শ্রীকৃষ্ণ বিচ্ছেদে – রুমাশ্রী সাহা চৌধুরী

শ্রীকৃষ্ণ বিচ্ছেদ অনলে মোর অঙ্গ যায় জ্বলিয়া..কানে হেডফোন মনে বিরহযন্ত্রণা,চোখটা আজ বড় ছলছল করছে শ্রীরাধার। ট্রেনের জানলা দিয়ে মুখটা বাড়ায় বাইরে, সবাইকে কত বাড়ির লোক সি অফ করতে এসেছে। এমন তো আগেও কতবার ট্রেনে করে গেছে,আসতো একজন হাগ করতো,কখনো তার ঠোঁটটায় ছুঁয়ে যেত ওর কানটা। না না সবার সামনে অন‍্য সময়ের মত আদর করে নরম কানটা কামড়ে দিতে পারত না। তবুও লেগে থাকত এক মনকেমন করা স্পর্শ। আজ এত ভিড়ের মাঝেও বড় ফাঁকা লাগলো স্টেশনটা,চশমার ফ্রেমটা অভিমানে একটু একটু করে ঝাপসা হয়ে সব আবছা করে দিলো।
থাক সবাই নিজের মত করে,থাকুক তিলোত্তমা কলকাতাও। আর কখনো আসবে না,কখনো আসবে না এখানে। অভিমানে আড়ি করেছে ময়দানের সবুজ গাছগুলোর সাথে যেখানে হেলান দিয়ে বসত ওরা। কখনো বসে বসে খেত ঝালমুড়ি বা বাদামভাজা। আজকাল বোধহয় বাদামভাজা খেয়ে কেউ প্রেম করে না,সবাই বিরিয়ানি বা পিৎজা বার্গার খায় ঠান্ডা ঘরে বসে আর সেল্ফি তুলে পোস্ট করে। শুধু পাগলি ছিলো শ্রীরাধাই তাই খোলা আকাশের তলায় বসে সবুজ দেখতে দেখতে আর বকবক করতে করতে প্রেম করতে ভালোবাসত।
ভিক্টোরিয়ার নিরিবিলি আড়াল বা কফিহাউসের আড্ডায় বসে স‍্যান্ডউইচে কামড় দিয়ে কফিতে চুমুক দেওয়া আর প্রাণখোলা হাসিতে গড়িয়ে পরা সবটাই আজ তিনশত্রু ওর কাছে। আর কোনদিন যাবে না ওখানে,কেন যে ঐ জায়গাগুলো শুধু চোখে আর মনে দোলা দিয়ে যায় এখনো। শ্রীরাধা চলে যাচ্ছে মেঘের দেশে হঠাৎই এসেছিলো কলকাতায় পড়াশোনা করবে বলে। পড়াশোনার সাথে সাথে ওর বৃষ্টিভেজা সবুজ মনটা ছুঁতে চেয়েছিলো কৃষ্ণেন্দুকে,রাধা মজা করে বলত আমার কালা কানাইয়া।
মা বলতো,’সাবধানে থাকিস রাধে,এই পাহাড় ছেড়ে থাকতে পারবি তো শহরে?শহরের লোকগুলো যে বড় কাঠখোট্টা,ওদের মন হয় না।’
সত‍্যি বোধহয় শহরের লোকেদের মনগুলো বড় মোড়কে মোড়ানো। তার ভাজে ভাজে যে কি খবর লেখা আছে কেউ জানে না কখনো,তাই তো ও কানাইয়ার মনের খবর জানতে পারেনি।

