শেষ থেকে শুরু

-পায়েল সেন

 

 সেদিন খুব বৃষ্টি হচ্ছিলো। তাই সুজয় চললো তার ঘরের সমস্ত জানলা বন্ধ করতে। ভিজে গিয়েছিল প্রায়। ঘর অন্ধকার করে এসে একমনে বসেছিলো সোফায়।  লক্ষ্য করছিল সেই রঙিন কাগজে মোড়ানো  রিতার উপহারটাকে।
আজ প্রায় তিন মাস হয়ে গেছে। সুজয় খুলেও দেখেনি রিতার সেই উপহার। তাই আজ একা অন্ধকার ঘরে সুজয় একে একে রঙিন কাজের মোড়ানো মলাট খুলতে লাগলো, কৌতূহল হলো রিতার মতন এক স্বার্থপর মেয়ে কিইবা দিতে পারে?

চমকে উঠলো সুজয়। সুজয়ের না পাওয়া সবচেয়ে প্রিয় একটি গল্পের বই। “রিতা কি ভাবে পেলো এই বই”। না জানি, কিসের এক উৎকণ্ঠায় কাটছিল সুজয়ের প্রতিটা মুহূর্ত।

প্রায় দু বছরের আলাপ সুজয়ের সাথে রিতার। কলেজে তাদের বিষয়ও পর্যন্ত একই ছিল। তাই বেশ বন্ধুত্ব হয়ে উঠেছিল সুজয়ের সাথে রিতার। এক সাথে কলেজে যাওয়া, পড়তে যাওয়া, আরও বন্ধুদের সাথে ঘুরতে যাওয়া সবই চলছিলো একে একে। তারই মধ্যে বেশ কিছু বার শারীরিক সম্পর্কেও মিলিত হয়ে ছিল তারা দুজন। বেশ চলছিলো এক বছর। সমস্যা শুরু হতে থাকে তারপর থেকে। কেন জানি হটাৎ রিতা এড়িয়ে যেতে থাকে সুজয়কে।

প্রথম প্রথম সুজয়ের মনে হয়েছিল হয়তো কোনো কারণে রিতার তার প্রতি অভিমান হয়েছে কিন্তু সুজয়ের সেই মনে হওয়াও টেকে নি বেশি দিন। মাঝে রিতা এমন ভান করতে শুরু করলো যে, সুজয় তার কাছে শুধু বন্ধু ছাড়া আর কিছুই নয়। সুজয় বহুবার চেষ্টা করেছিল রিতার মান ভাঙাতে। কতো বার নিজের অজান্তেই সুজয় ক্ষমা চেয়ে কেঁদে পর্যন্ত পড়েছিল রিতার সামনে। তবুও রিতার  ব্যাবহার সামান্যও বদলায়নি। বরং আরো কঠোর হয়েছিলো দিনের পর দিন।

সুজয় এই সমস্ত মনে করে রিতার বই টাকে ছুড়ে ফেলে দিলো ডাস্টবিনকে উদ্দেশ্য করে। আর ঠিক তখনই বইয়ের পাতার মাঝখান থেকে বেরিয়ে এলো  সাদা একটি কাগজ ভাঁজ করা। সুজয় লাফিয়ে উঠলো সোফা থেকে আর হাতের মুঠোয় নিয়ে খুললো সেই কাগজ। সুজয় প্রায় চমকে উঠলো, এতো তিন মাস আগে রিতার লেখা একটি চিঠি। সুজয় সময় নষ্ট না করে পড়তে শুরু করলো…..

