শুধু তুমি চাও যদি – পদ্মাবতী মন্ডল

ফোনটা সাইলেন্ট মোডে ছিল। অনেক কটা মিসড্ কল হয়েছে।বাড়ীতে থাকলে ফোনটা সাইলেন্টই থাকে। মা বা বাপি কেউ জানতে পারলে আর রক্ষে নেই । আসলে বৃন্দার কাছে যে ফোন আছে সেকথা বাড়ীর কেউ জানেই না। বড্ড কনজারভেটিভ ওরা। মেয়েদের বেশি বাড়বাড়ন্ত একদম পছন্দই করেন না বিকাশ বাবু । গল্পের নায়িকা বৃন্দার বাবা হলেন বিকাশ বাবু ।পেশায় তিনি একজন সরকারি স্কুলের প্রধান শিক্ষক ।বেশ ডাকসাইটে মেজাজী উনি ।ছেলে মেয়ে আর গিন্নির ব্যাপারে প্রচন্ড চোখ খোলা রাখেন ।মানে, কে কখন কোথায় যাবে? কতক্ষণ থাকবে সব ওনার নখদর্পনে ।ইদানিং মেয়ে কলেজে ভর্তির পর একটু নজর ছাড়া হয়েছে তার রুটিন ।মানে কখন আসে কখন যায় তা অতটা খেয়াল পরে না ।তবুও তক্কে তক্কে থাকেন ।ওনার দৃঢ় বিশ্বাস বৃন্দা এমন কিছু করবেই না যাতে বিকাশ বাবুর নাক কাটা যায় ।

এটা তো গেল বাবার পরিচয়, এবারে আসি রাসেশ্বরী, অর্থাৎ  বৃন্দার মায়ের কথায় উনি রান্না ঘর আর ঠাকুর ঘর ছেড়ে বেরোতেই পারেননি এই কুড়ি বছরে।বিয়ের পর সেই যে শ্বাশুরি মা চাবির গোছা খানা আঁচলে বেঁধে দিয়েছেন ওই নিয়েই প্রতিবেশী দের কাছে গল্প করে কাটিয়ে দিলেন এই অর্ধেক জীবন ।আর ছেলেমেয়ের খাওয়া দাওয়ার খবর ছাড়া অন্য বিষয়ে অতটা নাক গলান না ।ওনার ধারনা যে সময়টা তিনি টিকটিকির মত ছেলে মেয়ের পিছনে লাগবেন ততক্ষণ গীতা পাঠ করলে মোক্ষ লাভ হবে ।বিকাশ বাবুর অজান্তেই তাই রাসেশ্বরী ওনার নাম দিয়েছেন টিকটিকি ।

এদিকে বৃন্দা নতুন কলেজে উঠেই বন্ধু বান্ধব হই হুল্লোড় এসবই বেছে নিয়েছে ।এতদিন কো এড স্কুলে পড়লেও সেভাবে কোনো ছেলের সাথে কথা তো দূরের কথা পাশ দিয়ে পেরোনোও হয়নি ।বাবা হেডমাস্টার ছিল যে, সবসময় পিছনে পরে থাকতো ।আজ যেন বাঁধন ছাড়া হয়েছে সে ।

 “আজ ম্যে উপর আসমা নিচে,আজ ম্যেই আগে জমানা হ্যেই পিছে ” এই গানের মত ফিলিংস হয়েছে বৃন্দার ।সারাদিন কলেজ, টিউশন, নোটস্ এসবের ছুতোই বাড়ী থেকে হুটহাট বেড়িয়ে যেত ।মা এসবের মাঝে ঢোকেননি কখনও উনি জানতেন স্বয়ং পতি দেবতা যেখানে আছেন সেখানে আর ওনার মাথা ঘামানোর কী দরকার? সেই বৃন্দার আজ কলেজে নতুন ছেলে বন্ধু হয়েছে ।অনিকেত, সবাই যাকে অনিক বলে ডাকে ।তো এই অনিক হচ্ছে কলেজের একজন ছাত্র সংসদ এর নেতা ।কলেজে নবীন বরণের দিনই একটা পিঙ্ক কালারের শাড়ি পরা মেয়ের সামনে দাঁড়িয়ে প্রেম নিবেদন করল অনিক।