       ট্রেনের হুইসেল বাজলো,এই ছাড়বে এক্ষুণি। মা ফোন করলো সব ঠিক আছে তো। এন জি পিতে থেকে সোজা চলে যাবে পাহাড়ের কোলে ওদের ছোট গ্রাম সিটং। নামটা মনে হতেই মনটা জুড়িয়ে গেলো ওর,কমলালেবুর গাছ ঘেরা ওদের ছোট আস্তানা পাহাড়ের কোলে। একটু এগিয়ে গেলেই দেখা যায় রূপসী কাঞ্চনজঙ্ঘাকে প্রাণভরে। মাঝে মাঝে বইখাতা নিয়ে কমলালেবুর বাগানে বসে গায়ে মিষ্টি রোদ মাখতে মাখতে পড়ত ও। মা ওখানেই একটা স্কুলে পড়ান,ওর মা এখানকার মেয়ে বাবা কখনো এদেশে কাজে এসে মায়ের প্রেমে পড়েছিলেন। বাবা এখন নেই,ও দাদা আর মা আছে। দাদা কালিম্পঙের কনভেন্টে পড়ায়,ওখানেই থাকে,মাঝে মাঝে আসে। মা মাসিদের সাথে থাকে তবুও ফোন করলেই বলত,’রাধে পরীক্ষা হলেই চলে আসিস,পড়া তো তোর প্রায় শেষ। তোর কানাইয়াকে একবার নিয়ে আয়। আমাদের কমলালেবু গাছগুলোর তলায় বসে অনেক গল্প করবো।’
ট্রেন ছাড়লো,ভালোবাসার মানুষের শহর ছাড়িয়ে অনেক দূরে চলে যাচ্ছে রাধে। মা ডাকে ওকে এই নামে,আদর করে বার বার বলে রাধে রাধে। সত‍্যিই কি সব যুগের রাধারাই এমন কপাল পোড়া! হঠাৎ করেই কৃষ্ণেন্দুর ফোনটা সুইচড অফ,ও নেই কোথাও নেই। ওদের বাড়িতে কোনদিন যায়নি রাধা আসলে আলাপ হয়েছিলো ওদের ময়দানের গা ছুঁয়ে যে ট্রাম যায় সেখানেই। পাগলী রাধা,বৃষ্টি মাখবে বলে মুখ বাড়িয়েছিলো জানলা দিয়ে,হাতদুটো ছড়িয়ে দিয়েছিলো টুপটাপ বৃষ্টি ছুঁয়েছিলো ওর কাঠের লাল সবুজ চুড়িগুলো। বকুনি খেয়েছিলো কন্ডাক্টারের,হাসির শব্দ শুনে মুখ ঘুরিয়েছিলো দেখেছিলো নীলশার্টের একটা ছেলে বলছিলো,’আমার মত পাগল পাবলিক তাহলে আছে!’
পরে শুনেছিলো ঐ সবুজটুকু ছোঁয়ার জন‍্য সকাল সকাল অফিসে বেড়িয়ে যায় ট্রামে। ম‍্যাচ করে গিয়েছিলো দুজনের কেমেষ্ট্রী,একজনের বিশ্ববিদ‍্যালয় আরেকজনের অফিস আর তার ফাঁকেই জীবনানন্দ আর শক্তি চট্টোপাধ‍্যায়। রাধা কবিতা শুনতে ভালোবাসত আর কৃষ্ণেন্দু শোনাতে। রাধা গাইত সিটংয়ের নেপালী গান আর কৃষ্ণেন্দু রবীন্দ্রসঙ্গীত।
কৃষ্ণেন্দুকে চিনেছিলো একবছর,ওর বাড়ি চেনা হয়নি। শুনেছিলো ওর বাবা নেই,মা আর ও থাকে,বোনকে পড়তে পাঠিয়েছে ব‍্যাঙ্গালোরে। সংসারে ওদের প্রাচুর্য তেমন নেই তবে আর কয়েকটা বছর পরে রাধের মুঠো ভরে দেবে সুখের চাবিতে। হঠাৎ একটা ছেলে হারিয়ে গেলো,কোথায়? কদিন ধরেই দেখেছিলো অন‍্যমনস্ক বলেছিলো,’এই কোম্পানীর চাকরিটা ছাড়বে,ভালো একটা অফার পেয়েছে হয়ত চলে যেতে হবে।’…ক়েঁদেছিলো রাধা,’ ময়দানের সবুজে আমায় একা ফেলে রেখে চলে যাবে?’..’তুমি তো ফিরবে রাধে সিটং। কমলালেবুর গাছে হেলান দিয়ে হঠাৎ দেখবে আমি এসেছি তোমায় নিয়ে বাসা বাঁধবো বলে কোন এক সবুজ প্রান্তরে।’

