সত্যজিতের চিড়িয়াখানা-প্রচুর আলোচনা ও সামান্য সমালোচনা -অস্থির কবি

কটা সিনেমা তৈরির পেছনে যে ইন্টারেস্টিং গল্পগুলো থাকে তা দিয়েই হয়তো আরেকটা সিনেমা বানানো হয়ে যেতে পারে। এরকম বহু ছবি আছে যা তৈরি হতে হাজারো বাধা এসেছিল, একসময় বন্ধ হবার উপক্রম হয়েছিল এবং হয়তো তখন অনেকেই আশাও ছেড়ে দিয়েছিল কিন্তু তা সত্ত্বেও সেই ছবিটি শেষ পর্যন্ত সম্পূর্ন হয়, রিলিজ করে এবং চলচ্চিত্রপ্রেমীদের গবেষনার বিষয় হয়ে ওঠে। এরকমই একটি ছবি ছিল সত্যজিৎ বাবুর ‘পথের পাঁচালী’। কিন্তু অনেকে জানেন আবার অনেকে জানেন ও না ওনারই আরেকটা ছবিতেও ঠিক প্রায় একরকম না হলেও অন্য ধরনের ঘটনার ঘনঘটা এসে উপস্থিত হয়েছিল। সেই সিনেমাটির নাম – ‘চিড়িয়াখানা’।

সত্যজিৎ রায়ের একজন অ্যাসিস্ট্যান্ট ছিল তার নাম ছিল রমেশ সেন, ডাক নাম ছিল পুনু সেন। যখন ‘নায়ক’ সিনেমাটা তৈরি হচ্ছিল তখন উত্তম কুমার,পুনু সেন সহ সত্যজিৎ রায়ের অ্যাসিস্ট্যান্ট দের একটা প্রস্তাব দেন যে তোরা মিলে এবার একটা সিনেমা তৈরি কর আমি অভিনয় করব। আমি যা নিই তার অর্ধেক টাকাতেই আমি অভিনয় করে দেবো। সেই প্রস্তাবটা সবার খুব ভালো লাগে তখন কয়েকজন মিলে স্টার প্রোডাকশনস বলে একটা প্রোডাকশন কোম্পানি তৈরি করে এবং সেখানে এবং সত্যজিৎ রায়ের সাথে তারা কথা বলে সত্যজিৎ রায় তাদেরকে ‘চিড়িয়াখানা’ সিনেমা করার জন্য বলেন। কয়েক হাজার টাকায় চিড়িয়াখানার কপিরাইট কেনা হয়।  নায়ক সহ সত্যজিতের অনেক ছবির যারা প্রযোজক ছিলেন অর্থাৎ আর ডি বনসল গ্রুপ তারা ‘চিড়িয়াখানা’ করতে রাজি হন কিন্তু একটা ঝামেলায় ফেঁসে যান। ‘নায়ক’ ছবিতে নকল টাকা বানানো হয়েছিল সেটার পারমিশন নেয়া হয়নি বলে তাদেরকে সাময়িক প্রোডাকশন করতে আর দেওয়া হচ্ছিল না।  রমেশ সেন এর ভাইপো রঞ্জিত সেনের পরিচিত ছিলেন ব্যবসায়ী হরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য। তাকে এই ছবিটি করার জন্য রাজি করানো হয়। তিনি বলেন উত্তম কুমার এবং সত্যজিৎ রায় একসাথে যদি কাজ করেন তাহলে তিনি টাকা দেবেন না হলে টাকা দেবেন না। বারাসাত এর কাছে একটি জায়গায় আর্ট ডিরেক্টর বংশী চন্দ্রগুপ্ত তৈরি করেন গোলাপ কলোনী ও সেখানে শুটিং শুরু হয়। শুটিং চলাকালীন উত্তম কুমার ‘ছোটিসি মুলাকাত’ এর জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েন এবং দীর্ঘ সময় শুটিংয়ের অনুপস্থিত থাকেন। যখন তিনি ফেরেন তখন ‘ছোটিসি মুলাকাত’ ফ্লপ করেছে। চিড়িয়াখানার সেট এই উত্তমকুমারের হার্ট অ্যাটাক হয়। সেই ছবিতে কাজ করছিলেন ডা. শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায়। উনি ধরে ফেলেন হার্ট অ্যাটাক এবং যার ফলে উত্তম কুমার সে যাত্রা রক্ষা পান। এরপর সুস্থ হয়ে উঠলে আবার শুরু হয় ছবির কাজ। ছবির সাউন্ড রেকর্ডিং এবং রিলিজ নিয়েও বিস্তারিত ঝামেলা হয়। সে সমস্ত কথাই পুনু সেন কিছুদিন আগে আনন্দবাজারে লিখেছেন তাই ও নিয়ে আর বেশী কথায় গেলুম না।

