্যুৎ গতিতে এদিক ওদিক তাকায়, না, সেই বাচ্চাটিকে তার দৃষ্টিসীমার ভেতরে কোথাও দেখা যায় না।  বুঝতে পারে ডিলিট করেছে তারা। অনেক গুরুত্বপুর্ণ ভিডিও ছিল, সব ডিলিট করেছে।   কিন্তু কে জানে আবার কপি রেখেছে কি না? 

এত রাতে কোনো ফ্লাইট নেই, তাই হোটেলের দিকে হাঁটতে থাকে সে। জীবনে এই প্রথম এমন ব্ল্যাক মেইলের সম্মুখীন হল সে। রাগে তার সারা শরির জ্বলছে। নিস্ফল ক্রোধে দাত কিড়মিড় করতে থাকে সে। দশ লাখ টাকা অনেক। আসলে টাকাটা না দিয়ে  কোনো উপায় ছিল না রিফাতের। কারণ মোবাইলে শুধু তিন্নিই নয় এরকম আরও সাত আটটা মেয়ের সাথে তার ভিডিও ছিল যেগুলোতে তাকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। ওর সেটে এ্যাপ লক করে গোপনে রেখেছিল সে সেগুলো। শয়তানগুলো  সেগুলোও খুজে পেয়ে ইন্টারনেটে ছেড়ে দেয়ার হুমকি দিয়েছিল।সেগুলো ছড়ালে এতগুলোর মেয়ের সাথে প্রতারণার দায়ে পর্ণগ্রাফি আইনে উলটো পুলিশই তাকে জেলে পুরবে। তাছাড়া ওর ফ্রেন্ড লিস্টের সবার ইনবক্স এ যদি ভিডিওগুলি ছেড়ে দেয় তাহলে সে মুখ দেখাত কীভাবে?  ওদের দেয়া সিমের নাম্বারে ম্যাসেজ করে এই হুমকি তারা ক্রমাগত দিচ্ছিল বলেই না সে টাকাটা দিতে রাজী হয় সে। যদিও সে নিজেও একই কাজ করে। বিদেশি এক পর্ণ সাইটে এসব ভিডিও চড়া দামে বিক্রি করে সে।  কিন্তু তাতে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শুধু মেয়েগুলির ভিডিও থাকে, ও নিজেকে আড়ালে রাখে। এছাড়া পরে এই ভিডিওগুলি দিয়ে ব্ল্যাকমেইল করে মেয়েগুলোকে  সে বিভিন্ন হোটেলে তার নিজস্ব বিজনেসের ক্লায়েন্ট হ্যান্ডেল করতেও কাজে লাগায়।  ফেসবুকে সুন্দরী তিন্নিকে দেখে এই উদ্দ্যেশ্যেই তাকে পটিয়েছিল সে। কিন্তু মধ্যবিত্ত সেন্টিমেন্টের মেয়েটা  বিয়ের আগে  তাকে কিছুতেই  কাছে ঘেঁষতেই দিচ্ছিল না। তাই তার মন রাখতে সবাইকে না জানিয়ে নকল বিয়েটা  করা। কাজ উদ্ধার হলেই এমনিতেই কবে  ছুড়ে ফেলে দিত তাকে। বাবা মা মরা অসহায় মেয়ে , কিছুই করতে পারবে না। বেছে বেছে এমন মেয়েকেই ফাঁদে ফেলে সে। অধিকাংশ মেয়েই তার হাতের পুতুল হয়ে যায়। তাদের কেউ আবার লজ্জায়  চুপ থাকে , আবার কেউ কেউ সুইসাইডও  করে।   কিন্তু এবার যে এমন একটা ঘটনার সম্মুখীন হবে কে জানত?  যে নাম্বার থেকে ওদের সাথে  যোগাযোগ হচ্ছিল সেই নাম্বারে একবার ট্রাই করে সে কিন্তু নাম্বার বন্ধ পায়। এমনটাই হওয়ার কথা । হোটেলে ফিরে  কিছুক্ষন থম মেরে বসে থাকে। তারপর তিন্নিকে একটা ফোন করে।     

কয়েকবার ফোন করে ওর নাম্বার বন্ধ পায় রিফাত। ওর আবার কী হল? কপালে চিন্তার রেখা ফুটে ওঠে তার।এই মেয়েটাই আসলে কুফা। এতদিন এত মেয়ের সাথে সম্পর্কে জড়িয়েছে কখনোই এমন ঝামেলায় পড়েনি সে। এতগুলো টাকা গেল, আবার ভিডিওগুলোও নেই। ভেবেছিল কপি রাখবে কিন্তু সেই সময় হয়ে ওঠেনি। এরপরে আবার ভিডিও করা কঠিন হবে। এই ট্রমার পর আবার ভিডিও করতে সহজে রাজি হবে না মেয়েটা।যাই হোক, জোড় খাটাতে হবে। তিন্নি পুরাই লস প্রোজেক্ট ওর কাছে।কপালে চিন্তার রেখা মিলিয়ে গিয়ে সেখানে আবার বিরক্তির রেখা তীব্র হয় তার।   

হঠাৎ ইনবক্সের টুং টাং এ চমকে ওঠে সে। তিন্নির আইডি থেকে ম্যাসেজ। এতক্ষন পর হুশ হয়েছে নবাবজাদির । ম্যাসেজ ওপেন করতেই দেখে দীর্ঘ টেক্সট। বিরক্তি নিয়ে পড়তে শুরু করে আর পড়তে পড়তে  চক্ষু কোটর ছেড়ে বের হয়ে আসে তার ।