          আজ সবই গল্পকথা,শহরের মানুষের কাছে ঠকে গিয়ে শ্রীরাধা ফিরে চললো আজ নিজের দেশে। পাশের বাড়ির কেউ জানেনা,ওরা হঠাৎ চলে গেছে কোথায় কাউকে বলে যায়নি। অফিসে নাকি রেজিগনেশন দিয়েছিলো কয়েকদিন আগেই। ফাঁকি আর ফাঁকি সবটাই শুধু খেলা ছিলো,রাধের কৃষ্ণ আর ফিরবেনা, কেটে গেছে তার। তাইজন‍্যই তো শ্রীরাধাও আর মুখ দেখতে চায় না এই শহরের।
সারা ট্রেনেই বার বার ঝাপসা হয়ে গেল চশমার কাঁচটা,হয়ত নতুন কাউকে পেয়েছে জীবনে তাই এই রাতে অন্ধকারে তারা গুণতে ভালোবাসা পাগলীটাকে ফেলে পালালো। শরীরে আজ শুধুই বিচ্ছেদ অনলে পুড়ে যাবার দাগ। মা বললো,’কি হয়েছে রাধে?তোর কৃষ্ণ কালা কবে আসছে?কমলালেবুগুলো যে এবার পাকবে। গায়ে শালটা জড়িয়ে চোখটা মুছে বলে,’কৃষ্ণ কালা ভুলে গেছে রাধেকে।’..সব বোঝে গায়েত্রী,’বলেছিলাম না শহরের মানুষগুলো এমনি হয়।’

সিটংয়ে কমলালেবুর গন্ধ নিতে নিতে রাধার মন উড়ে যায় কখনো বাবুঘাটে,কখনো বা ভিক্টোরিয়ায়। মনের চোখটা কেন যে এত বাজে কে জানে সবসময় ঝাপটা দিয়ে মনে করিয়ে দেয় অতীতকে। তবে নিজেকে গুটিয়ে রাখেনি শ্রীরাধা নর্থবেঙ্গল ইউনিভার্সিটি থেকে রিসার্চের কাজ শুরু করেছে। মাঝে মাঝে ওকে যেতে হয় শিলিগুড়ি থেকে শিবমন্দিরে। মা আর দাদা সবসময় উৎসাহ দেয় পড়াশোনা করতে। মাঝে কেটে গেছে দুটো বছর,ওর প্রেমের শহর কলকাতায় আর পা রাখেনি ও,আড়ি করে এসেছিলো সেই কবে। তবুও একবার যেতেই হবে নাকি সেখানে,দরকার পড়েছে বেশ কিছু বইয়ের দেখে শুনে কিনতে হবে। সেই কলেজস্ট্রীটের বইপাড়া,ট্রামলাইনের ওপর দিয়ে হাঁটা টুংটুং ঘন্টি বড় কানে লাগবে তবুও যেতেই হবে।
মা বলে দিলো,’দুর্গাপূজোর আগেই চলে আসিস, দেরি করিসনা রাধে।’একা একা কাঁধে ব‍্যাগটা নিয়ে নামলো শিয়ালদা স্টেশনে,না কেউ আসেনি ওকে নিতে। দম আটকে আসলো এই ইটকাঠের শহরে,ময়দানের সবুজটা আর দেখতে ইচ্ছে করলো না। কলকাতা সাজছে পূজোর জন‍্য ঝকঝকে চকচকে হয়ে। তাতে কি ও তো চলে যাবে পূজোর আগেই,এখন কি আর যাবে ছোট ঝুমকো, চুড়ি আর কাঠের মালা কিনতে গড়িয়াহাট বা দক্ষিণাপণে। জাগবে না সারা রাত ম‍্যাডস্কস্কোয়ারে। ঝাল ফুচকা খেতে গিয়ে চোখের জল গড়ালে কেউ মুছিয়ে দেবে না আদর করে।