 

 

প্রিয়
সুজয়,

জানি তুমি আমাকে কোনো দিনও ক্ষমা করতে পারবেনা। আমি প্রতি নিয়ত তোমার ভালোবাসা কে অবহেলা করেছি। সম্মান দিইনি তোমার চোখের জলের। তার আজ আমি দোষী। মহা পাপী আজ আমি।
জানতে পেরে ছিলাম সেদিন সকালে, যেদিন তোমার চিলেকোঠার ঘরে তুমি আমায় জড়িয়ে ধরে ছিল। আর আমার বুকে মাথা রেখে বলেছিলে, “তোমায় জড়িয়ে ধরলে আমি এক অদ্ভুত শান্তি পাই”। আমি বলতে পারিনি জানো, আমার মনে লুকিয়ে রাখা কঠিন সত্যি টাকে।

আমি মরে যাচ্ছি সুজয়, আমি মরে যাচ্ছি। লিভারে ক্যানসার ধরা পড়েছে আমার তাও শেষ পর্যায়ের। বেঁচে থাকার সম্ভবনা আমার একে বারেই নেই।
সেদিন তোমার সাথে দেখা আমি মোটেই করতে চাইনি, কিন্তু তোমায় না দেখে থাকতেও পারিনি। ভেবেছিলাম তোমায় সবটা বলবো খুলে কিন্তু পারিনি। আমার নিজের কষ্ট, ভালোবাসার দোহাই দিয়ে তোমার ওপর চাপিয়ে দিতে পারিনি।

সত্যি বলছি, ক্যানসারের কষ্ট ততটা হয়নি যতটা তোমার কাছ থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখতে হয়েছিল। রোজ রোজ যেন আমার শরীরের গঠন একটু একটু করে ভাঙছিলো। অনুভব করছিলাম কোনো এক মরণ খাদক পোকা আমার শরীরের ভিতরে নিজের লালসা পূরণ করছিল। আর শেষ করছিল আমায় একে একে।

কি করেই বা আসতাম তোমার কাছে? কি করেই বা, তোমার চোখে দেখতাম নিজেকে? তাই ফন্দি করে ছিলাম মনে মনে, তোমার কাছে নিজেকে ছোট করার। তাই তোমার সমস্ত ভালোবাসা কে অবহেলা করেছিলাম আমি। হেঁসে উড়িয়ে দিয়ে ছিলাম তোমার কান্নাকে।
মনে আছে, তুমি একটা সাদা রুমাল দিয়ে ছিলে আমায়। আর তারপর প্রশ্ন করে ছিলে বারংবার, আমি সেটা ব্যাবহার করিনা কেনো? রক্ত লেগেছিল সেটাতে। আমার মরে যাওয়ার প্রমান আরো স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল তোমার ভালোবাসায়। তাই আনতে পারিনি তোমার সামনে, সেই না ওঠা রক্তের দাগ।

শরীরের অবস্থা বিশেষ ভালো না। কেমো তেও এখন আর কোনো লাভ হচ্ছে না। রক্ত বমি হচ্ছে ক্রমাগত। আয়নার সামনে এখন আর দাড়াই না। শরীর যেন কেমন ফ্যাকাশে হয়ে গেছে।
মায়ের শরীর টা ভালো নেই। বোধয় কাঁদতে কাঁদতে শরীর খারাপ করে ফেলেছে নিজের।
হয়তো এই সব জানার পর তুমি দয়া করবে আমায়। কিন্তু বিশ্বাস করো তোমার চোখে ভালোবাসা ছাড়া আর অন্য কিছুই আমি চাই না।

তবুও নিরুপায়, একবার এসো আমার বাড়িতে। বড্ড দেখতে ইচ্ছে করছে তোমায়। আর সাথে দুটো গোলাপ এনো।
এই বইটা উপহার সমেত দিলাম। আমার অস্তিত্বকে মনে রাখার জন্য।

– তোমার রিতা।

 

 

সুজয় যেনো ভাবতে পারলো না আর এক মুহূর্ত। চোখ ভরে গেলো জলে। রাগে, লজ্জায় নিজের মাথার চুল ধরে গোঙাতে লাগলো। এক টানে সমস্ত বই খাতার  টেবিলকে লন্ড ভন্ড করে মেটাতে লাগলো নিজের অপরাধের স্বাদ। জানলার কাঁচের মধ্যে কুপাতে লাগলো নিজের হাত কে। ঘরে এখন শুধু রক্ত। ইতিমধ্যে সুজয়ের মা কিছু অদ্ভুত আওয়াজ লক্ষ্য করছিল সুজয়ের ঘর থেকে। সেই আওয়াজ আরো তীব্র হতেই এক ছুটে ঘরে এসে দেখে ব্যাথায়, যন্ত্রনায় সুজয় কাতরাচ্ছে। ছেলের এই রূপ ব্যাবহারে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো সুজয়ের মা। কিন্তু সুজয় থেমে থাকার পাত্র নয়।