তিন্নি লিখেছে, “ সরি ডার্লিং, তোমার সাথে যোগাযোগ করতে একটু দেরি হয়ে গেলো। কী করব বল,  দশ লাখ টাকা ঠিকঠাক মত গুনতে একটু সময় তো লাগবেই, তাই না?   আসলে তোমার চার নম্বর শিকার মিথিলা মেয়েটা ছিল আমার ছয় নম্বর হাজবেন্ড এর কাজিন। তুমি যখন ওর ভিডিও করে ওকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিলে তখন ও কেঁদেকেটে আমার কাছে তোমার কথা বলেছিল। আর তখন থেকেই পরবর্তি শিকার হিসেবে তোমাকে টার্গেট করি আমি। তোমার মত বড় লোকের বখে যাওয়া ছেলেদের শিকার করতে আমি রিয়েলি এঞ্জয় করি। আমার ভিডিওগুলি আমি আগেই ডিলিট করেছিলাম। তাই ছিনতাইকারিরা ( এতক্ষনে নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ ওরা আমারই লোক) কোনো ভিডিওই পায়নি। তবে তোমার  আগের ভিডিওগুলি কিন্তু কপি রাখতে আমি ভুল করিনি মোটেই। কাজেই পুলিশ বা কাউকেই খবর দিয়ে যে কোনো লাভ হবে না এটা নিশ্চয়ই এতক্ষনে বুঝতে পারছ । ভালো থেকো তুমি। তোমার সাথে এই জনমে আমার যেনো আর দেখা না হয়। গুড  লাক।“ এর পরেই রিফাতকে ব্লক মেরে ওর আইডিটাই ডিলিট করে দেয় তিন্নি।

আর বিলাসবহুল হোটেলে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত রুমে থেকেও মোবাইল ফোনটি হাতে নিয়ে কুলকুল করে ঘামতে থাকে রিফাত।


FavoriteLoading Add to library

    Up next

    সম্পর্কের চিলেকোঠায় – বিদিশা মন্ডল... পরন্ত বিকেলে সূর্য যখন তার লালচে সংসার নিয়ে পশ্চিমদিকে ঢুলুঢুলু চোখে পাড়ি দিয়েছে তখন তানিয়া এককাপ ধোঁয়া ওঠা কপির কাপ হাতে ওর ফ্ল্যাটের বারান্দায় এসে দ...
    মহামানবের সাগরতীরে-  সমর্পণ মজুমদার...      রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন "এই ভারতের মহামানবের সাগরতীরে", যা খুব অল্প কথায় ব‍্যাখ‍্যা করে দিচ্ছে ভারতবর্ষের মহান চিরন্তন সামগ্রিকতাটিকে। স...
    ভৌতিক না অলৌকিক সেই কুকুরটা... - প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়   রোজই তো ফিরি আজ কেন গা ছমছম করছে? নিজেকেই প্রশ্ন করলাম। গভীর অন্ধকার পথ দিয়ে বাড়ি ফিরছি। গ্রামীণ এই এলাকাটায় বিদ্যু...
    দত্তক – সায়ন্তনী ধর চক্রবর্তী... ।।১।। এতদিনের প্রচেষ্টায় আজ ফাইনালি C.F.O. হতে পারলো সুদিপ্ত, এই পোস্টটা পাওয়ার জন্য প্রচুর খেটেছিল ও। খবরটা পেয়েই অফিস থেকে রেডি হয়ে বেরিয়ে পড়ল দী...
    একটি ছেলে - দীপ চক্রবর্তী ছোট্ট একটি ছেলে ক্রিকেট খেলবে বলে হাতে ব্যাট নিয়ে অনেকক্ষন দাঁড়িয়ে, কোনও একটি দূরের মাঠে... শচীন হ‌ওয়ার স্বপ্ন তার যে চোখে মুখে,...
    কর্মযোগী প্রফুল্লচন্দ্র... - সমর্পণ মজুমদার     ২রা আগস্ট ১৮৬১ খ্রিস্টাব্দে জন্ম হয়েছিল এমন একজন মনীষীর, যিনি বাংলার নবজাগরণের একজন উল্লেখযোগ্য পথিকৃৎ। যাঁর সম্বন্ধে ব...
    খোঁজ -সৌভিক মল্লিক তবুও তো যাই নীলপদ্মের খোঁজে। আকাল; তা জানি। তবুও ইচ্ছে হয়। মাঝে মাঝে এই খোঁজটাই লাগে বেশ! চোখের আলাপে গল্প তো লেখা হয়। আমার বুকের খাঁচাতে রক্তমা...
    বলিউডে ফের নরেন্দ্র মোদীর স্বচ্ছ ভারত অভিযান... - সায়নী দাস বলিউডে ফের নরেন্দ্র মোদীর স্বচ্ছ ভারত অভিযান। এই অভিযানকে সমাজের প্রত্যেকটি স্তরে পৌছে দিতে বলিউডে ফের আসতে চলেছে নতুন এক সিনেমা। অক্ষয় ...
    ধর্ষিতা – রুমা কোলে...   বড়োই অদ্ভুত এ সমাজ,,, তাই না? । যদি শিশুকন্যা তুই হোস ধর্ষিতা  তবে তোর ভবিষ্যত হোক বেশ্যা । । যদি মেয়ে তুই হোস ধর্ষিতা  তবে তোর বেঁচে থাকা...
    সম্পর্ক – বিভূতি ভূষন বিশ্বাস... আমি তখন ক্লাস সিক্সে পড়ি ।  ১৯৮০ সালের এক ঘন বর্ষার দিন প্রায় এক সপ্তাহ ধরে রিমঝিম করে অনবরত বৃষ্টি পড়েই চলেছে থামার কোন নাম গন্ধ নেই । গ্রামের রাস্তা...
    sabiha sultana

    Author: sabiha sultana

    Comments

    Please Login to comment