ছবিতে ব্যোমকেশ বক্সি র রোলটি করেছিলেন উত্তম কুমার। আজো বিতর্ক চলে যে সেরা ব্যোমকেশ কে ?  কারন ফেলুদার ভূমিকায় অভিনয় করেছেন মোট্টে চারজন অভিনেতা। নামগুলো বলি – সৌমিত্র চ্যাটার্জী, শশী কাপুর, সব্যসাচী চক্রবর্তী ও আবীর চট্টোপাধ্যায়। কিন্তু ব্যোমকেশ ছোট বড় পর্দা এবং মঞ্চ মিলিয়ে অভিনয় করেছেন প্রায় এক ডজন অভিনেতা।  তাদের মধ্যে যারা ব্যোমকেশ ভাল করেছেন, তারা হলেন – উত্তম কুমার, রজিত কাপুর, আবীর চট্টোপাধ্যায়, যীশু সেনগুপ্ত, গৌরব চক্রবর্ত্তী। এদের নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় নানারকম আলোচনা হয়। তাতে সিংহভাগেরই এখনো পছন্দ উত্তম কুমারকেই। যদিও আমার বাকিদের ও ভাল লাগে। উত্তম কুমারের পর আবীর শাশ্বত জুটিটা আমার বেশ লেগেছিল। কিন্তু শৈলেন মুখোপাধ্যায় কে অজিতের রোলে একদমই ভাল লাগেনি। অজিত ব্যোমকেশ যে কেমিস্ট্রি তা খুব ভাল ফুটিয়েছিলেন আবীর শাশ্বত। দুই বন্ধুর মতবিরোধ মতানৈক্য কি সুন্দর সেখানে। তুলনায় শৈলেন বাবু,সত্যজিৎ রায় লবির লোক বলেই ওই রোলটায় ঢুকে পড়েন। উনি অভিনেতা ভাল। বহু ছবিতে ওনাকে আমার অসামান্য লেগেছে। বিশেষত ওনার বাচন মাধুর্য্য। এত মিষ্টি করে কথা বাংলাছবির রুপালী পর্দায় পাহাড়ী সান্যাল ছাড়া আর কেউ বলেছে বলে আমার মনে পড়ছে না।