মায়ের কাছ থেকে নিজেকে মুক্ত করে ওই রক্তাক্ত অবস্থায় সে চললো রিতার বাড়ির উদ্দেশ্যে। তখন আর অটো ধরার সময় নেই, তাই ছুটতে লাগলো। অজানা এক অদ্ভুত ভয় যেন ক্রমাগত গ্রাস করছিল সুজয়কে। যদি অনেকটা দেরি হয়ে যায়, রিতা যদি আর না থাকে।

অনেক মানুষের জটলা দেখতে পাচ্ছিল রিতার বাড়ির সামনে। আর যেন এক পাও এগোতে পারলো না সুজয়। কঠিন বাস্তবের মুখোমুখি হওয়ার ভয়ে পা দুটো লোহার মতো শক্ত হয়ে উঠেছিল। তবুও সাহস নিয়ে ভিড় ঠেলে এগিয়ে যেতেই দেখে রিতা শুয়ে আছে, মেঝের মধ্যে। একটু দূরে থাকা কাঁচের গাড়ি। সব শেষ। শেষ বারের মতোন আর দেখা হলো না সুজয়ের মুখ রিতার।

অনুশোচনায় কঁকিয়ে উঠলো সুজয়। প্রায় পাগলের মতো ছুটে গেলো রিতার কাছে। সমানে দেখে রিতার মা বাবা দাঁড়িয়ে আছে। কি সুন্দর দেখতে লাগছে রিতাকে! মনে হয় শরীরের সমস্ত অসুখ বিদায় দিয়েছে। ঠিক আগের মতোই স্নিগ্ধ লাগছিলো রিতার মুখ। অজানা এক অলৌকিক সুখ আবদ্ধ করেছিল সুজয় কে। শরীরের ভেতর সমস্ত সুনামি শান্ত হচ্ছিল ধীরে ধীরে। সুজয় রিতার ঠান্ডা হাতটাকে নিজের আঙুলের ফাঁকে বন্ধী করলো। এ যেন চির বিদায়ের সময়।

ওদিকে শেষ প্রস্তুতিও প্রায় শেষ। দেহকে এবার চিরতরে বিদায় করার পালা। কান্নার হুল্লোড় উঠলো চারিদিকে। কিছু বোঝার আগেই রিতার বাবা সহ আরো কয়েকজন রিতার দেহকে তুলে শব গাড়িতে নিয়ে যাওয়ার উপক্রম করলো। সুজয় চিৎকার করে উঠলো। সে কিছুতেই রিতা কে যেতে দেবে না। পাগলের মতো গাড়ির দরজা আটকে দাঁড়িয়ে রইলো। এক টানে রিতার বাবা সুজয় কে মাটিতে ফেলে দিলো। গাড়ি চললো শেষের উদ্দেশ্যে।

পায়ের সামনে বড়ো পাথর টাকে লক্ষ্য করতে পারেনি সুজয় তাই  মুখ থুবড়ে পড়লো বড়ো রাস্তার উপর। উঠার ক্ষমতা আর নেই সুজয়ের। চোখের সামনে রিতার গাড়ি চলে গেল। সুজয় হাহাকারে কাঁদতে লাগলো। চোখের সামনে ভেসে উঠতে লাগলো, সেই চেনা কলেজ, ক্লাসের মাঝে হাত ধরে বসে থাকা রিতার। ব্যাগ নিয়ে মারপিট করা। গলা ছেড়ে গান গাওয়া। রিতার জন্য আইস-ক্রিম আর এক জোড়া কানের দুল উপহার দেওয়া। দুজনের একসাথে থাকার শপথ।

আবারও হয়তো পারতো সুজয় ছুটতে সেই না ফিরে আসা ইচ্ছের পিছনে। না, সে তখন ভাসছে হওয়ায়, মেঘের ওপারে। হাতে সেই সাদা রুমালে  দাঁড়িয়ে আছে রিতা।