ঐভাবে প্রস্তাব পেয়ে মনে মনে আপ্লুত বৃন্দা যেন হাতে আকাশের চাঁদ পেল ।বাবার শাসনে থাকাকালীন এভাবে প্রেম নিবেদন তো দূরের কথা কেউ চোখ তুলে তাকাইনি ওর দিকে ।গ্রামের সব ছেলেরা বিকাশ মাস্টার কে বড্ড ভয় পেত ।অনিক তো আর বিকাশ মাস্টার কে চেনে না ।তাই ঐ পিঙ্ক শাড়ি পরা বৃন্দার কিউট নেস দেখেই প্রেমে পরল ওর ।বৃন্দা তো আবেগে বিহ্বল হয়ে গোলাপটা নিয়েই নিল অনিকের হাত থেকে ।পাছে বাবা দেখতে পাই এই ভয়ে টিফিন বক্সের মধ্যে রেখে দিল ।বাড়ী ফিরে বার বার গোলাপ টা হাতে নিয়ে দেখছে ।আর ভাবছে সিনেমার ঘটনাগুলো তাহলে সত্যি হয়, হিরোরা যেভাবে প্রপোজ করে অনিক ও তো সেরকমই করল ।বৃন্দার চোখে অনিক এখন হিন্দি ছবির আমির আর বাংলা ছবির জিতের মত ।ওর মনে এখন নতুন নতুন সুর আসতে লাগলো ।বাবা কোন ছোটবেলায় হারমোনিয়াম কিনে দিয়েছিল সেটাতেই ভর সন্ধে বেলা জুড়ে দিলো কলেজ থেকে বাড়ী ফিরেই।

“আমারও পরাণও যাহা চাই….তুমি তাই, তুমি তাই গো ।”

আঠারো ঊনিশ বছরের মেয়েরা প্রেমে পরলে এমনটাই করে ।এধারণা আমার নিজের ।কারো মনের ভিতর ঢোকা কঠিন হলেও নিজের কথা ব্যক্ত করা সোজা ।

“কিরে তুই আজ রেওয়াজ এ বসলি যে বড়? ” চশমার ফ্রেম টা কানে একবার সন্তোষজনক গুঁজে বিকাশবাবু বৃন্দাকে বললেন ।

“না আসলে কলেজে সোশ্যাল আছে তো তাই আমি অংশ নিয়েছি ।”বৃন্দার তোতলানো জবাব ।

“বই এর ব্যাগটা দে তো মা”

কেন বাপি? বুক ঢিপ ঢিপ করছে ওর ।ব্যাগের ভেতর তো অনিকের দেওয়া গোলাপ টা আছে ।যাইহোক চিলের মত ছোঁ মেরেই একপ্রকার ব্যাগটা হাতিয়ে নিল বিকাশ বাবু ।বইগুলো তো নতুনই হয়ে আছে ।পড়িসনি নাকি? আরে এটা! এটা কী?তত ক্ষণে বৃন্দার হার্টবিট চরমে ।যা! সব শেষ ।কলেজ যাওয়া বন্ধ ।এসব কত কিছুই না ভাবছে বৃন্দা।

“এই ছেঁড়া ব্যাগ নিয়ে আর কাল থেকে কলেজ যাবি না ।এটা তো ছিঁড়ে গেছে ।এই নে এটা দিয়ে কাল একটা ব্যাগ কিনে নিস ” বলেই একটা পাঁচশো টাকার নোট বের করে দিল ।

হাঁফ ছেড়ে বেঁচে গেছে সেদিন মেয়েটা ।উফ আরেকটু হলেই হয়েছিল ।পরদিন কলেজ গিয়েই দেখা হল অনিকের সাথে ।

“তোমাকে মাত্র একদিন দেখিনি তবু মনে হচ্ছে যেন কত বছর দেখিনি “বৃন্দার হাতটা ধরে বললো অনিক ।

“যাঃ।কত বাজে কথা “হাত ছাড়িয়ে নিয়ে লজ্জা পেলো বৃন্দা ।যখন আমি ছিলাম না তখন?

তখন কার কথা আলাদা ।আজ তো শুধু তোমাকেই ভালোবাসি ।তুমি তো আমার এই এইখানটাই আছো, দেখো এই খানটাই ।বলেই বৃন্দার হাতটা অনিক নিজের বুকের বাম দিকে রাখলো ।অনবরত হার্টের ধুকপুক আওয়াজটা নিজে হাতে অনুভব করলো বৃন্দা ।এই প্রথম বারের জন্য এমন ফিলিংস হল তার ।ঠিক নাগরদোলা তে চেপে যখন সেটা উপর থেকে নামলে যেমন বুক থেকে পেট পর্যন্ত একটা ফিলিংস হয় ঠিক সেই রকম ।ভেতরকার ছটফটানি কন্ট্রোল করে বাইরে অনেকটা ম্যাচুউরিটির সুরে বললো বৃন্দা

“তুমি আমার জন্য কী করতে পারো? “

কে জানে? তবে অনেককিছু করার ইচ্ছে আছে ।তার আগে তোমার জন্য সারপ্রাইজ আছে ।এদিকে এসো ।

কী সারপ্রাইজ?

