সংসার জীবন – প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়

ধ্যাৎ তেরিকা, এটা একটা জীবন হল! দিনরাত গাধার মতো খাটছি। কার জন্য খাটছি জানি না। কেউ কারোর নয়। মেয়ের বিয়ে হয়ে গেলে পর হয়ে যাবে। আদর করে মানুষ করলাম। গায়ে যেন আঁচড়টি না লাগে। তার সব কথা মেনে নিয়ে তাকে একেবারে চোখের মণি করে রাখলাম। যাঃ শালা। একদিন দেখি নিজের ঘরে রাত দুপুর পর্যন্ত ফোনে হাসাহাসি, ফিসফিস শব্দে কথাবার্তা। আমি বউকে বললুম, মেয়ের ঘরে শোবার চেষ্টা করো, গতিক ভালো ঠেকছে না। দিনকালকে বিশ্বাস নেই। বউ বলল, ওকে ওর ভালোটা বুঝতে দাও। আমি চুপ করে গেলাম। সংসার জীবনে কম কথা বলা সুস্থ্যাস্থের লক্ষণ।

সময় কেটে যায়। মেয়ে বড় হয়ে গেল। তার আলাদা জগত তৈরি হল। বেশিরভাগ কথাই জানতে পারি না। ডিগ্রি কোর্স শেষ করে চাকরি খুঁজতে লাগল। আমি বললাম, কি দরকার চাকরির? ভালো পাত্র দেখে বিয়ে দিয়ে দেব। ওমা, মেয়ে বলল, ও কথা বলো না বাবা। আমি বললাম, কেন? মেয়ে বলল, তুমি রাগ করবে নাতো? আমি বললাম, তোমার ওপর কবে রাগ করেছি হিসাব দাও। মেয়ে হাসি মুখে বলল, সেই জন্যই তো কথাটা বললাম বাবা। আমায় চাকরি পেতেই হবে। কারণ যাকে ভালোবাসি সে অতি সাধারণ একটা চাকরি করে। সংসার চালানো যাবে না। আমি অবাক হয়ে মেয়ের মুখের দিকে তাকালাম মাত্র। পাশে বউ ছিল, তিনি তেলেবেগুনে জ্বলে উঠে বললেন, যত বড় মুখ নয়, তত বড় কথা! তুমি ওকে প্রশ্রয় দিয়ে দিয়ে ছোট থেকে মাথাটা খেয়েছো। বিরাট চেঁচামেচি শুরু করল বউ। মেয়ে চুপ করে আছে। আমি ঘর থেকে বেরিয়ে গেলাম। রাতে বউ বলল, আমি অবাক হচ্ছি ভেবে, তুমি মেয়েটাকে কিছু বলছো না কেন? প্রশ্রয় দিচ্ছি কেন? আমি চুপ করে রইলাম। কারণ আমি যা বলব বউ বুঝবে না। ভাবলাম, কোনও ভাবেই মেয়েটার সুন্দর মনে আমি আঘাত দিতে পারব না। অনেক স্বপ্ন নিয়ে সে ছেলেটাকে ভালোবেসেছে। এটাই তো ভালোবাসা, ভালোবেসে সব করতে চাইছে। মনে মনে বললাম, সুখী হোস মা।