যাহোক এখানে পার্সোনাল কথা বলার জায়গা না। ছোট থেকে সিনেমা দেখছি তো। সত্যজিৎ রায়ের চয়েসকে খাটো করার ধৃষ্টতা আমার নেই কিন্তু আমিও তো একটা দর্শক। আমার মতামতের আশা করি পাঁচ পয়সা হলেও দাম আছে। এখন অচল জানি। তবু ওটুকু পেলেই আমার চলবে কারন আমি জানি বহু ফিল্ম বোদ্ধা  তীর দিয়ে বিঁধবেন সত্যজিৎ রায়ের চয়েসকে সমালোচনা করার জন্য। তাদের অবগতির জন্য বলি – রায় বাবু কিন্তু খুশি ছিলেন না। পরবর্তীকালে উনি নিজে এই সিনেমাটিকে নিজের দূর্বলতম সিনেমা আখ্যা দেন। ছবিতে উত্তমকুমার ছাড়া বড় স্টার ছিল না। যদিও উত্তমকুমার যেখানে থাকেন সেখানে তিনি থাকলেই এনাফ। তার অভিনয় দেখার জন্যই লোকে ছবি দেখে। কিন্তু কোন সিনেমাকে অ্যাজ এ ফিল্ম  কারো হৃদয় ছুঁতে গেলে কিছু কিছু জায়গায় ফ্ল্যাশ করতে হবে। দর্শককে চমকে দিতে হবে। সেটা চিড়িয়াখানায় একদমই ছিল না এটা বলছি না। তবে সেটা  চিড়িয়াখানায় যথেষ্ট ল্যাক করেছে বলেও আমার মনে হয়। দেখুন আমার যা মনে হয় তা-ই তো আমি লিখব। কোন কিছু লাগল ভাল, কিন্তু তাকে বাংলার পাঁচের মত মুখ করে চিবিয়ে চিবিয়ে বলব – লেগেছে মোটামুটি, আর হৃদয়কে একদমই টাচ না করা  সত্ত্বেও বলব দারুন লেগেছে সেটা পারব না। ক্রিটিক আমি নই। আমি সাধারন কমার্শিয়াল ছবির দর্শক। সেই অ্যাঙ্গেল থেকেই বিচারটা করব। আমার পয়েন্ট অফ ভিউ কারো পছন্দ নাও হতে পারে কিন্তু এটা ভাববেন না যে আমার কিছু বলার অধিকারই নেই।  চিড়িয়াখানা ছবি হিসাবে আমার কাছে ক্লাস কিন্তু এটাও ঠিক কিছু কিছু জায়গা বেশ একঘেয়ে লাগে।

‘ নায়ক’ এ  যে উত্তমকুমারকে আমরা পাই তাকে কিন্তু আমরা এখানেও কিছুটা পাই। সেটা সেলফ কনশাসনেস কিনা জানি না। উত্তমকুমার কে দেখলেই এই ছবিতে মনে হবে উনি জানেন – কার সিনেমায় উনি অভিনয় করছেন। এ একদম আলাদা উত্তমকুমার। কি তার ইনভলভমেন্ট ক্যারেকটারের প্রতি। এই জিনিসটা কিন্তু সৌমিত্র বাবুর চোখ এড়িয়ে যায়নি। উনি যেহেতু নিজে সত্যজিৎ রায়ের বহু সিনেমায় কাজ করেছেন, উনি জানেন সত্যজিৎ ঘরানাটা ঠিক কি রকম। উনি বলেছেন বহু সাক্ষাৎকারে যে নায়কের থেকে চিড়িয়াখানায় উত্তমদার আমার অনেক বেশী ভাল লাগে। এটাও বলেছেন,  উত্তমদা কত ইন্টেলিজেন্ট অভিনেতা যে একটা ছবিতে কাজ করেই উনি মাণিকদার কাজের স্টাইলের সাথে নিজেকে একাত্ম করে নিয়েছিলেন। দুজনার মধ্যে রেষারেষি ছিল মারাত্মক । সৌমিত্র বাবুর দিক থেকে হয়ত সেটা বেশীই হয়ে থাকবে। কিন্তু সেটা খুব ব্যাক্তিগত একটা জায়গা। প্রেসকে কিন্তু উনি উত্তমকুমারের নামে আজেবাজে কখনো বলেননি যদিও আরো অনেকের নামে বলেছেন। উত্তমকুমারের নামে কিন্তু ওনার মুখে বেশীরভাগ সময়েই ভাল কথাই শোনা গেছে। ওনার অতি বড় শত্রু ও এটা অস্বীকার করতে পারবেন না। ছবিতে সুশীল মজুমদার, কনিকা মজুমদার, নৃপতি চ্যাটার্জী কে খুব ভাল লাগে তাদের নিজ নিজ চরিত্রে। কিন্তু আবার একটু ব্যাক্তিগত ভাললাগার কথা বলি- চিন্ময় রায়ের একটা বিস্ময়ের অভিব্যাক্তি  আর সুব্রতা চ্যাটার্জীর একটা হাসির সিন এই সিনেমায় ভুলতে পারি না। সুলালবাবু অর্থাৎ জহর গাঙ্গুলী বেশ বনেদি টাইপ ক্যারেকটারে দারুন অভিনয় করেন এ ছবিতে।

