সঙ্গী – অনিন্দিতা পাল (অর্না)

ভূমির মনটা খারাপ। সারাদিন মোবাইল ঘাটায় ওর মা ওকে বকেছে। কিচ্ছু ভাল লাগছে না ওর। বন্ধু অর্নাকেও অনেকবার ফোন করল সেও ফোনটা ধরছে না। কলেজে কিছু কাজ আছে তাই কলেজ যেতে হবে। অর্নার ফোনটা এখনও সুইচ অফ্ বলছে। তাই ওর ওপরে বেশ রাগ হয়। অগত্যা মায়ের চেঁচামেচি শুনতে শুনতে বিষণ্ন মুখে কলেজের পথে বেরোয়।
ভূমি রাস্তা চলা শুরু করুক তার মধ্যেই জানিয়ে দিই অর্না আর ভূমির পরিচয়। ভূমি ও অর্না দুজনে ছোটোবেলার খুব ভালো বন্ধু। বন্ধুত্বের বন্ধন ছিন্ন করে কেউ কাউকে ছেড়ে যেতে পারেনি। এখন তারা উত্তরপাড়া গার্লস কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্রী। একজনের যদি মনে দুঃখ মুখে হাসি থাকে তবে অপরজন সহজেই বুঝে যায় তার কষ্ট। সেই অর্নার ওপর ভূমি অভিমান করেছে।

     ভূমি সাইকেল নিয়ে খুব ধীরগতিতে যাচ্ছে। হঠাৎই পেছন থেকে অর্নার ডাক এই ভূমি এত অভিমান করিস কেন আমার ওপর ? কালকেও রাগ করে বাড়ি থেকে বেরোলি, কলেজে এসে রাগ ভাঙালাম। আজ আবার অভিমান করলি ?
অভিমানী সুরে ভূমি বললো ‘তোকে সকাল থেকে কতবার ফোন করেছি ? বারবার সুইচ অফ্ বলছে। একবারো নিজে থেকে ফোন করতে ইচ্ছা হয় না ?’
অর্না হাসিমুখ করে বলল ‘সরি রে, ভুল হয়ে গেছে। কিন্তু তোর কী হল ? বয়ফ্রেন্ডের সাথে ঝগড়া ? নাকি বাড়িতে ঝামেলা ?
সবসময়ের মতো ভূমির সেই একই উত্তর কিছু হয়নি আমার। অর্না মনে  মনে ভাবে তোর পেট থেকে ঠিক খবর বার করে নেব।
তারা কলেজে পৌঁছে যে যার বিভাগের শ্রেনীকক্ষে চলে যায়। ভূমির ক্লাস শেষ হতেই
শ্রেনীকক্ষ থেকে বেরিয়ে এসে দেখে অর্না বাইরে দাড়িয়ে। ভূমি অর্নাকে জিজ্ঞেস করে ‘কিরে তোর ক্লাস হয়নি ?’ অর্না মুচকি হেসে উত্তর দেয় ‘হ্যাঁ, হয়েছে তো। স্যার তাড়াতাড়ি ছেড়ে দিল।’
ভূমি অর্নাকে বলে জানিস তো আজ খুব শশ্মান ঘাটে  যেতে ইচ্ছে করছে। অর্না বলল ‘শশ্মান ঘাটে কেন যাবি ? সখেরবাজার ঘাটে চল।’ ভূমি বলল না..না, আজ শশ্মান ঘাটে যাব। সখেরবাজার ঘাটে তো প্রতিদিন যাই। অর্নাও আর দ্বিমত প্রকাশ করল না। শুধু বলল ‘হ্যাঁ তাই চল। সত্যিটা জানানোর সময় হয়ে গেছে।’ ভূমি বিস্মিত ভাবে অর্নার দিকে তাকিয়ে বলল ‘কীসের সত্যি ?’ অর্না বলল ‘চল ওখানে গিয়ে বলব। ভূমির চোখের সামনেই অর্না যেন একটু অন্যরকম হয়ে গেল। রাস্তায় হেঁটে আসতে আসতে ভূমির মনখারাপের কারণটা জেনে নিল। কলেজ থেকে শশ্মান ঘাটের দূরত্ব বেশি নয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘাটে পৌঁছে দেখল খুব ভিড় ঘাটেতে। একটা মৃতদেহের গাড়ি এসেছে, তাই এত ভিড়। সামনে এগোতেই দেখতে পেল দেওয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে অর্নার প্রেমিক অংশু। ভূমি কাছে গিয়ে সবেমাত্র বলতে যাবে অংশুদা তুমি এখানে কেন? তার আগেই অংশু ভূমিকে দেখে বলল তুমিও এসেছো ? তোমার বন্ধু তো আমাকে ছেড়ে চলে গেল। একবারো ভাবল না, কত সহজে সব বন্ধন টুকরো টুকরো করে দিল।