ছেলেটা বড় হয়ে ক্যাম্পাস ইন্টারভিউ থেকে চাকরি পেয়ে বাইরে চলে গেল। প্রথম প্রথম খুব আসত। ক্রমে কমিয়ে দিল। পরে ফোনে জানাল মাকে, একটা মেয়েকে ভালোবেসেছে। তাকেই বিয়ে করতে চায়। আর বিয়েটা হবে ওখানেই। দক্ষিণী মেয়ে, তাদের পরিবার চাইছে ওখানেই বিয়ে হোক। বউ তো কেঁদেই অস্থির। আমি বললুম, চলো, ঘুরে আসি। ছেলেমেয়েরা বড় হলে তাদের মতন থাকতে দাও। নিজের জীবনটাকে ওদের বুঝে নিতে দাও। এ প্রসঙ্গে একটা কথা মনে পড়ে গেল। একবার আমার এক আত্মীয় এসে বললেন, ছেলেটার বিয়ে দিলাম, এখন খুব বেগোরবাঁই করছে। দিনরাত অশান্তি করছে আমার বউ। আমি বললাম, একটা প্ল্যান দিচ্ছি করে দেখো। আত্মীয় বললেন, কি বলো? আমি বললাম, ছেলে-বউমাকে আলাদা করে দাও। ওরা ভালো থাকুক তোমরাও ভালো থাকো। কয়েক মাস পরে ওই আত্মীয় আর বৌদি এসে হাজির। হাতে ইয়া বড় মিষ্টির বাক্স। আমি বললাম, কি ব্যাপার গো? আত্মীয় হেসে বললেন, খুব আরামে আছি। বউমা আর শাশুড়ির খুব ভাব এখন। আলাদার ফল। আমি বউকে বললাম,  যেচে অশান্তি নিও না। প্রথমদিকে রাজি হয়নি বউ। শেষে বউ, মেয়ে জামাইকে নিয়ে আমি হাজির হলাম ওদের ওখানে। ছেলে খুব খুশি আমাদের পেয়ে। বউ মিশে গেল ওদের সঙ্গে। আমি একধারে বসে ভাবলাম, ছেলেমেয়ের মুখের এই তৃপ্তির হাসিটাই তো আমরা সারা জীবন ধরে চাই। ওরা সুখী হোক। বিয়ে মিটে যাবার পর আসার সময় ছেলে বলল, বউ নিয়ে যাব বাবা। আমি বললাম, তোমাদেরই তো বাড়ি বাবা। অবশ্যই এসো, থাকো। আমরা তো চাই।

সময় বহিয়া যায় নদীর স্রোতের প্রায়। কখন যে আমরা একেবারে বুড়িয়ে গেলাম কে জানে। এখন আর তেমন কিছু ভালোলাগে না। দিনরাত ঘড়ির দিকে তাকাই, কটা বাজে? নিজেকেই প্রশ্ন। তবু মাঝে মাঝে মেয়েটা আসে, নাতিটা আসে তাতে একটু মুখরিত হই দুজনে। তারপর যে কে সেই। হাঁ করে চেয়ার নিয়ে বারান্দায় বসে থাকি। পায়ে পায়ে হেঁটে যাব কবে সেই নদীর ধারে? ভয় হয়, কার জন্য এত কিছু করলাম? জীবনটাই বা কি! বউয়ের জন্য চিন্তা আসে। সে তো সবসময় মেয়ের সঙ্গে বকবক করছে। এই আজকে বিগ বাজারে তো কালকে আইনক্সে। কি একটা ছবি এসেছে। তোলপাড় চলছে চারিদিকে। অন্ধকার প্রেক্ষাগৃহে বসে মানুষ সমব্যাথী হয়ে চোখের জল ফেলছেন। ছবি শেষ হলে, আলো জ্বলে উঠলেই বদলে যাবে মুখোশের মুখগুলো। এরই নাম জীবন, এরই নাম সংসার।
অন্ধকার এখন খুব ভালোলাগে। চুপিচুপি ভাবনায় ছন্দপতন ঘটায় না। বউ বাড়িতে এসে খাবার টেবিলে কি ছবি দেখল, মুখস্থের মতো বলে যায়। ছেলেটা আসে না ওর বোধহয় মনেই নেই। অথবা নিদারুণ যন্ত্রণাকে বুকে চেপে রেখেছে। মেয়েরা সব পারে। মাঝে মাঝে আমার মুখের দিকে চেয়ে থাকে। তখন ভীষণ ওকে অসহায় মনে হয়। আমি জিজ্ঞেস করি, কিছু বলবে? ও ঘাড় নাড়ে, তার মানে নয়। ভাগ্যিস মেয়েটা ছিল নইলে কি নিয়ে বাঁচতো  ও?
কি আশ্চর্য আজ বিছানায় শুতেই আমার ভীষণ ঘুম পাচ্ছে। অন্যদিন তো পায় না! একি সত্যিই ঘুম নাকি রবি ঠাকুরের গানে বললে,  ‘ দিনের শেষে ঘুমের দেশে ঘোমটা-পরা ওই ছায়া ভুলালো রে ভুলালো মোর প্রাণ…’। হায় আমি তলিয়ে যাচ্ছি নতুন দেশে।