(সমাপ্ত )


FavoriteLoading Add to library

Up next

ভূত-ভবিষ্যৎ -প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়     সহেলি পাশ ফিরে শুলো। আজ তেমন গরম নেই। কারণ ক’দিনের বৃষ্টিতে বেশ চমৎকার আবহাওয়া হয়ে গেছে। ঘরের দুটো বড় জানালা খুলে...
স্ফুলিঙ্গ –  কৌশিক প্রামাণিক...   আজ যেন সব হারিয়ে যেতে চাইছে ক্ষণিকের মিথ্যাগুলোর জন্যে, তবু তো আমি আঁকড়ে ধরতে চেয়েছিলাম সেই পুরোনো তোমাকে | এই সেদিনকারই তো কথা যেদিন আমায...
শেষ ঠিকানা -স্নিগ্ধা রায়... অস্তমিত সূর্যের গোধূলী আলোয় ম্লান হয়ে আসা দিনের শেষে ক্লান্ত বিধ্বস্ত পায়ে তখন শুধুই ঘরে ফেরার তাগিদ, শ্মশানের অশ্বত্থ গাছের ডালে চলছে কাক চিলের মিট...
Poem…ফাগুনের ডাক   ফাগুনের ডাক চারিদিকে শুধু জ্বলছে আগুন জ্বলুক না, আজ আগুনকে বইছে ফাগুন বউক না।।   বনভূমিতে আজ আবির রঙ লাগুক না, পলাশ শিমুলে যেন খুশির ঢঙ জাগুক না।।...
খতরনাক খেল – সৌম্যদীপ সৎপতি... খেলার কথা শুনবি যদি, বলছি যা দে মন তাতে, দেখেছিলুম খেল একখান হ্যালোইনের সন্ধ্যাতে। সেদিন রাতে ভূতুম পাড়ার "মামদো ইলেভেন্স" দলে "স্কন্ধকাটা ক্লাব"কে...
মায়ের টানে – সমর্পণ মজুমদার... বাড়ি যাবার সকালের ট্রেনটা ধরতে গেলে আমায় সাড়ে চারটে থেকে পৌনে পাঁচটার মধ্যে বাস ধরতে হয়। দারুন একটা রোমাঞ্চ হয়। তার উপর এখন আমি পুজোয় বাড়ি যাচ্...
আত্মোপলব্ধি -দীপ্তি মৈত্র... সাহিত্যের রূপ দুটি,তথ্য ও সত্য। তথ্যের মধ্যে জ্ঞান থাকে, সত্যের মধ্যে বোধ। সাহিত্যের সত্য আর অন্তরের সত্য মিলে সৃষ্টি হয় নতুন সত্ত্বা- তার নাম আ...
নিজের সঙ্গে দেখা - দেবাশিস ভট্টাচার্য   আজ বিয়ের পঁচিশ বছর সম্পূর্ণ হলো।আমি অনিন্দিতা বসু।  ব্যাংক এর ডেপুটি ম্যানেজার সায়ক বসুর স্ত্রী। নবনীতা বসুর মা। এই এখ...
সত্যজিতের চিড়িয়াখানা-প্রচুর আলোচনা ও সামান্য সমালো... একটা সিনেমা তৈরির পেছনে যে ইন্টারেস্টিং গল্পগুলো থাকে তা দিয়েই হয়তো আরেকটা সিনেমা বানানো হয়ে যেতে পারে। এরকম বহু ছবি আছে যা তৈরি হতে হাজারো বাধা এসেছি...
অমানুষ, এক অমর উত্তম গাথা-... - অস্থির কবি (কল্লোল চক্রবর্ত্তী) (উত্তম পর্ব ২) উত্তম কুমারের প্রায় শেষ দিকের অভিনয় জীবনের এক মাস্টার স্ট্রোক হল - "অমানুষ"। এই ছবির পর তিনি বম্বেত...
Admin navoratna

Author: Admin navoratna

Happy to write

Comments

Please Login to comment