  আগে চোখটা তো বন্ধ কর ।দুহাত দিয়ে পেছন থেকে চেপে ধরলো অনিক বৃন্দার চোখ ।তার পর নিয়ে গেল একটা ফাঁকা ঘরে যেখানে আগে থেকেই বৃন্দার জন্য অনিক গোলাপের একটা সুন্দর গিফ্ট সাজিয়ে রেখেছিল অনেকটা ফিল্মি স্টাইলে ।ঠিক যেমনটা বৃন্দা ভাবতো সিনেমা দেখতে দেখতে ।অনেকটা সেরকম ।

“আজ তো তোমার বার্থ ডে “অনিক চোখদুটো ছেড়ে দিয়ে বললো ।

তুমি কী করে জানলে?

সেটা একান্তই আমার ব্যপার ।যাকে ভালোবাসি তার বার্থ ডে জানবো না? তাও হয় নাকি? বলেই ইংরাজি গানটা ফোনে বাজাতে লাগলো

“হ্যাপি বার্থডে টু ইউ…” আর এই যে ম্যাডাম এটা আপনার বার্থ ডে গিফ্ট ।বলেই একটা ফাইব ইঞ্চির স্মার্ট ফোন দিল ওকে ।

ফোন!? চোখদুটো বড়বড় করে বললো বৃন্দা বাবা জানলে আর রক্ষা নেই ।না না এটা আমি রাখবো কোথায়?

কেন? লুকিয়ে রাখবে ।প্লিজ এটা রাখো ।নাহলে তোমার সাথে আমার কথা হবে কীকরে?

অনেক অনুরোধের পর ফোনটা নিল বৃন্দা।আর লুকিয়ে রাখলো ।পাছে বাপি টের পায় ।

এবার আমার গিফ্ট কই?

আমি তো কিছু আনিনি অনিক ।হতবম্ভের মত চেয়ে রইল বৃন্দা।

তা বললে তো হবে না, আমারও গিফ্ট চাই ।যা চাইবো তাই দেবে তো?

আরে আমার কাছে থাকলে তো দেবো? আচ্ছা কী চাও বলো?

আগে প্রমিজ করো,যে যা চাইবো তাই দেবে ।

আচ্ছা বাবা বল তো?

তোমাকে একবার হাগ করতে দেবে?

নিরুত্তর বৃন্দা ।মুহুর্তের মধ্যেই বিদ্যুতের মত রোমাঞ্চ লাগলো ওর গায়ে ।কিন্তু মুখে কোনো কথা নেই ।

“মৌনতা সম্মতি লক্ষনম “প্রবাদ বাক্য টি মনে মনে পাঠ করে একুশ বছরের ছেলেটি ধীর পায়ে এগিয়ে গেল ঊনিশ বছরের মেয়েটির দিকে ।তখন লজ্জায় আর ভয়ে লাল হয়ে বৃন্দা দুই চোখ বন্ধ করে দিল ।আবেগ ভরা দুজনের শরীরে তখন উত্তাল ঢেউ ।দুজনেরই ভেসে যেতে ইচ্ছে করলো জোয়ারে ।অনেকক্ষণ আলিঙ্গনের  সময়ে দুটো ঠোঁট ও সেদিন মিলেছিল একটা মোহনায় ।এ যেন এক নতুন পৃথিবী।বাঁধাধরা জীবনের গন্ডি পেরোনো দুটো পাখনা মেলা পাখি প্রথম নিয়ম লঙ্ঘন করেছিল সেদিন ।

হয়ত বাবা তখন স্কুলে পড়া মেয়েদের সংযম শেখাতে ব্যস্ত ।মা বসে আছে গীতাই মুখ গুঁজে ।আবেগের পৃথিবীটা এত সুন্দর তা বোঝার সময় জীবন আমাদের দেয় ।আমরা কেউ কেউ এতটাই ভেসে যাই যে কূল খুঁজে পাইনা শেষ পর্যন্ত ।আবার কেউ কেউ বিবেক দিয়ে ভাবি  কিন্ত আবেগ কে বাদ দি না ।আবেগ আর বিবেকের সংযোগে গড়ে ওঠে সংসার ।আর  বাবার শাসনের বৃন্দাদের ফোনে ছেলেবন্ধুর দেওয়া লুকানো মোবাইল এর রিংটোনে তখন বেজে ওঠে