ছবির কাহিনীটি এরকম – নিশানাথ সেন একজন রিটায়ার্ড জজ। ফুলের ব্যবসা তার। তার নির্মিত গোলাপ কলোনীতে ঠাঁই দিয়েছেন তাদের যাদের এক কালে শাস্তি দিয়েছিলেন। সত্যি কি ইউনিক স্টোরিলাইন। নিশানাথ বাবুর দুশ্চিন্তা তাদের মধ্যে কেউ যদি রাগ পুষে রেখে তার ক্ষতি করে। সেই সন্দেহেই সত্যান্বেষী ব্যোমকেশ বক্সির সাহায্য নিতে তার আগমন। আর ভালবাসার তুমি কি জানো বলে একটা পুরানো ছবির গান কে উনি ক্লু হিসাবে ব্যোমকেশের কাছে রেখে যান। ব্যোমকেশ যায় সেখানে জাপানী বেশে। এরপরের সিনে দেখা যায় ব্যোমকেশের কাছে একটা ফোন আসে যে নিশানাথ খুন হয়েছেন। এবার ব্যোমকেশ তদন্তে নামেন যে খুনটা করল কে । এই সিনেমাটি ছিল হুডানিট টাইপের। অর্থাৎ খুনটা কে করেছে তা বোঝা যাবে সবার শেষে। হুডানিট সিনেমায় সত্যজিতের পছন্দ ছিল না। কারণ একবার মানুষ যদি জেনে যায় খুন করেছে তাহলে সেকেন্ড টাইম সে আর সিনেমাহলে আসবে না। সিনেমা রিপিট অডিয়েন্স পাবে না। এই রিপিট অডিয়েন্স শব্দটা এখন শুনতে ডায়নসোরের মত লাগে। একবার দেখারই সময় নেই কারো তো রি-পিট ! নতুন ছবির চেয়ে বরং ইউটিউবে উত্তমকুমারের সিনেমা এখন রিপিট অডিয়েন্স পায়।কোন জাদুতে আজো মানুষ দেখে চলে সেই সব ছবি। যাহোক চিড়িয়ায় ফিরি।যদিও একটাও চিড়িয়া ছিল না বরং একটা সাপ ধরিয়ে দেন সত্যজিৎ উত্তমকুমারের হাতে। কে এই উদ্ভট আইডিয়া ওনার মাথায় ঢোকালো তা ভগবানই জানেন। সিনেমার সাথে তা কোন ভাবেই রিলেট করেনি। হয়ত চিড়িয়াখানা বললেই আমাদের যে জিনিসটার কথা মনে পড়ে সেই জন্তু জানোয়ারের কিছুই ছবিতে ব্যবহারের জায়গা নেই দেখেই সত্যজিৎ সাপের ব্যবহার করেন। বিচিত্র জীব এই সাপ – এই সংলাপটি অবশ্য উত্তমকুমারের কন্ঠে শুনতে ভারী ভাল লেগেছিল।

ছবি করার জন্য ‘চিড়িয়াখানা’ খুব ভাল কনটেন্ট নয় বলে এই ছবির কাহিনিকার বা মূল উপন্যাসের রচয়িতা শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় মনে করতেন। কিন্তু ছবি হয়, একাধিক পুরষ্কার সন্মান ও পায়। উত্তমকুমার এ ছবিতে অভিনয়ের জন্য ভরত পুরষ্কার পান। পরবর্তীকালে অঞ্জন দত্ত একই বিষয় নিয়ে ব্যোমকেশ ও চিড়িয়াখানা বলে একটি ছবি তৈরি করেন। সেটা একটা রদ্দি মার্কা ছবি হয় এবং এই সিনেমাটারই বি গ্রেড সংস্করন হয়ে দাঁড়ায়।

____


ADMIN

Author: ADMIN

Comments

Please Login to comment