চলে যাবে ভাবলেও যাওয়া হলো না সব কাজ সারতে সারতে পূজো এসে গেলো। কাল সকালে ভোরের ট্রেনেই চলে যাবে শ্রীরাধা। আজ তো ষষ্ঠী,কাজ শেষ করে ডুব দিলো পাজি মনটা নষ্টালজিয়ার অলিগলিতে। তাই পারলো না রাধা একা একাই ঘুরে বেড়ালো ওদের প্রেমে পাগলামি করার জায়গাগুলোতে। ময়দানে,ভিক্টোরিয়ায়,বাবুঘাটে, ট্রামের জানলায়,মেট্রো স্টেশনে। সেই পুরোনো ঝালমুড়িওয়ালাটা,ওর হয়ত মনে নেই ওকে তবুও আজ ইচ্ছে করলো ঝালমুড়ি চিবোতে চিবোতে নষ্টালজিয়ায় ডুব দিতে। আজ মনে হলো ওর একবার যেতেই হবে,না গেলে ও পারবেই না ম‍্যাডক্সস্কোয়ারে। যে যাবার সে তো চলে গিয়েছে তবুও আছে স্মৃতিটুকু হৃদয়জুড়ে। তাই আজ শুধু ডাউনমেমোরি লেনে নিত‍্য যাওয়া আসা রাধার।
রাতে পায়ে পায়ে পথচলা,আর নিজের মনে মনে অনেক কথা বলা এভাবেই কখন যে রাধা এসে দাঁড়িয়েছে প্রথম হাতে হাত রেখে দুর্গা দেখার জায়গায় বুঝতেই পারেনি। এর মধ‍্যেই বেশ ভিড় প‍্যান্ডেলে এক পাশে দাঁড়িয়ে মনভরে দেখলো মাকে। মোবাইলে একটা ছবিও তুললো,কাল এই স্মৃতিটুকু নিয়ে চলে যাবে সিটংয়ে। আগের ছবিগুলো আর নেই,সিমটাও পাল্টে ফেলেছে একটা সময়ের পর। তবে মনে কখন যেন সবটা এসে যায় একটু আলগা পেলেই। ঠাকুর দেখতে দেখতে আনমনা হয়ে গিয়েছিল বেশ গরম এখনো,বাইরে এসে একটু নিশ্বাস নেয় রাধা। এখানেই তো প্রথম শাড়িতে ওকে দেখে গলাটা ঝেড়েছিলো কৃষ্ণেন্দু,’ইশ্ সবুজ পাগলী একদম সবুজ আর অরেঞ্জে এসেছে। দেখি দেখি ও বাবা! হাতে আবার ম‍্যাচিং চুড়ি। নাহ্ আমার হবু বৌ কিন্তু বেশ সুন্দরী চোখ ফেরানো যায়না।’…লজ্জায় মাথা নিচু করেছিলো শ্রীরাধা। আজ মনে হতেই এখনো শিহরণ জাগলো মনে।