      ভূমি অংশুর কোনো কথাই বুঝতে পারছে না। অংশুদা ভূমির কোন বন্ধুর কথা বলছে ? ওর কোন বন্ধু অংশুদা কে ছেড়ে গেল ? এসব যখন ভাবছে অংশু তখন বলল, ‘দেখো একা একা কেমন ঘুমিয়ে আছে, আমরা এতো কান্নাকাটি করছি একবারো চোখ খুলছে না। এত কিছুর মধ্যে ভূমি অর্নাকেও দেখতে পাচ্ছে না, কোথায় যে গেল মেয়েটা..
মৃতদেহের সামনে খুব ভিড়, তাই মৃতদেহের মুখটাও দেখা যাচ্ছে না। সারাশরীরে কেমন যেন অস্বস্তি শুরু হয়ছে ভূমির। মৃতদেহের মুখটা খুব দেখতে ইচ্ছা করছে। গাড়ির ভিতর থেকে মৃতদেহটা বার করা হল। এবার চুল্লিতে পোড়ানো হবে। মৃতদেহটা বার করে এনে মাটিতে রাখতেই দৃষ্টি যায় মৃতদেহের ওপর। চোখের ওপর তুলসী পাতা, নাকে তুলো দেওয়া, পায়ে আলতা মাখানো সেই মৃতদেহটা আর কারোর নয়, ভূমির সেই ছোটবেলার বন্ধু, এতদিনের খেলার সঙ্গী অর্নার। খুব সুন্দর করে সাজিয়েছে অর্নাকে। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারে না ভূমি। তখনই ভূমি অনুভব করে অর্না যেন তাকে বলছে বুঝলি এবার কোন সত্যিটা বলার কথা বলছিলাম। এখনও ধোঁয়াশায় আছিস তবে কালকের কথা মনে কর। ভূমি ভাবতে থাকে আগেরদিনের কথা। অর্না বাড়ি থেকে বেরোতে দেরি করায় অর্নার ওপর ভূমি রাগ করে। অর্না ভূমির বাড়ির কাছে আসতেই ভূমি ওকে দেখে তাড়াতাড়ি সাইকেল চালাতে শুরু করে। অর্নাও ভূমির মতো জোড়ে সাইকেল চালায়। কিন্তু শুধুমাত্র ভূমির দিকে লক্ষ্য রাখতে গিয়ে ওর সামনে এগিয়ে আসা লরির দিকে লক্ষ্য করে না। ধাক্কা খেয়ে পড়ে যায়। লরির ড্রাইভারও হতভম্ব হয়ে ব্রেক টিপতে ভুলে যায়। পিষে দেয় অর্নাকে।

ভূমি কিছুদূর এগিয়ে যাওয়ার পর অর্নাকে পেছনে দেখতে না পেয়ে দাঁড়িয়ে যায়। দাঁড়িয়ে পিছনে তাকাতেই চোখের পলকে যেন অর্না সামনে চলে আসে। এসে ভূমিকে বলে দাঁড়ালি কেন চল ? ভূমি সাইকেল চালানো শুরু করবে ঠিক তখনই পিছন থেকে চেঁচামেচির আওয়াজ পায়। ও পিছনে তাকাতে যাবে….অর্না আবার বলে ওঠে কলেজে দেরি হচ্ছে তো চল। ভূমির কাছে এবার স্পষ্ট। কাল থেকে যে ওর সাথে ছিল সেটা সশরীর অর্না নয়, অর্নার আত্মা। ভূমি কাঁদতে কাঁদতে অর্নার মৃতদেহের দিকে তাকিয়ে বলে আমার অজান্তেই এতদিনের বন্ধন ছিন্ন করে দিলি ? অর্নার মৃতদেহ যেন চোখমেলে বলে ওঠে আমি যাইনি তোদের সাথেই আছি। অংশু এতক্ষণ পর অর্নাকে স্পর্শ করার সুযোগ পেয়েছে। এখন তো আর তাদের সম্পর্ক বাড়িতে জানাজানি হলে কোনো ক্ষতি হবে না। সম্পর্কে জড়িয়ে থাকা দুটো মানুষের মধ্যে একটা মানুষতো আজ নিঃশব্দে মৃতদেহে পরিণত হয়েছে। আবেগের তাড়নায় অংশু অর্নার মৃতদেহকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে। অপরিচিত এক ব্যক্তির অর্নাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদার জন্য সবাই তাকিয়ে থাকে অংশুর দিকে। অংশু তখন তার অর্নাকে আদর করতে ব্যস্ত। হাতের মুঠোয় বন্দি করে রাখা সিঁদুরকৌটো থেকে সিঁদুর নিয়ে অংশু অর্নার সিঁথি রাঙিয়ে তোলে। সবাই মিলে অংশুকে সরানোর চেষ্টা করে তখন ভূমি এগিয়ে এসে অংশুর পরিচয় দেয়। অর্নার বাবা সব শুনে অংশুকে বুকে জড়িয়ে ধরে। মৃতদেহটা চুল্লিতে ঢোকানো হয় তখনই অর্নার বাবা আর অংশুর কানে কানে এসে কেউ বলে যায় আমি আজ সম্পূর্ণ ।