“শুধু তুমি চাও যদি, সাজাবো আবার নদী, এসেছি হাজার বারণে “

-(সমাপ্ত)


FavoriteLoading Add to library

Up next

বেইমান- তমালী চক্রবর্ত্তী... সব্জিভর্তি থলে নিয়ে অনেক কষ্ট করে বাড়ির দরজার তালা খুলল ফাতিমা বেগম। আজকাল আর আগের মতো দৌড়ঝাঁপ পোষায় না। ৬০ তম বসন্ত কিছুদিন আগেই পেরিয়েছে, হাঁপ ধরা স...
আমার বন্ধু অমলকৃষ্ণ... - দেবাশিস ভট্টাচার্য    কলেজে পড়ার সময় বেশ কয়েক বছর আমাকে কলুটোলার একটি মেসে থাকতে হয়েছিল। আমার বাড়ি মেদিনীপুরে। রোজ কলকাতা  যাতায়াত এর অসুবি...
কিপটে ভূতের গল্প – শাশ্বতী সেনগুপ্ত...       নাদেশ্বর বাঁড়ুজ্যে মরে গেলেন। ভূত হয়ে ভূত জগতে পর্দাপণ মাত্রই শুনতে পেলেন তাকে নিয়ে ফিসফিসানি আরম্ভ হয়েছে। তিনি হাওয়ায় কান পাততেই কথা স্পষ্ট হল,...
ভালোবাসার শহর – সুশান্ত ভট্টাচার্য... রোজ সকালে পিহু তার এসি গাড়িতে করে তার স্কুলে যায় আর সেই গাড়িতেই ফিরে আসে । এসেই তার খিদে পায়, মায়ের হাতে ভাত খেয়ে তার নিজের ঘরে খাটে গোলাপী চ...
আদমিভ – সৌম্য ভৌমিক... ওই যে গাছের কোটরখানি উলঙ্গ হয়েছে আজ, জীর্ণ পুরুষ শীর্ণ পিতা ছেড়েছে রাজার সাজ। হে পুরুষ তুমিও তো আয়েসি হতে পারতে, শীতের রাতে আগুনশিখা বুকের থেকে কাড়...
মন মিলান্তি(পর্ব-৪~শেষ পর্ব)... #মন_মিলান্তি_পর্ব_৪ #মুক্তধারা_মুখার্জী #চরিত্র_ঘটনা_কাল্পনিক,#মিল_খুঁজে_পেলে_লেখিকা_দায়ী_নন😊 বমিটা হওয়ার পর থেকেই শরীরটা কেমন করছিল যেন শ্রেয়সীর। ত...
কল্পনায় অ্যাটলান্টিস... - রাজদীপ ভট্টাচার্য্য   সম্প্রতি ২২ সে জুলাই দা ওয়ার্ল্ড অফ ডি সি সিনেম্যাটিক ইউনিভার্স এর অন্যতম ছবি একোয়া ম্যান এর প্রথম ট্রেইলার রিলিস হ...
মৃত্যুহীন ভালোবাসা... - ডঃ মৌসুমি খাঁ ভালোবাসার মৃত্যু নেই সে চিরন্তন বয়ে চলেছে হৃদয় জুড়ে - মনের এক ফল্গু নদীর চোরাস্রোতের মতো, কখনও উদ্দাম উচ্ছল জলধারা ভাসিয়ে নিয়ে য...
বাংলা ছায়াছবির বাদশা... শাহরুখ খানকে বলা হয় বলিউডের বাদশা। কারন তিনি "বাদশা" বলে একটি হিন্দী ছবিতে অভিনয় করেছিলেন। ছবিটি ফ্লপ করেছিল। কিন্তু তার বহু আগে এই বাংলায় "বাদশা" বলে...
বিলম্বিত মানিক প্রাপ্তি – অস্থির কবি... নবরত্ন পত্রিকার জন্মলগ্ন থেকেই চলচ্চিত্র সংক্রান্ত লেখা এই পত্রিকাটিতে আমি লিখে আসছি। পত্রিকা কর্তৃপক্ষের আগ্রহ এবং তাদের শ্রদ্ধা সম্মানে ভীষণই অভিভূত...
ADMIN

Author: ADMIN

Comments

Please Login to comment