        সবাই কত হৈ হৈ করছে মাঠে,বাচ্চাগুলো ছোটাছুটি করছে।    ‘না এবার চলে যেতে হবে,কাল ভোরে উঠতে হবে’। পা বাড়ায় শ্রীরাধা,হঠাৎই কানে আসে একটা পরিচিত গলা,গুবলু এদিকে,পড়ে যাবি যে।’…এগিয়ে যেতে গিয়েও থমকে পেছন ঘুরলো শ্রীরাধা। কিছুটা দূরে তবুও চিনতে ভুল হলোনা,এখন আর নীল শার্ট পরে না। অলিভ সবুজ শার্টে কৃষ্ণেন্দু,কোলে একটা বাচ্চা,ওর গলাটা জড়িয়ে। কৃষ্ণেন্দু বাবা হয়েছে,কি মিষ্টি বাচ্চাটা। আদুরে চোখে তাকিয়ে ওর মুখের দিকে কৃষ্ণেন্দু,ওর চোখেই পড়লো না কখন যে বিরহিনী রাধা চোখ ভর্তি জল নিয়ে চলে গেলো।
কেন যে এসেছিলো স্মৃতির নুড়ি পাথর খুঁজতে কে জানে? কৃষ্ণেন্দু এখন অন‍্যের স্বামী আর বাবাও,কেন যে প্রেম বারবার কাঁদায় রাধাদের? তাই বোধহয় আর সামনে যেতে পারেনি ওর। সারাটা ট্রেনে আজ আর চশমা পরা হলো না রাধার বার বার চোখের পাতা ভিজলো। এতটা অবিশ্বাসের কাজ করতে পারলো ওর কৃষ্ণ কালা! সিটংয়ের পথও আজ যেন ভিজলো,অভিমানী রাধার চোখের জলে। মা বললো,’রাধে এলি,এতো আনমনা কেন রে?সব ঠিক আছে তো?তোর কাজ হলো তো?’
ঘাড় নাড়ে রাধা,সব এলোমেলো যে আজ। বাচ্চাটাকে দেখে কিছু করতে পারেনি নাহলে হয়ত কৃষ্ণেন্দুর সবুজ শার্ট চোখের জলে ভিজিয়ে বলত,কেন এমন করলে?
পড়াশোনায় আবার ডুবে গেছে রাধা,কাজ বাড়িয়ে নিয়েছে। বন্ধুত্ব হয়েছে অনেকের সাথে শুধু প্রেমে কখনো ডুব দেয়নি মন। মাঝে কেটে গেছে বেশ কয়েকমাস,হঠাৎই সেদিন দেখা হয়েছিলো শুভর সাথে শিলিগুড়িতে। কৃষ্ণেন্দুই আলাপ করিয়েছিলো বলেছিলো বন্ধু,চিনতে চায়নি রাধা মুখ ফিরিয়েছিলো। ফোননম্বরটাও দিতে চায়নি। শুভ জানতে চেয়েছিলো এখন কোথায় থাকে ও। চলে যেতে যেতে রাধা বলেছিলো,’আমার যেখানে থাকার কথা ছিলো সেখানেই। যাতায়াত করি কখনো সিটং কখনো শিলিগুড়ি।’আর কথা বলতে ইচ্ছে করেনি রাধার।