_____


FavoriteLoading Add to library
Up next
পরন্তবেলার সূর্য - বিদিশা মন্ডল   আমি কোথায়, কি হয়েছে আমার?"- দূর্ঘটনায় হাসপাতালে ভর্তি হওয়া শিবু জ্ঞান ফিরে পাবার পর যন্ত্রণায় কাতর হয়ে প্রশ্নগুলো করলো। নার্...
।।ঠোঁটের ভালোবাসা।।... ফেসবুক থেকে বেডরুমের জার্নিটা তোর মনে আছে?কি যে বলিস? ভোলার জো আছে?তোর এক ডাকেতেই কিভাবে ছুটে গেছিলাম নর্থ টু সাউথ?দরজায় তোর ফার্স্ট অ্যাপিয়ারেন্সেই...
বেগুনের বিরিয়ানী - অনামিকা দাস   আপনাকে যদি প্রশ্ন করা হয় যে আপনার "ক্রাশ" এর নামগুলি উল্ল্যেখ করতে,নিঃসন্দেহেই আপনি সেই তালিকার মধ্যে বিরিয়ানীর নামটাই সর্বপ্...
ওদের তো মন আছে, শরীর আছে – তুষার চক্রবর্তী... (১) সৌনক আটটা নাগাদ ঘুম থেকে উঠে মুখ ধুয়ে নিজের হাতে চা বানিয়ে নিয়ে, এসে বসেছে তার আট তলার ফ্ল্যাটের ব্যালকনিতে। সঙ্গে গত সোম থেকে আজ রবিবারের খবরের ...
মুর্শিদাবাদ ভ্রমণ, অন্যভাবে... -   অনুজিত দাস  আমরা সবাই যখন মুর্শিদাবাদ তথা হাজার দুয়ারী ঘুরতে আসি এবং সময়াভাবে শুধুমাত্র গঙ্গার পূর্বের দর্শনীয় ও ঐতিহাসিক স্থানগুলি এবং নবনির্মিত...
প্রথম মিস্টার পারফেকশানিস্ট-  অস্থির কবি ( কল্লোল ...   উত্তম পর্ব -তিন   ইদানিং বলিউডের আমির খানকে মিস্টার পারফেকশনিস্ট বলা হয়। যেমন এক কালে রাহুল দ্রাবিড়কে ওয়াল বলা হত। ক্রিকেট দেখা ছেড়ে দি...
কাল-পুরুষ ও পৃথিবী – রথীকান্ত সামন্ত... পূর্ণপৃথক দৃষ্টিকোণ, আর দেহ ছাড়ার তাড়ায় চোখের আয়নায় মুখ দেখতে ভুলে গেছি আমি যেটুকু আঁধার জোনাকি-আলোয় হারায় কাঁটা জেনেও সে পথেরই হই অনুগামী। বিরহ আ...
সুরসাধক ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য্যকে শ্রদ্ধার্ঘ্য -দিব্য... "একটি নাম নামেই গান সে গান শুধু ধনঞ্জয়। একটি মান দেদীপ্যমান। সে মান মানি ধনঞ্জয়। একটি প্রাণ আকাশ প্রাণ। সে প্রাণ জানি ধনঞ্জয়।" শ্রদ্ধাঞ্জলি........
সেই পাগলটা – বর্ষা বেরা... সেই পাগলটা তাকে প্রথম দেখেছিলাম গড়িয়ার মোড়ে | অদ্ভুত পোশাক তার,অদ্ভুত সব কার্যকলাপ কখনও নিজের চুল ছিঁড়ছে,কখনও বা ছুটছে লোকের পিছনে, তবু নেই তার আত...
গেম – সাবিহা সুলতানা...        অনেকক্ষন থেকে কলিংবেল টিপছে শাহেদ, কিন্তু ভেতর থেকে দরজা খোলার কোন লক্ষণই নেই। দরজায় কয়েকবার কান পাতে সে , নাহ, কেউ এগিয়ে আসছে বলেও মনে...
ADMIN

Author: ADMIN

Comments

Please Login to comment