____


FavoriteLoading Add to library
Up next
মনে আছে – সুস্মিতা দত্তরায়... বয়স এগিয়ে গেছে- ঝাপসা স্মৃতির অন্তরালে প্রেমটা রয়ে গেছে । সেই যে তখন ছুটির দিনে কাপড় মেলা ছাদে লজ্জা খুশির লুকোচুরি সোহাগ মাখানো রোদে । ...
করিডোর - বর্ষা বেরা   ব্ল্যাক করিডোর,কানে হেডফোন,কফিতে চুমুক        হাতে ব্যোমকেশ। মুখে সাদা ধোঁয়া,গুনছে প্রহর,এক ঝড়েতেই    সবশেষ ।। হঠাৎ বসন্ত,...
মাছওয়ালী – পলাশ মজুমদার... ' ওই মাছটা কত করে দিচ্ছিস? ' - কোনটা, দেশী না বিলাসপুর? ' দেশী ' - দেশী একশো আশি, বিলাসপুর কুড়ি, পোনা দেড়শো। ' আর কাতলাটা? ' - ওটা তুই নিতে পারবি...
পাখি পাঁচালী – সৌম্য ভৌমিক... পাতি কাকটা তক্কে আছে কখন বেরোবে চড়াই, দোয়েল রানী শিস দিয়ে যায় না করে বড়াই। টেলিগ্রাফের তারে বসে ফিঙেটা লেজ নাড়ে, শুনতে পেলাম ঝগড়া করে তিনটে ছ...
ঝিলের ধারে বাড়ি – গার্গী লাহিড়ী... আমার ঝিলের ধারে বাড়ি কোনো এক অতীতে ছাদের কোন ঘেঁষে রঙিন সুতোর দড়িতে আলতো একটু হেসে হওয়ার সাথে সই পাতাতো তোমার জংলা ডুরে শাড়ী এখন সময় শুধুই বয়ে ...
আবর্ত – সৈকত মন্ডল... যারা ভাঙাচোরা অতীত থেকে উঠে আসে, হটাৎ পেয়ে যাওয়া উষ্ণতার স্রোতে ভেসে, বোধ হয় তারাই জানে স্বপ্নভাঙ্গার আঘাত টা, বোঝে, মুহূর্তে নিঃস্ব হাওয়ার আকস...
দেশ ভালো আছে -সৌভিক মল্লিক... তবু কেমন যেন একটা অতৃপ্তি থেকে যায়। ক্ষুদ্র আনন্দ নিখোঁজের শোকে হয়তো। কখনো মাটি মাখিয়ে এ শরীরের স্বচ্ছতায় যদি ভালোবাসার দূর্গ স্থাপন করা যেতো! ...
ল্যাম্প – অর্পণ সামন্ত... -আরেহ্,ডাক্তারবাবু যে! পিছনে ফিরে তাকালেন ডক্টর মহেন্দ্রলাল সরকার।সন্ধ্যার সামান্য অন্ধকার কিন্তু এই গলিটাতে নিকষ কালো অন্ধকার।বয়েস বাড়ছে,চোখের তীব্র...
উত্তোরণ – সৈকত মন্ডল... যদি ভাবো এক লহমায় সরিয়ে নেবে নিজেকে, তবে থামো, এ সূর্য শেষ সকালের নয়... যদি মনে করো কফিনের নিস্তব্ধতায় মিলিয়ে যাবে, তবে বলে যাও, চেষ্টারও উর্দ্ধে ক...
উপহার – বিভূতি ভূষন বিশ্বাস... মায়ের হাত ধরে কাঁচা রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে আছি । একেবারে অজপাড়াগাঁ ফাঁকা রাস্তা,লোকজন নেই বললেই চলে । দুটি ছোট্ট ছেলে কাঁধে হাত দিয়ে হেঁটে আসছে । আমার থ...
ADMIN

Author: ADMIN

Comments

Please Login to comment