      সময় বয়ে চলে নিজের খাতে,শ্রীরাধারও হঠাৎই চাকরি হয়ে যায় দার্জিলিংয়ের কনভেন্টে। আসলে ওর দরকার ছিল চাকরিটার। পাহাড়ের কোলে কোলে মেঘে মেঘে মনখারাপের খবর ছড়িয়ে গিয়েছিলো রাধার আর বেশিদিন হলেই হয়ত ধস নামত বড় রকমের। তাই খুব দরকার নিজেকে কাজের মধ‍্যে রাখার।
ছুটিতে রাধা বাড়ি গেছে,মা বসে থাকে ওদের দুই ভাইবোনের জন‍্য। কতবার মাকে বলেছে ওর সাথে গিয়ে থাকতে কিন্তু মায়ের নাকি কমলালেবুর গন্ধ নাকে না এলে ঘুমই আসেনা। সেদিন বিকেলে মেঘের আড়াল থেকে দেখা যাচ্ছে সোনায় মোড়ানো কাঞ্চনজঙ্ঘা,মন হারিয়ে যায় রাধার। মা হঠাৎই ডাকে,’রাধে,এধারে একটু আয় বেটিয়া। আরে শুনে যা তো।’ বাগান থেকে এদিকটায় এগিয়ে আসে রাধা কিন্তু দাঁড়াতে পারেনা সারা শরীরটা কেঁপে ওঠে,কৃষ্ণেন্দু! সত‍্যি কি সাহস একেবারে ছেলেকে কোলে নিয়ে এখানে। সাথে উনি তো মা,নিশ্চয় বৌকেও এনেছে। এরা কি চায়?আর কত অপমান করবে ওকে!
ঘরের দিকে পা বাড়ায় রাধা। ‘রাধা যেয়োনা,অনেক দূর থেকে আমরা এসেছি। গুবলুর ঠান্ডা লাগছে। একটু বসতে দাও অন্তত।’
মা এগিয়ে যায়,’মেহেমান রাধে ওরা,এসো তোমরা।’..মুখ ফেরায় রাধা,হাল্কা টান পরে ওর শালে, ‘মাম্মা’…পারেনা রাধা নিচু হয়ে কোলে তুলে নেয় গুবলুকে। ঘরে আসে ওরা রাধা শুধু শুনলো,বললো কৃষ্ণেন্দু আর ওর মা। চোখ গড়ালো আবার ওর দুই চোখ বেয়ে। গুবলুকে একদম চেপে ধরলো বুকের কাছে। ওর শরীরের ওমে ঘুমিয়ে পড়েছে পুচকেটা কখন যে বুঝতেই পারেনি। না না কৃষ্ণেন্দু বিয়ে করেনি হঠাৎই খবর আসে রাতারাতি ওদের চলে যেতে হয়। সে ছিলো এক দুঃস্বপ্নের রাত জানতে পারে ওর ছোট বোন প্রেগন‍্যান্ট,কে বা কারা একাজ করেছে জানতে পারেনা। কি করে যে বোনটা খারাপ হয়ে গিয়েছিলো বুঝতেই পারেনি। তখন বেশ অনেকটা দেরি হয়ে গেছে কিছু করার ছিলো না। ওরা কাউকে সেই লজ্জার কথা বলতে পারেনি,এলোমেলো হয়ে গিয়েছিলো সবটা। তারপর এক দীর্ঘ লড়াই,গুবলু এসেছিলো কিন্তু বাঁচাতে পারেনি কম বয়সী বোনটাকে। নিজেকেই বাবা হয়ে যেতে হয়েছিলো গুবলুর,বোনের কলঙ্ক ঢাকতে। তারপর চাকরি নিয়ে এদিকওদিক অনেকদিন ঘুরে পূজোতে কলকাতায় এসেছিলো কয়েকদিনের জন‍্য বাড়ি বিক্রী করতে। আর তাই বোধহয় রাধা দেখেছিলো কয়েক মিনিটের জন‍্য আর ভুল বুঝেছিলো। বোনের কথা বলতে বলতে কাঁদলো ওরা মা আর ছেলে। গুবলুর জগত শুধু মামা আর দিদা মানে ওর পাপা আর আম্মা। হঠাৎ কেন ছেলেটা এভাবে শ্রীরাধার কাছে দৌড়ে এলো?ও তো কোনদিন দেখেনি ওকে। শুনলো গুবলু এমনি মিষ্টি সবার কাছে যায়। আর ওর মায়ের ছবি দেখেই হয়ত রাধার কাছে এসেছে,কে জানে আজ আর কোন মান অভিমান আর ভুল বোঝাবুঝি টিকলো না। কৃষ্ণেন্দুর বুকে মাথা রেখে অভিমানে শুধুই কাঁদলো শ্রীরাধা,ও এতোটা পর যে একবারও ওকে বলা গেলোনা ওদের বিপদের কথা। কেন কৃষ্ণেন্দু করলো এমন?কৃষ্ণেন্দুর এলোমেলো জীবনে জড়াতে চায়নি রাধাকে।রাধার অভিমান আজ ধুয়ে মুছে গেলো কালিন্দীর জলে। বাইরের বৃষ্টিও আজ ধুয়ে দিলো পাহাড়কে,স্নান করলো পাহাড় আর শান্ত হলো রাধার মত।

      কৃষ্ণেন্দুর ঠিকানা আজও বড় এলোমেলো,চাকরিটা সবে নতুন। খুব ছোট বাড়িতে থাকে ওরা ব‍্যাঙ্গালোরে।শুভই ওকে বলেছিলো মানে মনে করিয়ে দিয়েছিলো আজও রাধা আছে অপেক্ষায়। মা শোনেনি কোন বারণ ছুটে এসেছিলো। রাধার আজ আর ভয় করেনা কৃষ্ণেন্দুকে ছেড়ে থাকতে। সে যুগেই হোক বা এ যুগেই কৃষ্ণ বোধহয় শুধুই রাধার। সত‍্যিকারের ভালোবাসা অভিমানে ঢাকা পড়লেও মনে বেঁচে থাকে চিরকালই। গুবলু শ্রীরাধার কনভেন্টে স্কুলেই পড়ে এখন। অবসরে ওরা পাহাড়ের কোলে রডোডেনড্রনের তলায় বসে অপেক্ষা করে, আর বেশিদিন নয় পাহাড় বলছে কৃষ্ণ আসবে তাড়াতাড়ি। হঠাৎই শ্রীরাধার ফোনটা বেজে ওঠে,একচিলতে রোদ্দুর খেলে যায় ওর মুখে মনে মনে বলে বাজলো আমার শ‍্যামের বাঁশী।

-সমাপ্ত


FavoriteLoading Add to library

Up next

লাইটহাউস – সৈকত মন্ডল... আরও একটা বছর, আরও কয়েকটা মাইলস্টোন, তাতে লেখা স্বপ্নপূরনের দ্বুরত্ব, আরও কিছুটা রাস্তা, অন্ধকার, তবে কেন জানিনা ঠিক নিসঙ্গ নয়, অচেনা, অজানা কেও...
ভালোবাসি অন্ধকারকে – রুমা কোলে... তোমার চাহিদা দিনের , আমার রাতটুকুই প্রিয় । তুমি ভালোবাসো আলো , আর আমি ! রাতের কালো । হ্যাঁ ,  কালো , অন্ধকার , কালো ঘুটঘুটে অন্ধকার , যেখানে নিজ...
মুক্তি  ‘আমায় তুমি মেরে ফেলবে মা? আমি মেয়ে সেটা কি আমার দোষ মা? আমায় তুমি বাঁচাবে না?'এক ঝটকায় চোখ দুটো খুলে ফেলল পাপড়ি। দরদর করে ঘামছে, গলা শুকিয়ে কাঠ...
শাসন - সরোজ কুমার চক্রবর্ত্তী   ড্যাডি বলে প্রফেসার মম্  বলে ডাক্তার দাদু , দিদা বলে ভাই হতে হবে অফিসার l বই আর খাতা নিয়ে কাটে সারাক্ষণ, ভাল...
পরিশোধ স্পৃহা -তুষার চক্রবর্তী...    সুমনা সোফায় বসে ফোনের অপেক্ষা করছে। বেশ অধৈর্য্য লাগছে। সময় যেন কাটছে না। চিন্তাও হচ্ছে। পল্লবের ছেলেরা কি ঠিকঠাক কাজটা করে উঠতে পারলো না! এতো দেরি...
ADMIN

Author: ADMIN

Comments

Please Login to comment